ডিসেম্বরের মধ্যে পায়রাবন্দর চালুর প্রত্যাশা নৌপরিবহনমন্ত্রীর

নৌপরিবহনমন্ত্রী শেখ রবিউল আলম জানিয়েছেন, চলতি বছরের মধ্যেই পায়রাবন্দরকে পূর্ণাঙ্গভাবে চালু করতে সরকার ব্যাপক পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে এবং মূল কার্যক্রমগুলো ডিসেম্বরে মধ্যে সম্পন্ন হওয়ার কথা রয়েছে।
বুধবার (২২ এপ্রিল) সংসদে পটুয়াখালী-৪ আসনের সরকারি দলের সদস্য এ বি এম মোশাররফ হোসেনের উত্থাপিত প্রশ্নের জবাবে তিনি এ কথা বলেন।
মন্ত্রী জানান, ২০১৫ সালে যুক্তরাজ্যভিত্তিক পরামর্শক প্রতিষ্ঠান এইচআর ওয়ালিংফোর্ড পায়রা বন্দর স্থাপনের জন্য টেকনো-ইকোনমিক সম্ভাব্যতা সমীক্ষা পরিচালনা করে, যা স্বাধীনতার পর দেশে সমুদ্রবন্দর নির্মাণের প্রথম উদ্যোগ হিসেবে চিহ্নিত।
তিনি বলেন, ২০১৬ সালে ভূমি অধিগ্রহণ ও ক্ষতিগ্রস্তদের পুনর্বাসন কার্যক্রম শুরু হয়। ২০১৯ সালে দুটি বড় দীর্ঘমেয়াদি প্রকল্প বন্দরের প্রথম টার্মিনাল নির্মাণ এবং সড়ক ও সেতু সংযোগ উন্নয়ন হাতে নেওয়া হয়। প্রকল্পগুলো যথাক্রমে জুলাই ও ডিসেম্বরের মধ্যে শেষ হওয়ার কথা রয়েছে।
মন্ত্রী বলেন, আন্ধারমানিক নদীর ওপর ১ হাজার ১৮০ মিটার দীর্ঘ চার লেনের সেতু এবং ঢাকা-কুয়াকাটা মহাসড়কের সঙ্গে সংযোগকারী ৬.৩৫ কিলোমিটার দীর্ঘ ছয় লেনের টার্মিনাল অ্যাক্সেস সড়ক নির্মাণকাজ প্রায় শেষ পর্যায়ে রয়েছে এবং ডিসেম্বরের মধ্যে সম্পন্ন হওয়ার আশা করা হচ্ছে। এসব কাজ শেষ হলে আগামী বছরের শুরু থেকে বন্দরটি পূর্ণাঙ্গভাবে চালু হবে।
তবে তিনি উল্লেখ করেন, বন্দরের প্রধান নৌপথ রাবনাবাদ চ্যানেলে বর্তমানে বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচলের জন্য পর্যাপ্ত গভীরতা নেই। উচ্চমাত্রার পলি জমার কারণে নিয়মিত ড্রেজিং প্রয়োজন হবে। এ লক্ষ্যে দুই বছর মেয়াদি ড্রেজিং প্রকল্প এবং দুটি ট্রেইলিং সাকশন হপার ড্রেজার (টিএসএইচডি) ক্রয়ের বিষয়টি বিবেচনাধীন।
বন্দরের গুরুত্ব তুলে ধরে মন্ত্রী বলেন, বর্তমানে দেশের প্রায় ৯৬ শতাংশ সামুদ্রিক বাণিজ্য চট্টগ্রাম বন্দর দিয়ে পরিচালিত হয়। বর্ধিত বৈদেশিক বাণিজ্যের চাপ সামাল দিতে এবং জরুরি পরিস্থিতিতে বিকল্প কৌশলগত সুবিধা নিশ্চিত করতে পায়রা বন্দরের উন্নয়ন অত্যন্ত জরুরি।
