এবার সংসদে স্পিকার-ডেপুটি স্পিকার নির্বাচন হবে যেভাবে

নবনির্বাচিত সংসদ সদস্যদের শপথের মধ্য দিয়ে আবার কার্যকর হয়েছে বাংলাদেশের জাতীয় সংসদ। সংবিধান অনুযায়ী, সরকারি ফলাফল প্রকাশের ৩০ দিনের মধ্যে সংসদ অধিবেশন আহ্বানের বাধ্যবাধকতা রয়েছে। সেই হিসাবে আগামী ১২ মার্চ সংসদের অধিবেশন ডেকেছেন রাষ্ট্রপতি।
তবে দ্বাদশ জাতীয় সংসদের স্পিকার শিরীন শারমিন চৌধুরী পদত্যাগ করেছেন এবং ডেপুটি স্পিকার শামসুল হক টুকু মামলায় কারাগারে থাকায় প্রথম অধিবেশনে সভাপতিত্ব কে করবেন, তা নিয়ে প্রশ্ন তৈরি হয়েছে।
গত ১৭ ফেব্রুয়ারি সংসদ সদস্য হিসেবে শপথ নেওয়ার পরই তারেক রহমানকে সংসদ নেতা ও প্রধানমন্ত্রী নির্বাচিত করেছে বিএনপি জোট।
অন্যদিকে সংসদীয় টিমের বৈঠকে জামায়াতে ইসলামী-এনসিপি জোট জামায়াত আমির শফিকুর রহমানকে বিরোধীদলীয় নেতা আর এনসিপির আহ্বায়ক নাহিদ ইসলামকে বিরোধীদলীয় চিফ হুইপ নির্বাচিত করেছেন।
রোববার (২২ ফেব্রুয়ারি) সচিবালয়ে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ জানিয়েছেন আগামী ১২ মার্চ জাতীয় সংসদের প্রথম অধিবেশন অনুষ্ঠিত হবে। সেই অধিবেশনেই স্পিকার, ডেপুটি স্পিকার নির্বাচিত হবেন। ওই অধিবেশনেই ভাষণ দেবেন রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন।
সংবিধান ও জাতীয় সংসদের কার্যপ্রণালী বিধি অনুযায়ী, পূর্ববর্তী সংসদের স্পিকার বা ডেপুটি স্পিকারের উদ্বোধনী অধিবেশনে সভাপতিত্ব করার কথা।
বিগত সংসদদের স্পিকার-ডেপুটি স্পিকারের অবর্তমানে সংসদ অধিবেশন কীভাবে শুরু হবে বা প্রথম অধিবেশনে কে সভাপতিত্ব করবেন, সেটি নিয়েও নানা আলোচনা দেখা যাচ্ছে।
সংসদবিষয়ক গবেষক অধ্যাপক নিজাম উদ্দিন আহমেদ বলেন, বর্তমানে বিগত সংসদের স্পিকার কিংবা ডেপুটি স্পিকারের অনুপস্থিতিতে রাষ্ট্রপতি মনোনীত কোনো ব্যক্তিকে দিয়ে অধিবেশন শুরু করাতে হবে।
সংসদ অধিবেশন শুরু হবে কীভাবে
গত ১২ ফেব্রুয়ারির নির্বাচনে দুই-তৃতীয়াংশের বেশি আসনে জয়লাভ করার পর এরই মধ্যে সরকার গঠন করেছে বিএনপি। পরদিন গত ১৩ ফেব্রুয়ারি মধ্যরাতে জাতীয় সংসদের নির্বাচিত সংসদ সদস্যদের নামে গেজেট প্রকাশিত হয়েছে।
বিএনপি সরকারের ঘোঘণা অনুযায়ী, আইনে বেঁধে দেওয়া সময়ের দুই দিন আগেই ১২ মার্চ সংসদের প্রথম অধিবেশন অনুষ্ঠিত হবে। সোমবার বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতি এই সংসদের প্রথম অধিবেশন আহ্বান করেছেন।
