logo
Advertisement

প্রক্রিয়াজাত ৩১ পণ্যে পাওয়া গেছে ভারী ধাতু

এশিয়া পোস্ট নিউজ
এশিয়া পোস্ট নিউজযবিপ্রবি
প্রক্রিয়াজাত ৩১ পণ্যে পাওয়া গেছে ভারী ধাতু
বিভিন্ন প্রক্রিয়াজাত খাবার। ছবি: নিউ ইয়র্ক টাইমস

দেশের বাজারে বিক্রি হওয়া প্রক্রিয়াজাত ৩১টি পণ্যে ভারী ধাতুর উপস্থিতির তথ্য উঠে এসেছে এক যৌথ গবেষণায়। বেকারি পণ্য, স্ন্যাকস ও স্যাভরি পণ্য, চকলেট ও কনফেকশনারি, দুগ্ধজাত পণ্য এবং পানীয়–এই পাঁচ ধরনের ৩২টি পণ্যের নমুনা গবেষণায় পরীক্ষা করা হয়। এর মধ্যে ভারী ধাতু থাকা ৩১টি পণ্যে শিশুদের সম্ভাব্য অ-ক্যানসারজনিত স্বাস্থ্যঝুঁকি নির্ধারিত মাত্রার ওপরে পাওয়া গেছে। প্রাপ্তবয়স্কদের ক্ষেত্রে এমন পণ্যের সংখ্যা নয়টি।

শিশুদের ক্ষেত্রে ঝুঁকি তুলনামূলক বেশি হওয়ার কারণ হিসেবে গবেষণা প্রতিবেদনে তাদের কম শারীরিক ওজনের বিষয়টি উঠে এসেছে। একই পরিমাণ খাবার গ্রহণ করলেও শরীরের ওজনের তুলনায় তাদের ধাতুর গ্রহণমাত্রা বেশি হতে পারে।

‘অ্যাসেসমেন্ট অব হেভি মেটাল কন্টামিনেশন অ্যান্ড অ্যাসোসিয়েটেড নন-কার্সিনোজেনিক অ্যান্ড কার্সিনোজেনিক হেলথ রিস্কস ইন প্রসেসড ফুডস ফ্রম বাংলাদেশ’ টাহটেলে গবেষণার প্রতিবেদনটি প্রকাশ করেছে ‘জার্নাল অব ফুড কম্পোজিশন অ্যান্ড অ্যানালাইসিস’। গত ২২ আগস্ট প্রতিবেদনটি অনলাইনে প্রকাশিত হয়।

প্রতিবেদন অনুযায়ী, বিস্কুট, পাউরুটি, কেক, ড্রাই কেক, ক্রিম রোল, ঘি টোস্ট, টোস্ট, চানাচুর, চিপস, ঝালমুড়ি, ওয়েফার, নুডলস, চকলেট, মিল্ক পাউডার, হরলিকস, আইসক্রিম, ফলের জুস, কফি, কমলার জুস ও বিভিন্ন ধরনের ড্রিংকসসহ ৩২টি পণ্যের নমুনা পরীক্ষা করা হয়। এর মধ্যে ৩১টি পণ্যে ভারী ধাতুর উপস্থিতির তথ্য উঠে এসেছে।

গবেষণায় ছয়টি ভারী ধাতু সিসা, ক্যাডমিয়াম, আর্সেনিক, ক্রোমিয়াম, তামা ও নিকেল পরীক্ষা করা হয়। এর মধ্যে কোনো নমুনাতে ক্যাডমিয়াম ও আর্সেনিক শনাক্ত হয়নি। তবে ক্রোমিয়াম, নিকেল, তামা ও সীসার উপস্থিতি পাওয়া গেছে।

গবেষণার জন্য যশোর জেলার বিভিন্ন খুচরা বিক্রয়কেন্দ্র থেকে নমুনা সংগ্রহ করা হয়। প্রতিটি পণ্যের ভিন্ন উৎপাদন ব্যাচের তিনটি করে প্যাকেট নিয়ে সেগুলো একত্র করে পরীক্ষার জন্য নমুনা তৈরি করা হয়।

গবেষকদের ভাষ্য অনুযায়ী, পরীক্ষিত পণ্যগুলো দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে নিয়মিত বাজারজাত হওয়ায় ফলাফল শুধু যশোরের ভোক্তাদের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। দেশের অন্যান্য এলাকার ভোক্তার ক্ষেত্রেও প্রাসঙ্গিকতা রয়েছে।

