সফল পদ্ধতি উদ্ভাবন বিওআরআইয়ের /সেন্টমার্টিনের শৈবাল থেকে ওষুধশিল্পের কাঁচামাল

সেন্টমার্টিনের শৈবাল থেকে ওষুধশিল্পের কাঁচামাল
উপকূলে শৈবালের চাষ। ছবি: এশিয়া পোস্ট

সামুদ্রিক গবেষণায় বড় সাফল্য পেয়েছে বাংলাদেশ ওশানোগ্রাফিক রিসার্চ ইনস্টিটিউট (বিওআরআই)। সেন্টমার্টিন ও কক্সবাজার উপকূলের সামুদ্রিক শৈবাল থেকে ওষুধশিল্পের তিনটি গুরুত্বপূর্ণ কাঁচামাল নিষ্কাশনের বৈজ্ঞানিক পদ্ধতি উদ্ভাবন করেছেন প্রতিষ্ঠানটির গবেষকরা।

Advertisement

উপাদান তিনটি হলো আগার, ক্যারাজিনান ও অ্যালজিনেট। বিশ্বজুড়ে ওষুধ, কসমেটিকস, টয়লেট্রিজসহ ৩০০টিরও বেশি শিল্পে এগুলো ব্যবহৃত হয়।

বাংলাদেশে সামুদ্রিক শৈবাল গবেষণার সূচনা সত্তরের দশকে। জাতীয় অধ্যাপক ড. নূরুল ইসলাম ১৯৭২ থেকে ১৯৭৮ সাল পর্যন্ত সুন্দরবন থেকে সেন্টমার্টিন পর্যন্ত উপকূলে নিবিড় গবেষণা চালান।

সেন্টমার্টিন ও কক্সবাজার উপকূলের সামুদ্রিক শৈবাল থেকে ওষুধশিল্পের তিনটি গুরুত্বপূর্ণ কাঁচামাল নিষ্কাশনের বৈজ্ঞানিক পদ্ধতি উদ্ভাবন করেছেন প্রতিষ্ঠানটির গবেষকরা। ছবি: এশিয়া পোস্ট
সেন্টমার্টিন ও কক্সবাজার উপকূলের সামুদ্রিক শৈবাল থেকে ওষুধশিল্পের তিনটি গুরুত্বপূর্ণ কাঁচামাল নিষ্কাশনের বৈজ্ঞানিক পদ্ধতি উদ্ভাবন করেছেন প্রতিষ্ঠানটির গবেষকরা। ছবি: এশিয়া পোস্ট

সেই গবেষণায় ১৭০টির মতো শৈবাল প্রজাতি শনাক্ত হয়। এরপর দীর্ঘদিন থমকে ছিল এই উদ্যোগ। ২০২২ সালে এশিয়াটিক সোসাইটির লাইব্রেরি থেকে সেই দলিলের একটি ফটোকপি সংগ্রহ করেন গবেষকরা। সেটিকে ভিত্তি ধরে নতুন করে গবেষণা শুরু হয়।

সেই ব্ল্যাক অ্যান্ড হোয়াইট স্কেচ ও ছবি থেকে আধুনিক প্রযুক্তির সাহায্যে শৈবাল শনাক্ত করা ছিল বড় চ্যালেঞ্জ। কেননা, শৈবালের বিভিন্ন প্রজাতির পার্থক্য অত্যন্ত সূক্ষ্ম।

দীর্ঘ দুই বছরের প্রচেষ্টায় গবেষকরা সেন্টমার্টিন দ্বীপ থেকে ১৪৩টি শৈবাল প্রজাতি শনাক্ত করতে সমর্থ হন। ছবি: এশিয়া পোস্ট
দীর্ঘ দুই বছরের প্রচেষ্টায় গবেষকরা সেন্টমার্টিন দ্বীপ থেকে ১৪৩টি শৈবাল প্রজাতি শনাক্ত করতে সমর্থ হন। ছবি: এশিয়া পোস্ট

দীর্ঘ দুই বছরের প্রচেষ্টায় গবেষকরা সেন্টমার্টিন দ্বীপ থেকে ১৪৩টি শৈবাল প্রজাতি শনাক্ত করতে সমর্থ হন। এর মধ্যে ১৪টি প্রজাতি অত্যন্ত উচ্চ বাণিজ্যিক ও ঔষধি গুরুত্বসম্পন্ন।

