logo

দ্বৈত নাগরিকত্বের জটিলতা, সুখবর পেলেন ২১ প্রার্থী

দ্বৈত নাগরিকত্বের জটিলতা, সুখবর পেলেন ২১ প্রার্থী

ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে দ্বৈত নাগরিকত্বের অভিযোগ আছে, এমন প্রার্থীদের জন্য নমনীয় হয়েছে নির্বাচন কমিশন (ইসি)। শেষ দিন গতকাল রোববার (১৮ জানুয়ারি) আপিল শুনানিতে ২১ প্রার্থীর প্রার্থিতা বহাল রাখা হয়েছে। এ সময় বাতিল হয়েছে তিন প্রার্থীর মনোনয়নপত্র। স্থগিত রয়েছে এক প্রার্থীর আপিল। এর মধ্য দিয়েই শেষ হয়েছে ইসির টানা ৯ দিনের আপিল শুনানি।

শুনানি শেষে রোববার রাতে প্রধান নির্বাচন কমিশনার (সিইসি) এএমএম নাসির উদ্দিন বলেছেন, রিটার্নিং কর্মকর্তাদের সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে করা আপিল শুনানিতে কোনো পক্ষপাত করিনি। স্বতন্ত্র প্রার্থীদের আমরা ১ শতাংশ ভোটারের সমর্থনের বিষয়টিও ছেড়ে দিয়েছি। আমরা চাই, সবার অংশগ্রহণে একটা সুন্দর নির্বাচন হোক।

এদিন সব মিলিয়ে আরও ৪১ প্রার্থীর মনোনয়নপত্র বৈধ হয়েছে। আর বাতিল হয়েছে ২০ জনের মনোনয়নপত্র। বাতিল প্রার্থীদের মধ্যে একজন অনুপস্থিত থাকায় তার মনোনয়নপত্র অবৈধ হয়। এ ছাড়া দুটি আপিল অপেক্ষমাণ রাখা হয়েছে।

গত ৯ দিনে ইসিতে আপিল করে ৪৩৮ জন প্রার্থিতা ফিরে পেলেন। তবে ইসি ২০৩ জনের মনোনয়নপত্র অবৈধ ঘোষণা করায় তারা প্রার্থিতা হারিয়েছেন। প্রয়োজনীয় কাগজপত্র প্রদান সাপেক্ষে পরবর্তী সিদ্ধান্তের জন্য দুটি আবেদন স্থগিত রেখেছে ইসি।

এদিন দ্বৈত নাগরিকত্বের অভিযোগ দিয়ে প্রতিপক্ষ প্রার্থীর আপিল নামঞ্জুর করে বিএনপির হেভিওয়েট প্রার্থী ও ফেনী-৩ আসনের আবদুল আউয়াল মিন্টুর প্রার্থিতা বহাল রাখে ইসি। এ ছাড়া একই অভিযোগ থাকলেও মনোনয়নপত্র দাখিলের আগে বিদেশি নাগরিকত্ব ত্যাগের প্রমাণপত্র ও অ্যাফিডেভিটসহ প্রয়োজনীয় কাগজপত্র জমা দিলে বিএনপির আরও আট প্রার্থী বৈধ বিবেচিত হন।

তারা হলেন– দিনাজপুর-৫ আসনের একেএম কামরুজ্জামান, সাতক্ষীরা-৪-এর মনিরুজ্জামান, ফরিদপুর-২ শামা ওবায়েদ, সুনামগঞ্জ-২ তাহির রায়হান চৌধুরী, মৌলভীবাজার-২ শওকতুল ইসলাম শকু, ব্রাহ্মণবাড়িয়া-৪ মুশফিকুর রহমান, শেরপুর-২ ফাহিম চৌধুরী এবং মানিকগঞ্জ-৩ আসনের আফরোজা খানম রিতা। এ ছাড়া কুমিল্লা-৩ আসনের বিএনপির প্রার্থী কাজী শাহ মোফাজ্জল হোসাইন কায়কোবাদের মনোনয়নপত্র স্থগিত রাখা হয়।

দ্বৈত নাগরিকত্বের জটিলতা থাকলেও শুনানিতে প্রার্থিতা ফিরে পান জামায়াতে ইসলামী, জাতীয় পার্টি, জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি), ইসলামী আন্দোলন এবং স্বতন্ত্র মিলিয়ে ১৩ প্রার্থী।

