logo
তদন্ত প্রতিবেদন

খাবারের দোকানে বসে নিউগিনি আবাসন প্রকল্পে হামলার পরিকল্পনা

খাবারের দোকানে বসে নিউগিনি আবাসন প্রকল্পে হামলার পরিকল্পনা
নিউগিনি প্রোপার্টিজ আবাসন প্রকল্পে অবস্থিত সালমান মুক্তারিরের স্টুডিওতে ভাঙচুর চালানো হয়। ছবি : এশিয়া পোস্ট

জমি ও চলাচলের রাস্তা নিয়ে বিরোধ। সেই বিরোধের জেরে আবাসন প্রকল্পে হামলার পরিকল্পনা হয় খাবারের দোকানে বসে। এরপর দুই বাহিনী থেকে লোক জোগাড় করে রাতে চালানো হয় সশস্ত্র হামলা। রাজধানীর ইসিবি চত্বরের নিউগিনি আবাসন প্রকল্পে হামলার তদন্তে এমন তথ্য পাওয়ার কথা জানিয়েছে তদন্তসংশ্লিষ্ট সূত্র।

সূত্রগুলোর বরাতে প্রথম আলো তাদের প্রতিবেদনে জানায়, হামলার দিন দুপুরে বৈঠকের পর বিকেলে দুই জায়গায় লোক জড়ো করা হয়। পাঁচটি পিকআপে করে ও হেঁটে ঘটনাস্থলে যায় প্রায় ২০০ হামলাকারী। রাত সাড়ে ১০টার দিকে মূল ফটকে গুলি ছুড়ে হামলা শুরু করে তারা। হামলায় অংশ নেন মিরপুরের মো. ইব্রাহিম ও মামুন বাহিনীর সদস্যরা। এই ইব্রাহিম ভাষানটেক থানা বিএনপির আহ্বায়ক। পুলিশের তালিকায় তার নাম ‘কিলার ইব্রাহিম’।

দুপুরে রাজধানীর ইসিবি চত্বরের একটি খাবারের দোকানে বৈঠক হয়। বিকেল ৪টার দিকে ভাষানটেকের দেওয়ানপাড়া দোতলা মসজিদের সামনের মাঠে একদল লোক জড়ো হয়। আরেক দল জড়ো হয় মানিকদী এলাকায়।

তদন্তসংশ্লিষ্ট সূত্রের ভাষ্য, এসব জায়গা থেকে আগ্নেয়াস্ত্র ও লাঠিসোঁটা নিয়ে পাঁচটি পিকআপে করে এবং হেঁটে নিউগিনি আবাসন প্রকল্পে যায় প্রায় ২০০ হামলাকারী। রাত সাড়ে ১০টার দিকে মূল ফটকে গুলি ছুড়ে প্রকল্পে হামলা চালায় তারা।

তদন্তসংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো বলছে, হামলায় মিরপুর এলাকার দুটি ‘সন্ত্রাসী বাহিনীর’ সদস্যরা অংশ নেয়। একটি বাহিনী ভাষানটেক থানা বিএনপির আহ্বায়ক মো. ইব্রাহিমের। অন্যটি পল্লবীর মফিজুর রহমান মামুনের। হামলাকারীদের মধ্যে ইব্রাহিমের অনুসারীই ছিল সবচেয়ে বেশি। এই দুই বাহিনী থেকে হামলার লোক জোগাড়ের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছিল ঠিকাদার বিকাশ চন্দ্র শাহকে।

গত ২৬ সেপ্টেম্বর রাতে ইসিবি চত্বর এলাকায় নিউগিনি প্রপার্টিজ আবাসন প্রকল্পে হামলার সময় কনটেন্ট ক্রিয়েটর সালমান মুক্তাদিরের স্টুডিওতেও ভাঙচুর–লুটপাট করা হয়। ওই রাতেই ঘটনার বিবরণ দিয়ে সালমান একটি ভিডিও প্রকাশ করেন। এ নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমসহ বিভিন্ন মহলে ব্যাপক প্রতিক্রিয়া হয়।

হামলা ও ভাঙচুরের মামলায় এখন পর্যন্ত সাতজনকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ। তারা হলেন মেজর জেনারেল (অব.) গোলাম মহিউদ্দিন চৌধুরী, মিজানুর রহমান, শাহরিয়ার মাহমুদ, শাহ আলম, মামুন, আসলাম ও মুন্না। সর্বশেষ গত বুধবার গ্রেপ্তার হন মামলার ৪ নম্বর আসামি গোলাম মহিউদ্দিন চৌধুরী। পুলিশ জানিয়েছে, সাতজনই রিমান্ডে আছেন। গ্রেপ্তার হওয়া মামুন ও বাহিনীপ্রধান মফিজুর রহমান মামুন আলাদা ব্যক্তি।

