গ্রেপ্তারি পরোয়ানা নিয়ে নিখোঁজ পিআইও বিজন কৃষ্ণ

ভোলার মনপুরার উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়নকারী কর্মকর্তা (পিআইও) বিজন কৃষ্ণ খরাতি। চেক জালিয়াতির মামলায় গ্রেপ্তারি পরোয়ানা মাথায় নিয়ে দুই সপ্তাহ ধরে কর্মস্থল থেকে নিখোঁজ রয়েছেন তিনি।
মনপুরার উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মো. আবু মুছা বলেন, বিজন গত দুই সপ্তাহ যাবৎ অফিস করছেন না। কোন ধরনের পূর্বানুমোদিত ছুটি বা ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের অনুমতি ছাড়াই তিনি অনুপস্থিত রয়েছেন।
বিজন কৃষ্ণের বিরুদ্ধে প্রথম মামলা হয় ২০২৪ সালের ডিসেম্বরে। সিনিয়র জুডিসিয়াল ম্যাজিস্ট্রেটের আদালতে এটি দায়ের করেন ঝালকাঠির নলছিটি উপজেলার ঠিকাদার হাবিবুর রহমান। মামলা নং ৩৬৯/২৪। এই মামলায় তার বিরুদ্ধে সমন জারি করেন আদালত।
হাবিবুর রহমানের অভিযোগ, ২০২৩ সালের ১৫ সেপ্টেম্বর তিন মাসের মধ্যে পরিশোধের শর্তে বিজন তার ছেলে মো. অনিকের কাছ থেকে ১২ লাখ টাকা ধার নিয়েছিলেন। তবে পরে ওই টাকা আর ফেরত দেননি তিনি।
অভিযোগ রয়েছে, সরকারি কাজ ও চাকরি পাইয়ে দেওয়ার নামে ঠিকাদার এবং সাধারণ মানুষের কাছ থেকে বড় অঙ্কের অর্থ নিতেন বিজন। একই কাজ পাইয়ে দেওয়ার নাম করে একাধিক ঠিকাদারের থেকে নিতেন নগদ অর্থ। বিশ্বাস অর্জনে দিতেন এমন অ্যাকাউন্টের চেক, যেখানে টাকা নেই।
নলছিটির ব্যবসায়ী জাহিদ হোসেনের থেকে ৩০ লাখ টাকা নিয়েছিলেন বিজন। এর বদলে তাকে একটি ভুয়া চেক ধরিয়ে দেন। পরে টাকা ফেরত না পেলে বরিশালের চিফ মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে মামলা করেন জাহিদ। মামলা নং ২৩৭৮/২০২৪।
বাদীপক্ষের আইনজীবী অ্যাডভোকেট আজাদ রহমান বলেন, শুধু আমার মক্কেল নয়, ঝালকাঠি ও নলছিটির এমন অনেকের কাছ থেকে অর্থ নিয়েছেন বিজন। ২০২৪ সালের ১৬ অক্টোবর আদালত তার বিরুদ্ধে ওয়ারেন্ট জারি করেছেন।
নলছিটির শিবেশ্বর রায়, কায়কোবাদ এবং মাইনুল ইসলাম নামের তিন ব্যক্তির চেক জালিয়াতির মামলায়ও আসামি বিজন। প্রতিটি মামলায় একই ধরনের জালিয়াতির কৌশল ব্যবহার করেছেন তিনি। এভাবে অন্তত পাঁচজনের কাছ থেকে নগদ অর্থ হাতিয়ে নেওয়ার অভিযোগ রয়েছে তার বিরুদ্ধে।
সরকারি প্রকল্পের তহবিল আত্মসাৎ
নলছিটির পিআইও থাকাকালে সরকারি প্রকল্পে দুর্নীতির গুরুতর অভিযোগ রয়েছে বিজনের বিরুদ্ধে। ২০২১-২২ অর্থবছরে আশ্রয়ণ-২ প্রকল্পের অধীনে তৃতীয় পর্যায়ে ৩০২টি ঘরের মধ্যে ১২৮টি নির্মাণের জন্য এক কোটি ৪৫ লাখ ৪৭ হাজার ৫০০ টাকা বরাদ্দ পায় নলছিটি উপজেলা প্রশাসন। বিজন ঘরপ্রতি তিন লাখ চার হাজার টাকা হারে উত্তোলন করেন এবং পরিবহন ব্যয়সহ পুরো টাকা তুলে নেন। কিন্তু ৫৫টি ঘর নির্মাণ করেননি তিনি।
বিষয়টি তৎকালীন বরিশাল বিভাগীয় কমিশনারের নজরে এলে ২০২৩ সালে বিজনকে এক কোটি ৬৯ লাখ ৯৫ হাজার টাকা উপজেলা প্রশাসনের ব্যাংক হিসেবে জমা দেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়। সে অনুযায়ী, একদিনের মধ্যে ওই টাকা জমা দেন তিনি।
মনপুরার একজন সরকারি কর্মচারী বলেন, আমরা যদি দুর্নীতি করে ধরাও পড়ি, তাও একদিনে দুই কোটি টাকা দিতে পারবো না। বিজন সেটা পেরেছে। দুর্নীতি করে কত টাকা কামাই করলে একদিনে পৌনে দুই কোটি টাকা দেওয়া যায়!
