‘সংসদে অলি-আল্লাহ থাকায় সরকারি দল আতঙ্কিত’

এশিয়া পোস্ট নিউজ
‘সংসদে অলি-আল্লাহ থাকায় সরকারি দল আতঙ্কিত’
গোলাম মাওলা রনি। ছবি: সংগৃহীত

জাতীয় সংসদে ‘অলি-আল্লাহ’ থাকায় সরকারি দল আতঙ্কিত থাকে বলে মন্তব্য করেছেন সাবেক সংসদ সদস্য গোলাম মাওলা রনি।

বুধবার (১ জুলাই) একটি বেসরকারি টেলিভিশনের টকশোতে অংশ নিয়ে এমন মন্তব্য করেন তিনি।

গোলাম মাওলা রনি বলেন, ‘বর্তমান সংসদে অলি-আল্লাহর যে জিল্লতি, সেই অলি-আল্লাহ, অলি-আল্লাহদের কতগুলো লক্ষণ আছে। তারা যদি কাউকে বলে, “এই তুই মরে যা”, সঙ্গে সঙ্গে সে মরে যায়। “এই তুই বেঁচে থাক, তুই বেঁচে থাক”, তো এইরকম অলি-আল্লাহ সংসদে আছে, যার জন্য সরকারি দলের যারা লোকজন আছে তাদের মধ্যে একটা ভয়, আতঙ্ক। যে, এই লোকের কথামতো সূর্য স্থির থাকে, সে যদি আমাকে বলে যে “তুই মরে যা”, আমি এই সংসদের মধ্যে যদি দাফাদাফি করে মরে যাই, আমার কোর্ট-টাইয়ের অবস্থা কী হবে? আমার মন্ত্রীত্বের অবস্থা কী হবে?’

সাবেক এই সংসদ সদস্য বলেন, ‘এইজন্য হয় কী, এখানে (সংসদে) নরমে-গরমে, শরমে সব মিলিয়ে। তো নরম-গরম হলো যে, ওই যে একটা ভয় অলি-আল্লাহ, জান্নাত পাওয়া যাবে না, অভিশাপ দিতে পারে। আর শরম হলো, আমরা একসঙ্গে দীর্ঘদিন ভাই ভাই ছিলাম। কত গলাগলি আমাদের সম্পর্ক, কত মধুর, আমরা একে অপরের কত গোপন কথা জানি। তো সেই ক্ষেত্রে অল অব এ সাডেন কী করে আমরা বিরোধিতা করি, আমাদের তো শরম লাগে।’

বর্তমান সংসদের বাজেট বিতর্ককে অতি নাটকীয় বলেও উল্লেখ করেন গোলাম মাওলা রনি। তিনি বলেন, ‘সংসদের বাজেট বিতর্ককে অতি নাটকীয়তা বলে আমার কাছে মনে হচ্ছে। সরকারি দলের অনেক সংসদ সদস্য আছে। অনেক কিছু ঘটছে সংসদের ভেতরে এবং বাইরে। তারা না পারছে বলতে, না পারছে প্রকাশ করতে। বা চুপ থাকতেও পারছে না, অনেকটা অঙ্গ জ্বলে যাওয়ার মতো অবস্থা। সেই দিক থেকে হয় কী যে, একটা নির্দিষ্ট লেভেল পর্যন্ত আপনি খেলতে পারেন, যেটা ফজলুর রহমান সাহেব বলেছেন। ঢাকা স্টেডিয়ামে যদি মেসিকে আনা হয় এবং আগে থেকেই যদি বলা হয় যে মেসি এই কয়টি গোল দেবে, এভাবে এভাবে গোল দেবে, কোনো প্লেয়ার সেই খেলা দেখতে যাবে না।’

তিনি বলেন, ‘আমাদের এই পার্লামেন্টে যা কিছু হচ্ছে, মানে উনারা হয়তো মনে মনে খুব খুশি যে আমরা ভীষণ রকম বিনোদন দিলাম। ভীষণ রকম প্রতিযোগিতা শুরু করলাম এবং সংসদ ফাটাফাটি একটা অবস্থা। একদিকে সব কোর্ট-টাই পরা মাওলানা, অন্যদিকে সব দাড়ি-টুপি পরা মাওলানা। এই মাওলানারা পাল্লা দিয়ে মানে আরবি বলছে, উর্দু বলছে, হিন্দি বলছে। এটা ভীষণ রকম একটা, ওই যাকে বলা হয়, আমাদের গ্রামে পালাগান হতো। আমাদের সংসদে মমতাজ এভাবে গান গেয়েছিল।’

গোলাম মাওলা রনি বলেন, ‘তারা চেষ্টা করছে, এই পার্লামেন্ট যেন প্রাণবন্ত হয়, সুন্দর হয়, সবকিছু হয়। অনেকে উর্দু বই-টই নিয়েও সেখানে যাচ্ছে। এই সংসদে অলি-আল্লাহ, গাউস-কুতুবদের অভাব নাই। এমন অলি-আল্লাহ আছে যার কথামতো সূর্য থেমে যায়, স্থির হয়ে যায়, একটু নড়াচড়া করে না সূর্য। বিশ্বাস করেন, আমি বাংলার জমিনে এইরকম জ্যান্ত, জীবন্ত অলি-আল্লাহ কখনো দেখিনি।’

