কম্বোডিয়ায় ‘সাইবার দাস’ হিসেবে বিক্রি, ১৭ দিন ঘুরিয়ে মামলা নিল পুলিশ

উচ্চ বেতনের চাকরির রঙিন স্বপ্ন দেখিয়ে চার যুবককে কম্বোডিয়ায় পাচার করে বিক্রি করে দেওয়া হয়েছিল চীনাদের পরিচালিত একটি ‘সাইবার স্ক্যাম’ সেন্টারে। সেখানে দিনের পর দিন ইলেকট্রিক শক আর অমানুষিক নির্যাতন সয়ে, কয়েক দফায় মুক্তিপণ দিয়ে প্রাণ হাতে নিয়ে দেশে ফিরেছেন তারা। কিন্তু দেশের মাটিতে ফিরেও শেষ হয়নি তাদের লড়াই। পাচারকারীদের বিরুদ্ধে মামলা করতে রাজধানীর ভাটারা থানার দোরগোড়ায় টানা ১৭ দিন ধরে ঘুরেছেন এই নিঃস্ব যুবকেরা। এমনকি মামলার দাবিতে তিন দিন থানার সামনেই অনাহারে ও নির্ঘুম রাত কাটানোর পর মামলা নেয় পুলিশ।
রোববার (২৬ এপ্রিল) ভুক্তভোগীদের সঙ্গে কথা বলে এসব তথ্য জানা যায়।
তাদের অভিযোগ, গত ৯ এপ্রিল মামলার আবেদন দিলেও পুলিশ গড়িমসি করছিল। সর্বশেষ গত বৃহস্পতিবার থেকে শনিবার রাত পর্যন্ত চারজন ভুক্তভোগী থানার সামনে অবস্থান নেন। এর মধ্যে জাহিদ শেখ নামে একজন গুরুতর অসুস্থ হয়ে গ্রামে ফিরে গেছেন। বাকিরা মামলা না হওয়া পর্যন্ত বাড়ি না ফেরার পণ করেছিল। অবশেষে শনিবার (২৫ এপ্রিল) রাত সাড়ে ৯টার দিকে মামলা নেয় ভাটারা থানার পুলিশ।
প্রতারণার শিকার ভুক্তভোগীরা হলেন, রাজবাড়ি সদর উপজেলার বড়নূরপুর গ্রামের আমির মিয়ার ছেলে মো. আলামিন ও তার ভাগিনা মো. জাহিদ শেখ এবং বগুড়ার শাহজানপুরের বাসিন্দা সানোয়ার হোসেন ও মো. মাহিদুল।
ভুক্তভোগী সানোয়ার হোসেন এশিয়া পোস্টকে বলেন, গত ৯ এপ্রিল আমাদের যারা বিদেশে পাচার করেছিল তাদের বিরুদ্ধে মামলা করতে থানায় অভিযোগ দিয়েছি। ১৭ অপেক্ষার পর গতকাল (শনিবার) রাত সাড়ে ৯টার দিকে মামলা নেয় পুলিশ।
তিনি বলেন, মামলা করার জন্য আমরা চারজন ভুক্তভোগী গত তিন দিন ধরে খাওয়া-ঘুম বাদ দিয়ে থানার সামনে পড়েছিলাম।
যেভাবে চলত সাইবার দাসত্ব
ভুক্তভোগী মো. আলামিন জানান, ওয়ার্ক পারমিট ভিসায় নেওয়ার কথা বলে তাদেরকে ট্যুরিস্ট ভিসায় কম্বোডিয়া পাঠানো হয়েছিল। কম্বোডিয়া বিমানবন্দরে নামার পরই গোলাম মোস্তফা মুকুল ও আরিফ শেখ নামের দুই পাচারকারী তাদের সঙ্গে থাকা ডলার কেড়ে নেয়। তিন দিন পর তাদেরকে ১৫০০ ডলারের বিনিময়ে চীনাদের একটি স্ক্যাম সেন্টারে বিক্রি করে দেওয়া হয়।
আলামিন বলেন, চীনারা আমাকে একটি মেয়ের নামে ভুয়া আইডি খুলে দিয়েছিল। আমার কাজ ছিল আমেরিকার বিত্তশালীদের প্রেমের ফাঁদে ফেলে তাদের ব্যাংক অ্যাকাউন্টের তথ্য হাতিয়ে নেওয়া। এই কাজে বিবেকের তাড়নায় অস্বীকৃতি জানালে শুরু হতো নির্যাতন। ইলেকট্রিক শক দিয়ে অচেতন করা হতো, প্লাস দিয়ে নখ উপড়ে ফেলার চেষ্টা চলত।
ভুক্তভোগীরা জানান, সেই বন্দি অবস্থা থেকে পরিবারের পাঠানো টাকায় চীনাদের কাছ থেকে মুক্তি পাই। কিন্তু পরে আবারও বাংলাদেশি পাচারকারী মুকুলের খপ্পরে পড়ি আমরা। সেখানে একটি ঘরে আমাদেরকে ১৫ দিন আটকে রেখে আবারও জনপ্রতি ৫০ হাজার টাকা করে মুক্তিপণ আদায় করা হয়। শেষ পর্যন্ত ধারদেনা করে বিমানের টিকিট কেটে গত ডিসেম্বর ও জানুয়ারিতে দেশে ফিরে আসি।
অভিযুক্ত যারা
ভুক্তভোগীদের দাবি, ফেসবুক বিজ্ঞাপনের মাধ্যমে তারা রাজধানীর ভাটারার বাঁশতলা এলাকার ‘এম আর ইন্টারন্যাশনাল’ ও ‘রনি ট্যুর অ্যান্ড ট্রাভেলস’-এর সঙ্গে যোগাযোগ করেন। এই প্রতিষ্ঠানের মাসুদ রানা রনি একেকজনের কাছ থেকে পাঁচ লাখ টাকা করে নেন।
তাদেরকে পুরোনো পল্টনের রিক্রুটিং এজেন্সি ‘মেসার্স বাংলাদেশ’ (RL-1555) থেকে ভুয়া ডিমান্ড লেটার তৈরি করে দেওয়া হয়েছিল।
পুলিশের বক্তব্য
দীর্ঘ ১৭ দিন পর মামলার বিষয়ে জানতে চাইলে ভাটারা থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মাজাহারুল ইসলাম বলেন, অভিযোগটি পাওয়ার পর আমরা তদন্ত করেছি এবং পাচারের সত্যতা পাওয়া গেছে। পরে গতকাল (শনিবার) রাতে মামলাটি নথিভুক্ত করা হয়। মামলার আসামিদের গ্রেপ্তারের চেষ্টা অব্যাহত রয়েছে।
থানা পুলিশ সূত্রে জানা গেছে, মানবপাচার আইনে করা ওই মামলায় রিক্রুটিং এজেন্সির পাঁচজনকে আসামি করা হয়েছে।
ব্র্যাক মাইগ্রেশন ওয়েলফেয়ার সেন্টারের কর্মকর্তা মো. আল আমিন নয়ন বলেন, এই ঘটনাটি শুধু চারজনের ব্যক্তিগত লড়াই নয়; এটি আমাদের বিচার ব্যবস্থার এক কঠিন চিত্র। পাচারের শিকার মানুষ যখন বিচারের জন্য থানার সামনে না খেয়ে পড়ে থাকে, তখন বুঝতে হবে পাচারকারীরা কতটা প্রভাবশালী।’