logo

দীর্ঘমেয়াদি ইরান যুদ্ধ বাংলাদেশের পরিস্থিতিকে আরও খারাপ করতে পারে

দীর্ঘমেয়াদি ইরান যুদ্ধ বাংলাদেশের পরিস্থিতিকে আরও খারাপ করতে পারে

ইরান যুদ্ধের কারণে বাংলাদেশে জ্বালানি ও বিদ্যুৎ সংকট নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। কারণ, দেশে জ্বালানির মজুত খুবই সীমিত এবং যুদ্ধ কত দিন চলবে তা নিয়ে অনিশ্চয়তা রয়েছে।

যুদ্ধ দ্রুত শেষ হওয়ার কোনো লক্ষণ না থাকায় ভবিষ্যতে জ্বালানি সংকট দেখা দিতে পারে—এমন আশঙ্কায় সাধারণ মানুষের মধ্যে উদ্বেগ বাড়ছে।

সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো জানায়, বাংলাদেশ মূলত মধ্যপ্রাচ্য থেকে জ্বালানি আমদানির ওপর নির্ভরশীল। দেশের বর্তমান মজুতও পর্যাপ্ত নয়। এ অবস্থায় যুদ্ধ কয়েক মাস স্থায়ী হলে সম্ভাব্য জ্বালানি সংকট আরও তীব্র হতে পারে।

এ নিয়ে মানুষের মধ্যে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছে যে জ্বালানি সংকট বাড়তে পারে, শিল্প উৎপাদন কমে যেতে পারে এবং পরিবহন ব্যয় বাড়তে পারে, যা শেষ পর্যন্ত মূল্যস্ফীতি বাড়াতে পারে।

এ পরিস্থিতিতে দেশের জ্বালানি সরবরাহ ব্যবস্থা সচল রাখতে সরকারকে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়ার পরামর্শ দিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা।

তাদের পাঁচ সুপারিশ হলো—

১. জ্বালানি আমদানির জন্য বিকল্প উৎস অনুসন্ধান করা।

২. অবিলম্বে লোডশেডিংসহ মিতব্যয়ী ব্যবস্থা চালু করা।

৩. সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদন বৃদ্ধি করা।

৪. বিলম্ব না করে নিজস্ব গ্যাস ও কয়লা উত্তোলন এবং কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎ উৎপাদন দ্রুত বাড়ানো।

৫. পেট্রোল পাম্পে জ্বালানি রেশনিং কার্যকর করতে কঠোর নজরদারি নিশ্চিত করা।

এ বিষয়ে যোগাযোগ করা হলে সাবেক অন্তর্বর্তী সরকারের জ্বালানি উপদেষ্টা ড. ফাওজুল কবির খান এশিয়া পোস্টকে বলেন,

দেশে তাৎক্ষণিকভাবে বিদ্যুৎ ও জ্বালানি সংকট নেই। আসন্ন ঈদ পর্যন্ত নিরবচ্ছিন্ন সরবরাহ নিশ্চিত করা হয়েছে।

তিনি বলেন,

এ ধরনের যুদ্ধ পরিস্থিতি যে কোনো সময় দেখা দিতে পারে। তাই বাংলাদেশকে জ্বালানি ও বিদ্যুৎ উৎপাদনে স্বনির্ভর হতে হবে।

ড. ফাওজুল কবির খান বলেন, জ্বালানি খাতে স্বনির্ভরতা অর্জনের জন্য পরিকল্পিত উদ্যোগ নিয়ে সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদন বাড়াতে হবে।

তিনি বলেন,

বাংলাদেশে সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদনের ব্যাপক সম্ভাবনা রয়েছে। এ জন্য প্রয়োজন সঠিক পরিকল্পনা ও উদ্যোগ।

তিনি আরও বলেন, আমদানিনির্ভর জ্বালানি ব্যবস্থার ওপর থেকে দেশকে ধীরে ধীরে বেরিয়ে আসতে হবে।

