কে এই নতুন পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী হুমায়ুন কবির

মন্ত্রিসভায় রদবদলের অংশ হিসেবে প্রধানমন্ত্রীর পররাষ্ট্রবিষয়ক উপদেষ্টা হুমায়ুন কবিরকে পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রীর দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। শুক্রবার (২১ আগস্ট) বঙ্গভবনের দরবার হলে নবনির্বাচিত রাষ্ট্রপতি মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর তাকে প্রতিমন্ত্রী হিসেবে শপথ পড়ান। তিনি টেকনোক্র্যাট কোটায় প্রতিমন্ত্রীর দায়িত্ব পেয়েছেন।
এর আগে প্রধানমন্ত্রীর পররাষ্ট্রবিষয়ক উপদেষ্টা হিসেবে তিনি পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ছাড়াও দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ এবং বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বে ছিলেন।
সিলেটের সন্তান, বেড়ে ওঠা যুক্তরাজ্যে
হুমায়ুন কবিরের শিকড় সিলেটের ওসমানীনগরে। যুক্তরাজ্যে বেড়ে ওঠা এই রাজনীতিক উচ্চশিক্ষাও সম্পন্ন করেছেন দেশটির কয়েকটি খ্যাতনামা বিশ্ববিদ্যালয়ে। ইউনিভার্সিটি অব সাসেক্স থেকে আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিষয়ে বিএ (অনার্স) করার পর তিনি লন্ডন স্কুল অব ইকোনমিকস অ্যান্ড পলিটিক্যাল সায়েন্স (এলএসই) থেকে রাজনীতিতে মাস্টার্স করেন। এরপর ইউনিভার্সিটি অব কেমব্রিজ থেকে ব্যবস্থাপনায় মাস্টার্স এবং লিডস ল স্কুল থেকে আইনে এলএলএম ডিগ্রি অর্জন করেন।
তার শিক্ষাগত ও পেশাগত অভিজ্ঞতার বড় অংশই যুক্তরাজ্যকেন্দ্রিক। ব্রিটিশ রাজনীতি, প্রশাসন ও আন্তর্জাতিক সম্পর্কের সঙ্গে দীর্ঘদিন যুক্ত থাকার অভিজ্ঞতা রয়েছে তার। বিভিন্ন সূত্রে জানা যায়, তিনি লন্ডনের মেয়রের কার্যালয়ে কৌশলগত সহকারী হিসেবে কাজ করেছেন। পরে লিউইশাম এক্সিকিউটিভ মেয়রের কার্যালয়ে কেবিনেট উপদেষ্টা হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেন।
ব্রিটিশ সরকারের গুরুত্বপূর্ণ দপ্তরে কাজ
হুমায়ুন কবিরের কর্মজীবনের উল্লেখযোগ্য অধ্যায় যুক্তরাজ্য সরকারের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ দপ্তরে কাজের অভিজ্ঞতা। তিনি সাবেক ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী বরিস জনসন ও ঋষি সুনাকের সময় যুক্তরাজ্যের ক্যাবিনেট অফিসে কাজ করেছেন। এ ছাড়া সাবেক প্রধানমন্ত্রী লিজ ট্রাসের সঙ্গেও কাজ করার অভিজ্ঞতা রয়েছে তাঁর।
ব্রিটিশ সরকারের প্রশাসনিক কাঠামোয় কাজ করার পাশাপাশি তিনি আন্তর্জাতিক বাণিজ্য, আইন ও নীতিনির্ধারণ-সংশ্লিষ্ট কাজেও অভিজ্ঞতা অর্জন করেন। তার নিজের প্রকাশিত জীবনীতে লন্ডনের মেয়রের কার্যালয়, ১০ ডাউনিং স্ট্রিটের কপ২৬ (COP26) টিম, যুক্তরাজ্যের বিচার মন্ত্রণালয় ও আন্তর্জাতিক বাণিজ্য বিভাগের সঙ্গে কাজের অভিজ্ঞতার কথা উল্লেখ করা হয়েছে।