তারা হলেন– ঢাকা-১ আসনে জামায়াত প্রার্থী মোহাম্মদ নজরুল ইসলাম, সুনামগঞ্জ-৩ স্বতন্ত্র আনোয়ার হোসেন, হবিগঞ্জ-১ স্বতন্ত্র শেখ সুজাত মিয়া, ব্রাহ্মণবাড়িয়া-৩ জামায়াতের জুনায়েদ হাসান, নোয়াখালী-১ ইসলামী আন্দোলনের জহিরুল ইসলাম, রংপুর-১ জাতীয় পার্টির মঞ্জুম আলী, চাঁপাইনবাবগঞ্জ-২ জাতীয় পার্টির খোরশেদ আলম, নাটোর-১ খেলাফত মজলিসের আজাবুল হক, যশোর-২ জামায়াতের মোসলেহ উদ্দিন ফরিদ, চট্টগ্রাম-৯ জামায়াতের ডা. একেএম ফজলুল হক, চট্টগ্রাম-৩ ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের আমজাদ হোসেন, কুড়িগ্রাম-৩ জামায়াতের মাহবুব আলম সালেহী এবং সিলেট-১ আসনে এনসিপির প্রার্থী এহতেশামুল হক।

তবে দ্বৈত নাগরিকত্বের অভিযোগে প্রার্থিতা বাতিল হয় কুমিল্লা-১০ আসনের বিএনপির প্রার্থী আবদুল গফুর মিয়া, ময়মনসিংহ-৬ আসনের স্বতন্ত্র তানভীর আহমেদ রানা এবং কিশোরগঞ্জ-১ আসনের ইসলামী আন্দোলনের প্রার্থী আজিজুর রহমান।

এ ছাড়া ঋণখেলাপির অভিযোগ থাকা চট্টগ্রাম-৪ আসনে বিএনপির প্রার্থী আসলাম চৌধুরীর প্রার্থিতা বহাল রাখা হয়েছে। একই অভিযোগে চট্টগ্রাম-২ আসনের একই দলের প্রার্থী সারোয়ার আলমগীরের প্রার্থিতা বাতিল করেছে নির্বাচন কমিশন (ইসি)। বাতিল হয়েছে অন্যান্য দল ও স্বতন্ত্র মিলিয়ে আরও ১৬ জনের মনোনয়নপত্র।

এদিকে গত ৯ দিনের শুনানিতে বিএনপির মোট চার প্রার্থীর মনোনয়নপত্র বাতিল হয়। রোববার দুজন ছাড়াও এর আগে ঋণখেলাপির দায়ে শনিবার কুমিল্লা-৪ আসনের বিএনপি প্রার্থী মঞ্জুরুল আহসান মুন্সী এবং গত ১৩ জানুয়ারি যশোর-৪ আসনে একই দলের টিএইচ আইয়ুবের মনোনয়নপত্র বাতিল করে ইসি।  

রাজধানীর আগারগাঁওয়ে নির্বাচন ভবন মিলনায়তনে রোববার সকাল ১০টা থেকে কয়েক দফা বিরতি দিয়ে রাত সোয়া ৮টা পর্যন্ত নবম ও শেষ দিনের আপিল শুনানি অনুষ্ঠিত হয়। প্রধান নির্বাচন কমিশনার (সিইসি) এএমএম নাসির উদ্দিনের সভাপতিত্বে অন্য চার নির্বাচন কমিশনার শুনানি করেন। ইসির জ্যেষ্ঠ সচিব আখতার আহমেদ ও আইন শাখার কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।   

শুনানি শেষে ইসি থেকে জানানো হয়, শেষ দিনে ৬১১ থেকে ৬৪৫ নম্বর পর্যন্ত ক্রমিকের আপিল এবং আগে অপেক্ষমাণ থাকা ৩৫টি মিলিয়ে মোট ৬৩টি আপিলের নিষ্পত্তি করে ইসি। যার মধ্যে মনোনয়নপত্র বাতিলের বিরুদ্ধে ২১টি এবং গ্রহণের বিরুদ্ধে দুটি মোট ৪৫টি মঞ্জুর করা হয়। আরও ৩৫টি নামঞ্জুর করা হয়। মনোনয়নপত্র বাতিলের বিরুদ্ধে নামঞ্জুর হয়েছে ১৮টি এবং গ্রহণের বিরুদ্ধে করা আরও ১৬টি আপিল। রিটার্নিং কর্মকর্তা কর্তৃক মনোনয়নপত্র বাতিলাদেশ বহাল রাখা সংক্রান্ত একটি আপিল নামঞ্জুর হয়েছে। শুনানিকালে তিনটি আপিল প্রত্যাহার করে নেওয়া হয়। একজন অনুপস্থিত ছিলেন এবং কমিশন দুটি আপিল আবেদন অপেক্ষমাণ রেখেছে।

