‘শেখ হাসিনাকে সমর্থনের অভিযোগে শিক্ষকদের অন্যায়ভাবে শাস্তির মুখোমুখি করা হচ্ছে’

চব্বিশের গণ-অভ্যুত্থানে ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও তার দল আওয়ামী লীগের সঙ্গে সম্পৃক্ততার অভিযোগে পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর একাধিক শিক্ষক ও শিক্ষার্থীকে অন্যায়ভাবে শাস্তির মুখোমুখি করা হচ্ছে বলে দাবি করেছে আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থা হিউম্যান রাইটস ওয়াচ (এইচআরডব্লিউ)।
সংস্থাটি জানিয়েছে, সুষ্ঠু তদন্ত ও আত্মপক্ষ সমর্থনের সুযোগ না দিয়ে এবং শুধু রাজনৈতিক বিশ্বাসের ওপর ভিত্তি করে এবং যথাযথ আইনি প্রক্রিয়া অনুসরণ না করে কোনো পদক্ষেপ নেওয়া আন্তর্জাতিক মানবাধিকার আইনের লঙ্ঘন। এটি অনেকটা আগের সরকারগুলোর দমনমূলক প্রচেষ্টার পুনরাবৃত্তি, যার মাধ্যমে তারা বাংলাদেশের পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে রাজনৈতিক মতামত ও প্রকাশভঙ্গিকে নিয়ন্ত্রণ করার চেষ্টা করত।
বুধবার (৪ নভেম্বর) লন্ডন থেকে প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে এসব কথা জানায় এইচআরডব্লিউ।
প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়, ২০২৪ সালে শিক্ষার্থী-জনতার আন্দোলনের মুখে শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পর থেকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় ও শেরেবাংলা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়সহ অন্তত ২০টিরও বেশি পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে আশি ও নব্বইয়ের দশকে দেখা যাওয়া রাজনৈতিক দলভিত্তিক আচরণের পুনরাবৃত্তি ঘটছে।
সংস্থাটির এশিয়া বিষয়ক উপপরিচালক মীনাক্ষী গাঙ্গুলী বলেন, ‘বাংলাদেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে রাজনৈতিক চর্চার এক দীর্ঘ ইতিহাস রয়েছে। কেবল স্বৈরাচারী শাসকদেরই এই আলোচনাকে ভয় পাওয়া উচিত, শিক্ষার্থীদের আন্দোলনের মধ্য দিয়ে গঠিত সরকারের ক্ষেত্রে এমনটা হওয়া সমীচীন নয়।
তিনি আরও বলেন, ক্ষমতাসীন ও বিরোধী দলের মধ্যে রদবদল হলেই একই দমন-পীড়নের পুনরাবৃত্তি ঘটবে, বাংলাদেশের উচিত অতীতের এমন অধ্যায়টি পুরোপুরি বন্ধ করা।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, স্বচ্ছ তদন্ত ছাড়া ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অন্তত ৪৪ জন শিক্ষকের শিক্ষা ও প্রশাসনিক কার্যক্রম বন্ধ রাখার নির্দেশ দেওয়া হয়, যার মধ্যে ৬ জনকে সাময়িকভাবে বরখাস্ত এবং আরও ১৪ জনের বিরুদ্ধে তদন্ত শুরু হয়েছে। এ ছাড়া ১২৬ জন শিক্ষার্থীকে সাময়িক বহিষ্কার এবং সনদ স্থগিত করা হয়েছে।
একইভাবে বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ে ১২ জন শিক্ষককে বরখাস্ত ও ৩৪ জনের কর্মপরিধি সীমিত করা হয়েছে। এছাড়া শেরেবাংলা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ে ১২ জন শিক্ষকের সাময়িক বরখাস্তসহ ৮৫ জন শিক্ষকের পদোন্নতি আটকে দেওয়া হয়েছে।