তিনি আরও জানান, পায়রা এলাকায় ইতোমধ্যে ২ হাজার ৬৪০ মেগাওয়াট উৎপাদন ক্ষমতার দুটি কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র স্থাপিত হয়েছে, ফলে কয়লা আমদানি পরিচালনার জন্য বন্দরের কার্যক্রম চালু করা প্রয়োজন।
বন্দরটি দেশের দক্ষিণ-মধ্যাঞ্চলে শিল্পায়ন, কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং আর্থসামাজিক উন্নয়ন ত্বরান্বিত করবে বলেও তিনি উল্লেখ করেন। অবকাঠামোগত অগ্রগতি তুলে ধরে মন্ত্রী বলেন, ৫ হাজার ৯০০.৯৯ একর জমি অধিগ্রহণ করা হয়েছে এবং পুনর্বাসন কাজ চূড়ান্ত পর্যায়ে রয়েছে।
এ ছাড়া নেদারল্যান্ডসের রয়্যাল হাসকোনিংডিএইচভি এবং বুয়েট যৌথভাবে একটি মাস্টারপ্ল্যান প্রণয়ন করেছে। সাতটি সহায়ক জাহাজ সংগ্রহ করা হয়েছে এবং এক লাখ বর্গমিটার গুদাম সুবিধা নির্মাণ সম্পন্ন হয়েছে। প্রথম টার্মিনাল প্রকল্পের আওতায় ৬৫০ মিটার জেটি এবং ৩.২৫ লাখ বর্গমিটার ব্যাকআপ ইয়ার্ড নির্মাণ শেষ হয়েছে, যেখানে একসঙ্গে তিনটি ২০০ মিটার দীর্ঘ জাহাজ ভিড়তে পারবে।
তিনি বলেন, ১০০ মিটার সার্ভিস জেটি, কনটেইনার ফ্রেইট স্টেশন, কার ইয়ার্ড এবং প্রয়োজনীয় কার্গো হ্যান্ডলিং যন্ত্রপাতিও স্থাপন করা হয়েছে। পাশাপাশি টার্মিনাল ভবন, সাবস্টেশন, যোগাযোগ নেটওয়ার্ক এবং ভেসেল ট্রাফিক ম্যানেজমেন্ট সিস্টেম (ভিটিএমএস) স্থাপন করা হয়েছে।
কার্যক্রম প্রস্তুতির বিষয়ে মন্ত্রী বলেন, কাস্টমস ও শিপিং সুবিধা স্থাপন করা হয়েছে এবং আইএসপিএস কোড অনুযায়ী স্মার্ট অ্যাক্সেস ম্যানেজমেন্ট সিস্টেম চালু করা হয়েছে। ড্রেজিং ব্যয় মেটাতে জাহাজের ওপর যৌক্তিক ফি আরোপের জন্য গেজেট চূড়ান্ত পর্যায়ে রয়েছে।
তিনি আরও জানান, রাবনাবাদ চ্যানেলের রক্ষণাবেক্ষণ ড্রেজিং ও দুটি হপার ড্রেজার ক্রয়, বন্দর কর্মকর্তা-কর্মচারীদের জন্য আবাসন ও ইউটিলিটি সুবিধা নির্মাণ এবং আইসিটিভিত্তিক বন্দর পরিচালনা ব্যবস্থা উন্নয়নসহ কয়েকটি প্রকল্প অনুমোদনের অপেক্ষায় রয়েছে।
মন্ত্রী আশা প্রকাশ করেন, ডিসেম্বরের মধ্যে পায়রাবন্দরের পূর্ণাঙ্গ কার্যক্রম শুরু হবে। ড্রেজিং প্রকল্প বাস্তবায়নের পর ২০২৭-২৮ সালের মধ্যে বন্দরটি ২২০ মিটার দৈর্ঘ্য, ১০.৫ মিটার ড্রাফট এবং ৪৫ হাজার টন ধারণক্ষমতার জাহাজ পরিচালনা করতে সক্ষম হবে।