logo
Advertisement

সিজারে অনাগ্রহ ৯১ শতাংশ নারীর, পরিবারের চাপে সিদ্ধান্ত বদল: গবেষণা

• গবেষণায় অংশ নেওয়া ৫০৩ নারীর মধ্যে ৭৩ শতাংশ সিজারে সন্তান জন্ম দিয়েছেন

• বেসরকারি হাসপাতালে সিজারের হার ৮৫ শতাংশ, সরকারি হাসপাতালে ৪৬ শতাংশ

• শুধু চিকিৎসক বা হাসপাতাল নয়, সিজারের পেছনে পরিবার-সমাজেরও প্রভাব

• আয় বেশি হলে সিজারের প্রবণতা বেশি

এশিয়া পোস্ট নিউজ
এশিয়া পোস্ট নিউজ
সিজারে অনাগ্রহ ৯১ শতাংশ নারীর, পরিবারের চাপে সিদ্ধান্ত বদল: গবেষণা
এআই দিয়ে তৈরি প্রতীকী ছবি

বাংলাদেশে সিজারের মাধ্যমে সন্তান জন্ম দেওয়া নারীদের ৯১ শতাংশ শুরুতে এই পদ্ধতি চাননি। তারপরও পরিবার, সমাজ ও সামাজিক প্রত্যাশার চাপে শেষ পর্যন্ত এটিই হয়েছে তাদের সন্তান জন্মদানের পথ।

নতুন এক গবেষণায় উঠে এসেছে এসব তথ্য। এতে দেখা গেছে ব্যক্তিগত মতামত বা চিকিৎসকের সরাসরি পরামর্শের চেয়েও পারিবারিক ও সামাজিক প্রত্যাশা সিজারের সিদ্ধান্তে বেশি প্রভাব ফেলছে।

বাংলাদেশি গবেষক ও যুক্তরাষ্ট্রের কর্নেল বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক শিক্ষক ড. জামাল উদ্দিনের এই গবেষণা প্রকাশিত হয়েছে যুক্তরাষ্ট্রের হাওয়ার্ড জার্নাল অব কমিউনিকেশনস-এ। শিরোনাম ‘কালচারাল নর্মস অ্যান্ড ম্যাটারনাল হেলথ বিহেভিয়ার: সোশ্যাল ইনফ্লুয়েন্সেস অন সিজারিয়ান সেকশন ইনটেনশনস ইন বাংলাদেশ’।

ড. জামাল উদ্দিন বর্তমানে সেন্টার ফর সাউথ এশিয়ান মিডিয়া অ্যান্ড কালচারের ফ্যাকাল্টি রিসার্চ ফেলো। গবেষণাটি হাওয়ার্ড বিশ্ববিদ্যালয়ে সম্পন্ন করা তার একটি গবেষণা-অভিসন্দর্ভের (ডিসার্টেশন) অংশ, যা ড. জা ইউন চুংয়ের তত্ত্বাবধানে পরিচালিত হয়েছে।

১৮ থেকে ৩৫ বছর বয়সী ৫০৩ জন বাংলাদেশি নারীর অংশগ্রহণে অনলাইন জরিপের মাধ্যমে চালানো এই গবেষণা গত ২ সেপ্টেম্বর জার্নালে প্রকাশিত হয়।

বেসরকারিতে সিজার প্রায় দ্বিগুণ

চিকিৎসার প্রয়োজনে সিজার মা ও শিশু উভয়ের জীবন বাঁচাতে পারে। কিন্তু বাংলাদেশে, বিশেষত বেসরকারি হাসপাতালগুলোতে এই হার দ্রুত বেড়েছে।

গবেষণাপত্রে উল্লেখ করা হয়, গত ১৫ বছরে বাংলাদেশে অপ্রয়োজনীয় সিজারের হার আট গুণ বেড়েছে। এটি মূলত হাসপাতালভিত্তিক প্রসবের ঊর্ধ্বমুখী প্রবণতার সঙ্গে সংগতিপূর্ণ।

আগের একাধিক গবেষণায় দেখা গিয়েছিল, কিছু বেসরকারি হাসপাতালে সিজারের হার প্রায় ৮৪ শতাংশ পর্যন্ত পৌঁছেছে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার নির্ধারিত মানদণ্ড অনুযায়ী এই হার হওয়া উচিত ১০ থেকে ১৫ শতাংশ।