নিজস্ব গ্যাস ও কয়লা সম্পদ অনুসন্ধান ও উত্তোলনের মাধ্যমে এই খাতে স্বনির্ভরতা অর্জন করা সম্ভব বলেও মন্তব্য করেন তিনি।

এদিকে বিশিষ্ট জ্বালানি বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ড. ইজাজ হোসেন এশিয়া পোস্টকে বলেন,

বর্তমান পরিস্থিতিতে পেট্রোল পাম্পে জ্বালানি রেশনিং ব্যবস্থা চালু করা একটি কার্যকর তাৎক্ষণিক পদক্ষেপ। এটি সঠিকভাবে বাস্তবায়নের জন্য কঠোর নজরদারি চালু করতে হবে।

তিনি বলেন, যুদ্ধ চলতে থাকলে বাংলাদেশ জ্বালানি ও বিদ্যুৎ খাতে গুরুতর সংকটের মুখে পড়তে পারে। তাই মিতব্যয়ী নীতি গ্রহণ করা জরুরি।

দীর্ঘমেয়াদি পরিস্থিতি মোকাবিলায় সরকারকে লোডশেডিং শুরু করারও পরামর্শ দেন তিনি। তিনি আরও বলেন, আগের সরকারগুলো গ্যাস মজুতের ক্ষেত্রে ভুল সিদ্ধান্ত নিয়েছিল।

‘বাংলাদেশ প্রায় শতভাগ আমদানিনির্ভর গ্যাস ব্যবস্থার ওপর নির্ভরশীল হওয়ায় অন্তত দুই থেকে তিন মাসের গ্যাস মজুত থাকা উচিত ছিল। কিন্তু বর্তমানে প্রায় দৈনন্দিন আমদানির ওপর নির্ভর করতে হচ্ছে,’ বলেন তিনি।

তিনি বলেন, মধ্যপ্রাচ্যে দীর্ঘমেয়াদি যুদ্ধ শুরু হলে সরকারকে সিঙ্গাপুরের মতো বিকল্প উৎস থেকে জ্বালানি আমদানির কথা ভাবতে হবে, যদিও এতে ব্যয় বেশি হবে।

আরেক জ্বালানি বিশেষজ্ঞ বদরুল ইমামও এ বিষয়ে একই মতপ্রকাশ করেছেন।

বদরুল ইমাম বলেন,

এ ধরনের পরিস্থিতি মোকাবিলায় সরকারকে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা নিতে হবে। জরুরি ভিত্তিতে নিজস্ব গ্যাস ও কয়লাক্ষেত্র অনুসন্ধান করতে হবে এবং বিদ্যুতের চাহিদা পূরণে কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎ উৎপাদন বাড়াতে হবে।

তিনি সতর্ক করে বলেন, যুদ্ধ দ্রুত শেষ না হলে পরিস্থিতি আরও খারাপ হতে পারে।

জ্বালানি মজুত নিয়ে উদ্বেগের মধ্যেই বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশনের (বিপিসি) চেয়ারম্যান মো. রেজানুর রহমান সাংবাদিকদের জানান, দেশে বর্তমানে ১ লাখ ৩৬ হাজার টন জ্বালানি তেল মজুত রয়েছে।

তিনি বলেন, নিরবচ্ছিন্ন সরবরাহ নিশ্চিত করতে ২ মার্চ পর্যন্ত সাতটি জ্বালানিবাহী জাহাজের জন্য এলসি খোলা হয়েছে।

৩ মার্চ কারওয়ান বাজারে বিপিসি ভবনে সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে তিনি এ তথ্য জানান।

বিপিসির তথ্য অনুযায়ী বর্তমানে দেশে জ্বালানি মজুত রয়েছে— ডিজেল ১৪ দিনের, অকটেন ২৮ দিনের, পেট্রোল ১৫ দিনের, ফার্নেস অয়েল ৯৩ দিনের এবং জেট ফুয়েল ৫৫ দিনের।

