কোরবানির হাটে সুস্থ পশু চিনবেন কীভাবে

পবিত্র ঈদুল আজহার আর মাত্র দুই সপ্তাহ বাকি। সময় ঘনিয়ে আসায় কোরবানির পশু কিনতে দেশের বিভিন্ন পশুর হাটে মানুষের ভিড় বাড়বে। কোরবানির পশু কেনার সময় কৃত্রিমভাবে মোটাতাজা করা পশু চেনার উপায় এবং প্রাকৃতিকভাবে গরু মোটাতাজাকরণ বিষয়ে দিকনির্দেশনা দিয়েছেন বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের (বাকৃবি) ফিজিওলজি বিভাগের অধ্যাপক ও প্রাণী বিশেষজ্ঞ ড. মোহাম্মদ আলম মিয়া।
ড. মোহাম্মদ আলম মিয়া বলেন, কৃত্রিমভাবে মোটাতাজা করা গরুর নাক সাধারণত শুকনো থাকে। এসব গরুর শরীর থলথলে হয় এবং দেহে অতিরিক্ত পানি জমে থাকে। একটু হাঁটলেই হাঁপিয়ে যায় এবং শ্বাস-প্রশ্বাসের হার বেড়ে যায়। গরুগুলোকে ক্লান্ত ও অলস দেখায়, অনেক সময় দাঁড়িয়ে থাকতে কষ্ট হয়।
অধ্যাপক আলম মিয়া জানান, কৃত্রিমভাবে মোটাতাজা করা গরুর শরীরে হাত দিলে স্বাভাবিক প্রতিক্রিয়া কম দেখা যায়। আঙুল দিয়ে চাপ দিলে শরীরের অংশ দেবে যায় এবং স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরতে সময় লাগে। এসব গরুর রানের মাংস অস্বাভাবিক নরম হয় এবং হাড়ও তুলনামূলক দুর্বল থাকে। ফলে দুর্ঘটনায় হাড় ভেঙে যাওয়ার ঝুঁকি বেশি থাকে।
তিনি বলেন, এসব গরুর খাওয়ার আগ্রহ কম থাকে এবং নিয়মিত জাবর কাটে না। অনেক সময় মুখ দিয়ে অতিরিক্ত লালা বা ফেনা বের হতে দেখা যায়। দীর্ঘ পথ হাঁটিয়ে হাটে আনার পর তারা দ্রুত ক্লান্ত হয়ে পড়ে এবং বসে গেলে সহজে উঠতে চায় না।
সুস্থ গরু চেনার উপায় সম্পর্কে তিনি বলেন, সুস্থ গরুর নাক ভেজা বা ঘামযুক্ত থাকবে, চোখ উজ্জ্বল থাকবে এবং শরীরে হাত দিলে দ্রুত প্রতিক্রিয়া দেখা যাবে। সুস্থ গরু চঞ্চল স্বভাবের হয়, খাবার দেখলে খেতে আগ্রহ প্রকাশ করে এবং নিয়মিত জাবর কাটে। এ ছাড়া সুস্থ গরুর চামড়া টানটান ও চকচকে থাকে। গরুর শরীরে আঙুল দিয়ে চাপ দিলে যদি দ্রুত আগের অবস্থায় ফিরে আসে, তাহলে সেটি স্বাভাবিক ও প্রাকৃতিকভাবে মোটাতাজা হওয়ার লক্ষণ। অন্যদিকে চাপ দেওয়ার পর দেবে থাকলে বুঝতে হবে শরীরে অতিরিক্ত পানি জমেছে।

হাটে অনেক সময় পশুটি অসুস্থ নাকি সুস্থ- এটি নির্ণয় নিয়ে ক্রেতা-বিক্রেতার মধ্যে দ্বিধা তৈরি হতে পারে। সে ক্ষেত্রে সহজে চেনার কিছু উপায় জানিয়েছেন অধ্যাপক আলম মিয়া।
তিনি বলেন, যদি তাপমাত্রার কথাই ধরি, তাহলে পশুর তাপমাত্রা মানুষের মতো মাপা যায় না, পশুর ক্ষেত্রে রেকটাল টেম্পারেচার (মলাশয়ের তাপমাত্রা) নিতে হয়। কিন্তু কেনার সময় তা করা সম্ভব নয়, সে ক্ষেত্রে পশুর কানের গোড়ায় হাত দিয়ে তাপমাত্রা পরিমাপ করা যায় সহজেই। এ ছাড়া আরেকটি সহজ উপায় হলো গরুর নাকের উপরের অংশে (মাজল) হাত দিলে স্থানটি যদি শুকনা মনে হয়, তাহলে ধরে নিতে হবে গরুটি অসুস্থ।
