চাকরি যাচ্ছে আরও ৬৩ পুলিশ কর্মকর্তার

পুলিশের বিভিন্ন পর্যায়ের ৬৩ কর্মকর্তার বিরুদ্ধে চাকরিচ্যুতির প্রক্রিয়া এগিয়ে নিচ্ছে সরকার। দীর্ঘদিন কর্মস্থলে অনুপস্থিত থাকা, নাশকতার সঙ্গে জড়িত থাকার অভিযোগ, অসদাচরণ ও দুর্নীতিসহ নানা অভিযোগ রয়েছে তাদের বিরুদ্ধে। তালিকায় সাবেক পুলিশ সুপার (এসপি), ডিআইজি ও অতিরিক্ত ডিআইজি পদমর্যাদার কর্মকর্তারাও রয়েছেন।
এরই মধ্যে ঢাকা জেলার সাবেক এসপি মো. আসাদুজ্জামানসহ ছয় কর্মকর্তাকে চাকরি থেকে বরখাস্ত করা হয়েছে। ২০২৪ ও ২০২৫ সালে কর্মস্থলে অনুপস্থিত থাকার ঘটনায় দায়ের করা বিভাগীয় মামলায় অভিযোগ প্রমাণিত হওয়ায় তাদের বিরুদ্ধে এ ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে।
স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের বরাতে কালবেলা প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০২৪ সালের ৬ আগস্ট থেকে যারা পলাতক রয়েছেন, তাদের মধ্যে ৩৩ কর্মকর্তাকে চাকরি থেকে চূড়ান্তভাবে বাদ দেওয়ার সিদ্ধান্ত হয়েছে। অবশ্য গত দুই বছরে পলাতক থাকার অভিযোগে শতাধিক পুলিশ কর্মকর্তা চাকরি হারিয়েছেন।
এই তালিকায় রয়েছেন রংপুরের সাবেক অতিরিক্ত উপ-পুলিশ কমিশনার এবং পুলিশ সুপার পদে পদোন্নতিপ্রাপ্ত মো. শাহ নূর আলম পাটওয়ারী। তার বিরুদ্ধে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল রায় ঘোষণা করেছেন। তিনি বর্তমানে পলাতক।
সাবেক এসপি মো. আলী আশরাফ ভূঞার বিরুদ্ধেও পলায়নের অভিযোগ রয়েছে। একইভাবে রাজশাহী রেঞ্জের সাবেক পুলিশ সুপার জেসমিন কেকা ও আয়েশা সিদ্দিকা পলাতক। জেসমিন কেকার বিষয়ে তদন্ত প্রতিবেদন স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে জমা পড়েছে। আয়েশা সিদ্দিকাকে বরখাস্তের বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
বগুড়ার সাবেক এসপি সুদীপ কুমার চক্রবর্তী এরই মধ্যে চাকরি হারিয়েছেন। এ কারণে তার বিরুদ্ধে চলমান দ্বিতীয় বিভাগীয় মামলার কার্যক্রম স্থগিত করা হয়েছে।
চট্টগ্রাম রেঞ্জের সাবেক ডিআইজি নূরে আলম মিনার বিষয়েও তদন্ত চলছে। তিনি পলাতক থাকায় তার চাকরিও যাওয়ার পথে।
অসদাচরণ ও দুর্নীতির অভিযোগে ডিএমপির সাবেক ডিআইজি কাজী মনিরুজ্জামানের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে। দীর্ঘদিন ধরে পলাতক থাকার অভিযোগে এ কে এম এহসানউল্লাহর চাকরিও যাচ্ছে।
পলাতক কর্মকর্তাদের মধ্যে আরও রয়েছেন ডিআইজি বিপ্লব বিজয় তালুকদার, অতিরিক্ত ডিআইজি টুটুল চক্রবর্তী, অ্যাডিশনাল ডিআইজি মোহাম্মদ ফরিদ উদ্দিন, ডিএমপির সাবেক উপ-পুলিশ কমিশনার মো. নাজমুল ইসলাম, রাজশাহী রেঞ্জের সাবেক ডিআইজি মো. আনিসুর রহমান, পুলিশ অধিদপ্তরের সাবেক অতিরিক্ত ডিআইজি প্রলয় কুমার জোয়ারদার, ঢাকা রেঞ্জের সাবেক ডিআইজি সৈয়দ নুরুল ইসলাম, এন্টি টরোরিজম ইউনিটের সাবেক পুলিশ সুপার মো. আবু মারুফ হোসেন, এপিবিএনে সংযুক্ত ডিআইজি হাসানুজ্জামান মোল্যা, নারায়ণগঞ্জের সাবেক পুলিশ সুপার গোলাম মোস্তফা রাসেল, পুলিশ সুপার পদোন্নতিপ্রাপ্ত হাসান আরাফাত, বাংলাদেশ আনসার ও গ্রাম প্রতিরক্ষা বাহিনীর জামালপুরের সাবেক জেলা কমান্ড্যান্ট জে এম ইমরান, গাজীপুর ইন্ডাস্ট্রিয়াল পুলিশের সাবেক এসপি মো. রহমত উল্লাহ চৌধুরী, ডিএমপির সাবেক যুগ্ম পুলিশ কমিশনার এস এম মেহেদী হাসান, লক্ষ্মীপুরের সাবেক এসপি মো. তারেক বিন রশিদ এবং ট্যুরিস্ট পুলিশের সাবেক অতিরিক্ত ডিআইজি শ্যামল কুমার মুখার্জী।