বিপিসি চেয়ারম্যান বলেন, যুদ্ধ পরিস্থিতি বিবেচনায় বিকল্প বাজার থেকে জ্বালানি আমদানির বিষয়টি ভাবা হচ্ছে। তবে বর্তমান মজুত অনুযায়ী জ্বালানির দাম বাড়ানোর তাৎক্ষণিক কোনো কারণ নেই।

বিপিসির মজুতের তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যায়, নতুন সরবরাহ না এলে ১৪ থেকে ২১ দিনের মধ্যে জ্বালানি মজুত শেষ হয়ে যেতে পারে। ইতোমধ্যে জ্বালানি বহনকারী দুটি জাহাজ চট্টগ্রামে পৌঁছেছে এবং এর একটি থেকে তেল খালাস শুরু হয়েছে।

এদিকে বিদ্যুৎ ও জ্বালানি প্রতিমন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকু বলেছেন, জ্বালানি পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বিগ্ন হওয়ার কোনো কারণ নেই। আগামী ৯ মার্চ আরও দুটি তেলবাহী জাহাজ দেশে পৌঁছাবে।

শনিবার (৭ মার্চ) প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে জ্বালানি পরিস্থিতি নিয়ে বৈঠক শেষে সাংবাদিকদের তিনি এ তথ্য জানান।

মন্ত্রী বলেন, পেট্রোল পাম্পে জ্বালানি রেশনিং কার্যকরভাবে বাস্তবায়নের জন্য রোববার (৮ মার্চ) থেকে ভ্রাম্যমাণ আদালত অভিযান শুরু করবে।

তিনি বলেন, বাস্তবে কোনো ঘাটতি না থাকলেও জনগণের মধ্যে অযথা আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছে। দেশে পর্যাপ্ত জ্বালানি মজুত রয়েছে।

মন্ত্রী আরও বলেন, বিকল্প উৎস থেকে তেল আমদানির চেষ্টা করছে সরকার।

এর আগে বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশন (বিপিসি) শুক্রবার এক নির্দেশনায় পেট্রোল পাম্প থেকে জ্বালানি সরবরাহের সীমা নির্ধারণ করে দেয়।

নির্দেশনা অনুযায়ী—

  • মোটরসাইকেল প্রতিদিন ২ লিটার পেট্রোল বা অকটেন নিতে পারবে।
  • ব্যক্তিগত গাড়ি প্রতিদিন সর্বোচ্চ ১০ লিটার।
  • এসইউভি বা জিপ এবং মাইক্রোবাস ২০–২৫ লিটার।
  • পিকআপ ও লোকাল বাস প্রতিদিন ৭০–৮০ লিটার ডিজেল।
  • দূরপাল্লার বাস, ট্রাক, কাভার্ডভ্যান ও কনটেইনার ট্রাক প্রতিদিন ২০০–২২০ লিটার ডিজেল নিতে পারবে।

জ্বালানি প্রতিমন্ত্রী জনগণকে তেল মজুত না করার আহ্বান জানিয়ে বলেন, বাজারে হঠাৎ চাহিদা বেড়ে যাওয়ার কারণেই এই উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।

জ্বালানির দাম বাড়ানোর সিদ্ধান্ত এখনও হয়নি

বর্তমান পরিস্থিতিতে দেশে জ্বালানি তেলের দাম বাড়ানোর বিষয়ে সরকার এখনও কোনো সিদ্ধান্ত নেয়নি বলে জানিয়েছে বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশন (বিপিসি)।

শুক্রবার বিপিসির সচিব শাহিনা সুলতানা স্বাক্ষরিত এক বিজ্ঞপ্তিতে এ তথ্য জানানো হয়।

জ্বালানি পাচার ঠেকাতে সীমান্তে তল্লাশি জোরদার করেছে বিজিবি

আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানির দাম বৃদ্ধির কারণে দেশে জ্বালানি পাচারের আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। এ পরিস্থিতিতে সীমান্ত এলাকায় জ্বালানি পাচার রোধে বিজিবি বিভিন্ন সীমান্তে জনবল, টহল এবং তল্লাশি কার্যক্রম বাড়িয়েছে।