খামারিদের উদ্দেশ্যে ড. আলম মিয়া বলেন, অনেক খামারি হাতুড়ে চিকিৎসক বা কোয়াকদের পরামর্শে ডেক্সামেথাসন, প্রেডনিসোলনসহ বিভিন্ন স্টেরয়েড ব্যবহার করে পশু মোটাতাজা করেন। এসব ওষুধ পশুর রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা কমিয়ে দেয় এবং লিভার ও কিডনির মারাত্মক ক্ষতি করে। অনেক ক্ষেত্রে হঠাৎ পশুর মৃত্যুও ঘটতে পারে। প্রাকৃতিক ও বৈজ্ঞানিক উপায়ে খুব সহজেই গরু মোটাতাজা করা সম্ভব। এজন্য দুই থেকে চার বছর বয়সী স্বাস্থ্যবান গরু নির্বাচন, নিয়মিত কৃমিনাশক প্রয়োগ, সুষম খাদ্য সরবরাহ, ভিটামিন-মিনারেল প্রিমিক্স ব্যবহার এবং পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন পরিবেশ নিশ্চিত করা জরুরি। সঠিক ব্যবস্থাপনায় তিন থেকে ছয় মাসের মধ্যেই একটি গরু ভালোভাবে মোটাতাজা করা সম্ভব।
সবশেষে তিনি কোরবানির পশু কেনার ক্ষেত্রে ক্রেতাদের আরও সচেতন হওয়ার পরামর্শ দিয়ে বলেন, শুধু পশুর আকার-আকৃতি দেখে সিদ্ধান্ত না নিয়ে তার স্বাভাবিক আচরণ, শ্বাস-প্রশ্বাসের গতি, নাকের অবস্থা ও চলাফেরা ভালোভাবে পর্যবেক্ষণ করা জরুরি। পশুর শারীরিক অবস্থা নিয়ে কোনো সন্দেহ দেখা দিলে উপজেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা বা রেজিস্টার্ড ভেটেরিনারি চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া উচিত।
এদিকে ময়মনসিংহ জেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তার কার্যালয় সূত্রে জানা যায়, কোরবানির জন্য জেলায় চাহিদা রয়েছে ১ লাখ ৮১ হাজার ২৬৬টি পশুর। বিপরীতে জেলার ১৩টি উপজেলায় প্রস্তুত রয়েছে ২ লাখ ২৬ হাজার ১৪৮টি। জেলার চাহিদার চেয়ে ৪৪ হাজার ৮৮২টি পশু উদ্বৃত্ত রয়েছে। এসব পশুর মধ্যে গরু সবচেয়ে বেশি। এ ছাড়া রয়েছে ছাগল, ভেড়া ও মহিষ। এসব উদ্বৃত্ত পশু জেলার বাইরে বিক্রি করে দেওয়া হবে।
সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, প্রস্তুত করা পশুর মধ্যে গরুর সংখ্যা ১ লাখ ১৫ হাজার ৯৪৭টি আর ছাগল ১ লাখ ৩ হাজার ৯৬৬টি। এ ছাড়া কোরবানির জন্য রয়েছে ৫ হাজার ৩৪৪টি ভেড়া ও ৮৮৬টি মহিষ।
ময়মনসিংহ জেলার অতিরিক্ত প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা ডা. মোহাম্মদ আব্দুল্লাহ আল মামুন বলেন, প্রয়োজনের চেয়ে বেশি পশু প্রস্তুত রয়েছে। জেলার চাহিদা মিটিয়ে অতিরিক্ত পশু ঢাকাসহ দেশের অন্যান্য জেলায় পাঠানো হতে পারে। কোরবানির হাটে সুস্থ পশু কিনতে ভালোভাবে যাচাই-বাছাই করতে হবে। প্রয়োজনে প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তাদের পরামর্শ নিতে পারেন।