ইশতেহার বাস্তবায়নে পেশাদার পরিকল্পনাবিদদের সম্পৃক্ততা জরুরি: বিআইপি

নির্বাচনি ইশতেহারে নগরায়ণ ও পরিকল্পনার অগ্রাধিকার ইতিবাচক হলেও বাস্তবায়নে পেশাদার পরিকল্পনাবিদদের সম্পৃক্ততা এবং প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কার জরুরি বলে মন্তব্য করছেন নগর ও অঞ্চল পরিকল্পনাবিদরা।
রোববার (৮ ফেব্রুয়ারি) বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব প্ল্যানার্সের (বিআইপি) কনফারেন্স রুমে ‘জাতীয় সংসদ নির্বাচন ২০২৬ ইশতেহার পর্যালোচনা: পরিকল্পনা, নগরায়ণ ও টেকসই উন্নয়ন’ শীর্ষক সংবাদ সম্মেলনে বক্তারা এসব কথা বলেন।
এ সময় বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের ঘোষিত নির্বাচনি ইশতেহার পর্যালোচনা করে একটি সমন্বিত দিকনির্দেশনা তুলে ধরেছে সংগঠনটি। এতে জাতীয় স্থানিক পরিকল্পনা প্রণয়ন, সাশ্রয়ী আবাসন, পরিবেশ সুরক্ষা, গণপরিবহন উন্নয়ন, স্থানীয় সরকার ব্যবস্থার শক্তিশালীকরণ এবং সামাজিক ন্যায্যতা নিশ্চিতের ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়।
সংবাদ সম্মেলনে সভাপতিত্ব করেন বিআইপি সভাপতি পরিকল্পনাবিদ ড. মুহাম্মদ আরিফুল ইসলাম। অনুষ্ঠান সঞ্চালনা করেন বিআইপির সহসভাপতি পরিকল্পনাবিদ শেখ মুহম্মদ মেহেদী আহসান।
স্বাগত বক্তব্যে শেখ মুহম্মদ মেহেদী আহসান বলেন, বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নির্বাচনি ইশতেহার যদি সমন্বিতভাবে বিবেচনা এবং বাস্তবায়ন করা যায়, তাহলে দেশে দীর্ঘমেয়াদি ও টেকসই উন্নয়ন নিশ্চিত করা সম্ভব।
তিনি বলেন, উন্নয়ন কেবল প্রকল্পভিত্তিক হলে চলবে না। বরং একটি সমন্বিত রাষ্ট্রীয় দৃষ্টিভঙ্গির মাধ্যমে পরিকল্পনা প্রণয়ন ও বাস্তবায়ন করতে হবে। এ ক্ষেত্রে প্রশাসনিক কাঠামো, নীতিনির্ধারণ প্রক্রিয়া এবং বাস্তবায়ন ব্যবস্থায় মৌলিক সংস্কার অপরিহার্য। আগামী নির্বাচিত সরকারকে জয়ী ও পরাজিত সব রাজনৈতিক দলকে সম্পৃক্ত করে একটি অন্তর্ভুক্তিমূলক উন্নয়ন পরিকল্পনা গ্রহণ করতে হবে।
সংবাদ সম্মেলনে মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন বিআইপি সভাপতি ড. মুহাম্মদ আরিফুল ইসলাম।
তিনি বলেন, বাংলাদেশের জুলাই বিপ্লব দেশের গণতান্ত্রিক ইতিহাসে একটি গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক, যা রাজনৈতিক পরিবর্তনের পাশাপাশি সামাজিক, অর্থনৈতিক ও নগর উন্নয়নের নতুন সম্ভাবনার দ্বার উন্মোচন করেছে।
আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে রাজনৈতিক দলগুলোর নির্বাচনি ইশতেহারে নগরায়ণ, অবকাঠামো, আবাসন ও পরিবহন খাতে পরিকল্পনার বিষয়গুলো গুরুত্ব পেয়েছে—এটি ইতিবাচক বলে মন্তব্য করেন তিনি।