কোন পণ্যে কী পরিমাণ ধাতু

বেকারি পণ্যের মধ্যে বিস্কুটের প্রতি কেজিতে ক্রোমিয়াম পাওয়া গেছে ০.৫৯ থেকে ৩.৯০, নিকেল ০ থেকে ১.১৫, কপার ২.২০ থেকে ৫.৩৩ এবং সিসা ২.৫৫ থেকে ৪.৬৫ মিলিগ্রাম। পাউরুটিতে ক্রোমিয়াম ১.৮২, কপার ৩.৯০ ও সিসা ৩.১৩ মিলিগ্রাম/কেজি পাওয়া গেছে। দুই ধরনের কেকের মধ্যে ক্রোমিয়াম পাওয়া গেছে ২.১২ ও ৯.৩৫ আর নিকেল ০.১৭, কপার ৫.২৯ ও সিসা ১১.৩৩ মিলিগ্রাম/কেজি ছিল। ড্রাই কেকে ক্রোমিয়াম ২.৪৪, কপার ৩.৪৯ ও সিসা ৪.৫৫ মিলিগ্রাম পাওয়া যায়।

বেকারি পণ্যের মধ্যে সবচেয়ে বেশি মাত্রায় ধাতু পাওয়া গেছে ক্রিম রোলে। এতে ক্রোমিয়াম ৩৫.৩৯ মিলিগ্রাম, নিকেল ০.৬৫, কপার ৫.৬৮ এবং সিসা ৩৫.৭০ পাওয়া গেছে। ঘি টোস্টে ক্রোমিয়াম ২.৫৮, নিকেল ১.৩৪ ও কপার ১.২৫ এবং টোস্টে ক্রোমিয়াম ৩.৫৮, নিকেল ২.০৪ ও কপার ৩.৭৩ মিলিগ্রাম/কেজি পাওয়া যায়।

স্ন্যাকস ও ঝালজাতীয় খাবারের মধ্যে চানাচুরে ক্রোমিয়াম ২.০৭, নিকেল ০.৬২, কপার ৮.০৮ ও সিসা ৩.০৯ মিলিগ্রাম/কেজি পাওয়া গেছে। বিভিন্ন ধরনের চিপসে ক্রোমিয়াম ০.৭৩ থেকে ৩.৭১, নিকেল ০ থেকে ১.৩১, কপার ৩.৭১ থেকে ৭.১৩ এবং সিসা ১.০২ থেকে ২.৬৩ মিলিগ্রাম/কেজি পাওয়া যায়। ঝালমুড়িতে ক্রোমিয়াম ৩.৬৭, নিকেল ১.৪৯, কপার ৪.৮২ ও সিসা ১.০৫ ছিল। আর মামা ওয়েফারে ক্রোমিয়াম ৫.৭৪, নিকেল ২.০৫, কপার ২২.০০ ও সিসা ১.২৯ মিলিগ্রাম/কেজি পাওয়া গেছে।

চকলেটেও পাওয়া গেছে উল্লেখযোগ্য মাত্রার ভারী ধাতু। মিল্ক চকলেটে ক্রোমিয়াম ২৬.৬৭, কপার ৭.৯৫ এবং সিসা ২৯.৪৯ মিলিগ্রাম/কেজি পাওয়া যায়। পিনাট চকলেটে ক্রোমিয়াম ১.০৯, কপার ৭.২১ ও সিসা ১.৪৮ মিলিগ্রাম/কেজি ছিল। অন্য দুটি চকলেট নমুনায় ক্রোমিয়াম ৩.৪৯ ও ৬.৬৭, নিকেল ০.৯৯ ও ৫.৪২, কপার ২.৩৪ ও ৪.৯৩ এবং সিসা ১.৩৮ ও ৩.১৬ মিলিগ্রাম/কেজি পাওয়া গেছে।

গবেষণা প্রতিবেদন

দুগ্ধজাত পণ্যের মধ্যে মিল্ক পাউডারে ক্রোমিয়াম ৬.৩৯, নিকেল ০.৮৭, কপার ৩.৮৪ ও সিসা ২.৫০ মিলিগ্রাম/কেজি পাওয়া গেছে। হরলিকসে ক্রোমিয়াম ৬.৬৭, নিকেল ৪.০২, কপার ১৫.৬৬ ও সিসা ৫.১৫ মিলিগ্রাম/কেজি ছিল। আইসক্রিম বারে ক্রোমিয়াম ৭.৪৩, নিকেল ৪.০৫, কপার ৩.২২ ও সিসা ৪.১৮ মিলিগ্রাম/কেজি এবং কাপ আইসক্রিমে ক্রোমিয়াম ৬.৪৯, নিকেল ৩.১৯, কপার ৩.৫৬ ও সিসা ৩.০২ মিলিগ্রাম/কেজি পাওয়া যায়।

পানীয়ের মধ্যে ফলের জুসে কপার ০.২১ ও সিসা ০.৮২ মিলিগ্রাম/কেজি পাওয়া গেছে। কফিতে ক্রোমিয়াম ৩.৭২, নিকেল ০.৭৯, কপার ৩.১৯ ও সিসা ২.৭৯ মিলিগ্রাম/কেজি এবং কমলার জুসে ক্রোমিয়াম ৪.৫৬, নিকেল ১.৭৬, কপার ১.০৮ ও সিসা ২.১৮ মিলিগ্রাম/কেজি পাওয়া যায়। বিভিন্ন ড্রিংকসের নমুনায় ক্রোমিয়াম ২.১৭ থেকে ১৩.৯৮, নিকেল ১.২২ থেকে ৪.৭৫, কপার ৪.০৬ থেকে ১৩.৫৮ এবং সিসা ৩.৫৩ থেকে ১১.৮৮ মিলিগ্রাম/কেজি পর্যন্ত পাওয়া গেছে।

