logo
Advertisement

জরিপের ফল/প্রধানমন্ত্রীর প্রতি সন্তুষ্ট ৬৬ শতাংশ মানুষ, সরকারের প্রতি ৫৪

এশিয়া পোস্ট ডেস্ক
প্রধানমন্ত্রীর প্রতি সন্তুষ্ট ৬৬ শতাংশ মানুষ, সরকারের প্রতি ৫৪
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। ছবি : সংগৃহীত

সরকার পরিচালনার ছয় মাস পূর্তি উপলক্ষে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান ও সরকারের কর্মকাণ্ড নিয়ে জনমত জরিপ পরিচালনা করা হয়। এতে দেখা যায়, প্রধানমন্ত্রীর কাজে সন্তুষ্ট দেশের ৬৬ দশমিক ৩০ শতাংশ মানুষ। তবে সরকারের সার্বিক কর্মকাণ্ডে খারাপ বলেছেন ৩২ দশমিক ৯০ শতাংশ মানুষ। ডপলার রিসার্চ বাংলাদেশ লিমিটেড নামে স্বাধীন জনমত গবেষণা প্রতিষ্ঠানের ‘অ্যাপ্রুভাল রেটিং সার্ভে ২০২৬’ শীর্ষক জরিপে এসব তথ্য উঠে এসেছে।

Advertisement

এ ছাড়া জাতীয় সংসদের প্রধান বিরোধী দল জামায়াতে ইসলামীর সমর্থকদের মধ্যে ৬৫ দশমিক ৫০ শতাংশ, জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) সমর্থকদের মধ্যে ৬৫ দশমিক ৮০ শতাংশ এবং কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের ৫২ দশমিক ৫০ শতাংশ সমর্থকও প্রধানমন্ত্রীর কাজে সন্তুষ্ট।

বুধবার (১৯ আগস্ট) বিকালে রাজধানীর আগারগাঁওয়ে বিডা ভবনের মাল্টিপারপাস হলে এক অনুষ্ঠানে এ জরিপের ফলাফল প্রকাশ করা হয়।

একই জরিপে সরকারের সামগ্রিক পারফরম্যান্স (কর্মতৎপরতা) সম্পর্কে প্রশ্ন করা হলে কিছুটা ভিন্ন চিত্র পাওয়া গেছে। সরকার ভালোভাবে তার দায়িত্ব পালন করছে বলে মনে করছেন ৫৪ দশমিক ৫০ শতাংশ মানুষ আর খারাপ বলেছেন ৩২ দশমিক ৯০ শতাংশ মানুষ।

গবেষণাপ্রতিষ্ঠান ইনোভিশন কনসাল্টিংয়ের ধারাবাহিকতায় জন্ম নেওয়া এই প্রতিষ্ঠান জরিপের জন্য ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বরে ইনোভিশনের এক জরিপে অংশ নেওয়া ১০ হাজার ৪১৩ জনের সঙ্গে সম্প্রতি টেলিফোনে যোগাযোগ করেছিল। তাদের মধ্যে ৩ হাজার ৪৪৩ জন ডপলারের জরিপে অংশ নিয়েছেন। এই নমুনায় দেশের ৬৪টি জেলার ৪৮৯টি ওয়ার্ড ও গ্রামের প্রতিনিধিত্ব ছিল।

প্রতিষ্ঠানটির দাবি, কোনো রাজনৈতিক দল বা মন্ত্রণালয়ের প্রভাব ছাড়াই স্বাধীনভাবে জরিপটি পরিচালনা করা হয়েছে।

সামগ্রিকভাবে বাংলাদেশ সঠিক নাকি ভুল পথে যাচ্ছে, এমন প্রশ্ন করা হয়েছিল ডপলারের এই জরিপে। উত্তরে ৪৮ দশমিক ৬০ শতাংশ মানুষ বলেছেন, দেশ সঠিক পথে যাচ্ছে। ভুল পথে যাচ্ছে মনে করেন, ৩৫ দশমিক ৬০ শতাংশ। আর ১৫ দশমিক ৮০ শতাংশ কোনো উত্তর দেননি। বিএনপির সমর্থকদের ৬৫ দশমিক ৫০ শতাংশ, জামায়াত সমর্থকদের ৪৪ শতাংশ ও এনসিপি সমর্থকদের ৫৫ দশমিক ২০ শতাংশ বলেছেন, দেশ সঠিক পথে যাচ্ছে। আওয়ামী লীগের সমর্থকদের ক্ষেত্রে এই হার সর্বনিম্ন—৩৪ দশমিক ৪০ শতাংশ।

প্রধানমন্ত্রীর গ্রহণযোগ্যতা বেশি

জরিপে অংশ নেওয়া প্রাপ্তবয়স্কদের ৬৬ দশমিক ৩ শতাংশ প্রধানমন্ত্রীকে তার কাজের জন্য সন্তুষ্টির কথা জানিয়েছেন। বিপরীতে ২১ দশমিক ৬ শতাংশ অসন্তুষ্ট এবং ১২ দশমিক ১ শতাংশ কোনো মন্তব্য করেননি।