আলোচনার এক পর্যায়ে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদের প্রসঙ্গ উঠে আসে। গোলাম মাওলা রনি বলেন, ‘সালাউদ্দিন সাহেব যেভাবে কথাবার্তা বলতেছেন, অনেক সুন্দর। মানে পার্লামেন্টে দাঁড়ানোর সঙ্গে সঙ্গে মনে হয় যেন বাংলার উইনস্টন চার্চিল দাঁড়িয়েছেন। সবদিক থেকে, কী না জানেন তিনি! ইংরেজি জানেন, হিস্ট্রি জানেন, ইতিহাস জানেন, উর্দু জানেন, আরবি জানেন, সংবিধান জানেন, কোরআন জানেন, হাদিস জানেন, ইজমা জানেন, কিয়াস জানেন।’

বর্তমান পার্লামেন্ট দেশের ১৩তম সংসদ উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘প্রথম থেকে এ পর্যন্ত সালাউদ্দিন সাহেবের মতো এত সুন্দর, দেখতে সুন্দর, শিক্ষিত, মার্জিত, সব বিষয়ে পারদর্শিতা, এই রকম কোনো সংসদে যাকে বলা হয় বিকল্প, যাকে বলা হয় অল্টারনেটিভ প্রধানমন্ত্রী। তো এইরকম অল্টারনেটিভ প্রধানমন্ত্রী বাংলাদেশে আসেনি কখনো।’

গোলাম মাওলা রনি বলেন, ‘তার (সালাহউদ্দিন আহমদ) ব্যাপারে সরকারি দলের লোকজনও খুশি, বিরোধী দলের লোকজনও খুশি। তিনি বক্তব্য দিতে উঠলে পুরো সংসদটা প্রাণবন্ত হয়ে যায়। সরকার এবং বিরোধী দলের লোকজন তারা তালি বাজায়, স্পিকার স্বয়ং নিজে মুগ্ধ হয়ে তার দিকে তাকিয়ে থাকেন। তিনি ১০ মিনিট সময় চাইলে ৪০ মিনিট সময় চলে আসে।’

আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি সংক্রান্ত এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘এটা এমনি বলে। রুমিন ফারহানার কথায় কি কিছু আসে যায় নাকি? রুমিন ফারহানা এই দল থেকে মানে তাকে নমিনেশন দেওয়া হয় নাই, সে বিরোধী দলে চলে গেছে। এখন এই ভদ্রমহিলা তো দীর্ঘদিন সংগ্রাম করছেন, লড়াই করছেন, তার একটা অভিমান না? ফারজানা পুতুল মন্ত্রী হলো। এখন রুমিন ফারহানা বলতে পারে না যে, ফারজানা পুতুল যদি প্রতিমন্ত্রী হয়, আমিও তো মন্ত্রী হতে পারতাম। তো সেই জায়গা থেকে এখন সে একটা বিরোধী দলে আছে। মনের ক্ষোভ থেকে, দুঃখ থেকে, যাতনা থেকে তিনি দুই-চারটা কথা বলবেন, এটা সরকারি দলের কর্তা ব্যক্তিরা কিন্তু মেনে নেন। ফলে ডাজ নট ম্যাটার, আইন-শৃঙ্খলার অবনতি হয়েছে। জামায়াতের ডাক্তার শফিক বলেছেন? বলেননি। বাইরে হয়তো দুই-একজন বলে, জামায়াতের যারা নেতৃবৃন্দ রয়েছেন তারা এমপি হননি, এমপি হলে তারা বলতেন না।’

সংসদে বর্তমানে এক ধরনের আবহ আছে উল্লেখ করে গোলাম মাওলা রনি বলেন, ‘ওটা আপনি ভেতরে না গেলে বুঝতে পারবেন না। নিলুফার চৌধুরী মনি আছেন, উনি ভেতরে থাকেন, উনি বুঝতে পারবেন যে ভেতরের আবহাওয়াটা কী। আপনি বিশ্বাস করেন, জামায়াতের সবাই আতর মেখে আসে। ফলে ওই অঞ্চলে মানে যেটা ট্রেজারি বেঞ্চের উল্টো দিকে যেটা আছে, খালি দেখবেন বিভিন্ন রকম আতরের গন্ধে ম ম ম ম করে চারদিকে। তো এটা অসাধারণ একটা ফ্লেভার।’

সাবেক এই সংসদ সদস্য বলেন, ‘সরকারি দলের অনেক এমপি আছেন, মন্ত্রী আছেন। তারা অনেক দামী দামী সেন্ট (ব্যবহার করেন) ওখানে আছেন। আমরা যখন ছিলাম, সেই সময়টাতে অনেক এমপি ছিল আসলে যারা দাঁত মাজত না ঠিকমতো, মুখ থেকে গন্ধ আসত। অনেকের গা থেকে, ঘাম থেকে গন্ধ আসত, ঠিক এই রকম জিনিস আমার কাছে মনে হচ্ছে না যে, এমন একটা পরিবেশ এখন আছে। এখন এই সংসদ একটা “অলৌকিক সংসদ”, এই সংসদ একটা চমৎকার সংসদ, সেই সংসদে যা কিছু হচ্ছে, আমি মনে করি আমাদের দেশের কল্যাণের জন্যই হচ্ছে।’