logo

বিএমইউতে সমন্বিত ক্যানসার গবেষণা ইনস্টিটিউট প্রতিষ্ঠার পরিকল্পনা

বিএমইউতে সমন্বিত ক্যানসার গবেষণা ইনস্টিটিউট প্রতিষ্ঠার পরিকল্পনা
বাংলাদেশ মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ে ১৮ অক্টোবর অনুষ্ঠিত গোলটেবিল বৈঠকে অতিথিরা। ছবি: এশিয়া পোস্ট

বাংলাদেশ মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ে (বিএমইউ) এক ছাতার নিচে ক্যানসার রোগীদের পূর্ণাঙ্গ চিকিৎসা সেবা নিশ্চিতে সমন্বিত ক্যানসার গবেষণা ইনস্টিটিউট পরিকল্পনার কথা জানিয়েছেন প্রতিষ্ঠানটির ভাইস চ্যান্সেলর (ভিসি) অধ্যাপক ড. এফ. এম. সিদ্দিকী।

তিনি জানান, দেশে ক্যানসার চিকিৎসার সার্বিক উন্নয়নে আধুনিক যন্ত্রপাতি ও অবকাঠামো উন্নয়নের পাশাপাশি উচ্চতর চিকিৎসা শিক্ষা, বৈজ্ঞানিক গবেষণা, দক্ষ জনবল সৃষ্টি, ক্লিনিক্যাল ট্রায়াল এবং আন্তর্জাতিক সহযোগিতা বৃদ্ধির উদ্যোগ নেওয়া হবে।

রোববার (১৮ অক্টোবর) বিশ্ববিদ্যালয়ের মিল্টন হলে ‘বাংলাদেশের ক্যানসার শিক্ষা, গবেষণা ও সেবার অগ্রগতি: বিএমইউর ভিশন ও নেতৃত্ব’ শীর্ষক গোলটেবিল বৈঠকে প্রধান অতিথির বক্তব্যে ভিসি এ পকিল্পনার কথা জানান।

বিএমইউ ভিসি বলেন, ‘ক্যানসার চিকিৎসা ব্যবস্থাপনা এখন দ্রুত পরিবর্তন হচ্ছে। রেডিয়েশন অনকোলজি, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা যুক্ত হয়ে বিশ্বব্যাপী অত্যন্ত উন্নত প্রযুক্তির দিকে এগিয়ে গেছে। ক্যানসার চিকিৎসায় প্রিসিশন মেডিসিন, মলিকুলার টার্গেটেড ট্রিটমেন্ট এবং নেক্সট-জেনারেশন সিকোয়েন্সিংয়ের মতো আধুনিক প্রযুক্তি আমাদের ব্যবহারের সুযোগ রয়েছে কিনা তা ভাবার সময় এসেছে।’

ক্যানসার চিকিৎসায় জেনেটিক্সের প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরে তিনি আরও বলেন, ‘ক্যানসার চিকিৎসায় আমাদের জেনেটিক্স ও মলিকুলার টেকনিক জানতেই হবে, কারণ এটাই মূল ভিত্তি। দেশের চিকিৎসা ব্যবস্থার আধুনিক প্রযুক্তি যেন দেশের সব স্তরের ক্যান্সার রোগীর জন্য সহজলভ্য হয়, বিএমইউকে সেই ভিশন নিয়ে এগিয়ে যেতে হবে।’

গবেষণার প্রসঙ্গে এফ. এম. সিদ্দিকী বলেন, ‘অন্যান্য হাসপাতালগুলো মূলত শুধু চিকিৎসাসেবা কেন্দ্রিক। কিন্তু আমাদের বিশ্ববিদ্যালয় মূলত তিনটি স্তম্ভের ওপর দাঁড়িয়ে আছে—শিক্ষা, চিকিৎসা সেবা এবং গবেষণা। আমরা এখানে এমএস ও এমডি শিক্ষার্থীদের ট্রেনিং দিয়ে ভবিষ্যতের ক্যান্সার বিশেষজ্ঞ তৈরি করছি।’

বিএমইউকে ‘সেন্টার অব এক্সিলেন্স’ হিসেবে গড়ে তোলা প্রসঙ্গে তিনি বলেন, “গ্লোবাল র‍্যাঙ্কিংয়ে আমাদের অবস্থান পর্যবেক্ষণ করলে দেখা যায় যে, আমরা একাডেমিয়া ও ইন্ডাস্ট্রির মেলবন্ধন এবং একাডেমিক গবেষণায় অনেকটা পিছিয়ে আছি। এই ঘাটতিগুলো চিহ্নিত করে স্বল্প, মধ্য ও দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার মাধ্যমে বিএমইউকে ক্যান্সার চিকিৎসায় ‘সেন্টার অব এক্সিলেন্স’ হিসেবে গড়ে তুলতে হবে।”