এর আগে গত ৩০ ডিসেম্বর থেকে ৪ জানুয়ারি মনোনয়নপত্র বাছাইকালে মোট দুই হাজার ৫৬৮টি মনোনয়নপত্রের মধ্যে এক হাজার ৮৪২ জন প্রার্থীর মনোনয়নপত্র বৈধ ঘোষণা করেন রিটার্নিং ও সহকারী রিটার্নিং কর্মকর্তারা। ৭২৩ জনের প্রার্থিতা বাতিল করা হয়। এ ছাড়া বিএনপি চেয়ারপারসন ও সাবেক প্রধানমন্ত্রী  খালেদা জিয়ার মৃত্যুতে তাঁর পক্ষে তিনটি আসনে দাখিল করা তিনটি মনোনয়নপত্র বাছাই ছাড়াই কার্যক্রম শেষ করা হয়। 

ইসির প্রাথমিক বাছাই তালিকা বিশ্লেষণে দেখা যায়, স্বতন্ত্র প্রার্থীদের মধ্যে বেশির ভাগ বাদ গেছে ১ শতাংশ সমর্থন সূচক স্বাক্ষর না থাকায়। এ ছাড়া দ্বৈচয়নের ভিত্তিতে ভোটারকে খুঁজে না পাওয়া, সার্টিফিকেটের কপি দাখিল না করা, রিটার্নের কপি দাখিল না করা, হলফনামায় ম্যাজিস্ট্রেটের স্বাক্ষর না থাকা ইত্যাদি।

গত ৫ থেকে ৯ জানুয়ারি মনোনয়নপত্র গ্রহণ ও বাতিলের আদেশের বিরুদ্ধে আপিলের সুযোগ দেয় নির্বাচন কমিশন। নির্বাচন ভবন প্রাঙ্গণে আপিল কেন্দ্রে অঞ্চলভিত্তিক ১০টি বুথে এই পাঁচ দিনে মোট ৬৪৫টি আপিল জমা পড়ে। বেশ কটি ছিল মনোনয়নপত্র গ্রহণের বিরুদ্ধেও। গত ১০ জানুয়ারি এসব আপিলের শুনানি শুরু করে ইসি।

সিইসি এএমএম নাসির উদ্দিন প্রার্থী ও তাদের প্রতিনিধিদের উদ্দেশে বলেন, ‘আপনারা হয়তো আমাদের সমালোচনা করতে পারেন। স্বতন্ত্র প্রার্থীদের ১ শতাংশ ভোটারের সমর্থনসূচক স্বাক্ষরের বিষয়টা আমরা কীভাবে ছেড়ে দিয়েছি, আপনারা দেখেছেন। বিকজ উই ওয়ান্ট দ্য ইলেকশন টু বি পার্টিসিপেটেড। আমরা চাই, সবার অংশগ্রহণে একটা সুন্দর নির্বাচন হোক। আপনারা সহযোগিতা না করলে কিন্তু হবে না।’

সিইসি বলেন, ‘আই ক্যান অ্যাশিউর আমার তরফ থেকে এবং আমার টিমের পক্ষ থেকে কোনো পক্ষপাতিত্ব করে কোনো জাজমেন্ট আমরা দিইনি। আপনারা কোয়ারি করেছেন কোয়ারি জবাব দিয়েছেন, আই এম এমেজ টু সি অ্যাট দিস। এটা আমাদের আলেম-ওলামারা বাহাস বলেন। আপনাদের আমি আন্তরিক মোবারকবাদ জানাই ইসির পক্ষ থেকে। আমি আশা করব, ভবিষ্যতেও আপনাদের কাছ থেকে এ ধরনের সহযোগিতা পাব।’

এ সময় নির্বাচন কমিশনার ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) আবুল ফজল মো. সানাউল্লাহ বলেন, আমরা ঋণখেলাপি যাদের ছাড় দিয়েছি, মনে কষ্ট নিয়ে দিয়েছি। শুধু আইন তাদের পারমিট করেছে বিধায়।

নির্বাচনী তপশিল অনুযায়ী, প্রার্থিতা প্রত্যাহারের শেষ তারিখ ২০ জানুয়ারি। রিটার্নিং কর্মকর্তা চূড়ান্ত প্রার্থী তালিকা প্রকাশ করে প্রতীক বরাদ্দ করবেন ২১ জানুয়ারি। নির্বাচনী প্রচারণা শুরু হবে ২২ জানুয়ারি। প্রচার চালানো যাবে ১০ ফেব্রুয়ারি সকাল সাড়ে ৭টা পর্যন্ত। আর জাতীয় নির্বাচন ও গণভোটের ভোট গ্রহণ করা হবে ১২ ফেব্রুয়ারি সকাল সাড়ে ৭টা থেকে বিকেল সাড়ে ৪টা পর্যন্ত।