বয়স, লিঙ্গ, শিক্ষা ও আয়ভেদে প্রায় সব শ্রেণিতেই প্রধানমন্ত্রীর প্রতি সন্তুষ্টির হার ৬০ শতাংশের বেশি বলে জরিপে উঠে এসেছে। এমনকি বিরোধী দলগুলোর সমর্থকদের মধ্যেও প্রধানমন্ত্রীর ব্যক্তিগত গ্রহণযোগ্যতা দেখা গেছে।

বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর সমর্থকদের ৬৫ দশমিক ৫ শতাংশ এবং জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) সমর্থকদের ৬৫ দশমিক ৮ শতাংশ প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের কাজে সন্তুষ্ট বলে জানিয়েছেন।

তবে প্রধানমন্ত্রীর ব্যক্তিগত গ্রহণযোগ্যতার তুলনায় সরকারের সার্বিক কর্মকাণ্ডে সন্তুষ্টির হার কম, যা ৫৪ দশমিক ৫ শতাংশ।

বিরোধী নেতাদের মূল্যায়ন

জামায়াতের আমির শফিকুর রহমান (বিরোধীদলীয় নেতা) ও এনসিপির আহ্বায়ক নাহিদ ইসলাম (বিরোধীদলীয় চিফ হুইপ) সংসদে কেমন ভূমিকা রাখছেন, এমন প্রশ্ন করা হয়েছিল এ জরিপে। উত্তরে জামায়াত নেতার ক্ষেত্রে ৪৭ দশমিক ৭০ শতাংশ আর নাহিদের ক্ষেত্রে ৩৯ দশমিক ৮০ শতাংশ মানুষ ‘ইতিবাচক’ মত দিয়েছেন।

পুরুষদের মধ্যে ৫২ দশমিক ৯০ শতাংশ ডা. শফিকুরের ব্যাপারে ইতিবাচক হলেও নারীদের ক্ষেত্রে এই হার ৪২ দশমিক ৮০ শতাংশ। অন্যদিকে পুরুষদের মধ্যে নাহিদ ইসলামের ৪৩ দশমিক ৮০ শতাংশ সমর্থন থাকলেও নারীদের ক্ষেত্রে তা ৩৬ শতাংশ।

এনসিপির আহ্বায়ক নাহিদ ইসলামের সমর্থন বেশি ১৮ থেকে ২৯ বছর বয়সীদের মধ্যে (৪৬ দশমিক ৭০ শতাংশ), সবচেয়ে কম ষাটোর্ধ্বদের মধ্যে (৩০ দশমিক ৭০ শতাংশ)। এ ছাড়া ৩২ দশমিক ১০ শতাংশ মানুষ ডা. শফিকুর রহমান সম্পর্কে আর ৩৭ দশমিক ২০ শতাংশ মানুষ নাহিদ ইসলাম সম্পর্কে যথেষ্ট না জানার কথা উল্লেখ করেছেন জরিপে।

দেশ কোন পথে, বিভক্ত জনমত

দেশ সঠিক পথে এগোচ্ছে কি না, এ প্রশ্নে জনমতে বিভক্তি স্পষ্ট। ৪৮ দশমিক ৬ শতাংশ উত্তরদাতা মনে করেন দেশ সঠিক পথে চলছে। অন্যদিকে ৩৫ দশমিক ৬ শতাংশ মনে করেন দেশ ভুল পথে যাচ্ছে।

রাজনৈতিক দলভেদেও এ বিষয়ে বড় পার্থক্য দেখা গেছে। বিএনপির সমর্থকদের ৬৫ দশমিক ৫ শতাংশ দেশ সঠিক পথে রয়েছে বলে মনে করেন। আওয়ামী লীগ সমর্থকদের মধ্যে এ হার ৩৪ দশমিক ৪ শতাংশ।

বিভাগভেদেও মতামতে পার্থক্য রয়েছে। ময়মনসিংহে ৬১ দশমিক ৭ শতাংশ মানুষ দেশ সঠিক পথে চলছে বলে মনে করলেও খুলনায় এ হার ৩৮ দশমিক ৭ শতাংশ।

খাদ্য-জ্বালানির মূল্য ও বিদ্যুৎ নিয়ে উদ্বেগ

দেশের সবচেয়ে বড় সমস্যা কী, কোনো তালিকা না দিয়ে জরিপে এই প্রশ্ন করা হয়েছিল। এর উত্তরে ৫৯ দশমিক ৫ শতাংশ উত্তরদাতা বলেছেন বিদ্যুৎ ও জ্বালানির কথা এবং ৫৯ দশমিক ১০ শতাংশ বলেছেন নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের অতিরিক্ত দামের কথা। তৃতীয় স্থানে আইনশৃঙ্খলা (৩২ দশমিক ৬০ শতাংশ) এবং চতুর্থ স্থানে কর্মসংস্থান (৩০ দশমিক ৮০ শতাংশ)।