ক্যানসার রোগীদের অর্থনৈতিক ও মানসিক সংকটের বিষয়ে সতর্ক করে ভিসি বলেন, কোনো পরিবারে একজনের ক্যান্সার হলে পুরো পরিবার বড় একটি বিপর্যয়ের মধ্যে পড়ে। অনেক সময় চতুর্থ পর্যায়ের রোগী এলে চিকিৎসকরা প্রগনোসিস জেনেও এমন চিকিৎসা পদ্ধতি বেছে নেন, যা রোগীর দীর্ঘমেয়াদি বাঁচার সম্ভাবনা না বাড়িয়ে উল্টো পরিবারটিকে নিঃস্ব করে দেয়। যেখানে চিকিৎসায় দীর্ঘমেয়াদী বেঁচে থাকার সম্ভাবনা খুব কম, সেখানে পরিবারকে বাস্তবতা বুঝিয়ে প্রিপারেশন বা ‘টিউনিং’ করাতে হবে। প্রগনোসিস ভালো না জেনেও অতিরিক্ত খরচের চিকিৎসা দেওয়া ঠিক নয়। বিশেষ করে বাংলাদেশের মতো দরিদ্র দেশে একটা ক্যানসার রোগীর চিকিৎসায় যেন পরিবারটি সর্বস্বান্ত না হয়ে যায়, সেদিকে চিকিৎসকদের খেয়াল রাখা জরুরি, যোগ করেন তিনি।

সংবাদমাধ্যমের ভূমিকা তুলে ধরে তিনি বলেন, ‘হেলথ রিপোর্টার্স ফোরামের মতো সংগঠনগুলো আমাদের সিস্টেমের অবিচ্ছেদ্য অংশ। এ ধরনের গোলটেবিল আলোচনার মাধ্যমে তথ্যের আদান-প্রদান ঘটে, যার ফলে চিকিৎসক ও সাংবাদিকদের মধ্যে যে দৃষ্টিভঙ্গির গ্যাপ বা ভুল বোঝাবুঝি থাকে তা দূর হয়ে যায়।’

বৈঠকে বাংলাদেশ হেলথ রিপোর্টার্স ফোরামের সভাপতি প্রতিক এজাজ ক্যানসার চিকিৎসার সংকটগুলোকে একটি ‘যুদ্ধ’ হিসেবে চিহ্নিত করে চিকিৎসকদের আরও দায়িত্বশীল ও মানবিক হওয়ার আহ্বান জানান। তিনি বলেন, ‘দেশে ক্যানসার রোগীদের পারিবারিক ও আর্থিক নিঃস্ব হওয়ার চিত্র আমরা প্রতিদিন দেখি। ক্যানসার চিকিৎসায় সংকট কাটাতে বড় সিদ্ধান্ত চিকিৎসকদেরই নিতে হবে। কারণ এটি রোগীদের বাঁচানোর এক লড়াই।’

স্বাস্থ্য ব্যবস্থার নানা সীমাবদ্ধতার কথা তুলে ধরে তিনি বলেন, রেডিওথেরাপির কোটি টাকার মেশিন বাক্সে পড়ে থাকার মতো খবর গণমাধ্যমে আসার পরেই কেবল সরকার জানতে পারে এবং উদ্যোগ নেয়। ফলে প্রশাসনিক স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে বিএমইউর গবেষণা ও অগ্রগতির বিষয়ে স্বাস্থ্য সাংবাদিকদের সাথে নিয়মিত আলোচনার প্রস্তাব দেন তিনি।

বিএমইউর ডেন্টাল অনুষদের ডিন অধ্যাপক ডা. সাখাওয়াৎ হোসেন ওরাল ক্যানসার নিয়ে বলেন, বিশ্বজুড়ে মোট ক্যানসারের ৩ থেকে ৫ শতাংশ ওরাল ক্যানসার হলেও দক্ষিণ এশিয়ায় এই হার অনেক বেশি। গ্লোবোক্যান ২০২২-এর হিসাব অনুযায়ী, বাংলাদেশে দ্বিতীয় শীর্ষ ক্যানসার হচ্ছে ওরাল ক্যাভিটি ক্যানসার (৯.৬ শতাংশ)। জর্দা, গুল ও পানের মতো ধোঁয়াহীন তামাকের ব্যাপক ব্যবহারই এর প্রধান কারণ। দেশে লজিস্টিকস ও দক্ষ জনবলের ঘাটতি থাকায় আমাদের প্রতিরোধে জোর দিতে হবে। সচেতনতা বাড়াতে সংবাদমাধ্যম, সরকারি প্রচার ও পাঠ্যপুস্তকে এই তামাকজাত পণ্য ছাঁড়ানোর আহ্বান যুক্ত করা প্রয়োজন।