নিষ্কাশন পদ্ধতি উদ্ভাবন

সবচেয়ে বড় সাফল্য এসেছে গবেষণাগারে। লাল ও বাদামি শৈবাল থেকে আগার, ক্যারাজিনান ও অ্যালজিনেট নিষ্কাশনের নির্দিষ্ট বৈজ্ঞানিক পদ্ধতি উদ্ভাবন করেছেন বিজ্ঞানীরা। ওষুধের ক্যাপসুলের আবরণ তৈরি, ওষুধের স্থায়িত্ব বৃদ্ধি এবং তরল ও জেল-ধরনের ওষুধের সঠিক মিশ্রণ প্রস্তুতিতে আগার ও ক্যারাজিনান অপরিহার্য। এগুলো স্ট্যাবিলাইজার ও জেলিং এজেন্ট হিসেবে কাজ করে।

গবেষণাগারের সাফল্যকে মাঠ পর্যায়ে নিয়ে যাওয়ার ব্যাপারেও অগ্রগতি হয়েছে। ছবি: এশিয়া পোস্ট
গবেষণাগারের সাফল্যকে মাঠ পর্যায়ে নিয়ে যাওয়ার ব্যাপারেও অগ্রগতি হয়েছে। ছবি: এশিয়া পোস্ট

বিওআরআই-এর বায়োলজিক্যাল ওশানোগ্রাফি বিভাগের সিনিয়র সায়েন্টিফিক অফিসার ও বিভাগীয় প্রধান আবু সাঈদ মুহাম্মদ শরীফ। তিনি এশিয়া পোস্টকে বলেন, ‘আমরা দীর্ঘ প্রচেষ্টায় সামুদ্রিক শৈবাল থেকে আগার, ক্যারাজিনান ও অ্যালজিনেট নিষ্কাশনের নিজস্ব বৈজ্ঞানিক পদ্ধতি বা প্রোটোকল সফলভাবে তৈরি করেছি। এটি ওষুধ, কসমেটিকস ও টয়লেট্রিজসহ ৩০০টিরও বেশি শিল্পে সরাসরি ব্যবহার করা সম্ভব।’

বিওআরআই-এর এই উদ্ভাবন বাংলাদেশকে সংশ্লিষ্ট শিল্পে আরও স্বনির্ভর করে তুলবে এবং এ খাতে আমদানি কমিয়ে বৈদেশিক মুদ্রা সাশ্রয় করবে বলে আশা সংশ্লিষ্টদের।

ক্যানসার চিকিৎসায় নতুন সম্ভাবনা

কেবল ওষুধশিল্পের কাঁচামালেই থেমে নেই গবেষণা। বিওআরআই-এর বায়োলজিক্যাল ওশানোগ্রাফি বিভাগ এখন সামুদ্রিক জীব ‘সি আর্চিন’ এবং নির্দিষ্ট কিছু শৈবাল থেকে ক্যানসার প্রতিরোধী (সাইটোটক্সিক) উপাদান অনুসন্ধানে গবেষণা চালাচ্ছে।

প্রাথমিক গবেষণায় আশাব্যঞ্জক ফল মিলেছে। এই উৎসগুলো থেকে প্রাপ্ত বায়োঅ্যাক্টিভ কম্পাউন্ড ক্যানসার কোষের বিস্তার রোধে এবং জীবাণুনাশক হিসেবে কার্যকর বলে দেখা গেছে।

মাঠ পর্যায়ে চাষ ও কর্মসংস্থান

গবেষণাগারের সাফল্যকে মাঠ পর্যায়ে নিয়ে যাওয়ার ব্যাপারেও অগ্রগতি হয়েছে। ২০২৪ সালে টিস্যু কালচার প্রযুক্তিতে শৈবালের চারা বা সিডলিং তৈরির প্রকল্প সফলভাবে সম্পন্ন হয়েছে। এটি চাষিদের জন্য নিরবচ্ছিন্ন চারার সরবরাহ নিশ্চিত করবে।

বর্তমানে মহেশখালী চ্যানেল, রেজু খাল এবং উন্মুক্ত সাগরের সোনারপাড়া সৈকত এলাকায় শৈবাল চাষের সফল ট্রায়াল চলছে।