বাংলাদেশের বিদ্যমান সংবিধান ও জাতীয় সংসদের কার্যপ্রণালি বিধি অনুযায়ী, পূর্ববর্তী সংসদের স্পিকার কিংবা ডেপুটি স্পিকারের উদ্বোধনী অধিবেশনে সভাপতিত্ব করার কথা।
২০২৪ সালের ৭ জানুয়ারি দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পর জাতীয় সংসদের স্পিকার নির্বাচিত হয়েছিলেন শিরীন শারমিন চৌধুরী। আর ডেপুটি স্পিকার নির্বাচিত হয়েছিলেন শামসুল হক টুকু।
ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানে শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পর সংসদের স্পিকারের পদত্যাগ ও ডেপুটি স্পিকারের কারান্তরীণ থাকায় সংসদের প্রথম অধিবেশন কীভাবে পরিচালিত হবে, সেটি নিয়েও নানা প্রশ্ন সামনে আসছে।
সংবিধানের ৭৪ অনুচ্ছেদে স্পিকার ও ডেপুটি স্পিকার নির্বাচন সম্পর্কে বলা আছে, ‘কোনো সাধারণ নির্বাচনের পর সংসদের প্রথম বৈঠকে সংসদ সদস্যদের মধ্য হইতে সংসদ একজন স্পিকার ও একজন ডেপুটি স্পিকার নির্বাচিত করিবেন এবং এই দুই পদের যেকোনোটি শূন্য হইলে সাত দিনের মধ্যে কিংবা ওই সময়ে সংসদ বৈঠকরত না থাকিলে পরবর্তী প্রথম বৈঠকে তাহা পূর্ণ করিবার জন্য সংসদ সদস্যদের মধ্য হইতে একজনকে নির্বাচিত করিবেন।’
সংবিধানে আরও বলা আছে, স্পিকার বা ডেপুটি স্পিকারের পদ শূন্য ডেপুটি স্পিকার, তার পদও শূন্য হলে বা কোনো কারণে তারা দায়িত্ব পালনে অসমর্থ হলে সংসদের কার্যপ্রণালি বিধি অনুযায়ী কোনো সংসদ সদস্য এই দায়িত্ব পালন করবেন।
তবে জাতীয় সংসদের কার্যপ্রণালি বিধি অনুযায়ী, প্রথম অধিবেশন পরিচালনার জন্য রাষ্ট্রপতি কাউকে মনোনীত করতে পারেন।
আবার সংবিধানে একটি অনুচ্ছেদ বলা আছে, স্পিকার বা ডেপুটি স্পিকারের পদ শূন্য হলেও পরবর্তী উত্তরাধিকারী দায়িত্বভার গ্রহণ না করা পর্যন্ত তারা স্বীয় পদে বহাল আছেন বলে গণ্য হবেন।
সংসদবিষয়ক গবেষক অধ্যাপক কে এম মহিউদ্দিন বলেন, ‘বর্তমান প্রেক্ষাপটে বিগত সংসদের স্পিকার, ডেপুটি স্পিকার দুজনই অনুপস্থিত। যে কারণে একটা সংসদ অধিবেশন ডাকার পর কী হবে, সেটা নিয়ে একটা সংকট আছে। কেননা এটা ব্যতিক্রমী একটা ঘটনা।’
তার মতে, স্পিকার ও ডেপুটি স্পিকার দুজনের একজনও যদি না থাকেন, তাহলে রাষ্ট্রপতি মনোনীত কোনো ব্যক্তি অধিবেশন পরিচালনা করতে পারেন কার্যপ্রণালি বিধির (৫) ধারা অনুযায়ী।
মহিউদ্দিন বলেন, ‘এটা যদি অনুসরণ করা হয়, তাহলে রাষ্ট্রপতির মাধ্যমে মনোনয়ন আসতে হবে। এ ক্ষেত্রে হয়তো রাষ্ট্রপতিকে প্রধানমন্ত্রী যেভাবে বলবেন, সেভাবেই হবে।’
