লন্ডনে গিয়ে তারেক রহমানের কাছ থেকে নির্বাচনের তারিখ নিয়ে আসেন ড. ইউনূস

অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূস লন্ডনে গিয়ে তারেক রহমানের কাছে জুলাই আন্দোলনের ট্রফি দিয়ে নির্বাচনের তারিখ নিয়ে আসেন বলে মন্তব্য করেছেন স্থানীয় সরকার প্রতিমন্ত্রী মীর শাহে আলম।
মঙ্গলবার (৭ এপ্রিল) জাতীয় সংসদে রাষ্ট্রপতির ভাষণের ওপর আলোচনায় অংশ নিয়ে তিনি এ কথা বলেন। এদিন সকাল সাড়ে ১০টায় স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদের সভাপতিত্বে সংসদের অধিবেশন শুরু হয়।
প্রতিমন্ত্রী বলেন, ‘জুলাই-আগস্টের আন্দোলনে ছাত্র-জনতার সঙ্গে আমরা সবাই ছিলাম। ট্রফি আমরা কারও কাছে নিতে যাইনি। ক্যাপ্টেন কে? সেটা অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান ড. মুহাম্মদ ইউনূস ছিলেন। এ কারণে উনি লন্ডনে গিয়ে আমাদের ক্যাপ্টেন, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের কাছে ট্রফি দিয়ে নির্বাচনের তারিখ নিয়ে আসেন। এতে প্রমাণিত হয়, ছাত্র-জনতার আন্দোলনের নেতৃত্বে মূল ভূমিকা কোন দলের ছিল, কোন নেতার ছিল।’
দেশের আন্দোলন-সংগ্রামে বিএনপিকে বিজয়ী দল হিসেবে তুলে ধরলেন বগুড়া থেকে নির্বাচিত হয়ে আসা স্থানীয় সরকার প্রতিমন্ত্রী মীর শাহে আলম।
বিএনপির অবদান তুলে ধরতে গিয়ে তিনি বলেন, ‘১৯৭১, ১৯৯০ এবং জুলাই-আগস্ট, তিনটি আন্দোলনের ট্রফিই আমাদের ঘরে। এ রকম ট্রফি শুধু বিএনপির ঘরে, অন্য কোনো রাজনৈতিক দল দেখাতে পারবে না। আওয়ামী লীগ একাত্তর ও নব্বইয়ের কথা বলতে পারবে। কিন্তু জুলাই-আগস্টের ট্রফি তাদের নেই। বিরোধী দলের বন্ধুরা জুলাই-আগস্ট বলতে পারবে, কিন্তু একাত্তর ও নব্বইয়ের কথা বলতে পারবে না।’
এ সময় বিরোধীদলীয় সদস্যরা হইচই শুরু করলে প্রতিমন্ত্রী বলেন, ‘বিরোধী দলের এমপিরা হইচই করতে পারেন, তারা নব্বইয়ের কথা বলতে পারেন। ১৯৮৬ সালের নির্বাচনে ঢাকঢোল পিটিয়ে তারাই আওয়ামী লীগের সঙ্গে নির্বাচনে গিয়েছিলেন।’
প্রতিমন্ত্রী শাহে আলম বলেন, ‘এনসিপির এক নেতা বাইরে বলেছিলেন, ‘জুলাই আন্দোলনে ছাত্র-জনতা খেলেছে, আর ট্রফি নিয়েছে বিএনপি।’
এ সময় বিরোধী দলের সংসদ সদস্যরা আরও হইচই করতে থাকলে শাহে আলমের বক্তব্য না দেওয়ার অনুরোধ জানান স্পিকার।
বিরোধীদলীয় নেতা ও জামায়াতে ইসলামীর আমির ডা. শফিকুর রহমান এ সময় প্রতিমন্ত্রীর বক্তব্যের কিছু বক্তব্য ‘অসত্য’ দাবি করে তা সংসদের কার্যবিবরণী থেকে বাদ (এক্সপাঞ্জ) দেওয়ার আহ্বান জানান।
এ পর্যায়ে প্রতিমন্ত্রী শাহে আলম বলেন, ‘আমরা সবাই আন্দোলন করেছি, এটা অস্বীকার করার সুযোগ নাই। কিন্তু ক্যাপ্টেন একজনই থাকেন, সে ক্যাপ্টেনের কাছে অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান লন্ডনে গিয়ে আলোচনা করে নির্বাচনের তারিখ নিয়ে আসছেন বলেই এ দেশে একটি অবাধ, সুষ্ঠু নির্বাচন হয়েছে।’
সংসদ অধিবেশন পরিচালনাকারী খেতাবপ্রাপ্ত বীর মুক্তিযোদ্ধা হাফিজ উদ্দিন আহমদের উদ্দেশে প্রতিমন্ত্রী বলেন, ‘আপনাকে দেখলে এখানে অনেকের ভালো লাগবে, কারও কারও ভালো লাগবে না। কিন্তু আপনি ১৯৭১ সালকে প্রতিনিধিত্ব করছেন। এই ক্রেডিট বিএনপির। কারণ, স্বাধীনতার ঘোষক রাষ্ট্রপতি শহীদ জিয়াউর রহমান।’
এ পর্যায়ে শাহে আলম সরকারি দলের বেঞ্চে উপস্থিত থাকা কয়েকজনের নাম উল্লেখ করে বলেন, যেটি বিরোধী দলের বেঞ্চের মধ্যে খুঁজে পাওয়ার কোনো সুযোগ নেই।
