আমাকে উপড়ে ফেলার চেষ্টা হয়েছে, বিএনপির সহযোগিতা ছিল শতভাগ: রাষ্ট্রপতি

অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে দেড় বছর বিভিন্ন চক্রান্ত, আন্দোলনের মাধ্যমে উৎখাত করা, বিদেশ সফরে যেতে না দেওয়া এবং আন্তর্জাতিক অঙ্গন থেকে আড়াল করাসহ নানা ঘটনার কথা জানিয়েছেন আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ে রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব নেওয়া মো. সাহাবুদ্দিন।
গত শুক্রবার (২০ ফেব্রুয়ারি) রাতে কালের কণ্ঠকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে এসব কথা বলেন রাষ্ট্রপ্রধান। সোমবার (২৩ ফেব্রুয়ারি) সেই সাক্ষাৎকার প্রকাশ করেছে পত্রিকাটি।
একসময় দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) কমিশনার ছিলেন মো. সাহাবুদ্দিন। আওয়ামী লীগ সরকারের সময় ২০২৩ সালের ২৪ এপ্রিল পাঁচ বছরের জন্য রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব নেন ৭৫ বছর বয়সী সাহাবুদ্দিন।
রাষ্ট্রপ্রধান হিসেবে মো. সাহাবুদ্দিন বাংলাদেশের সশস্ত্র বাহিনীর সর্বাধিনায়ক। এর বাইরে পদটি মূলত আনুষ্ঠানিক। দেশের কার্যনির্বাহী ক্ষমতা থাকে প্রধানমন্ত্রী ও মন্ত্রিসভার হাতে।
দায়িত্ব নেওয়ার ১৬ মাসের মাথায় এক কঠিন পরিস্থিতির মধ্যে পড়েন তিনি। ২০২৪ সালে প্রথমে কোটাবিরোধী আন্দোলন এবং পরে সহিংসতার জেরে ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানে আওয়ামী লীগ সরকার ক্ষমতাচ্যুত হয়। প্রধানমন্ত্রীর পদ ছেড়ে শেখ হাসিনা চলে যান ভারতে। অনিবার্য পরিস্থিতিতে বঙ্গভবনে থেকে যান রাষ্ট্রপতি। পরে তাকে সংসদ বিলুপ্ত করার আদেশ দিতে হয়েছে এবং অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকারকে শপথ পড়াতে হয়েছে।
অন্তর্বর্তী সরকারের নেওয়া নানা সিদ্ধান্তকে অধ্যাদেশে পরিণত করতে তাকেই সই দেওয়ার আনুষ্ঠানিকতা সারতে হয়েছে। এমনকি নির্বাচনের পর তারেক রহমানের নতুন সরকারও রাষ্ট্রপতি সাহাবুদ্দিনের কাছ থেকে শপথ নিয়েছে।
রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন বিভিন্ন চক্রান্ত হয়েছে দাবি করে সাক্ষাৎকারে বলেন, ‘দেশের শান্তি-শৃঙ্খলা “চিরতরে ধ্বংস করার এবং সাংবিধানিক শূন্যতা সৃষ্টি করার অনেক পাঁয়তারা” হয়েছে। আমি দৃঢ়চিত্তে আমার সিদ্ধান্তে অবিচল ছিলাম। যে কারণে কোনো ষড়যন্ত্রই সফল হয়নি। বিশেষ করে অসাংবিধানিক উপায়ে রাষ্ট্রপতিকে উপড়ে ফেলার অসংখ্য ছক ব্যর্থ হয়েছে।’
প্রশ্ন রাখা হয়েছেল, আপনার পদত্যাগ দাবিতে বিক্ষোভ হতে দেখেছি। বঙ্গভবন অভিমুখে মিছিল হয়েছে, আন্দোলন হয়েছে। সে পরিস্থিতিতে বঙ্গভবনের ভেতরের পরিবেশ কেমন ছিল? আপনার ভাবনা কী ছিল?
জবাবে রাষ্ট্রপতি বলেন, ‘আমাকে কতভাবে উপড়ে ফেলার চেষ্টা করা হয়েছে! কোনো পরিস্থিতিতেই আমি ভেঙে পড়িনি। আমি বলেছি, আমার রক্ত ঝরে যাবে বঙ্গভবনে। রক্ত ঝরে ঝরুক। আরেক ইতিহাসে আমি যোগ হব। কিন্তু আমি সাংবিধানিক ধারাবাহিকতা রক্ষা করব—আমি এই সিদ্ধান্তেই অবিচল ছিলাম। আল্লাহর ইচ্ছা আর আমার দৃঢ়তা।’
কে বা কাদের নেতৃত্বে ওই আন্দোলন হয়েছিল? কেনই বা আপনার প্রতি এত আক্রোশ ছিল তাদের?