মামলাটির তদন্তের দায়িত্ব ক্যান্টনমেন্ট থানা থেকে ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের (ডিবি) গুলশান বিভাগে হস্তান্তর করা হয়েছে। ডিবি গুলশান বিভাগের উপকমিশনার আ ফ ম আনোয়ার হোসেন জানান, জমি নিয়ে বিরোধের জেরে হামলার ঘটনা ঘটেছে। সাতজনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। বাকি আসামিদের গ্রেপ্তারের চেষ্টা চলছে। হামলার পরিকল্পনায় কারা জড়িত, কারা অংশ নিয়েছে, কারা অস্ত্র সরবরাহ করেছে—এসব বিষয়ে তদন্ত চলছে। কিছু তথ্য পাওয়া গেছে, সেগুলো যাচাই–বাছাই করা হচ্ছে।

খাবারের দোকানে বৈঠক

মামলার তদন্তসংশ্লিষ্ট একাধিক কর্মকর্তা জানান, হামলার দিন দুপুরে ইসিবি চত্বরের একটি খাবারের দোকানে বৈঠক হয়। দোকানের সিসি ক্যামেরার ফুটেজে সেখানে ১৩ জনকে দেখা গেছে। তাদের মধ্যে দুজনকে শনাক্ত করা হয়েছে। একজন গ্রেপ্তার শাহরিয়ার মাহমুদ, অন্যজন বিকাশ চন্দ্র শাহ। বাকি ১১ জনকে শনাক্তের চেষ্টা চলছে। বৈঠকটি ছিল হামলার পরিকল্পনা নিয়ে। শাহরিয়ার ও বিকাশ সেই পরিকল্পনায় যুক্ত ছিলেন বলে তদন্তে তথ্য পাওয়া গেছে।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, বিকাশ বিভিন্ন আবাসন প্রকল্পে ভবন নির্মাণের কাজ করেন। নিউগিনি আবাসন প্রকল্পের মালিক নাজিম উদ্দিন ভুঁইয়ার সঙ্গে জমি নিয়ে গোলাম মহিউদ্দিন চৌধুরীসহ কয়েকজনের বিরোধ ছিল। বিরোধসংশ্লিষ্ট জমিতে ভবন নির্মাণের কাজ দেওয়া হয় বিকাশকে।

তদন্তসংশ্লিষ্ট সূত্রের দাবি, ভবন নির্মাণের পাশাপাশি নিউগিনির মালিকের সঙ্গে কথা বলে চলাচলের রাস্তার ব্যবস্থা করার কথা ছিল বিকাশের। কিন্তু নাজিম উদ্দিন রাস্তা দিতে রাজি হননি। এই বিরোধের সঙ্গে হামলার যোগসূত্র রয়েছে বলে তদন্তকারীরা মনে করছেন।

পরিকল্পনায় সংশ্লিষ্টতা ও হামলার জন্য লোক জোগাড়ের অভিযোগের বিষয়ে বিকাশ চন্দ্র শাহর বক্তব্য পাওয়া যায়নি। তিনি আত্মগোপনে আছেন। পুলিশ বলছে, তাকে গ্রেপ্তারের চেষ্টা চলছে।

দুই বাহিনীর লোক জোগাড়

তদন্তসংশ্লিষ্ট সূত্র বলছে, খাবারের দোকানের বৈঠক থেকে হামলার সিদ্ধান্ত হয়। লোক জোগাড়ের দায়িত্ব দেওয়া হয় বিকাশকে। তিনি মুক্তিযোদ্ধা প্রজন্ম লীগের যুগ্ম আহ্বায়ক শাহ আলম অনিকের মাধ্যমে ইব্রাহিম ও মফিজুর রহমান মামুনের সঙ্গে যোগাযোগ করেন। এই দুই বাহিনীর লোকজন ভাড়াটে হিসেবে হামলায় অংশ নেয় বলে সূত্রের দাবি।

ভাষানটেকের দেওয়ানপাড়া এলাকার কয়েকজন বাসিন্দা বলেন, দোতলা মসজিদের সামনে ইব্রাহিমের একটি ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানের কার্যালয় রয়েছে। ঘটনার দিন বিকেল চারটার দিকে ভাষানটেক বস্তি ও পল্লবী এলাকা থেকে লোকজন এনে মসজিদের সামনের মাঠে জড়ো করা হয়। তাদের অভিযোগ, ইব্রাহিমের বাহিনীর মাসুম ওরফে ফরসা মাসুম হামলাকারীদের জড়ো করে নিউগিনি আবাসন প্রকল্পে নিয়ে যান।