এ সময় বিরোধী দলের সদস্যরা আবার প্রতিবাদমুখর হয়ে ওঠেন।
তখন স্পিকার বলেন, ‘বিরোধী দলের বেঞ্চেও মুক্তিযোদ্ধা রয়েছেন। আমি নিজেও মাঠে থেকে দেখেছি, গাজী নজরুল ইসলাম (সাতক্ষীরা-৩) একজন মুক্তিযোদ্ধা।’
এরপর জামায়াতের উদ্দেশে প্রতিমন্ত্রী বলেন, ‘বেগম খালেদা জিয়া বিরোধী দলের (সাবেক) এমপিদের গাড়িতে পতাকা দিয়ে দায়মুক্তি দিয়ে সরকারের অংশ করে জাতির কাছে সম্মানিত করেছে। সে কথা তো একবারও বলেন না।’
২০০১ সালে বিএনপি নেতৃত্বাধীন চারদলীয় জোট সরকারে জামায়াতের তৎকালীন আমির মতিউর রহমান নিজামী ও সেক্রেটারি জেনারেল আলী আহসান মো. মুজাহিদকে মন্ত্রী করা হয়েছিল। তারা দুজনই আওয়ামী লীগ সরকার আমলে একাত্তরের যুদ্ধাপরাধের বিচারে দোষী সাব্যস্ত হয়ে মৃত্যুদণ্ডে দণ্ডিত হন।
বিএনপির এই সংসদ সদস্য বলেন, ‘২০১৪ সালের পর আপনাদের আর খুঁজে পাওয়া যায়নি। দীর্ঘদিন যাবৎ আমরা চারদলীয় জোট, ২০-দলীয় জোটে একসঙ্গে ছিলাম। একে অপরকে বহুভাবে চিনি। একই মিটিংয়ে বসে আন্দোলন, লড়াই করেছি, সমাবেশ করেছি। কিন্তু কোনো এক অজানা কারণে আপনারা গুপ্ত হয়ে জুলাই-আগস্টের পরে প্রকাশ্য এসে জাতির সামনে বারবার জুলাই-আগস্টকে ধারণ করে ভুল বোঝাতে চাচ্ছেন। আপনারা জুলাই-আগস্টকে এমনভাবে ধারণ করতে চান, মনে হয় ১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধ হয়নি, নব্বইয়ের স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলন হয়নি।’
প্রতিমন্ত্রী ২০১৪ সালের পর জামায়াতকে খুঁজে পাওয়া যায়নি বললেও ২০১৮ সালে একাদশ সংসদ নির্বাচনে বিএনপি নেতৃত্বাধীন জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের হয়ে অংশ নিয়েছিলেন বর্তমান বিরোধীদলীয় নেতা শফিকুর রহমানসহ জামায়াতের নেতারা। তখন জামায়াতের নিবন্ধন বাতিল ছিল। এ কারণে তারা নির্বাচন করেছিলেন বিএনপির ধানের শীষ প্রতীকে।
বক্তব্যের শেষের দিকে সরকার পরিচালনায় বিরোধী দলের সহযোগিতা চেয়ে শাহে আলম বলেন, ‘আমরা ঐক্যবদ্ধভাবে দেশকে এমন পর্যায়ে নিয়ে যেতে চাই, যাতে মানুষ মনে করে একসময়কার জোটবদ্ধ বিএনপি-জামায়াত যদিও আজকে আলাদা আলাদা, কিন্তু তারা আবার ভেতরে ভেতরে এক হয়ে দেশকে ভালো জায়গায়, সুন্দর জায়গায় নিয়ে গেছে।’
প্রতিমন্ত্রীর বক্তব্য শেষে বিরোধীদলীয় নেতা শফিকুর রহমান বক্তব্য দিতে দাঁড়ান। তিনি বলেন, ‘আমরা প্রথম দিনই অঙ্গীকার করেছি, এই বিরোধী দল গতানুগতিক বিরোধী দল হবে না। ন্যায়সংগত সব কাজে সহযোগিতা এবং অন্যায়, জন-অধিকার হরণকারী সব পদক্ষেপে কণ্ঠ থাকবে আপসহীন।’
শাহে আলমের বক্তব্যের প্রসঙ্গে শফিকুর রহমান বলেন, ‘আজকে সংসদ সদস্য (মীর শাহে আলম) রাষ্ট্রপতিকে ধন্যবাদ জানাতে গিয়ে আমাদের জেরবার করে ফেলেছেন। অসংখ্য অসত্য তথ্য এখানে এসেছে। দুই-একটার প্রতিবাদ আপনি (স্পিকার) নিজেও করেছেন। আমাদের দাবি, অসত্য কোনো তথ্য যাতে সংসদে কেউ পরিবেশন না করেন।’
প্রতিমন্ত্রীর বক্তব্যের কিছু অংশ শফিকুর রহমান কার্যপ্রণালি থেকে বাদ দেওয়ার আহ্বান জানালে স্পিকার বলেন, ‘আমি বক্তব্য পরীক্ষা করে দেখব। সেখানে কোনো অসংসদীয় এবং অসত্য তথ্য থাকলে এক্সপাঞ্জ করা হবে।’
এরপর জামায়াত নেতা শাহজাহান চৌধুরী বক্তব্য দিতে দাঁড়ালে স্পিকার অতীত ভুলে সামনের দিকে এগিয়ে যাওয়ার আহ্বান জানিয়ে বলেন, ‘এ বিষয়ে আলোচনার জন্য আরও ৫০ ঘণ্টা সময় রয়েছে, যেখানে সদস্যরা তাদের পাল্টাপাল্টি যুক্তি উপস্থাপনের সুযোগ পাবেন।’