গোলাম মোস্তফা রাসেলের বরখাস্তের আদেশ চূড়ান্ত করার জন্য রাষ্ট্রপতির কাছে সার-সংক্ষেপ পাঠানো হয়েছে।
স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তাদের ভাষ্য, ২০২৪ সালের ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থানের সময় বেআইনিভাবে ছাত্রদের ওপর গুলি চালানো এবং আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ে ক্ষমতার অপব্যবহারের অভিযোগ থাকা কর্মকর্তাদের একটি বড় অংশ দেশ ছেড়েছেন।
তাদের কেউ পার্শ্ববর্তী দেশে অবস্থান করছেন। কেউ আবার আমেরিকা ও ইউরোপের বিভিন্ন দেশে চলে গেছেন। কর্মস্থলে অনুপস্থিত থাকার কারণে তাদের কাজে ফেরার নির্দেশ দেওয়া হলেও অনেকে তাতে সাড়া দেননি।
এ অবস্থায় সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে বিভাগীয় মামলা করা হয়। তদন্তের প্রয়োজনে দ্বিতীয় দফায় কারণ দর্শানোর নোটিশও পাঠানো হয়েছে। কয়েকজন নোটিশের জবাব দিলেও সেসব জবাব সন্তোষজনক নয় বলে মনে করছে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়।
সরকারি কর্মচারী (শৃঙ্খলা ও আপিল) বিধিমালা, ২০১৮ অনুসরণ করেই তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে। মন্ত্রণালয়ের সংশ্লিষ্টরা বলছেন, বিভাগীয় প্রক্রিয়া শেষ করে চাকরিচ্যুতির সিদ্ধান্ত নেওয়া হচ্ছে।
আরও অভিযোগ যেসব কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে
ঢাকা হাইওয়ে পুলিশের সাবেক অ্যাডিশনাল ডিআইজি মীর মোদাচ্ছের হোসেনের নথি উপস্থাপনের কাজ চলছে।
মৌলভীবাজারের শ্রীমঙ্গল ২৪ আনসার ব্যাটালিয়নের সাবেক পরিচালক মুহাম্মদ মেহেদী হাসানের বিরুদ্ধে অভিযোগনামা ও অভিযোগ বিবরণীর খসড়া পাঠানোর জন্য চিঠি দেওয়া হয়েছে। তাকে বাংলাদেশ আনসার ও গ্রাম প্রতিরক্ষা বাহিনীর খুলনা রেঞ্জে সংযুক্ত করে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়েছে।
গাইবান্ধার সাবেক এসপি মো. কামাল হোসেনের বিভাগীয় মামলাটি প্রায় শেষ পর্যায়ে। তাকেও চাকরিতে রাখা হবে না বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রে ইঙ্গিত পাওয়া গেছে।
পুলিশ অধিদপ্তরে সংযুক্ত অ্যাডিশনাল ডিআইজি মোহাম্মদ জহিরুল ইসলামের মামলাও চলছে। ব্যক্তিগত শুনানির জন্য ডাকা হলেও অসুস্থতার কারণ দেখিয়ে তিনি উপস্থিত হননি।
ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের উপ-কমিশনার মোহাম্মদ জসিম উদ্দিনের মামলাটি পর্যালোচনার পর্যায়ে রয়েছে।
এ ছাড়া গাইবান্ধা পিবিআইর সাবেক এসপি রাজীব ফরহান ও নাটোর সার্কেলের সাবেক এএসপি মো. আপেল মাহমুদের মামলায় ব্যক্তিগত শুনানি এখনো হয়নি।
নাশকতা সৃষ্টির অভিযোগে সাময়িক বরখাস্ত হওয়া তিন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তার বিরুদ্ধে বিভাগীয় কার্যক্রম চলছে।
বাংলাদেশ আনসার ও গ্রাম প্রতিরক্ষা বাহিনীর খুলনা রেঞ্জে সংযুক্ত মুহাম্মদ মেহেদী হাসানের বিরুদ্ধে নাশকতার অভিযোগ আনা হয়েছে। তিনি সাময়িক বরখাস্ত রয়েছেন। তার চাকরি হারানোর সম্ভাবনাও রয়েছে।