ক্রিম রোলে সিসা ৩৫.৭০ ও ক্রোমিয়াম ৩৫.৩৯ মিলিগ্রাম/কেজি। যা পরীক্ষিত নমুনাগুলোর মধ্যে সর্বোচ্চ। মিল্ক চকলেটে সিসা ২৯.৪৯ ও ক্রোমিয়াম ২৬.৬৭, মামা ওয়েফারে কপার ২২.০০ এবং চকলেট-২ নমুনাতে নিকেল ৫.৪২ মিলিগ্রাম পাওয়া গেছে।

গবেষক কারা, সুপারিশ কী

যবিপ্রবির পুষ্টি ও খাদ্য প্রযুক্তি বিভাগ এবং পরিবেশ বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিভাগের গবেষকদের পাশাপাশি ড্যাফোডিল ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি ও অস্ট্রেলিয়ার ইউনিভার্সিটি অব উলংগংয়ের গবেষকদের অংশগ্রহণে গবেষণাটি পরিচালিত হয়েছে।

গবেষণাটির প্রধান লেখক ও গবেষক হিসেবে ছিলেন যবিপ্রবি পুষ্টি ও খাদ্যপ্রযুক্তি বিভাগের সাবেক শিক্ষার্থী ও ড্যাফোডিল ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটির প্রভাষক মো. সাখাওয়াত হোসাইন।

অন্য গবেষকরা হলেন লিসা খানম, তাপস কুমার চক্রবর্তী, নিজাম উদ্দিন, ফারদিব মাহবুব, মো. মোস্তফা কামাল, নাজিয়া নওশাদ লিনা ও সুবাসিশ দাস শুভ। সুবাসিশ দাস শুভ গবেষণাটির সংশ্লিষ্ট লেখক (করেসপন্ডিং অথর)।

গবেষণায় কোনো নির্দিষ্ট প্রতিষ্ঠান বা কারখানাকে উৎস হিসেবে চিহ্নিত করা হয়নি। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ভারী ধাতু মাটি, পানি ও বায়ু থেকে খাদ্যশৃঙ্খলে প্রবেশ করতে পারে। উৎপাদন ও প্রক্রিয়াজাতকরণের সময় শিল্প-সরঞ্জাম, খাদ্য উপাদান বা প্যাকেজিং থেকেও দূষণের সম্ভাবনা থাকতে পারে।

গবেষকরা প্রক্রিয়াজাত খাবারে ভারী ধাতুর উপস্থিতি নিয়মিত পর্যবেক্ষণ, কঠোর নিয়ন্ত্রণ, উন্নত উৎপাদনব্যবস্থা এবং মান নিয়ন্ত্রণ জোরদারের ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন। পাশাপাশি আরও বেশি সংখ্যক পণ্য ও নমুনা নিয়ে ভবিষ্যতে গবেষণার প্রয়োজনীয়তার কথাও উল্লেখ করেছেন।

মো. সাখাওয়াত হোসাইন এশিয়া পোস্টকে বলেন, আমরা প্রতিনিয়ত প্রক্রিয়াজাত খাবার খেয়ে থাকি। মাস্টার্সের থিসিসের কাজ করতে গিয়ে আমার মনে প্রশ্ন জাগে, আমরা যে প্রক্রিয়াজাত খাবার খাচ্ছি, সেগুলো কতটা নিরাপদ। সেই প্রশ্ন থেকে এ বিষয়ে গবেষণা শুরু করি।

তিনি বলেন, গবেষণায় কয়েকটি খাবারে উদ্বেগজনক মাত্রায় ভারী ধাতুর উপস্থিতি পাওয়ার পর আরও আগ্রহ তৈরি হয়। বিভিন্ন জায়গা থেকে নমুনা পরীক্ষা করে প্রায় একই ধরনের ফল পাওয়া যায়। তখন মনে হয়েছে এ বিষয়ে আরও বিস্তৃতভাবে কাজ করে মানুষকে সচেতন করা প্রয়োজন।

সাখাওয়াত হোসাইন বলেন, বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে নিয়ে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া জরুরি, যাতে প্রক্রিয়াজাত খাবারের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং মানুষের স্বাস্থ্যঝুঁকি কমানো সম্ভব হয়। গবেষণাটি জাতীয় পর্যায়ে গুরুত্ব পেয়েছে এবং মানুষের কল্যাণে এটি কাজে লাগার সুযোগ তৈরি হয়েছে।

গবেষণা প্রতিবেদন পড়ুন এখানে