জমি কেনাবেচায় জালিয়াতি
দ্বিতীয় শ্রেণির কর্মকর্তা হয়েও বরিশালে অর্ধকোটিরও বেশি টাকার জমি কেনেন বিজন। জালিয়াতির মাধ্যমে সেই জমি আবার একাধিক ক্রেতার কাছে বিক্রি করেন। সরকারি চাকরিতে যোগদানের কয়েক বছরের মাথায় বরিশাল সিটি কর্পোরেশনের ৫০ নম্বর আলেকান্দা মৌজায় পাঁচ দশমিক ছয় চার শতাংশ জমি কেনেন বিজন। ২০১৯ সালের অক্টোবরে ৬০ লাখ ছয় হাজার টাকা ক্রয়মূল্য দেখিয়ে ওই জমির রেজিস্ট্রেশন করেন। যদিও জমির প্রকৃত দাম আরও বেশি বলে মনে করা হয়। এরপর জমিতে আরসিসি কলামসহ একতলার ছাদ, সিঁড়ি ও সীমানাপ্রাচীর নির্মাণ করেন। পরে এটি বিক্রির সিদ্ধান্ত নেন বিজন।
সে অনুযায়ী, ২০২৪ সালের মার্চে ১৯ লাখ টাকা জমিটি বায়না করেন পটুয়াখালীর ব্যবসায়ী দেবাশীষ মজুমদারসহ চার ব্যক্তি। এক কোটি ১৭ লাখ টাকায় জমি বিক্রির চুক্তি হয়। জমির মালিকানা সম্পূর্ণভাবে হস্তান্তরের আগে বায়নার বিপরীতে দেবাশীষসহ চারজনকে ১৯ লাখ টাকার চেক দেন বিজন। তবে মাত্র তিন মাসের মধ্যেই একই জমি আরেক সহকর্মী পিআইও সোহাগ খানের কাছে বিক্রি করেন তিনি। বিষয়টি জানতে পেরে বায়নার টাকা উঠাতে গেলে ব্যাংক বিজনের চেক প্রত্যাখ্যান করে।
এরপর দেবাশীষ বরিশালের চিফ মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেটের আদালতে মামলা (৬৪৬/২৪) করেন। একই সময়ে বিজন ও সোহাগ উভয়কে বিবাদী করে জমি নিয়ে আরেকটি মামলা (৫৪/২০২৪) করেন তিনি বরিশাল প্রথম যুগ্ম জেলা জজ আদালতে।
মামলার নথিতে দেখা যায়, সোহাগ ৯০ লাখ ৯০ হাজার টাকায় বিজনের কাছ থেকে জমিটি কেনার বায়না দলিল করেছিলেন। যোগাযোগ করা হলে সোহাগ জমি কেনার কথা অস্বীকার করেন।
মূলত একই জমি দুই জনের কাছে বিক্রির বিষয়টি আসলে সোহাগের আয়ের উৎস নিয়ে প্রশ্ন উঠবে। অভিযোগ উঠবে দুর্নীতির। দৃশ্যত তা ধামাচাপা দিতেই দ্রুত আপোসের পথে হাঁটেন সোহাগ। আপোসনামা অনুযায়ী, সোহাগ জমিতে তার দাবি ছেড়ে দেন। বিজন জমি হস্তান্তর করেন দেবাশীষসহ চারজনের কাছে।
দেবাশীষ মজুমদার বলেন, মামলা করলে তারা আমাদের সঙ্গে আপোস করে। আদালতে সেই আপোসনামা জমা দিয়ে মামলা নিষ্পত্তি করেছি। জমি বুঝে পেয়েছি। পরে আমরাও বিক্রি করে দেই।
আটকে আছে দাপ্তরিক কাজ
বিজনের তিনটি মোবাইলের সবগুলোই বন্ধ থাকায় তার সঙ্গে ফোনে যোগাযোগ করা সম্ভব হয়নি। দুই সপ্তাহ ধরে অফিস না করায় কর্মস্থল থেকেও বক্তব্য পাওয়ার সুযোগ নেই।
ইউএনও আবু মুছা বলেন, প্রায় দুই সপ্তাহ ধরে তিনি নিখোঁজ। আমরাও তাকে পাচ্ছি না। তার অনুপস্থিতিতে উপজেলা কার্যালয়ের অনেক কাজ আটকে আছে। এ বিষয়ে জেলা অফিসকে জানিয়েছি। তারা হয়ত মন্ত্রণালয়ে জানিয়েছে।
বিজনের বিরুদ্ধে মামলা এবং ওয়ারেন্টের বিষয়ে ইউএনও বলেন, এ ধরনের কিছু অভিযোগের কথা শুনেছি। বরিশাল, ঝালকাঠি থেকে বেশ কয়েকজন আমার কাছে ফোনে তার বিরুদ্ধে এমন অভিযোগ জানিয়েছেন। ওয়ারেন্টের কথাও শুনেছি। ওয়ারেন্ট যদি তামিল হয় এবং তিনি গ্রেপ্তার হন, তাহলে তাকে বরখাস্ত করা হবে।