বজ্রাঘাতে ছয় জেলায় ১৩ জনের মৃত্যু

বজ্রাঘাতে গাইবান্ধায় পাঁচজনসহ ছয় জেলায় মোট ১৩ জনের মৃত্যু হয়েছে। রোববার (২৬ এপ্রিল) বিকেলে এসব ঘটনা ঘটে। এর মধ্যে গাইবান্ধার তিন উপজেলায় পাঁচজন, সিরাজগঞ্জের দুই উপজেলায় দুজন, জামালপুরের দুই উপজেলায় দুজন, ঠাকুরগাঁওয়ের পীরগঞ্জে দুজন এবং নাটোরের সিংড়া ও বগুড়ার গাবতলীতে একজন করে মারা গেছেন।
গাইবান্ধায় শিশুসহ পাঁচজনের মৃত্যু
গাইবান্ধার সুন্দরগঞ্জে বজ্রাঘাতে এক শিশুসহ তিনজনের মৃত্যু হয়েছে। এ ঘটনায় আরও একজন আহত হয়েছেন। এ ছাড়া সাঘাটায় একজন ও ফুলছড়িতে একজন মারা গেছে।
নিহতরা হলেন, সুন্দরগঞ্জের ফুয়াদ চৌধুরী (১০), রাফি চৌধুরী (১৫) ও মিজান মিয়া (২০), সাঘাটার নম্বার আলী (৬৫) এবং ফুলছড়ি উপজেলার মানিক (১৯)।
সুন্দরগঞ্জে নিহতদের মধ্যে ফুয়াদ চৌধুরী সাবেক ইউনিয়ন পরিষদের (ইউপি) চেয়ারম্যান জাহাঙ্গীর আলম সুজা চৌধুরীর ছেলে। এ ছাড়া রাফি চৌধুরী ছোটন মিয়ার ছেলে এবং মিজান মিয়া নবীর হোসেনের ছেলে। সুন্দরগঞ্জের ধোপাডাঙ্গা ইউনিয়নের দক্ষিণ ধোপাডাঙ্গা গ্রামে বজ্রপাতে তারা মারা যান। ফুলছড়িতে নিহত মানিক উপজেলার ফুলছড়ি ইউনিয়নের জামিরা চরে ঘোড়ার গাড়ি চালানোর সময় বজ্রপাতে মারা যান। সাঘাটার নম্বার আলী উপজেলার বোনারপাড়া ইউনিয়নে মাঠে কাজ করার সময় বজ্রপাতে মারা যান।
সুন্দরগঞ্জ উপজেলার ধোপাডাঙ্গা ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান মোকলেছুর রহমান মন্ডল বলেন, আজ বিকেল ৪টার দিকে হঠাৎ আকাশ কালো মেঘে ঢেকে যায় এবং বজ্রসহ বৃষ্টি শুরু হয়। এ সময় ওই দুই তরুণ ও শিশু বাড়ির পাশের রাস্তায় গরু বাঁধার স্থানে দাঁড়িয়ে ছিল। হঠাৎ তাদের ওপর সরাসরি বজ্রাঘাত হলে ঘটনাস্থলেই তারা প্রাণ হারান। একই সময়ে পাশে থাকা একটি গরুও মারা যায়। এ সময় আহত শামীমকে দ্রুত উদ্ধার করে গাইবান্ধা সদর হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে।
সাঘাটায় বজ্রাঘাতে নম্বার আলী নামে বৃদ্ধের মৃত্যুর বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন বোনারপাড়া ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান নাছিরুল আলম স্বপন। তিনি বলেন, নম্বার আলী মাঠে কাজ করার সময় বজ্রাঘাতে মারা যান।
সিরাজগঞ্জে কৃষক ও যুবকের মৃত্যু
সিরাজগঞ্জের তাড়াশ ও রায়গঞ্জে পৃথক বজ্রাঘাতে এক কৃষক ও এক যুবকের মৃত্যু হয়েছে। রোববার বিকেলে এসব ঘটনা ঘটে।
তাড়াশের মাধাইনগর ইউনিয়নের বেত্রাশীন গ্রামে বিকেল সাড়ে ৪টার দিকে বজ্রাঘাতে আব্দুল হামিদ (৫০) নামে এক কৃষকের মৃত্যু হয়। নিহত আব্দুল হামিদ ওই গ্রামের মৃত গফুর আলীর ছেলে।
স্থানীয় ইউপি সদস্য মো. শফিকুল ইসলাম শফি বলেন, বিকেল সাড়ে ৩টার দিকে বৃষ্টির মধ্যে বাড়ির পাশে মাঠে কাজ করছিলেন আব্দুল হামিদ। এ সময় বজ্রাঘাতে ঘটনাস্থলেই তার মৃত্যু হয়।
এ বিষয়ে তাড়াশ থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো হাবিবুর রহমান বলেন, বজ্রাঘাতে কৃষক মারা যাওয়ার খবর পেয়েছি। বিষয়টির খোঁজখবর নেওয়া হচ্ছে।
