logo

পরিবেশ সুরক্ষায় নবায়নযোগ্য জ্বালানি ব্যবহারের আহ্বান

পরিবেশ সুরক্ষায় নবায়নযোগ্য জ্বালানি ব্যবহারের আহ্বান
ভার্চুয়াল আলোচনা সভায় অংশগ্রহণকারীরা। ছবি: সংগৃহীত

বিশ্ব পরিবেশ দিবস উপলক্ষে পিএসডিআই কনসালটেনসির কারিগরি সহায়তায় এবং জাবারাং কল্যাণ সমিতি ও পিএসডিআই ফাউন্ডেশনের যৌথ উদ্যোগে ‘পরিবেশ সুরক্ষা ও টেকসই উন্নয়নে নবায়নযোগ্য জ্বালানি ব্যবহারে বাংলাদেশের সম্ভাবনা’ শীর্ষক ভার্চুয়াল আলোচনা সভা অনুষ্ঠিত হয়েছে। সভায় দেশের বিভিন্ন প্রান্তের পরিবেশকর্মী, গবেষক, উন্নয়নকর্মী, গণমাধ্যমকর্মী ও তরুণ প্রতিনিধিরা অংশগ্রহণ করেন।

পিএসডিআই ফাউন্ডেশনের চেয়ারপারসন নিবেদিতা বর্মার সঞ্চালনায় এবং সংস্থার সাধারণ সম্পাদক সঞ্জয় মজুমদারের সভাপতিত্বে সভায় মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন বাংলাদেশ ইউনিভার্সিটি অব প্রফেশনালসের (বিইউপি) পরিবেশ বিজ্ঞান বিভাগের সহকারী অধ্যাপক ইশরাত জাহান। অতিথি আলোচক ছিলেন উৎসর নির্বাহী পরিচালক মোস্তফা কামাল যাত্রা, সুন্দরবন ও উপকূল সুরক্ষা আন্দোলনের সমন্বয়ক নিখিল চন্দ্র ভদ্র, ক্যাপ্টেন’স টিভির ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক ইসহাক ফারুকী এবং স্ট্রিট চিলড্রেন অ্যাকটিভিস্ট নেটওয়ার্কের সাধারণ সম্পাদক মো. মনিরুজ্জামান মুকুল।

মূল প্রবন্ধে অধ্যাপক ইশরাত জাহান বলেন, বর্তমানে বাংলাদেশে জীবাশ্ম জ্বালানি খাতের অবস্থা সম্ভাবনাময়। বিদ্যুৎ উৎপাদনে জীবাশ্ম জ্বালানির ওপর নির্ভরশীলতা কমানোর দিকে সচেষ্ট ও সচেতন হতে হবে। পাশাপাশি নবায়নযোগ্য জ্বালানি ব্যবহারে মানুষকে উদ্বুদ্ধ করতে হবে। টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা (এসডিজি) ৭ (সবার জন্য সাশ্রয়ী ও পরিচ্ছন্ন জ্বালানি) এবং এসডিজি ১৩ (জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলা) বাস্তবায়নের জন্য নবায়নযোগ্য জ্বালানি খাতে বিনিয়োগ বৃদ্ধি অপরিহার্য। সৌরশক্তি, বায়ুশক্তি, বায়োগ্যাস এবং বর্জ্য থেকে শক্তি উৎপাদনের সম্ভাবনা রয়েছে। বাংলাদেশের ভৌগোলিক ও সামাজিক বাস্তবতায় বিকেন্দ্রীভূত নবায়নযোগ্য জ্বালানি ব্যবস্থা গ্রামীণ উন্নয়ন ও পরিবেশ সুরক্ষায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।

মোস্তফা কামাল যাত্রা বলেন, বর্তমানে বিশ্বজুড়ে কার্বন নিঃসরণ কমানোর যে উদ্যোগ গ্রহণ করা হচ্ছে, সেখানে নবায়নযোগ্য জ্বালানি অন্যতম কার্যকর সমাধান হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। বাংলাদেশে সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদনের সম্ভাবনা অত্যন্ত উজ্জ্বল হলেও প্রযুক্তিগত সীমাবদ্ধতা, অর্থায়নের ঘাটতি, নীতিগত প্রতিবন্ধকতা এবং দক্ষ জনবলের অভাব এ খাতের বিকাশে চ্যালেঞ্জ হিসেবে রয়ে গেছে।

নিখিল চন্দ্র ভদ্র বলেন, জলবায়ু পরিবর্তনের সবচেয়ে বড় প্রভাব পড়ছে উপকূলীয় জনগোষ্ঠীর ওপর। সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি, লবণাক্ততা এবং ঘূর্ণিঝড়ের কারণে উপকূলীয় মানুষের জীবন ও জীবিকা ক্রমাগত ঝুঁকির মুখে পড়ছে। এ অবস্থায় নবায়নযোগ্য জ্বালানির প্রসার এবং কার্বন নিঃসরণ হ্রাসের মাধ্যমে পরিবেশগত ঝুঁকি কমানোর পাশাপাশি জলবায়ু সহনশীল সমাজ গড়ে তোলার উদ্যোগ গ্রহণ করতে হবে।