বিএনপির আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে উত্থান
বাংলাদেশের রাজনীতিতে হুমায়ুন কবিরের সক্রিয় ভূমিকা শুরু হয় বিএনপির আন্তর্জাতিক বিষয়ক কর্মকাণ্ডকে ঘিরে। ২০২৫ সালের অক্টোবরে বিএনপি তাকে আন্তর্জাতিক বিষয়ক যুগ্ম মহাসচিব হিসেবে নিয়োগ দেয়। এর আগে তিনি দলটির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানের পররাষ্ট্রবিষয়ক উপদেষ্টা হিসেবে কাজ করছিলেন।
দলের আন্তর্জাতিক যোগাযোগে তিনি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। বিভিন্ন দেশের রাষ্ট্রদূত ও কূটনীতিকদের সঙ্গে বিএনপি নেতৃত্বের বৈঠকে তাকে নিয়মিত দেখা গেছে। যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, ইউরোপীয় ইউনিয়নসহ বিভিন্ন দেশের কূটনীতিকদের সঙ্গে বৈঠক এবং আন্তর্জাতিক সম্পর্কবিষয়ক আলোচনায় তিনি দলের প্রতিনিধিত্ব করেছেন।
সরকারের পররাষ্ট্রনীতিতে সক্রিয়
২০২৬ সালের ১৭ ফেব্রুয়ারি বিএনপি সরকার গঠনের পর হুমায়ুন কবির প্রধানমন্ত্রীর পররাষ্ট্রবিষয়ক উপদেষ্টা হিসেবে দায়িত্ব নেন। পরে তাকে পররাষ্ট্র, দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ এবং বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব দেওয়া হয়।
উপদেষ্টা হিসেবে দায়িত্ব নেওয়ার পর থেকেই দেশের পররাষ্ট্রনীতি, ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্ক, আঞ্চলিক সহযোগিতা, রোহিঙ্গা সংকট, বাণিজ্য ও বিনিয়োগসহ বিভিন্ন বিষয়ে তাকে সক্রিয় দেখা গেছে। সাম্প্রতিক সময়ে ইউরোপীয় রাষ্ট্রদূতদের সঙ্গে বৈঠকে বাণিজ্য, বিনিয়োগ ও বেসামরিক বিমান চলাচল সহযোগিতা নিয়ে আলোচনা করেছেন তিনি।
সৌদি আরবসহ মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোর সঙ্গেও কূটনৈতিক যোগাযোগে তিনি সক্রিয় ছিলেন। আগস্টের শুরুতে সৌদি উপপররাষ্ট্রমন্ত্রী ওয়ালিদ বিন আবদুলকরিম আল-খুরাইজির ঢাকা সফরেও প্রধানমন্ত্রীর পররাষ্ট্রবিষয়ক উপদেষ্টা হিসেবে হুমায়ুন কবির বৈঠকে অংশ নেন।
সামনে বড় চ্যালেঞ্জ
পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রীর দায়িত্ব নেওয়ার ফলে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বাংলাদেশের অবস্থান জোরদার করা, প্রতিবেশী দেশগুলোর সঙ্গে সম্পর্ক পুনর্গঠন, রোহিঙ্গা সংকটের সমাধানে আন্তর্জাতিক সমর্থন বাড়ানো, অর্থনৈতিক কূটনীতি জোরদার এবং বাংলাদেশের স্বার্থকে সামনে রেখে ভারসাম্যপূর্ণ পররাষ্ট্রনীতি পরিচালনায় তাঁকে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে হবে বলে মনে করেন বিশ্লেষকেরা।
বিশেষ করে ভারত, যুক্তরাষ্ট্র, চীন ও ইউরোপীয় ইউনিয়নের সঙ্গে বাংলাদেশের সম্পর্কের ভারসাম্য রক্ষা এবং আঞ্চলিক ভূরাজনৈতিক পরিবর্তনের মধ্যে জাতীয় স্বার্থকে অগ্রাধিকার দেওয়া তার দায়িত্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ দিক।



