logo
Advertisement

৭৩ বছর বয়সেও থামেনি জীবনযুদ্ধ, আখ বিক্রি করে বাঁচার লড়াই

ইজমো আহম্মেদ
৭৩ বছর বয়সেও থামেনি জীবনযুদ্ধ, আখ বিক্রি করে বাঁচার লড়াই
মালিবাগ চৌধুরীপাড়ার ফুটপাতে আখ বিক্রি করছেন ৭৩ বছর বয়সী হামিদ হাওলাদার। ছবি: এশিয়া পোস্ট

রাজধানীর ব্যস্ত মালিবাগ চৌধুরীপাড়া। চারপাশের যান্ত্রিক কোলাহল, মানুষের ছুটোছুটি আর গাড়ির হর্নের শব্দ ছাপিয়ে প্রতিদিন এখানে বেজে চলে এক কঠিন বাস্তবতার সুর। এই শহুরে ব্যস্ততার ভিড়ে আখের পসরা সাজিয়ে বসেন ৭৩ বছর বয়সী হামিদ হাওলাদার। বয়সের ভারে শরীর নুয়ে এলেও থেমে থাকেনি তার জীবনযুদ্ধ; বরং বেঁচে থাকার তাগিদে এই বয়সেও প্রতিদিন ঘাম ঝরাতে হয় তাকে। হাতে ধারালো ছুরি নিয়ে একের পর এক আখ কাটেন এই বৃদ্ধ। কখনো অসাবধানতায় সেই ছুরির আঘাতে হাত বেয়ে রক্ত ঝরলেও থেমে থাকার সুযোগ নেই তার। কারণ, এই আখ বিক্রির আয়েই চলে তার সংসার।

Advertisement

নিজ হাতে আখ পরিষ্কার করে বিক্রি করেন হামিদ হাওলাদার। ছবি: এশিয়া পোস্ট
নিজ হাতে আখ পরিষ্কার করে বিক্রি করেন হামিদ হাওলাদার। ছবি: এশিয়া পোস্ট

রাজধানীর মালিবাগ চৌধুরীপাড়ার ফুটপাতে হামিদ হাওলাদারের সঙ্গে কথা হয় এশিয়া পোস্টের প্রতিবেদকের। আখ কাটতে কাটতে তিনি জানান, আজ থেকে প্রায় ৪৪ বছর আগে ১৯৮৩ সালে বরিশাল থেকে ঢাকায় আসেন তিনি। জীবিকার সন্ধানে কখনো বিক্রি করেছেন শাকসবজি, কখনো করেছেন অন্য কাজ। জীবনের দীর্ঘ সময় পরিশ্রম করেই কেটেছে তার। তবে সবচেয়ে বড় কষ্ট যেন বয়সের নয়, আপনজনের অবহেলার।

বয়স হয়েছে তো কী হয়েছে, জীবন তো আর থেমে থাকে না! বুকফাটা কষ্টগুলো আখের শক্ত খোসার আড়ালে লুকিয়ে রেখে আজও তিনি লড়ে যাচ্ছেন। সন্তান-সন্ততির কোলজুড়ে থাকার কথা থাকলেও এই বয়সে এসে হামিদ হাওলাদার যেন এক বড় নিঃসঙ্গতার নাম। যাদের মুখে হাসি ফোটাতে নিজের জীবনের সোনালি সময়গুলো অকাতরে বিলিয়ে দিয়েছেন, আজ সেই সন্তানরাই তার ছায়া হয়ে পাশে নেই। শুধু রক্তের সম্পর্কের এই দূরত্বই নয়, নিজের পৈত্রিক সম্পত্তি নিয়েও বয়ে বেড়াচ্ছেন বছরের পর বছর ধরে জমানো দীর্ঘশ্বাস।

নিজ হাতে আখ পরিষ্কার করছেন হামিদ হাওলাদার। ছবি: এশিয়া পোস্ট
নিজ হাতে আখ পরিষ্কার করছেন হামিদ হাওলাদার। ছবি: এশিয়া পোস্ট