বর্তমানে মহেশখালী চ্যানেল, রেজু খাল এবং উন্মুক্ত সাগরের সোনারপাড়া সৈকত এলাকায় শৈবাল চাষের সফল ট্রায়াল চলছে। ছবি: এশিয়া পোস্ট
বর্তমানে মহেশখালী চ্যানেল, রেজু খাল এবং উন্মুক্ত সাগরের সোনারপাড়া সৈকত এলাকায় শৈবাল চাষের সফল ট্রায়াল চলছে। ছবি: এশিয়া পোস্ট

গবেষকরা লোনা পানিতে শৈবাল চাষের প্রচলিত পদ্ধতি উন্নত ও পরিমার্জন করেছেন। এতে করে প্রতিকূল পরিবেশেও গুণগত মান বজায় রেখে সর্বোচ্চ ফলন পাওয়া সম্ভব হবে। উপকূলীয় জনগোষ্ঠীর জন্য এটি নতুন কর্মসংস্থানের পথ তৈরি করবে।

শৈবাল থেকে বায়োপ্লাস্টিক

ভবিষ্যৎ পরিকল্পনায় রয়েছে শৈবাল থেকে বায়োপ্লাস্টিক তৈরির গবেষণা। সাধারণ প্লাস্টিক প্যাকেজিং থেকে নির্গত মাইক্রোপ্লাস্টিক ক্যানসারের কারণ হতে পারে। শৈবাল থেকে তৈরি বায়োপ্লাস্টিক হবে সম্পূর্ণ পরিবেশবান্ধব ও পচনশীল। খাদ্য ও ওষুধ প্যাকিংয়ে এটি নিরাপদ বিকল্প হিসেবে কাজ করবে।

শৈবাল থেকে তৈরি বায়োপ্লাস্টিক হবে সম্পূর্ণ পরিবেশবান্ধব ও পচনশীল। ছবি: এশিয়া পোস্ট
শৈবাল থেকে তৈরি বায়োপ্লাস্টিক হবে সম্পূর্ণ পরিবেশবান্ধব ও পচনশীল। ছবি: এশিয়া পোস্ট

বিওআরআই-এর বায়োলজিক্যাল ওশানোগ্রাফি বিভাগের সিনিয়র সায়েন্টিফিক অফিসার আবু সাঈদ মুহাম্মদ শরীফ এশিয়া পোস্টকে বলেন, ‘আমরা শৈবাল থেকে বায়োপ্লাস্টিক তৈরির কাজও হাতে নিয়েছি, যা ভবিষ্যতে প্লাস্টিক দূষণ কমিয়ে জনস্বাস্থ্য রক্ষায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।’

বিনিয়োগের তাগিদ

গবেষণার সুফল সাধারণ মানুষের কাছে পৌঁছাতে সরকারের পাশাপাশি বেসরকারি বিনিয়োগকারীদের এগিয়ে আসা জরুরি বলে মনে করছেন বিজ্ঞানীরা। তাদের প্রত্যাশা, শিল্পোদ্যোক্তারা শৈবাল চাষ ও কাঁচামাল উৎপাদনের কারখানা গড়ে তুললে বাংলাদেশ অচিরেই আন্তর্জাতিক শৈবাল বাজারের বড় অংশীদারে পরিণত হবে।

আবু সাঈদ মুহাম্মদ শরীফ বলেন, ‘এই বৈজ্ঞানিক সাফল্যের প্রকৃত সুফল সাধারণ মানুষের কাছে পৌঁছাতে এবং দেশের অর্থনীতিতে বড় পরিবর্তন আনতে প্রয়োজন সরকারি ও বেসরকারি বিনিয়োগকারীদের বলিষ্ঠ অংশগ্রহণ। আমরা গবেষণাগারে প্রযুক্তির উন্নয়ন ঘটিয়েছি। এখন প্রয়োজন এই প্রযুক্তিকে শিল্প পর্যায়ে স্থানান্তর করা, যাতে চারা উৎপাদন থেকে শুরু করে পণ্য প্রক্রিয়াকরণ পর্যন্ত প্রতিটি স্তরে কর্মসংস্থান তৈরি হয়। সরকারের সঠিক পৃষ্ঠপোষকতা এবং বিনিয়োগ নিশ্চিত করা গেলে বঙ্গোপসাগরের এই শৈবাল বাংলাদেশের ব্লু-ইকোনমিকে শক্তিশালী করবে এবং বিশ্ববাজারে আমাদের এক অনন্য উচ্চতায় নিয়ে যাবে।’