নিউইয়র্কের উদ্দেশে যাত্রা করলেন প্রধানমন্ত্রী

জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের (ইউএনজিএ) ৮১তম অধিবেশনে যোগ দিতে যুক্তরাষ্ট্রের নিউইয়র্কের উদ্দেশে ঢাকা ত্যাগ করেছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান।
সোমবার (২১ সেপ্টেম্বর) সকাল পৌনে ৬টার দিকে হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর থেকে নিউইয়র্কের উদ্দেশে যাত্রা করেন তিনি। সফরসঙ্গী হিসেবে প্রধানমন্ত্রী সঙ্গে রয়েছেন তার সহধর্মিণী ডা. জুবাইদা রহমান।
হযরত শাহ জালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে প্রধানমন্ত্রীকে বিদায় জানানোর জন্য উপস্থিত ছিলেন স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায়মন্ত্রী ড. আব্দুল মঈন খান, বিএনপির ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব অ্যাডভোকেট রুহুল কবির রিজভী, জাতীয় সংসদের চিফ হুইপ মো. নূরুল ইসলাম মনি, মন্ত্রিপরিষদ সচিব নাসিমুল গনি, প্রধানমন্ত্রীর মুখ্য সচিব এ বি এম আব্দুস সাত্তারসহ সরকারি ঊধ্বর্তন কর্মকর্তারা।
প্রধানমন্ত্রীর প্রেস সচিব সালেহ শিবলী বলেন, ‘প্রধানমন্ত্রী, তার সহধর্মিণী ডা. জুবাইদা রহমান এবং অন্য সফরসঙ্গীদের নিয়ে তুর্কি এয়ারলাইন্সের একটি ফ্লাইট সকাল ৬টা ৫ মিনিটে হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর ত্যাগ করেছে।’
প্রায় ৮ ঘণ্টা ৪৫ মিনিটের ফ্লাইট শেষে বিমানটি তুরস্কের স্থানীয় সময় সকাল ১১টা ৩৫ মিনিটে ইস্তাম্বুল বিমানবন্দরে পৌঁছানোর কথা রয়েছে। ইস্তাম্বুলে দুই ঘণ্টা ৩৫ মিনিটের ট্রানজিট শেষে ফ্লাইটটি দুপুর ২টা ১০ মিনিটে (তুরস্ক সময়) নিউইয়র্কের উদ্দেশে রওনা হবে এবং নিউইয়র্ক সময় বিকেল ৫টা ৫৫ মিনিটে জন এফ কেনেডি (জেএফকে) আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে অবতরণ করবে।
বিমানবন্দরে প্রধানমন্ত্রীকে অভ্যর্থনা জানাবেন জাতিসংঘে বাংলাদেশের স্থায়ী প্রতিনিধি আইরিন খান এবং যুক্তরাষ্ট্রে নিযুক্ত বাংলাদেশের রাষ্ট্রদূত তারেক মো. আরিফুল ইসলাম। বিমানবন্দর থেকে মোটর শোভাযাত্রা সহকারে তাঁকে ‘হায়াত গ্র্যান্ড সেন্ট্রাল নিউ ইয়র্ক’-এ নিয়ে যাওয়া হবে। সফরকালে তিনি সেখানেই অবস্থান করবেন।

প্রধানমন্ত্রীর অতিরিক্ত প্রেস সচিব আতিকুর রহমান রুমন জানান, জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের অধিবেশনে অতীতে দেখা গেছে সরকার প্রধানগণ শতাধিক প্রতিনিধি দলের নেতৃত্ব দিতেন।