ড. জামাল উদ্দিনের পরিচালিত গবেষণায়ও অংশগ্রহণকারীদের মধ্যে এই ব্যবধান স্পষ্ট। মোট ৫০৩ জন নারীর মধ্যে ৩৬৬ জন বা ৭৩ শতাংশ সিজারের মাধ্যমে এবং ১৩৭ জন বা ২৭ শতাংশ স্বাভাবিক প্রসবে সন্তান জন্ম দিয়েছেন।

বেসরকারি হাসপাতালে ৮৫ শতাংশই সিজারের মাধ্যমে সন্তান জন্ম দিয়েছেন। সরকারি হাসপাতালে এই হার ৪৬ শতাংশ। এই প্রবণতা মাতৃস্বাস্থ্য, অপ্রয়োজনীয় অস্ত্রোপচার এবং পরিবারের ওপর আর্থিক চাপ নিয়ে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি করছে।

গবেষণার একটি গুরুত্বপূর্ণ ফলাফল হলো, অনেক নারী সিজার করলেও শুরুতে তারা এই পদ্ধতি চাননি। জরিপে দেখা গেছে, সিজারের মাধ্যমে সন্তান জন্ম দেওয়া নারীদের মধ্যে মাত্র ৯ শতাংশ শুরু থেকেই এর পক্ষে ছিলেন। বাকি ৯১ শতাংশের মধ্যে ৬১ শতাংশের প্রাথমিকভাবে এমন কোনো ইচ্ছা ছিল না। আর আংশিকভাবে ইচ্ছুক ছিলেন ৩০ শতাংশ। অন্যদিকে স্বাভাবিক প্রসবে সন্তান জন্মদানকারী নারীদের ৮ শতাংশ শুরুতে এই পদ্ধতিতে আগ্রহী ছিলেন না।

পরিবার-সমাজের প্রভাব

গবেষণায় নারীদের সিজার সংক্রান্ত সিদ্ধান্তকে প্রভাবিত করা চারটি প্রধান বিষয় বিশ্লেষণ করা হয়েছে। এগুলো হলো— ব্যক্তিগত মনোভাব, পারিবারিক-সামাজিক প্রত্যাশা, সিদ্ধান্ত নেওয়ার ব্যক্তিগত স্বাধীনতা এবং চিকিৎসকের সরাসরি প্রভাব।

এই চারটি বিষয়ের মধ্যে কেবল পারিবারিক-সামাজিক প্রত্যাশাই সিজারের সিদ্ধান্তের সঙ্গে উল্লেখযোগ্যভাবে সম্পর্কিত। নারীর নিজস্ব মনোভাব, সিদ্ধান্ত নেওয়ার স্বাধীনতা এবং চিকিৎসকের সরাসরি পরামর্শের চেয়ে পরিবার ও সমাজের মনস্তাত্ত্বিক চাপই প্রসূতির সিজারের সিদ্ধান্তকে সবচেয়ে বেশি প্রভাবিত করেছে।

গবেষণায় উঠে কিছু প্রচলিত বিষয় উঠে এসেছে, যেগুলো নারীদের সিদ্ধান্তে প্রভাব ফেলেছে। এর মধ্যে রয়েছে— ‘আজকাল সবাই সিজার করছে’, ‘নরমাল ডেলিভারির ব্যথা সহ্য করার দরকার নেই’, ‘আমাদের পরিবারে আগেও সিজার হয়েছে, কোনো সমস্যা হয়নি।’

সিজারকে আধুনিক, নিরাপদ বা স্বচ্ছল পরিবারের প্রতীক হিসেবে দেখার প্রবণতাও সামনে এসেছে। গবেষক জামাল উদ্দিন বলেন, ‘সিজারের সিদ্ধান্ত কেবল একটি চিকিৎসাগত বিষয় নয়, এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে পরিবার, সংস্কৃতি, সামাজিক প্রত্যাশা, ভয় ও মর্যাদাবোধ, এবং নিরাপদ প্রসব সম্পর্কে প্রচলিত ধারণা।’

সিজার করা নারীদের স্বাস্থ্য-সংক্রান্ত মনোভাব প্রকৃতপক্ষে স্বাভাবিক প্রসবের প্রতি বেশি অনুকূল ছিল। সিজার নিয়ে বরং তাদের মধ্যে বেশি উদ্বেগ কাজ করেছিল। অর্থাৎ, ব্যক্তিগত পর্যায়ে নেতিবাচক মনোভাব থাকা সত্ত্বেও তারা সিজারকে প্রত্যাশিত, নিরাপদ বা সামাজিকভাবে গ্রহণযোগ্য বিকল্প হিসেবে মেনে নিয়েছেন।