বিএমইউর সাম্প্রতিক আন্তর্জাতিক র‍্যাংকিংয়ে অবস্থানের কথা উল্লেখ করে বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক ভিসি অধ্যাপক ড. মো. শাহীনুল আলম বলেন, ‘সম্প্রতি বিশ্ব র‍্যাংকিংয়ে আমাদের বিশ্ববিদ্যালয় ১২০০ থেকে ১৪০০ তম অবস্থানের মধ্যে স্থান পেয়েছে। এর মধ্যে আমরা সবচেয়ে বেশি নম্বর পেয়েছি ‘রিসার্চ কোয়ালিটি’ ক্যাটাগরিতে। এর অর্থ হলো আমাদের ফ্যাকাল্টিরা অত্যন্ত মানসম্মত ও ভালো মানের গবেষণা করছেন।’

গবেষণায় সাফল্য থাকলেও শিল্পপ্রতিষ্ঠানের সঙ্গে যৌথ কাজের অভাবকে চিহ্নিত করে তিনি আরও বলেন, ‘রিসার্চ কোয়ালিটিতে ভালো করলেও ‘বিশ্ববিদ্যালয়-ইন্ডাস্ট্রি কোলাবরেশন’ বা যৌথ কাজের ক্ষেত্রে আমরা কম নম্বর পেয়েছি। তবে এর অর্থ এই নয় যে কাজ হচ্ছে না। বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রতিটি বিভাগেই কাজ হচ্ছে, কিন্তু আমরা সেটাকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দিতে পারিনি। আগামীতে এসব কাজকে অফিশিয়ালাইজ করতে পারলে এই সূচকে আমাদের নম্বর অনেক বাড়বে।’

এ সময় ক্লিনিক্যাল অনকোলজি বিভাগের প্রতিষ্ঠাতা ও বর্তমান চেয়ারম্যান অধ্যাক ডা. সৈয়দ আকরাম হোসেন বলেন, ‘ক্যানসার চিকিৎসায় ক্লিনিক্যাল অনকোলজি, মেডিকেল অনকোলজি, সার্জিক্যাল অনকোলজি, প্যাথলজি, রেডিওলজি, নিউক্লিয়ার মেডিসিনসহ সংশ্লিষ্ট বিভাগগুলোর মধ্যে সমন্বয় বাড়ানো। এতে রোগীর জন্য উপযুক্ত চিকিৎসা পদ্ধতি নির্ধারণ এবেং চিকিৎসার মানোন্য়নে সহায়তা মিলবে।’

বিএমইউর ক্লিনিক্যাল অনকোলজি বিভাগ ও বাংলাদেশ হেলথ রিপোর্টার্স ফোরামের যৌথ এই আয়োজনে উপস্থিত ছিলেন ডেন্টাল অনুষদের ডিন অধ্যাপক ডা. সাখাওয়াত হোসেন সায়ন্ত, জাতীয় ক্যানসার গবেষণা ইনস্টিটিউট ও হাসপাতালের পরিচালক অধ্যাপক ডা. মোস্তফা আজিজ সুমন, হেলথ রিপোর্টার্স ফোরামের সভাপতি প্রতীক ইজাজ ও সাধারণ সম্পাদক মুজাহিদ শুভসহ বিভিন্ন অনুষদের ডিন, বিভাগীয় চেয়ারম্যান, জ্যেষ্ঠ শিক্ষক, বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক, গবেষক ও রেসিডেন্টরা।

গোলটেবিল বৈঠকে বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয় (বুয়েট), ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, নর্থ সাউথ বিশ্ববিদ্যালয়সহ বিভিন্ন উচ্চশিক্ষা ও গবেষণা প্রতিষ্ঠানের শিক্ষক ও গবেষক, ওষুধশিল্পের প্রতিনিধি, রেডিওথেরাপি যন্ত্রপাতি ও চিকিৎসাপ্রযুক্তি সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠানের প্রতিনিধি, স্বাস্থ্যসংশ্লিষ্ট বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তা এবং বিপুলসংখ্যক চিকিৎসক ও গণমাধ্যমকর্মী অংশগ্রহণ করেন।