বরিশালের পৈতৃক মাটিতে প্রায় দুই কোটি টাকার সম্পদ থাকা সত্ত্বেও আজ তিনি পথের মানুষ। অভিযোগের তির ভাই ও প্রতিবেশীদের দিকে—যারা জালিয়াতি করে জবরদখল করে নিয়েছেন তার শেষ সম্বলটুকু। পকেটে কিংবা ব্যাগে জমির আসল কাগজপত্র আঁকড়ে ধরেও লাভ হয়নি কোনো, চোখের সামনে নিজের সম্পত্তি অন্যের দখলে চলে গেলেও কেবল তাকিয়ে দেখা ছাড়া উপায় ছিল না।

ভাগ্যের নির্মম পরিহাস! জীবনের শেষপ্রান্তে এসে তাকে একসঙ্গে দুটি যুদ্ধ লড়তে হচ্ছে—একদিকে নিজের অধিকার ফিরে পাওয়ার আইনি ও মানসিক লড়াই, অন্যদিকে পেটের ভাত জোগাতে ফুটপাতে ঘাম ঝরানোর লড়াই। প্রতিদিন মালিবাগ চৌধুরীপাড়ার ফুটপাতে আখ বিক্রি করে তার আয় হয় বড়জোর দুই থেকে আড়াই হাজার টাকা। সেই সামান্য আয়েই চলে তার ভাঙা চাকার মতো জীবনটা।

হামিদ হাওলাদারের কাছ থেকে আখ কিনছেন এক পথচারী। ছবি: এশিয়া পোস্ট
হামিদ হাওলাদারের কাছ থেকে আখ কিনছেন এক পথচারী। ছবি: এশিয়া পোস্ট

আখ কাটতে কাটতে হাতের তালুতে জমেছে জমাট বাঁধা কড়চিহ্ন আর কষ্টের দাগ। কিন্তু রূঢ় এই বাস্তবতাতেই খোদাই করা রয়েছে তার বেঁচে থাকার শেষ অবলম্বন। একসময়ের সেই রঙিন স্বপ্নগুলো আজ ফিকে হয়ে গেছে—যাদের নিয়ে শান্তিতে বার্ধক্য কাটানোর কথা ছিল, বার্ধক্যের ঠিক এই পড়ন্ত বেলায় এসে তাদের পরিবর্তে সঙ্গী হয়েছে ফুটপাতের রোদ-বৃষ্টি। মাথার ওপর ছাদ আছে কি না কিংবা পাশে আপন কেউ দাঁড়িয়ে আছে কি না, সে হিসেব মেলানোর ফুরসত তার নেই। তারচেয়েও অনেক বেশি ভারী হয়ে উঠেছে প্রতিদিনের দুমুঠো ভাতের অনিশ্চিত চিন্তা।

হামিদ হাওলাদারের এই গল্প কেবল একজন সংগ্রামী বৃদ্ধের ব্যক্তিগত না-পাওয়ার গল্প নয়; এটি আমাদের সমাজব্যবস্থার এমন এক নিষ্ঠুর প্রতিচ্ছবি, যেখানে বুকভরা আশা নিয়ে বড় করা সন্তান থাকতেও বহু বাবা-মা শেষ বয়সে এসে চরম নিঃসঙ্গতার চাদরে ঢেকে যান।

প্রশ্ন মনে জাগে—যে বাবা-মা সন্তানদের মানুষ করতে নিজের জীবন ও তারুণ্য বিলিয়ে দেন, জীবনের অন্তিম মুহূর্তে এসে কেন তাদের এমন করে আখের ভার কাঁধে তুলে নিতে হয়?

মালিবাগের ব্যস্ত সড়কের পাশে কুঁজো হয়ে বসা ৭৩ বছরের হামিদ হাওলাদার হয়তো প্রতিদিন শুধু আখই বিক্রি করেন; কিন্তু তার প্রতিটি আখের চেরার সঙ্গে যেন বিক্রি হয়ে যায় জীবনের দীর্ঘ কষ্ট, কেড়ে নেওয়া অধিকার আর আপনজনদের ভিড়ে হারিয়ে যাওয়া এক টুকরো না-বলা ভালোবাসা।