গবেষণায় সিজারের পেছনে চিকিৎসক বা হাসপাতালের ভূমিকা অস্বীকার করা হয়নি। তবে এতে দেখানো হয়েছে, পারিবারিক চাপ, ভয়, তথ্যের ঘাটতি ও সামাজিক রীতিনীতির মতো বিষয়গুলো এমন এক অদৃশ্য পরিবেশ তৈরি করে, যেখানে সিজারই একমাত্র পথ হয়ে দাঁড়ায়।

আয় বেশি হলে সিজারের প্রবণতা বেশি

গবেষণায় অংশগ্রহণকারীদের শিক্ষাগত ও আর্থিক অবস্থা বিশ্লেষণে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য উঠে এসেছে। যেসব নারীর আয়, শিক্ষা ও চিকিৎসকের কাছে নিয়মিত যাতায়াত বেশি, তাদের মধ্যে সিজারের প্রবণতা বেশি দেখা গেছে।

মোট অংশগ্রহণকারীদের মধ্যে ৩২ শতাংশের স্নাতকোত্তর বা তার বেশি ডিগ্রি ছিল, ৩৮ শতাংশের স্নাতক ডিগ্রি ছিল এবং ২৫ শতাংশ দ্বাদশ শ্রেণি বা ডিপ্লোমা সম্পন্ন করেছেন। সিজার করা নারীদের মধ্যে ৩৪ শতাংশের স্নাতকোত্তর বা তদূর্ধ্ব ডিগ্রি ছিল, যেখানে স্বাভাবিক প্রসবকারী নারীদের মধ্যে এই হার ছিল ২৬ শতাংশ।

গবেষক জামাল উদ্দিন বলেন, উন্নত দেশগুলোর প্রেক্ষাপটের সঙ্গে এই প্রবণতা সাংঘর্ষিক। উন্নত দেশে সাধারণত বেশি আর্থিক সামর্থ্য থাকা নারীদের কাছে বেশি তথ্য, স্বাধীনতা ও প্রাতিষ্ঠানিক সহায়তা থাকে। এটি তাদের প্রয়োজন অনুযায়ী স্বাভাবিক প্রসব বেছে নিতে সহায়তা করে। কিন্তু বাংলাদেশে বেশি আর্থিক সচ্ছলতা থাকা নারীরা মূলত বেসরকারি হাসপাতালে যাওয়ার সুযোগ বেশি পান। সেখানে সিজার সহজলভ্য এবং তা নিরাপত্তা, আধুনিকতা, সুবিধা ও সামাজিক মর্যাদার সঙ্গে যুক্ত বলে বিবেচিত হয়।

শুধু তথ্য দেওয়াই যথেষ্ট নয়

বাংলাদেশে অপ্রয়োজনীয় সিজার কমাতে গর্ভবতী নারীকে শুধু তথ্য দেওয়াই যথেষ্ট নয়। স্বামী, মা, শাশুড়ি এবং পরিবারের অন্য গুরুত্বপূর্ণ সদস্যদেরও মাতৃস্বাস্থ্য সংক্রান্ত আলোচনায় সম্পৃক্ত করা প্রয়োজন।

বাংলায় নির্ভরযোগ্য মাতৃস্বাস্থ্য বিষয়ক তথ্যের প্রাপ্যতা বাড়ানোর সুপারিশ করা হয়েছে গবেষণায়। এক্ষেত্রে সরকারি ওয়েবসাইট, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম, মোবাইল অ্যাপ্লিকেশন এবং হাসপাতালভিত্তিক ডিজিটাল মাধ্যম ব্যবহার করা যেতে পারে।

চিকিৎসকের সঙ্গে রোগীর যোগাযোগ উন্নত করা, স্বাস্থ্যকর্মীদের প্রশিক্ষণ জোরদার এবং হাসপাতালভিত্তিক সিজারের হার নিয়মিত পর্যবেক্ষণের সুপারিশ করেছেন গবেষক।

গবেষণায় চীনের নীতি-কৌশলের কথাও উদাহরণ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে, যেখানে জনসচেতনতামূলক প্রচারণা, চিকিৎসক প্রশিক্ষণ, হাসপাতাল রিপোর্টিং ও নিয়ন্ত্রক সংস্থার তদারকির মাধ্যমে সিজারের হার কমিয়ে আনা হয়েছিল।

ড. জামাল উদ্দিনের মতে, অপ্রয়োজনীয় সিজার কমানো কেবল চিকিৎসাশাস্ত্রের বিষয় নয়। এটি একইসঙ্গে পরিবার, যোগাযোগ, সচেতনতা ও সংস্কৃতিরও বিষয়।