তদন্তসংশ্লিষ্ট সূত্রের ভাষ্য, হামলাকারীদের বড় অংশ এসেছিল ভাষানটেক বস্তি থেকে। ঘটনাস্থল থেকে অস্ত্রসহ গ্রেপ্তার দুজনও সেখানকার বাসিন্দা। তারা ইব্রাহিমের অনুসারী বলে সূত্রটি জানিয়েছে।

পুলিশের একটি সূত্রের দাবি, হামলায় ইব্রাহিমের অনুসারী যুবরাজ, শাহেদ, শাকিল, রূপচান, বাবলু ও বুকপোড়া সুমনও জড়িত ছিলেন। ভাষানটেক এলাকার নানা অপরাধের সঙ্গে তাদের সংশ্লিষ্টতার অভিযোগ রয়েছে।

স্থানীয় বাসিন্দাদের অভিযোগ, ভাষানটেক এলাকায় ভবন নির্মাণের কথা শুনলেই সেখানে হাজির হন ইব্রাহিমের অনুসারীরা। তাদের কাছ থেকে মাটি ভরাটের সেবা এবং ইট, বালু, সিমেন্টসহ নির্মাণসামগ্রী নিতে বাধ্য করা হয়।

একজন ভবনমালিক নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, ইব্রাহিমের লোকজন তাকে তাদের কাছ থেকে নির্মাণসামগ্রী কেনার প্রস্তাব দেন। রাজি না হওয়ায় তার নির্মাণাধীন ভবনের সামনে গিয়ে গুলি করা হয়। পরে তিনি ইব্রাহিমের কাছ থেকে নিম্নমানের ইট ও বালু কিনতে বাধ্য হন।

নিউগিনিতে হামলায় পল্লবীর মফিজুর রহমান মামুনের বাহিনীর সদস্যরাও অংশ নিয়েছিলেন বলে জানিয়েছে পুলিশ। পুলিশের অভিযোগ, মিরপুর ও আশপাশের এলাকায় জোর করে জমি দখল করে দিতে ভাড়াটে হিসেবে কাজ করেন এই বাহিনীর সদস্যরা। মিরপুর ও পল্লবী এলাকার নানা অপরাধেও তাদের সংশ্লিষ্টতা রয়েছে।

মফিজুর রহমান মামুন পল্লবী থানার ৯১ নম্বর ওয়ার্ড বিএনপির সভাপতি ছিলেন। খুন, জমি দখল, চাঁদাবাজিসহ নানা অপরাধে জড়িত থাকার অভিযোগে গত মঙ্গলবার তাকে দল থেকে বহিষ্কার করা হয়।

নিউগিনি আবাসন প্রকল্পের মালিক নাজিম উদ্দিন ভুঁইয়াও বলেন, তার প্রতিষ্ঠানে হামলায় ইব্রাহিম ও মামুন বাহিনীর লোকজন জড়িত।

সন্ত্রাসী পাঠিয়ে হামলা করানোসহ বিভিন্ন অভিযোগের বিষয়ে জানতে মো. ইব্রাহিম ও মফিজুর রহমান মামুনের মোবাইল ফোনে যোগাযোগের চেষ্টা করা হয়। তবে তাদের পাওয়া যায়নি।

পুলিশকে লক্ষ্য করেও গুলি

হামলার এক পর্যায়ে ঘটনাস্থলে যান ছয়জন পুলিশ সদস্য। তদন্তসংশ্লিষ্ট সূত্র বলছে, হামলাকারীরা তাদের লক্ষ্য করেও গুলি ছোড়ে। পুলিশ সদস্যদের লক্ষ্য করে কারা গুলি ছুড়েছিল, তাদের এখনো শনাক্ত করা যায়নি। হামলার সময় অন্য অস্ত্রধারীদের পরিচয় শনাক্তেরও চেষ্টা চলছে।

মামলার এজাহারে অভিযোগ করা হয়েছে, হামলার সময় আনুমানিক ৫০টি গুলি ছোড়া হয়। অন্যদিকে পুলিশের ভাষ্য, পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে পুলিশ সদস্যরা পাঁচটি গুলি ছুড়েন।