শুরুতেই স্পিকার-ডেপুটি স্পিকার নির্বাচন
আগের স্পিকার-ডেপুটি স্পিকারের অনুপস্থিতিতে গত ১৭ ফেব্রুয়ারি প্রধান নির্বাচন কমিশনার (সিইসি) সংবিধানের ১৪৮ অনুচ্ছেদ অনুসরণ করে সংসদ সদস্যদের শপথ পাঠ করান।
বিএনপি-জামায়াত-এনসিপিসহ অন্য নির্বাচিত সংসদ সদস্যরা শপথবাক্য পাঠ করেন। ওই দিন বিকেলে বিএনপি চেয়ারম্যান তারেক রহমানের নেতৃত্বে মন্ত্রিসভার শপথগ্রহণ হয়।
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ জানিয়েছেন, আগামী মার্চের দ্বিতীয় সপ্তাহে জাতীয় সংসদের অধিবেশন বসবে। ওই অধিবেশনেই স্পিকার ও ডেপুটি স্পিকার নির্বাচিত করা হবে।

গবেষক ও বিশ্লেষকরা জানাচ্ছেন, এ ক্ষেত্রে সংসদের স্পিকার ও ডেপুটি স্পিকার নির্বাচিত করার ক্ষেত্রে কিছু সুনির্দিষ্ট কিছু বিধানও রয়েছে।
অধ্যাপক নিজাম উদ্দিন আহমেদ বলেন, ‘বিগত সংসদের স্পিকার-ডেপুটি স্পিকারের অনুপস্থিতিতে রাষ্ট্রপতি মনোনীত ব্যক্তির সভাপতিত্বে ত্রয়োদশ সংসদের প্রথম অধিবেশন শুরু করাতে হবে। তারপর ওই অধিবেশনেই স্পিকার ও ডেপুটি স্পিকার নির্বাচন করা হবে।’
সংবিধানের ৭৪ অনুচ্ছেদে বলা আছে, ‘কোনো সাধারণ নির্বাচনের পর সংসদের প্রথম বৈঠকে সংসদ সদস্যদের মধ্য হইতে সংসদ একজন স্পিকার ও একজন ডেপুটি স্পিকার নির্বাচিত করবে।’
নিয়ম অনুযায়ী, কোনো একজন সংসদ সদস্য স্পিকার হিসেবে কারও নাম প্রস্তাব করে সংসদ সচিবালয়ের সচিবকে নোটিশ করবেন। অন্য একজন সংসদ সদস্যকে সেই প্রস্তাবে সমর্থন জানাতে হবে। যার নাম প্রস্তাব করা হবে, তিনি স্পিকার হিসেবে দায়িত্ব পালনে সম্মত আছেন, এমন বিবৃতিও নোটিশের সঙ্গে দিতে হবে। এরপর এটি সংসদ সদস্যদের মধ্যে ভোটাভুটিতে যাবে।
অধ্যাপক কে এম মহিউদ্দিন বলছিলেন, ‘যদি স্পিকার ও ডেপুটি স্পিকার পদে একাধিক প্রার্থী না থাকেন, তাহলে কণ্ঠভোটের মাধ্যমেই স্পিকার ও ডেপুটি স্পিকার নির্বাচিত হবেন।’
সাধারণত স্পিকার নির্বাচিত হওয়ার পর তার সভাপতিত্বে ডেপুটি স্পিকার নির্বাচন করা হয়ে থাকে।
নিয়ম অনুযায়ী, এই নির্বাচনপ্রক্রিয়া শেষ হওয়ার পর অধিবেশন মুলতবি ঘোষণা করা হবে। সেই সময়ে স্পিকার ও ডেপুটি স্পিকারকে শপথ পাঠ করাবেন রাষ্ট্রপতি। তারা শপথ নেওয়ার পরেই তাদের সভাপতিত্বে শুরু হবে পরবর্তী সংসদের কার্যক্রম।