এমন প্রশ্নের জবাবে রাষ্ট্রপতি বলেন, ‘এখানে যখন ঘেরাও করল, সেনাবাহিনীর নবম ডিভিশন থেকে ফোর্স এসে তিন স্তরে নিরাপত্তা দিল। তারপর ওই যে মেয়েটা, লাফ দিয়ে কাঁটাতারের বেড়ার ওপরে উঠে ঝাঁপ দেয়। কী আশ্চর্যের ব্যাপার! এগুলো ভাড়াটিয়া। তারপর যখন সাউন্ড গ্রেনেড মারা হলো, লাফ দিয়ে পড়ল। পড়ার পর সে পড়েই থাকবে, ছবি তোলা হবে। সে ডাকছে ক্যামেরাম্যানকে যে ছবি তোলো, ছবি তোলো। মানে এটা দিয়ে সে ব্ল্যাকমেইল করবে। তারপর তাকে মহিলা পুলিশ দিয়ে আর মহিলা আর্মি দিয়ে টেনেহিঁচড়ে তুলে আর্মির জিপে করে নেওয়া হয়।’
সে রাতের বর্ণনায় রাষ্ট্রপ্রধান বলেন, ‘রাত ১২টার সময় বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের নেতা তখনকার তথ্য উপদেষ্টা নাহিদ ইসলাম ফোন করল, ‘এ রকম একটা খবর পাওয়া গেছে, ওরা আমাদের লোক না। আমি এ বিষয়ে প্রধান উপদেষ্টার সঙ্গে কথা বলেছি।’

বিএনপির অবস্থান
রাষ্ট্রপতির কাছে প্রশ্ন ছিল, সেই দুঃসময়ে কাউকে পাশে পেয়েছিলেন?
জবাবে রাষ্ট্রপতি বলেন, ‘আমি নির্দ্বিধায় বলতে পারি, ওই কঠিন সময়েও বিএনপির শীর্ষ নেতৃত্ব আমার পাশে ছিলেন। তারা তখনো সংবিধানের ধারাবাহিকতা অক্ষুণ্ন রাখার বিষয়টি আমার কাছে স্পষ্ট ভাষায় ব্যক্ত করেছেন। বিশেষ করে বিএনপির চেয়ারম্যান তারেক রহমানকে ঘিরে আমার মনের মধ্যে অনেক কৌতূহল জমা ছিল। কিন্তু আমি পর্যায়ক্রমে বুঝতে পারলাম, তিনি খুবই আন্তরিকতাপূর্ণ মানুষ। হি ওয়াজ সো কর্ডিয়াল! আমার দুঃসময়ে বিএনপির সহযোগিতা শতভাগ ছিল।’
তিনি বলেন, ‘বিএনপি থেকে উচ্চপদে আসীন নেতা আমাকে আশ্বস্ত করে বলেছিলেন যে, ‘আপনার প্রতি আমাদের সমর্থন আছে। আমরা সাংবিধানিক ধারাবাহিকতা অক্ষুণ্ন রাখতে চাই। কোনো অসাংবিধানিক উপায়ে রাষ্ট্রপতিকে অপসারণের পক্ষে আমরা নই।’
“আমি বলব যে বিএনপি ও তাদের জোটসঙ্গীরা একটা গ্রুপ হয়ে যায়। আর আরেকটা গ্রুপ হয়ে যায়, তাদের আপনারা সবাই চেনেন। তবে তারা শেষ পর্যন্ত সফল হয়নি। উদ্যোগটা ব্যর্থ হলো বিএনপি ও তাদের জোটের কারণে। একটা বৃহত্তর রাজনৈতিক দল যে স্ট্যান্ডটা নিয়েছে, সেটাকে সরকার তখন সমর্থন করতে বাধ্য হলো।’
সেনাবাহিনীর এগিয়ে আসা
‘এ ছাড়া তিন বাহিনীর পক্ষ থেকে আমাকে সর্বোচ্চ সমর্থন দিয়েছে। তারা শুধু একটা কথাই বলেছে, “মহামান্য, আপনি হচ্ছেন সশস্ত্র বাহিনীর প্রধান। আপনার পরাজিত হওয়া মানে পুরো সশস্ত্র বাহিনীরই পরাজিত হওয়া। এটা আমরা যেকোনো মূল্যে রোধ করব।” শেষ পর্যন্ত তারা এটা করেছে। তারা বিভিন্ন সময় আমার কাছে এসে আমাকে মনোবল দিয়েছে।’
‘শুধু তা-ই নয়, অন্তর্বর্তী সরকারের ভেতর থেকে আরেকবার আমাকে অপসারণের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল বলে শুনেছি। তখনো তিন বাহিনীর প্রধানরা আমার পক্ষে অবস্থান নেন। তারা তাঁদের এই অভিমত অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধানকেও গিয়ে জানান যে কোনো অসাংবিধানিক কর্মকাণ্ড তাঁরা হতে দেবেন না। বঙ্গভবনের সামনে যখন মব সৃষ্টি করা হয়, তখনো সশস্ত্র বাহিনী ওই অবস্থান নিয়েছিল।’

অধ্যাপক ইউনূসের ভূমিকা
রাষ্ট্রপতির কাছে প্রশ্ন ছিল, অপসারণ চেষ্টার বিষয়ে তখনকার প্রধান উপদেষ্টা মুহাম্মদ ইউনূসের সঙ্গে যোগাযোগ করেছিলেন কি না?