অন্যদিকে একই দিন বিকেল ৫টার দিকে রায়গঞ্জ উপজেলার ধানগড়া ইউনিয়নের মল্লিকচান এলাকায় বজ্রাঘাতে হাসান শেখ (২৫) নামে এক যুবকের মৃত্যু হয়। হাসান শেখ ওই এলাকার আব্দুল হালিম শেখের ছেলে।
স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, বিকেলে পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে নিজ জমিতে কাটা ধান এক পাশে জড়ো করছিলেন হাসান। এ সময় হঠাৎ আকাশে মেঘ জমে ঝড়বৃষ্টি শুরু হয় এবং বজ্রাঘাতে ঘটনাস্থলেই তিনি মারা যান।
ধানগড়া ইউনিয়ন পরিষদের প্যানেল চেয়ারম্যান মো. আমিনুল ইসলাম ঘটনার সত্যতা নিশ্চিত করে বলেন, বজ্রাঘাতে হাসান শেখের মৃত্যু অত্যন্ত মর্মান্তিক। আকস্মিক এই ঘটনায় এলাকায় শোকের ছায়া নেমে এসেছে।
রায়গঞ্জ থানার ওসি মো. আহসানুজ্জামান বলেন, ঘটনাটি অত্যন্ত দুঃখজনক। বজ্রাঘাতে এক যুবকের মৃত্যুর বিষয়টি নিশ্চিত হওয়া গেছে এবং এ বিষয়ে প্রয়োজনীয় আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে।
জামালপুরে কৃষক ও নারীর মৃত্যু
জামালপুরের মেলান্দহে রান্না করার সময় বজ্রাঘাতে মর্জিনা (২২) নামে এক নারী মৃত্যু হয়েছে। একই ঘটনায় পাশের বাড়ির শেফালী নামে আরও এক নারী আহত হয়ে হাসপাতালে চিকিৎসাধীন রয়েছেন।
বিকেল ৪টার দিকে উপজেলার হাজরাবাড়ী পৌরসভার কড়ইচড়া গ্রামে এ ঘটনা ঘটে। নিহত মর্জিনা ওই গ্রামের রাজীবের স্ত্রী। তার তিন বছর বয়সি একটি কন্যাসন্তান রয়েছে।
স্থানীয়রা জানান, বিকেলে বাড়ির উঠানে থাকা রান্নাঘরে কাজ করছিলেন মর্জিনা। এ সময় হঠাৎ বজ্রপাত হলে তিনি গুরুতর আহত হন। পরিবারের সদস্যরা দ্রুত উদ্ধার করে হাসপাতালে নেওয়ার পথেই তার মৃত্যু হয়।
একই সময় বৃষ্টির মধ্যে রাস্তা থেকে ছাগল আনতে গিয়ে বজ্রাঘাতে আহত হন পাশের বাড়ির বাসিন্দা হারুনের স্ত্রী শেফালী। পরে স্থানীয়রা তাকে উদ্ধার করে জামালপুর সদর হাসপাতালে ভর্তি করেন। বর্তমানে তিনি সেখানে চিকিৎসাধীন রয়েছেন।
মেলান্দহ থানার ওসি ওবায়দুর রহমান বলেন, বজ্রাঘাতে এক নারীর মৃত্যু এবং অপর এক নারী আহত হওয়ার খবর পাওয়া গেছে। আহত নারী হাসপাতালে চিকিৎসাধীন রয়েছেন।
একই দিনে সদর উপজেলার লক্ষীরচর ইউনিয়নের চরযথার্থপুর ভাটিপাড়া এলাকায় পৃথক আরেকটি বজ্রাঘাতে হাসমত আলী নামে এক কৃষকের মৃত্যু হয়েছে। এ সময় আহত হন তার চাচাতো ভাই আনোয়ার হোসেন।
জানা গেছে, বৃষ্টির সময় মাঠে কাজ করছিলেন তারা। বৃষ্টি শুরু হলে গরু নিয়ে বাড়ি ফেরার পথে বজ্রাঘাতে ঘটনাস্থলেই মারা যান হাসমত আলী। আহত আনোয়ার হোসেনকে উদ্ধার করে জামালপুর সদর হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে। এ ঘটনায় একটি গরুও মারা গেছে।
জামালপুর সদর হাসপাতালের সহকারী পরিচালক ডা. মাহফুজুর রহমান সোহান বলেন, বজ্রাঘাতে হাসমত আলীর মৃত্যু হয়েছে এবং আরও দুজন হাসপাতালে চিকিৎসাধীন রয়েছেন।
ঠাকুরগাঁওয়ে নারী ও যুবকের মৃত্যু