আরিফুল ইসলাম বলেন, ইশতেহারে ঘোষিত পরিকল্পনাগুলো বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে পেশাদার পরিকল্পনাবিদদের সম্পৃক্ততা অত্যাবশ্যক। একই সঙ্গে বিকেন্দ্রীকরণ কার্যকরভাবে বাস্তবায়ন করা গেলে বাংলাদেশকে একটি উন্নত রাষ্ট্রে রূপান্তর করা সম্ভব হবে। দেশের বৃহত্তর স্বার্থে আগামী নির্বাচিত সরকারকে বিআইপি সব ধরনের পেশাগত সহযোগিতা দিতে প্রস্তুত রয়েছে।
বিআইপির উপদেষ্টা পরিকল্পনাবিদ সালমা এ শফি বলেন, প্রায় সব রাজনৈতিক দলই তাদের ইশতেহারে নগর পরিকল্পনার বিষয়গুলো অন্তর্ভুক্ত করার চেষ্টা করেছে। কোনো দলের ইশতেহারে যে বিষয় অনুপস্থিত ছিল, অন্য দলের ইশতেহারে তা উঠে এসেছে।
তিনি বলেন, নির্বাচন-পরবর্তী সময়ে রাজনৈতিক দলগুলোর পাশাপাশি বিআইপির মতো পেশাজীবী সংগঠনের সঙ্গে পরামর্শ করে একটি সমন্বিত কর্মপরিকল্পনা গ্রহণ করা জরুরি। সংবাদ সম্মেলনের মাধ্যমে সেই সমন্বয়ের প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে বলে তিনি মন্তব্য করেন।
সংগঠনের সহসভাপতি পরিকল্পনাবিদ ড. ফারহানা আহমেদ বলেন, অপরিকল্পিত উন্নয়ন পরিবেশের ওপর মারাত্মক নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে এবং নগরগুলোকে ক্রমেই বসবাসের অযোগ্য করে তুলছে।
তিনি বলেন, রাজনৈতিক দলগুলোর ইশতেহারে সমন্বিত পরিকল্পনা ও পরিবেশবান্ধব উন্নয়নের প্রয়োজনীয়তা স্বীকৃতি পেয়েছে, যা আশাব্যঞ্জক। তবে স্থানিক ও অঞ্চলভিত্তিক পরিকল্পনার সঙ্গে অর্থনৈতিক কর্মকৌশলের কার্যকর সমন্বয় আরও জোরদার করতে হবে।
বিআইপির সাবেক সভাপতি পরিকল্পনাবিদ অধ্যাপক ড. আদিল মুহম্মদ খান বলেন, রাজনৈতিক দলগুলোর ইশতেহারে পরিকল্পনার গুরুত্ব আগের তুলনায় বেড়েছে, তবে টেকসই উন্নয়ন ও বিকেন্দ্রীকরণের ক্ষেত্রে এখনো সুনির্দিষ্ট রোডম্যাপের অভাব রয়েছে। তিনি জেলাভিত্তিক বাজেট বণ্টন, সাশ্রয়ী আবাসনের ভৌগোলিক বিস্তৃতি, গণপরিবহন উন্নয়ন এবং শিল্পদূষণ নিয়ন্ত্রণে ইটিপি বাধ্যতামূলক করার বিষয়গুলো বাস্তব প্রয়োগে আনার ওপর গুরুত্বারোপ করেন। একই সঙ্গে স্থানীয় সরকারকে শক্তিশালী করতে কেন্দ্রীয় বাজেট থেকে সরাসরি অর্থ বরাদ্দের দাবি জানান তিনি।
সংবাদ সম্মেলনে বিআইপি ১০ দফা সুপারিশ তুলে ধরা হয়। এসব সুপারিশের মধ্যে রয়েছে—সমগ্র দেশের জন্য স্থানিক ও আঞ্চলিক পরিকল্পনা প্রণয়ন, জলবায়ু ঝুঁকিপূর্ণ ও সংবেদনশীল এলাকার জন্য বিশেষ উন্নয়ন পরিকল্পনা, সাশ্রয়ী ও সামাজিক আবাসন ব্যবস্থা, পরিবেশ ও জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণ, সমন্বিত ও গণমুখী পরিবহন ব্যবস্থা, স্থানীয় সরকার ব্যবস্থার ক্ষমতায়ন, সামাজিক ন্যায্যতা নিশ্চিতকরণ এবং প্রমাণভিত্তিক ও পেশাদার পরিকল্পনা প্রক্রিয়া জোরদার করা।