জবাবে রাষ্ট্রপ্রধান বলেন, ‘ওই পরিস্থিতিতে ড. ইউনূসের কাছ থেকে কোনো ফোন পাইনি। আমার পক্ষে বা বিপক্ষে কোনো অবস্থানেই তিনি ছিলেন না। অবশ্য উনাকেও আমি সাহায্য চেয়ে কোনো আবদার করিনি। আমার মনোভাব ছিল, যা হচ্ছে হতে থাকুক, দেখা যাক কতদূর গড়ায়। তবে আমি এটুকু বলতে পারি যে, কূটনৈতিক মহল থেকেও আমাকে অপসারণ করার বিষয়ে নেতিবাচক অবস্থান ছিল। আমি এভাবে অসাংবিধানিক ও বেআইনিভাবে অপসারিত হই, সেটা তারাও চায়নি।’
রাষ্ট্রীয় সিদ্ধান্তের ক্ষেত্রে প্রধান উপদেষ্টা কি রাষ্ট্রপতির সঙ্গে সমন্বয় করেছিলেন?
এ প্রশ্নের উত্তরে মো. সাহাবুদ্দিন বলেন, ‘প্রধান উপদেষ্টা সংবিধানের কোনো বিধান মেনে চলেননি। সংবিধানে বলা আছে, উনি যখনই বিদেশ সফরে যাবেন, সেখান থেকে ফিরে এসে রাষ্ট্রপতির সঙ্গে দেখা করবেন এবং আমাকে ওই আউটপুটটা জানাবেন।’
‘কী আলোচনা হলো, কী হলো, কোনো চুক্তি হলো কি না, কী ধরনের কথাবার্তা হলো, এটা আমাকে লিখিতভাবে অবহিত করার কথা। তো, উনি তো বোধ হয় ১৪ থেকে ১৫ বার বিদেশ সফরে গেছেন। একবারও আমাকে জানাননি। একবারও আমার কাছে আসেননি।’
‘প্রেস উইং একদম নিল করে দিল’
রাষ্ট্রপতি সাহাবুদ্দিন বলেন, ‘একবার ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটির নির্বাচনে জেতার পর পুরো কমিটির সদস্যরা আমার সঙ্গে সৌজন্য সাক্ষাৎ করতে এলেন। আমি সাংবাদিকবান্ধব মানুষ হিসেবে তাঁদের সঙ্গে দেখা করি। খুবই সাধারণ একটা সাক্ষাৎ ছিল। আমাদের মধ্যে সামান্য কথাবার্তা হয়েছিল, তারপর ফটোসেশন হয়। ওই ঘটনা পরদিন কয়েকটি পত্রিকায় প্রকাশ হলে প্রধান উপদেষ্টার প্রেস উইং তা স্বাভাবিকভাবে নেয়নি। জোর করে উনারা খুঁজতে থাকল যে বঙ্গভবনের প্রেস উইংয়ের কে এই কাজটা করেছে।’
‘আসলে প্রেস উইংয়ের কেউ তো এই কাজ করেনি। আমি নিজেই সাংবাদিকদের চিঠি পেয়ে তাদের আসতে বলেছিলাম। কিন্তু তারা অত্যন্ত নির্লজ্জভাবে তিনটা মানুষকে এখান থেকে অপসারণ করে নিয়ে গেল। প্রেস সেক্রেটারি, ডেপুটি প্রেস সেক্রেটারি এবং অ্যাসিস্ট্যান্ট প্রেস সেক্রেটারি—তিনজনকেই নিয়ে গেল। পুরো উইংটাই প্রত্যাহার করে নিয়ে গেল।’