ঠাকুরগাঁওয়ের পীরগঞ্জ উপজেলায় পৃথক স্থানে বজ্রাঘাতে নারীসহ দুজনের মৃত্যু হয়েছে। রোববার (২৬ এপ্রিল) দুপুরে উপজেলার সৈয়দপুর ও কোষারাণীগঞ্জ ইউনিয়নে এসব ঘটনা ঘটে।
নিহতরা হলেন, উপজেলার সৈয়দপুর ইউনিয়নের নিয়ামতপুর গ্রামের রশিদুল ইসলামের স্ত্রী সেলিনা আক্তার (৩৫) এবং কোষারাণীগঞ্জ ইউনিয়নের কোষাডাঙ্গীপাড়া গ্রামের আকবর আলীর ছেলে ইলিয়াস আলী (৩৭)।
পারিবারিক সূত্রে জানা গেছে, দুপুরে সেলিনা আক্তার মাঠে কৃষিকাজ শেষ করে বাড়ি ফিরছিলেন। পথে বজ্রাঘাতে তিনি ঘটনাস্থলেই মারা যান।
অন্যদিকে, বিকেলে কোষারাণীগঞ্জ ইউনিয়নের কোষাডাঙ্গীপাড়া গ্রামের ইলিয়াস আলী জমির ফসল দেখতে মাঠে যান। এ সময় তিনি বজ্রাঘাতের শিকার হন। পরে স্থানীয় লোকজন তাকে ফসলি জমিতে মৃত অবস্থায় পড়ে থাকতে দেখে পরিবারের সদস্যদের খবর দেন।
পীরগঞ্জ থানার ওসি আব্দুল হাকিম ঘটনার সত্যতা নিশ্চিত করে বলেন, বজ্রাঘাতে পৃথক স্থানে দুজনের মৃত্যু হয়েছে। এ বিষয়ে প্রয়োজনীয় আইনি প্রক্রিয়া সম্পন্ন করে মরদেহ পরিবারের কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে।
নাটোরে ধান কাটা শ্রমিকের মৃত্যু
নাটোরের সিংড়ায় জমিতে ধান কাটার সময় বজ্রাঘাতে সম্রাট ফকির নামে এক শ্রমিকের মৃত্যু হয়েছে। বিকেলে উপজেলার ডাহিয়া ইউনিয়নের ঠেঙ্গা পাকুরিয়া গ্রামে এই ঘটনা ঘটে। নিহত সম্রাট ফকির সিরাজগঞ্জের শাহজাদপুরের নগরডোলা গ্রামের সাজা ফকিরের ছেলে।
স্থানীয়রা জানান, সিরাজগঞ্জের শাহজাদপুর থেকে কয়েকজন ধান কাটা শ্রমিক সিংড়ার ঠেঙ্গা পাকুরিয়া গ্রামের আব্দুল আউয়ালের জমিতে ধান কাটতে আসেন। বিকেলে শ্রমিকরা জমিতে ধান কাটার সময় সেখানে বজ্রাঘাত হয়। এতে শ্রমিক সম্রাট আহত হন। অন্য শ্রমিকরা উদ্ধার করে নাটোর সদর হাসপাতালে নিয়ে গেলে কর্তব্যরত চিকিৎসক সম্রাটকে মৃত ঘোষণা করেন। তার মরদেহ বর্তমানে নাটোর সদর হাসপাতালে রয়েছে।
সিংড়া থানার ওসি রফিকুল ইসলাম বলেন, এক শ্রমিকের মৃত্যুর সংবাদ পেয়েছেন। তবে কীভাবে মারা গেছেন, তা তিনি জানেন না। মরদেহ উদ্ধারের জন্য নাটোর সদর থানায় সংবাদ দেওয়া হয়েছে। পরে বিস্তারিত জানা যাবে।
বগুড়ায় ছাগল আনতে গিয়ে প্রাণ গেল যুবকের
বগুড়ার গাবতলীতে ছাগল আনতে গিয়ে বজ্রাঘাতে সুমন (৩৫) নামে এক যুবকের মৃত্যু হয়েছে। রোববার (২৬ এপ্রিল) বিকেল পৌনে ৪টার দিকে উপজেলার সোনারায় ইউনিয়নের মুচিখালী এলাকায় এ ঘটনা ঘটে।
নিহত সুমন মুচিখালী গ্রামের বাসিন্দা মো. আব্দুল করিমের ছেলে।
পুলিশ ও স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, বিকেলে হঠাৎ বৃষ্টি শুরু হলে বাড়ির পাশের জমি থেকে ছাগল আনতে যান সুমন। এ সময় আকস্মিক বজ্রাঘাতে হলে তিনি ঘটনাস্থলেই মারা যান।
গাবতলী মডেল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) রাকিব হাসান বলেন, এ ঘটনায় আইনগত ব্যবস্থা প্রক্রিয়াধীন রয়েছে।
[প্রতিবেদন পাঠিয়েছেন গাইবান্ধা, সিরাজগঞ্জ, জামালপুর, ঠাকুরগাঁও,নাটোর ও বগুড়া সংবাদদাতা]