তিনি আরও বলেন, জনগণের ভোটে নির্বাচিত প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান ছোট পরিসরে একটি প্রতিনিধি দল নিয়ে এই প্রথম জাতিসংঘ যাচ্ছেন। এত ছোট প্রতিনিধি দল নিয়ে বাংলাদেশের কোনো প্রধানমন্ত্রীর সফর এই প্রথম।
এ সফরে প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে সরকারের কয়েকজন মন্ত্রিপরিষদ সদস্য, রাজনীতিক ব্যক্তিত্ব, ঊর্ধ্বতন সরকারি কর্মকর্তা এবং ব্যক্তিগত কর্মকর্তারা রয়েছেন।
জানা গেছে, বিশিষ্ট ব্যক্তি হিসেবে প্রধানমন্ত্রীর সফরসঙ্গী হিসেবে থাকছেন বাংলাদেশের বিপ্লবী ওয়ার্কার্স পার্টির সাধারণ সম্পাদক সাইফুল হক ও জমিয়তে উলামায়ে ইসলামের মহাসচিব গোলাম মহিউদ্দিন ইকরাম।
প্রধানমন্ত্রীর প্রতিনিধি দলে মন্ত্রিসভার পাঁচ সদস্য, প্রতিমন্ত্রী ও উপদেষ্টা মিলে সাতজন সদস্য রয়েছেন। তাদের মধ্যে রয়েছেন অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী, বিমানমন্ত্রী রাশিদুজ্জামান মিল্লাত, আইনমন্ত্রী মো. আসাদুজ্জামান, অর্থ ও পরিকল্পনা বিষয়ক প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীর।
প্রতিনিধি দলের তালিকায় পররাষ্ট্রমন্ত্রী খলিলুর রহমানের নাম থাকলেও তিনি সাধারণ পরিষদের ৮১ তম অধিবেশনে সভাপতিত্ব করবেন।
এর আগে ঢাকায় এক সংবাদ সম্মেলনে পররাষ্ট্রসচিব আসাদ আলম সিয়াম জানান, ২২ সেপ্টেম্বর জাতিসংঘ মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেস কর্তৃক রাষ্ট্র ও সরকার প্রধানদের সম্মানে আয়োজিত এক স্বাগত প্রাতরাশসভায় যোগ দেবেন প্রধানমন্ত্রী। পরবর্তীতে তিনি অন্য বিশ্বনেতাদের সঙ্গে সাধারণ পরিষদের উদ্বোধনী অধিবেশনে যোগ দেবেন এবং সন্ধ্যায় রাষ্ট্র ও সরকার প্রধান এবং তাদের জীবনসঙ্গীদের সম্মানে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট আয়োজিত একটি সংবর্ধনা অনুষ্ঠানে অংশ নেবেন।
২৩ সেপ্টেম্বর সকালে প্রধানমন্ত্রী আন্তর্জাতিক দাতব্য ও মানবিক সংস্থার প্রতিনিধিদের সঙ্গে একটি প্রাতরাশ সভায় মতবিনিময় করবেন। পরে তিনি ব্রাজিল, দক্ষিণ আফ্রিকা, নরওয়ে এবং স্পেনের যৌথ উদ্যোগে আয়োজিত ‘বৈশ্বিক বৈষম্য সংকট মোকাবিলা’ বিষয়ক একটি সভায় বক্তব্য দেবেন।
এ ছাড়া তিনি জাতিসংঘ মহাসচিবের উদ্যোগে আয়োজিত ‘জলবায়ু পদক্ষেপ ও ন্যায়ঙ্গত উত্তরণ’ শীর্ষক এক উচ্চপর্যায়ের বৈঠকেও যোগ দেবেন। একই দিনে তিনি জোরপূর্বক বাস্তুচ্যুত রোহিঙ্গাদের মিয়ানমারে দ্রুততম সময়ে প্রত্যাবাসন নিশ্চিত করতে কার্যকর আন্তর্জাতিক সহযোগিতা চেয়ে রোহিঙ্গা সংকট বিষয়ক একটি পার্শ্ব-অনুষ্ঠানে অংশ নেবেন।

