রোহিঙ্গা সংকটের শুরু মিয়ানমারে, সমাধানও সেখানে: প্রধানমন্ত্রী

রোহিঙ্গা সংকটের টেকসই সমাধান মিয়ানমারেই করতে হবে বলে মন্তব্য করেছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। সংকটের অবসানে নিরাপদ, স্বেচ্ছামূলক ও মর্যাদাপূর্ণ প্রত্যাবাসনের জন্য আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের কার্যকর ভূমিকা চেয়েছেন তিনি।
বুধবার (২৩ সেপ্টেম্বর) নিউইয়র্কে জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের ৮১তম অধিবেশনের উচ্চপর্যায়ের এক পার্শ্ব বৈঠকে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন। বাংলাদেশ ও গাম্বিয়া যৌথভাবে বৈঠকটির আয়োজন করে।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, বাংলাদেশ আর অনির্দিষ্টকাল ধরে ১২ লাখের বেশি বাস্তুচ্যুত রোহিঙ্গার দায়িত্ব বহন করতে পারে না। মিয়ানমারে তাদের নিরাপদ, স্বেচ্ছামূলক ও মর্যাদাপূর্ণ প্রত্যাবাসনের মাধ্যমেই এই সংকটের স্থায়ী সমাধান সম্ভব।
বক্তব্যে তিনি শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান ও সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়ার সময় রোহিঙ্গাদের মিয়ানমারে ফেরত পাঠানোর প্রসঙ্গ তুলে ধরেন।
তারেক রহমান বলেন, অতীতে তাদের দূরদর্শী নেতৃত্বেই সফলভাবে রোহিঙ্গাদের মিয়ানমারে ফেরত পাঠানো সম্ভব হয়েছিল। তবে ২০১৭ সালের সহিংসতার পর এই সংকট আরও ভয়াবহ রূপ ধারণ করেছে। মানবিকতার তাগিদে বাংলাদেশ সীমান্ত খুলে দিয়েছিল, কিন্তু দীর্ঘ ৯ বছর ধরে এই বিপুল বোঝা বাংলাদেশের সামাজিক, অর্থনৈতিক ও পরিবেশগত ব্যবস্থাপনায় মারাত্মক চাপ সৃষ্টি করছে।
রোহিঙ্গা ও কক্সবাজারের স্থানীয় আশ্রয়দাতা জনগোষ্ঠীর জন্য মানবিক সহায়তার অর্থায়ন কমে যাওয়ায় উদ্বেগ জানান প্রধানমন্ত্রী। তিনি বলেন, ২০২৫ সালে ৯৩৪ মিলিয়ন ডলারের সহায়তার আবেদন করা হলেও ২০২৬ সালে প্রয়োজনীয় অর্থের পরিমাণ ৭১০ মিলিয়ন ডলারে নামিয়ে আনতে হয়েছে।
জাতিসংঘের ২০২৫-২৬ সালের যৌথ সহায়তা পরিকল্পনায় ২০২৬ সালে ৭১০ দশমিক ৫ মিলিয়ন ডলার প্রয়োজন বলে উল্লেখ করা হয়েছে। এই অর্থ রোহিঙ্গা শরণার্থী ও তাদের আশ্রয় দেওয়া স্থানীয় জনগোষ্ঠীসহ ১৬ লাখ মানুষের সহায়তায় ব্যবহারের কথা রয়েছে।
মানবিক সহায়তার ঘাটতি রাজনৈতিক নিষ্ক্রিয়তার অজুহাত হতে পারে না বলেও সতর্ক করেন তারেক রহমান।
রোহিঙ্গা সংকট সমাধানে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের সামনে পাঁচ দফা প্রস্তাব তুলে ধরেন প্রধানমন্ত্রী। এগুলো হলো—
১. দ্রুত, নিরাপদ, স্বেচ্ছামূলক ও মর্যাদাপূর্ণ প্রত্যাবাসনের জন্য একটি স্পষ্ট ও বিশ্বাসযোগ্য রোডম্যাপ তৈরি করা।
২. মিয়ানমারে রোহিঙ্গাদের ওপর সব ধরনের নির্যাতন বন্ধ করে তাদের নিজ জমিতে মৌলিক অধিকার ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করা।
৩. রোহিঙ্গা ও তাদের আশ্রয় দেওয়া ক্ষতিগ্রস্ত স্থানীয় জনগোষ্ঠীর জন্য পর্যাপ্ত ও স্থিতিশীল মানবিক সহায়তা নিশ্চিত করা।
৪. আন্তর্জাতিক বিচার আদালত ও আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতে চলমান জবাবদিহির প্রক্রিয়ায় পূর্ণ সমর্থন দেওয়া এবং অপরাধীদের শাস্তি নিশ্চিত করা।
৫. মাদকভিত্তিক অর্থনীতি, মানবপাচার, অবৈধ অস্ত্র ও ডিজিটাল প্রতারণার মতো আন্তঃসীমান্ত অপরাধ দমনে আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক সহযোগিতা বাড়ানো।
আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের প্রতি আহ্বান জানিয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘আসুন, আমরা একসঙ্গে নিশ্চিত করি, রোহিঙ্গাদের ভাগ্য যেন নিপীড়ন ও বাস্তুচ্যুতির আরেকটি গল্প হয়ে না থাকে। বরং তা হয়ে উঠুক ন্যায়বিচার, মর্যাদা ও আশার গল্প। আর এই গল্পের সূচনা হোক এখনই।’
এর আগে রোহিঙ্গা সংকটের স্থায়ী সমাধান ও নিরাপদ প্রত্যাবাসন নিয়ে জাতিসংঘের শরণার্থী সংস্থার প্রধান বারহাম সালেহর সঙ্গেও বৈঠক করেন তারেক রহমান। বৈঠকে মিয়ানমারে প্রত্যাবাসনের উপযোগী পরিবেশ তৈরি এবং সংকট সমাধানে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের সমন্বিত ভূমিকার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়।
জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের ৮১তম অধিবেশনে অংশ নিতে বর্তমানে নিউইয়র্কে রয়েছেন প্রধানমন্ত্রী। ২৪ সেপ্টেম্বর সাধারণ বিতর্কে বাংলাদেশের পক্ষে বক্তব্য দেবেন তিনি। প্রধানমন্ত্রী হিসেবে এটি হবে জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদে তার প্রথম ভাষণ।
তার সফরে রোহিঙ্গা সংকটের পাশাপাশি জলবায়ু পরিবর্তন, টেকসই উন্নয়ন, আন্তর্জাতিক সহযোগিতা ও বৈশ্বিক বৈষম্য মোকাবিলার বিষয়ও গুরুত্ব পাচ্ছে। বুধবার তিনি জলবায়ু বিষয়ক উচ্চপর্যায়ের বৈঠক এবং ব্রাজিল, দক্ষিণ আফ্রিকা, নরওয়ে ও স্পেন আয়োজিত বৈশ্বিক বৈষম্য সংকট মোকাবিলার সভাতেও অংশ নেওয়ার কথা রয়েছে।