শাস্তিমূলক পদক্ষেপগুলোর মধ্যে রয়েছে, চাকরি থেকে বরখাস্ত, সাময়িক বরখাস্ত এবং পাঠদানে নিষেধাজ্ঞা। এসব পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে মূলত এমন সব অভিযোগের ভিত্তিতে, যার মধ্যে রয়েছে শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন আওয়ামী লীগ সরকারের সহিংসতায় সহযোগী ছিলেন অথবা তারা দলটির সমর্থনে কোনো ‘বিধ্বংসী’ কর্মকাণ্ডে জড়িত ছিলেন, কিংবা ইসলামি পোশাক পরিধানকারী শিক্ষার্থীদের প্রতি বৈষম্যমূলক আচরণ করেছেন।
প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, আওয়ামী লীগের সদস্য বা সমর্থক হিসেবে অভিযুক্ত শত শত শিক্ষার্থীকেও বহিষ্কার করা হচ্ছে। ফলে তারা শিক্ষার অধিকার থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন।
হিউম্যান রাইটস ওয়াচ জানিয়েছে, তারা ক্ষতিগ্রস্ত এক ডজনেরও বেশি শিক্ষকের সাক্ষাৎকার নিয়েছে, বিশ্ববিদ্যালয়ের নথিপত্র যাচাই করেছে এবং টেলিভিশনে প্রচারিত আলোচনা ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া একটি ভিডিও পর্যালোচনা ও বিশ্লেষণ করেছে। শিক্ষক ও শিক্ষার্থীদের সঙ্গে কথা বলে বহিষ্কারের ঘটনা, পরীক্ষার সনদ বাতিল এবং ক্যাম্পাসে শিক্ষার্থীদের প্রবেশে নিষেধাজ্ঞার বিষয়টিও নিশ্চিত হয়েছে আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থাটি।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক ও জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক উপাচার্য ড. মশিউর রহমানের উদাহরণ টেনে এইচআরডব্লিউ জানায়, ২০২৪ সালের ২৫ সেপ্টেম্বর তাকে সকল শিক্ষাবিষয়ক ও প্রশাসনিক কাজ থেকে বিরত থাকার নির্দেশ দেওয়া হয়। তার বিরুদ্ধে অভিযোগ ছিল ২০২৪ সালের জুলাই মাসে টেলিভিশন টক শোতে তিনি আন্দোলনকে ‘অবৈধ, ভিত্তিহীন ও অযৌক্তিক’ বলেছেন। তবে টক শোর প্রচারিত ভিডিও ফুটেজ পর্যালোচনা করে এইচআরডব্লিউ এ ধরনের কোনো ফুটেজ বা মন্তব্যের অস্তিত্ব পায়নি।
২০২৪ সালের ৩ আগস্ট গণভবনে ‘গণহত্যায় উসকানি’ দেওয়ার আরেকটি অভিযোগ তার বিরুদ্ধে আনা হয়। তৎকালীন ভিসিদের জন্য ইউজিসির ডাকা ওই বৈঠকে এমন কোনো বক্তব্য দেওয়ার প্রমাণ তাকে দেওয়া হয়নি বলে ড. মশিউর রহমান জানান এবং তিনি তা অস্বীকার করেন। ২০২৬ সালের ৩১ আগস্ট বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ তাকে স্থায়ীভাবে বরখাস্তের সুপারিশ করলে তিনি এর বিরুদ্ধে আপিল করেন।
বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষকদের বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থার মূল ভিত্তি ছিল ২০২৪ সালের ৪ আগস্ট (শেখ হাসিনার দেশত্যাগের আগের দিন) বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে আয়োজিত একটি মিছিল। বিশ্ববিদ্যালয়ের তদন্ত কমিশন ওই মিছিলটিকে ‘সন্ত্রাসী’ মিছিল হিসেবে আখ্যা দেয়।