বাংলাদেশের বিদ্যমান সংবিধানে বলা আছে, স্পিকার বা ডেপুটি স্পিকার পদত্যাগ না করা পর্যন্ত বা পদশূন্য না হওয়া পর্যন্ত তারা তাদের পদে বহাল থাকবেন। পরবর্তী সাধারণ নির্বাচনের মাধ্যমে নতুন সংসদ গঠন না হওয়া পর্যন্ত তারা আগের পদেই বহাল থাকবেন।
নতুন নির্বাচনের মাধ্যমে পরবর্তী সংসদ অধিবেশন শুরু হলে নতুন স্পিকার ও ডেপুটি স্পিকারের শপথগ্রহণের মাধ্যমে পূর্ববর্তী স্পিকার ও ডেপুটি স্পিকারের কার্যকালের অবসান ঘটবে।
বিদ্যমান সংবিধানে স্পিকার ও ডেপুটি স্পিকার দুটি পদই সরকারি দল থেকে নির্বাচিত হয়। তবে রাষ্ট্রব্যবস্থা সংস্কারে যে জুলাই সনদ করা হয়েছে, সেখানে বিরোধী দল থেকে ডেপুটি স্পিকার পদ রাখার কথা বলা হয়েছে।
সরকার ও বিরোধীদলীয় হুইপের কাজ কী
জাতীয় সংসদে স্পিকার-ডেপুটি স্পিকার পদের পর গুরুত্বপূর্ণ দুটি পদ সরকারি ও বিরোধী দলের চিফ হুইপ বা হুইপ পদ।
চিফ হুইপ হলেন সংসদে সরকারি দলের মুখপাত্র। চিফ হুইপের সঙ্গে কয়েকজন হুইপও থাকেন। তাদের সবাই সংসদ সদস্যের মধ্যেই নির্বাচিত হয়ে থাকেন। চিফ হুইপ ও হুইপের প্রধান কাজ সংসদে দলীয় শৃঙ্খলা রক্ষা করা।
সংসদবিষয়ক গবেষকরা বলছেন, হুইপের দায়িত্বের মধ্যে রয়েছে, নিজ দলের সদস্যদের পার্লামেন্ট বা আইনসভায় নিয়মিত হাজির করার ব্যবস্থা করা, সংসদে কোনো বিল উত্থাপিত হলে দলীয় সব সদস্য যেন দলের পক্ষে ভোট দেন, তা নিশ্চিত করা কিংবা সদস্যরা কোন বিষয়ের ওপর কতক্ষণ বক্তব্য দেবেন, তার সময়সীমা নির্ধারণ করা।
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের নির্বাচিত সংসদ সদস্যরা ১৭ ফেব্রুয়ারি শপথ নিয়েছেন। শপথ গ্রহণের দিন সরকারি দল মন্ত্রিসভা গঠন করেছেন।
একই দিন সংসদেই, জামায়াত এনসিপি জোটের সংসদ সদস্যরা শপথবাক্য পাঠ করেন। পরে বিরোধী জোটের বৈঠকে জামায়াতে ইসলামীর আমির শফিকুর রহমানকে বিরোধীদলীয় নেতা, জামায়াতের নায়েবে আমির সৈয়দ আব্দুল্লাহ মোহাম্মদ তাহেরকে বিরোধীদলীয় উপনেতা ও এনসিপির আহ্বায়ক নাহিদ ইসলামকে বিরোধীদলীয় চিফ হুইপ নির্বাচিত করা হয়।
অধ্যাপক মহিউদ্দিন বলেন, আইন অনুযায়ী, চিফ হুইপ ও জাতীয় সংসদের বিরোধীদলীয় নেতার পদটি একজন পূর্ণ মন্ত্রীর পদমর্যাদার। এতে বিরোধীদলীয় নেতা একজন পূর্ণ মন্ত্রীর সমান সুযোগ-সুবিধা পেয়ে থাকেন।
বিএনপির পক্ষ থেকে তারেক রহমানকে সংসদ নেতা ও প্রধানমন্ত্রী ঘোষণা করা হলেও সংসদ উপনেতা কিংবা সরকারদলীয় চিফ হুইপ পদ এখনো ঘোষণা করা হয়নি।
সূত্র : বিবিসি বাংলা