ময়মনসিংহ রেঞ্জে সংযুক্ত সাময়িক বরখাস্তকৃত মো. ফখরুল আলমের বিরুদ্ধেও একই ধরনের অভিযোগ রয়েছে। তার নামে মামলা হয়েছে।
রাজশাহী রেঞ্জে সংযুক্ত সাময়িক বরখাস্তকৃত সৈয়দ ইফতেহার আলীর বিরুদ্ধে নাশকতা সৃষ্টির অভিযোগের বিভাগীয় মামলার পুনঃতদন্ত চলছে।
অসদাচরণ ও দুর্নীতির অভিযোগে চার কর্মকর্তার বিরুদ্ধে বিভাগীয় মামলা চলমান। এসব মামলার পরিণতিতে তাদের চাকরিচ্যুতির পথ তৈরি হচ্ছে। তবে চূড়ান্ত সিদ্ধান্তের আগে পিএসসির মতামত এবং রাষ্ট্রপতির অনুমোদন প্রয়োজন হবে।
ময়মনসিংহ রেঞ্জের ডিআইজির কার্যালয়ে সংযুক্ত এবং ঠাকুরগাঁও ইন-সার্ভিস ট্রেনিং সেন্টারের সাবেক কমান্ড্যান্ট (পুলিশ সুপার) এস এম ফজলুল হক বর্তমানে সাময়িক বরখাস্ত। তার বিরুদ্ধে দ্বিতীয় কারণ দর্শানোর নোটিশের উপস্থাপন করা হয়েছে।
রংপুরের সাবেক উপ-পুলিশ কমিশানর মোহাম্মদ শিবলী কায়সারের বিরুদ্ধে অসদাচরণের তদন্ত শেষ হয়েছে। তাকে বরখাস্তের বিষয়ে বিপিএসসির পরামর্শ চেয়ে চিঠি দিয়েছে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়।
কক্সবাজারের সাবেক এসপি মুহাম্মদ রহমত উল্লাহর বিরুদ্ধে অসদাচরণ ও দুর্নীতির অভিযোগে করা মামলার তদন্ত চলছে।
একই অভিযোগের তালিকায় রয়েছেন ডিএমপির সাবেক অতিরিক্ত পুলিশ কমিশনার (ক্রাইম অ্যান্ড অপারেশনস) মোহাম্মদ হারুন অর রশীদ।
পলায়ন, নাশকতা, অসদাচরণ ও দুর্নীতির বাইরে বিভিন্ন অভিযোগে আরও ১৩ পুলিশ কর্মকর্তার বিরুদ্ধে বিভাগীয় মামলা চলছে।
পুলিশ সদর দপ্তর সূত্রে জানা গেছে, এসব কর্মকর্তার অধিকাংশের চাকরিতে থাকার সুযোগ কম। তাদের কয়েকজনের বিরুদ্ধে জুলাই-আগস্টে চলা গণহত্যার সঙ্গে সম্পৃক্ততার অভিযোগ রয়েছে।
আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালেও কারও কারও বিরুদ্ধে মামলা চলছে। এ কারণে বিভাগীয় মামলার কার্যক্রম কোথাও কোথাও স্থগিত রাখা হয়েছে। ট্রাইব্যুনালের রায়ের পর সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের বিষয়ে পরবর্তী সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।
চাকরি থেকে চূড়ান্তভাবে বরখাস্ত করার আগে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের বিষয়ে সরকারি কর্মকমিশনের মতামত নেওয়ার বিধান রয়েছে। সেই প্রক্রিয়ার অংশ হিসেবে কয়েকজনের নথি পিএসসিতে পাঠানো হয়েছে।
আরও কয়েকজনকে চাকরি থেকে বাদ দেওয়ার অনুমোদন নিতে রাষ্ট্রপতির কার্যালয়ে সার-সংক্ষেপ পাঠানো হয়েছে। সব মিলিয়ে ১৫টি সার-সংক্ষেপ পিএসসি ও রাষ্ট্রপতির কার্যালয়ের প্রক্রিয়ায় রয়েছে বলে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় সূত্র জানিয়েছে।
ইতোমধ্যে পলায়ন এবং অনুমতি ছাড়া দীর্ঘদিন কর্মস্থলে অনুপস্থিত থাকার অভিযোগ প্রমাণিত হওয়ায় ঢাকা জেলার সাবেক এসপি মো. আসাদুজ্জামানসহ ছয় কর্মকর্তাকে ইতোমধ্যে চাকরি থেকে বরখাস্ত করা হয়েছে।
স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের প্রজ্ঞাপনে তাদের বরখাস্তের বিষয়টি জানানো হয়। অন্য পাঁচজন হলেন অতিরিক্ত পুলিশ সুপার পলাশ রঞ্জন দে, পুলিশ সুপার মোহাম্মদ ছানোয়ার হোসেন, অতিরিক্ত ডিআইজি মোহাম্মদ জায়েদুল আলম, অতিরিক্ত উপ-পুলিশ কমিশনার রাজীব দাস এবং সাবেক পুলিশ সুপার আরিফুর রহমান মণ্ডল।