ইসহাক ফারুকী বলেন, পরিবেশ ও জলবায়ু পরিবর্তন বিষয়ে জনসচেতনতা বৃদ্ধি ছাড়া কোনো টেকসই পরিবর্তন সম্ভব নয়। বিশেষ করে তরুণ প্রজন্মকে পরিবেশবান্ধব জীবনধারা, সবুজ প্রযুক্তি এবং নবায়নযোগ্য জ্বালানির ব্যবহার সম্পর্কে উদ্বুদ্ধ করতে হবে। এক্ষেত্রে গণমাধ্যম গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে পারে। নবায়নযোগ্য জ্বালানির সুবিধা, সম্ভাবনা এবং প্রয়োজনীয়তা সম্পর্কে ইতিবাচক বার্তা ছড়িয়ে দিতে মিডিয়ার সক্রিয় অংশগ্রহণ নিশ্চিত করার ওপর গুরুত্বারোপ করা হয়।

মো. মনিরুজ্জামান মুকুল বলেন, জাতীয় বাজেটে নবায়নযোগ্য জ্বালানি, পরিবেশ সংরক্ষণ এবং জলবায়ু অভিযোজন কার্যক্রমের জন্য পর্যাপ্ত বরাদ্দ নিশ্চিত করতে হবে। পরিবেশ রক্ষা ও জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলা কোনো একদিনের কর্মসূচি নয়; এটি একটি চলমান প্রক্রিয়া, যা সরকার, বেসরকারি প্রতিষ্ঠান, উন্নয়ন সংস্থা এবং সাধারণ জনগণের সম্মিলিত উদ্যোগের মাধ্যমে বাস্তবায়ন করতে হবে।

সঞ্জয় মজুমদার বলেন, জলবায়ু পরিবর্তন ও পরিবেশগত সংকট মোকাবিলায় সমন্বিত উদ্যোগের কোনো বিকল্প নেই। পরিবেশ, জলবায়ু এবং নবায়নযোগ্য জ্বালানি নিয়ে কাজ করা সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠান, গবেষণা সংস্থা, নাগরিক সমাজ এবং যুব সংগঠনসমূহকে একযোগে কাজ করতে হবে। টেকসই উন্নয়ন নিশ্চিত করতে হলে পরিবেশ সুরক্ষাকে উন্নয়ন পরিকল্পনার কেন্দ্রবিন্দুতে রাখতে হবে। নবায়নযোগ্য জ্বালানির ব্যবহার সম্প্রসারণ, পরিবেশবান্ধব নীতি বাস্তবায়ন এবং জনসম্পৃক্ততা বৃদ্ধির মাধ্যমে বাংলাদেশ জলবায়ু পরিবর্তনের চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করে একটি সবুজ, নিরাপদ ও টেকসই ভবিষ্যৎ নির্মাণে গুরুত্বপূর্ণ অগ্রগতি অর্জন করতে সক্ষম হবে।

আলোচনা সভায় নবায়নযোগ্য জ্বালানি বিষয়ে জাতীয় পর্যায়ে ব্যাপক সচেতনতামূলক কার্যক্রম পরিচালনা, পরিবেশ সুরক্ষায় নাগরিক সমাজ, শিক্ষাভাবন এবং যুবসমাজের সক্রিয় অংশগ্রহণ বৃদ্ধি, সৌর, বায়ু, বায়োগ্যাস ও অন্যান্য সবুজ জ্বালানি খাতে বিনিয়োগের নতুন সুযোগ চিহ্নিত ও উৎসাহিত করা, নবায়নযোগ্য জ্বালানি উন্নয়নে কার্যকর নীতি, কর্মপরিকল্পনা ও বাস্তবায়ন কাঠামো প্রণয়ন, জলবায়ু পরিবর্তন অভিযোজন ও প্রশমন কার্যক্রমে স্থানীয় জনগণের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা, পরিবেশ ও জ্বালানি খাতে গবেষণা, প্রযুক্তি উদ্ভাবন এবং দক্ষ মানবসম্পদ উন্নয়নে বিশেষ গুরুত্ব প্রদান, জাতীয় বাজেটে নবায়নযোগ্য জ্বালানি ও পরিবেশ সুরক্ষা কার্যক্রমের জন্য পর্যাপ্ত বরাদ্দ নিশ্চিত করা, আয়োজক প্রতিষ্ঠানসমূহসহ সংশ্লিষ্ট সংগঠনগুলোর মধ্যে ভবিষ্যৎ সহযোগিতা, যৌথ উদ্যোগ এবং জ্ঞান বিনিময়ের সুযোগ সৃষ্টি করা ইত্যাদি সুপারিশসমূহ তুলে ধরা হয়।