তবে বাকৃবি সাংবাদিক সমিতির প্রকাশিত ফেসবুক ভিডিও বিশ্লেষণ করে এইচআরডব্লিউ জানায়, সেখানে কেবল স্লোগান দিয়ে হেঁটে যাওয়ার দৃশ্য দেখা গেলেও কোনও সংঘাত বা সহিংসতার চিহ্ন ছিল না। এই মিছিলে স্লোগান দেওয়ার অভিযোগে ফার্মাকোলজি বিভাগের অধ্যাপক পূর্বা ইসলামকে ২০২৫ সালের ৪ আগস্ট বরখাস্ত করা হয়, যদিও ভিডিওতে তার স্লোগান দেওয়ার কোনও দৃশ্য মেলেনি।
একই দিনে অ্যানিমেল ব্রিডিং অ্যান্ড জেনেটিক্স বিভাগের অধ্যাপক ইয়াহিয়া খন্দকারকেও বরখাস্ত করা হয়। তবে তিনি জানান, আন্দোলনের পুরো সময়জুড়ে তিনি ঢাকায় পরিবারের সঙ্গে ছিলেন, ক্যাম্পাসে ছিলেন না। পরবর্তীতে হাইকোর্ট তার বরখাস্তের আদেশ স্থগিত করলেও অ্যাটর্নি জেনারেলের কার্যালয় এর বিরুদ্ধে আপিল করেছে।
সংস্থাটি জানায়, ইতোমধ্যে তিনজন শিক্ষক আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে মানবতাবিরোধী অপরাধে দোষী সাব্যস্ত হয়েছেন (যাদের দুইজন বর্তমানে কারাগারে) এবং অন্য একজন বিচারের অপেক্ষায় রয়েছেন।
২০২৬ সালের আগস্টের সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২২টি বিশ্ববিদ্যালয়ের অন্তত ৪০৪ জন শিক্ষককে তদন্তের আওতায় আনা হয়েছে, যারা ‘টেলিগ্রাম’ মেসেজিং অ্যাপে আওয়ামী লীগপন্থি একটি গ্রুপের সদস্য ছিলেন।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একটি পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক বলেন, ‘বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ আওয়ামী লীগপন্থি সেই শিক্ষকদের মিথ্যা অভিযোগে লক্ষ্যবস্তু বানাচ্ছে, যারা ২০২৪ সালের ছাত্র আন্দোলনকে সমর্থন করেননি। আমাদের ক্লাসে যেতে দেওয়া হচ্ছে না, আমরা গবেষণা কাজ করতে পারছি না। কার্যত আমরা কোনো কিছুই করতে পারছি না।’
মীনাক্ষী গাঙ্গুলী বলেন, ‘যেসব ব্যক্তি শান্তিপূণভাবে পূর্ববর্তী সরকারকে সমর্থন করেছিলেন, তাদের ওপর কোনো ধরনের প্রতিশোধমূলক পদক্ষেপ গ্রহণ করা হলে তা প্রমাণ করে যে দেশে বাকস্বাধীনতা ও সমাবেশের স্বাধীনতা সুরক্ষিত নয়। বিশ্ববিদ্যালয় হওয়া উচিত মুক্ত চিন্তার স্থান, যা তৎকালীন সরকারের প্রতি জোরপূর্বক সমর্থন আদায়ের জায়গা নয়।’
আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থাটির বিশ্লেষণে উঠে এসেছে, কোনো কোনো ক্ষেত্রে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম, প্রোগ্রেসিভ রাজনৈতিক গ্রুপ, টেলিগ্রাম গ্রুপ কিংবা টেলিভিশনে কথা বলার কারণে মিথ্যা ও রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত অভিযোগে শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের লক্ষ্যবস্তু করা হচ্ছে, যা শিক্ষা অঙ্গনে মতপ্রকাশের স্বাধীনতা এবং মুক্ত বুদ্ধির চর্চাকে বাধাগ্রস্ত করছে।