পররাষ্ট্রসচিব জানান, জলবায়ু সংক্রান্ত বৈঠকগুলোতে প্রধানমন্ত্রী একটি জলবায়ু-ঝুঁকিপূর্ণ দেশ হিসেবে বাংলাদেশের অবস্থান তুলে ধরবেন, যেখানে জলবায়ু অর্থায়ন, অভিযোজন, প্রযুক্তি হস্তান্তর, ক্ষয়ক্ষতি ও জলবায়ু ন্যায়বিচারের ওপর বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হবে।
প্রধানমন্ত্রী ২৪ সেপ্টেম্বর সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধির ফলে সৃষ্টি হওয়া অস্তিত্বের হুমকি নিয়ে আয়োজিত একটি উচ্চপর্যায়ের বৈঠকে উদ্বোধনী বক্তব্য দেবেন। এ ছাড়া তিনি বাংলাদেশ আয়োজিত দুটি গুরুত্বপূর্ণ পার্শ্ব-অনুষ্ঠানেও অংশ নেবেন।
একই দিনে তিনি প্রধান অতিথি হিসেবে মাতৃ ও নবজাতকের স্বাস্থ্য এবং ধাত্রীবিদ্যা-সংক্রান্ত আরেকটি অনুষ্ঠানে বক্তব্য রাখবেন। এতে তিনি মাতৃ ও শিশুস্বাস্থ্য সুরক্ষায় নতুন সরকারের গৃহীত পদক্ষেপ ও ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা তুলে ধরবেন এবং দক্ষ ও পেশাগতভাবে প্রশিক্ষিত ধাত্রী সেবার গুরুত্বের ওপর জোর দেবেন।
অধিবেশনের ফাঁকে প্রধানমন্ত্রীর সাথে কুয়েতের ক্রাউন প্রিন্স এবং ক্রোয়েশিয়া, ভুটান, থাইল্যান্ড, পাকিস্তান ও হাইতির প্রধানমন্ত্রীদের দ্বিপক্ষীয় বৈঠক অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা রয়েছে। বৈঠকে রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক সম্পর্ক, বাণিজ্য ও বিনিয়োগ, উন্নয়ন সহযোগিতা, রোহিঙ্গা সংকটসহ পারস্পরিক স্বার্থসংশ্লিষ্ট বিভিন্ন বিষয়ে আলোচনা হবে বলে আশা করা হচ্ছে।
এ ছাড়া জাতিসংঘ মহাসচিব, ইউরোপীয় কাউন্সিলের প্রেসিডেন্ট, ওয়ার্ল্ড ব্যাংক গ্রুপের প্রেসিডেন্ট, জাতিসংঘ মহাসচিবের মিয়ানমার বিষয়ক বিশেষ দূত এবং জাতিসংঘের শরণার্থী ও মানবাধিকার বিষয়ক হাইকমিশনারদের সঙ্গেও প্রধানমন্ত্রীর সৌজন্য সাক্ষাতের কথা রয়েছে। তিনি ইন্টারন্যাশনাল পিস ইনস্টিটিউটের প্রেসিডেন্টের সঙ্গেও বৈঠক করবেন বলে আশা করা হচ্ছে।
সরকারের অর্থনৈতিক কূটনীতির অংশ হিসেবে প্রধানমন্ত্রী মেটা, ওয়াল স্ট্রিট এবং বেশ কয়েকটি ব্যবসায়ী সংগঠনের জ্যেষ্ঠ প্রতিনিধিদের সঙ্গে বৈঠক করবেন।
প্রধানমন্ত্রীর আগামী ২৫ সেপ্টেম্বর নিউইয়র্ক সময় রাত ১১:০০ টায় এমিরেটস এয়ারলাইন্সের ফ্লাইট ইকেটুজিরোটু (ঊক২০২) যোগে জেএফকে আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর থেকে ঢাকার উদ্দেশে রওনা হওয়ার কথা রয়েছে।
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের জন্য জাতিসংঘের সর্বোচ্চ বৈশ্বিক মঞ্চে এটিই প্রথম অংশগ্রহণ। এর মধ্য দিয়ে বিশ্ববাসীর সামনে নতুন সরকারের রাজনৈতিক অঙ্গীকার এবং ভবিষ্যৎ বাংলাদেশের রূপরেখা তুলে ধরার সুযোগ তৈরি হবে।