যে দুটি বিষয়কে সবচেয়ে বড় সমস্যা বলা হয়েছে, সেই দুটিতেই সরকারের কাজের মূল্যায়ন সবচেয়ে খারাপ। জরিপে ৮৯ দশমিক ৪০ শতাংশ বলেছেন, সরকারের বিদ্যুৎ ব্যবস্থাপনা খারাপ হচ্ছে। জ্বালানি ও গ্যাসের ক্ষেত্রে ৭৯ দশমিক ৬০ শতাংশ এবং নিত্যপণ্যের মূল্যের ক্ষেত্রে ৬৯ দশমিক ১০ শতাংশ একই কথা বলেছেন। বিভাগ, আয় বা শিক্ষার ভিত্তিতে এই মূল্যায়নে খুব একটা হেরফের হয়নি।

ডপলারের জরিপে ৪৬ দশমিক ৫০ শতাংশ উত্তরদাতা বলেছেন, এক বছর আগের তুলনায় তাদের পরিবারের অবস্থা খারাপ হয়েছে, ভালো হয়েছে বলেছেন ১৭ দশমিক ৫০ শতাংশ।

সামনের ১২ মাসে আর্থিক অবস্থা ভালো হবে বলে আশা করছেন ৩৮ দশমিক ১০ শতাংশ, খারাপ হবে বলে মনে করছেন ২৪ দশমিক ৩০ শতাংশ। দেশ নিয়ে ৪৮ দশমিক ৪০ শতাংশ এক বছর আগের চেয়ে বেশি আশাবাদী, ৩৯ শতাংশ কম আশাবাদী এবং ৬ দশমিক ২০ শতাংশ বলেছেন দেশে কিছুই বদলায়নি।

নিরাপত্তা-ধর্মীয় স্বাধীনতা

ডপলারের জরিপের ফল অনুযায়ী, ৬৭ দশমিক ৫০ শতাংশ মানুষ এখন নিজেদের এলাকায় অন্ধকারে একা হাঁটতে নিরাপদ অনুভব করেন। অবশ্য পুরুষদের মধ্যে এই হার ৭০ দশমিক ৯০ শতাংশ হলেও নারীদের ক্ষেত্রে ৬৪ দশমিক ৩০ শতাংশ।

এ ছাড়া জরিপ অনুযায়ী ৯৫ দশমিক ২০ শতাংশ মানুষ এখন নিজেদের ধর্ম উন্মুক্তভাবে পালনে নিরাপদ বোধ করছেন। অবশ্য মুসলমান উত্তরদাতাদের মধ্যে ৯৭ দশমিক ১০ শতাংশ এ কথা বললেও হিন্দুদের মধ্যে এটি ৮২ শতাংশ আর বৌদ্ধ ও খ্রিষ্টানদের ক্ষেত্রে ৮১ দশমিক ১০ শতাংশ।

ফ্যামিলি কার্ড, করনীতি এবং গণভোটের রায়ের প্রতি সমর্থন

জরিপের ফলাফলে বলা হয়েছে, সরকারের ফ্যামিলি কার্ড প্রকল্পকে সমর্থন করছেন ৭৮ দশমিক ৬০ শতাংশ মানুষ, করনীতিকে সমর্থন করেছেন ৭০ দশমিক ৭০ শতাংশ। এ ছাড়া জরিপে অংশ নেওয়া ৭০ শতাংশ মনে করেন, গণভোটের ফল সরকারের বাস্তবায়ন করা উচিত।

সংসদ সদস্যদের মূল্যায়ন

কোনো সমস্যা নিয়ে এলাকার সংসদ সদস্যের কাছে গেলে তারা কতটা শোনেন, এমন প্রশ্নের উত্তরে জরিপে ৫০ দশমিক ৯০ শতাংশ মানুষ ইতিবাচক উত্তর দিয়েছেন। আর সংসদ সদস্যদের কাছে গেলে সমস্যা শুনবেন না বলে মনে করেন ৩৫ দশমিক ৯০ শতাংশ।

ফল প্রকাশের পর এই জরিপ নিয়ে আলোচনায় অংশ নেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উন্নয়ন অধ্যয়ন বিভাগের অধ্যাপক আসিফ মোহাম্মদ শাহান, বিডা ও বেজার নির্বাহী চেয়ারম্যান আশিক চৌধুরী, বিডিজবসের প্রতিষ্ঠাতা এ কে এম ফাহিম মাশরুর, ইনোভিশনের ব্যবস্থাপনা পরিচালক রুবাইয়াৎ সারওয়ার ও এনসিপির যুগ্ম সদস্য সচিব ফরিদুল হক।