এদিকে গত বুধবার সালমান মুক্তাদিরের ব্যাংক হিসাবের তথ্য ও লেনদেনের বিবরণ চেয়েছে বাংলাদেশ ফাইন্যান্সিয়াল ইন্টেলিজেন্স ইউনিট (বিএফআইইউ)। একটি গোয়েন্দা সংস্থার তথ্যের ভিত্তিতে এসব বিবরণ চাওয়া হয়।

জমি ও রাস্তা নিয়ে বিরোধ

নাজিম উদ্দিন ভুঁইয়া ২০১১ সাল থেকে ক্যান্টনমেন্ট থানাধীন ইসিবি চত্বর এলাকায় জমি কিনে আবাসন ব্যবসা শুরু করেন। এখন তার নিউগিনি আবাসন প্রকল্পের আয়তন ১০ থেকে ১২ বিঘা।

প্রকল্পসংলগ্ন ৩৫ কাঠা জমি নিয়ে বিরোধের বিষয়টি হামলার তদন্তে উঠে এসেছে। গত শুক্রবার সেখানে গিয়ে দেখা যায়, জমিটি খালি পড়ে আছে। এর তিন পাশে স্থানীয় বাসিন্দাদের ঘরবাড়ি, অন্য পাশে নিউগিনি আবাসন প্রকল্প। ওই জমি থেকে বের হওয়ার জন্য নিউগিনি প্রকল্পের রাস্তা ব্যবহারের বিষয়টি নিয়ে বিরোধ রয়েছে।

নাজিম উদ্দিন বলেন, ৩৫ কাঠার মধ্যে ১৫ কাঠা জমি গোলাম মহিউদ্দিন তার কাছে বিক্রি করেছেন। সেই জমিতে মাটি ভরাট করে তিনি সীমানাপ্রাচীর নির্মাণ করেছিলেন। ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর হামলা করে সেটি ভেঙে দেওয়া হয়।

নাজিমের অভিযোগ, জমি বুঝিয়ে না দিয়ে সেখানে বহুতল ভবন নির্মাণের ঘোষণা দেন গোলাম মহিউদ্দিন। পাশাপাশি নিউগিনি আবাসন প্রকল্পের ভেতর দিয়ে রাস্তা চান। রাস্তা দিতে রাজি না হওয়ায় ভাড়াটে সন্ত্রাসী দিয়ে হামলা করানো হয়।

নাজিমের বিরুদ্ধেও মামলা

নিউগিনির মালিক নাজিম উদ্দিনের বিরুদ্ধেও জমিসংক্রান্ত অভিযোগ রয়েছে। জোয়ার সাহারা এলাকায় সাড়ে আট কাঠা জমির পুরো দাম পরিশোধ না করে অন্যের কাছে বিক্রি করে দেওয়ার অভিযোগে গত জুলাইয়ে ক্যান্টনমেন্ট থানায় তার বিরুদ্ধে মামলা করেন মিজানুর রহমান নামের এক ব্যক্তি।

এজাহারে অভিযোগ করা হয়েছে, ২০২৪ সালে জমিটি কেনার জন্য বায়নাপত্র হয়। দাম নির্ধারণ করা হয় ৫ কোটি ৪০ লাখ টাকা। নাজিম উদ্দিন ১ কোটি টাকা পরিশোধ করেন। বাকি ৪ কোটি ৪০ লাখ টাকা ৫ মাসের মধ্যে দেওয়ার কথা থাকলেও তা পরিশোধ করেননি। এর মধ্যেই জমিটি অন্যের কাছে বিক্রি করে দেন বলে বাদীর অভিযোগ।

আওয়ামী লীগ আমলে রাজনৈতিক প্রভাব খাটিয়ে জমি দখলের অভিযোগের বিষয়ে নাজিম উদ্দিন জানান, ব্যবসায়িক প্রতিপক্ষরা বিভিন্ন সময়ে তাকে বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের ‘ট্যাগ’ দিয়ে হয়রানি করেছেন।

তার ভাষ্য, ২০২২ সালে বিএনপি–জামায়াতের সঙ্গে জড়িত থাকার অভিযোগে বিশেষ ক্ষমতা আইনে ঢাকার বিভিন্ন থানায় তার বিরুদ্ধে মামলা হয়। সেসব মামলায় গ্রেপ্তার হয়ে তিনি কারাগারে ছিলেন। জুলাই গণ–অভ্যুত্থানের সময়ও ক্যান্টনমেন্ট থানায় তার বিরুদ্ধে মামলা হয়। আবার ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর তাকে ‘আওয়ামী লীগের দোসর’ আখ্যা দিয়ে মামলা দেওয়া হচ্ছে।