তাহসিফের মরদেহ কিভাবে উদ্ধার হলো, উঠে এলো প্রত্যক্ষদর্শীর বর্ণনায়

রাজধানীর তুরাগ নদী থেকে বিমানবাহিনীর সাবেক কর্মকর্তা ফ্লাইট লেফটেন্যান্ট কে এম তাহসিফ সৌরির (তাওসিফ সৌরি) মরদেহ উদ্ধার করেছে নৌ পুলিশ। বুধবার (২৮ অক্টোবর) বিকেল আনুমানিক ৪টার দিকে রাজধানীর উত্তরখান থানার রাজাবাড়ী সংলগ্ন তুরাগ নদী থেকে তার মরদেহ উদ্ধার করা হয়।
মরদেহটি উদ্ধারের সময়ের বিস্তারিত উঠে এসেছে টঙ্গীর তুরাগ নদীর রাজাবাড়ি খেয়াঘাটে কাজ করা খোকন মিয়া নামে এক প্রত্যক্ষদর্শীর বর্ণনায়।
তিনি গণমাধ্যমকে বলেন, গতকাল দুপুরে হঠাৎ দেখি নদীর দক্ষিণ পাশ দিয়ে পশ্চিম দিক থেকে একটা মানুষ ভেসে আসতেছে। নদীর তীরে কিছু লোক লাশের পাশ ধরে ধরে হেঁটে আসছিল। কিছুক্ষণের মাঝেই লাশটি আমার সামনে দিয়ে যায়।
খোকন বলেন, খেয়াঘাটের পূর্বপাশে ৪টি স্পিডবোট ও একটি নৌকা বাঁধা ছিল। ঠিক সেখানে প্রথম যে সাদা স্পিডবোট ছিল, সেটাতে লাশটি আটকে যায়। তখন দুপুর ২টা। কয়েকঘণ্টা আটকে ছিল। পরে পুলিশ আসে।
মরদেহ উদ্ধারের সময় ঘটনাস্থলে থাকা এক শ্রমিক নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানান, গতকাল তাহসিফের মরদেহ উদ্ধারের সময় তিনি ঘটনাস্থলেই ছিলেন। তিনি সেখানে স্বজনদের দাঁড়িয়ে থাকতে দেখেন এবং পুলিশের সঙ্গে কথা বলতে দেখেন।
স্থানীয় এক নারী বলেন, একটি মরদেহ কাত হয়ে পড়ে থাকতে দেখি। কিন্তু মরদেহটি কোথা থেকে এসেছে, কেউ জানে না। সেখানে কয়েকটি স্পিডবোট ছিলো, তাতে মরদেহটি আটকে ছিল। নাহলে মরদেহটি ভেসে দূরে চলে যেত। কিছুক্ষণ পরে পুলিশ এসে মরদেহ উদ্ধার করে নিয়ে যায়।
পুলিশ সূত্রে জানা গেছে, সাবেক এই বিমান কর্মকর্তা মাঝেমধ্যে তুরাগ নদীর ওই ঘাট এলাকায় ঘুরতে যেতেন। স্থানীয় বাসিন্দারা ছোট নৌকায় নদী পারাপারের জন্য ঘাটটি ব্যবহার করেন। ঘটনার দিনও তিনি উত্তরার বাসা থেকে বের হয়ে সেখানে গিয়েছিলেন বলে জানা গেছে। পরে ঘাটসংলগ্ন এলাকা থেকে তার মরদেহ উদ্ধার করা হয়।
পরিবারের বরাত দিয়ে পুলিশ জানায়, ঘটনার দিন ওই সাবেক কর্মকর্তা এক জুনিয়র বন্ধুর সঙ্গে বাইরে বের হয়েছিলেন। এরপর তিনি আর বাসায় ফেরেননি। পরিবারের সদস্যরা তার খোঁজ শুরু করার পর নদীর ঘাটসংলগ্ন এলাকা থেকে মরদেহ উদ্ধারের খবর জানতে পারেন।
পুলিশ বলছে, মরদেহের অবস্থান ও শরীরে আঘাতের চিহ্ন না থাকার বিষয়টি গুরুত্ব দিয়ে দেখা হচ্ছে। বিষক্রিয়া, শ্বাসরোধ কিংবা অন্য কোনো কারণে মৃত্যু হয়েছে কি না, বিভিন্ন সম্ভাবনা সামনে রেখে তদন্ত চলছে। তবে ময়নাতদন্ত ও ফরেনসিক পরীক্ষার প্রতিবেদন পাওয়ার আগে এ বিষয়ে কোনো সিদ্ধান্তে পৌঁছাতে চাইছে না পুলিশ।
মরদেহ উদ্ধারের পর ঘটনাস্থলে সিআইডির ফরেনসিক টিম যায়। ফরেনসিক ভ্যানের মাধ্যমে বিভিন্ন আলামত সংগ্রহ করা হয়। পাশাপাশি পিবিআইও তদন্তে যুক্ত হয়েছে। ঘটনাস্থলের পরিস্থিতি, মরদেহের অবস্থান এবং পাওয়া আলামত বিশ্লেষণ করা হচ্ছে।
তদন্তে তার সঙ্গে সর্বশেষ বাইরে বের হওয়া ব্যক্তির বিষয়টিও গুরুত্ব দিয়ে দেখা হচ্ছে। ঘটনার দিন তারা কোথায় গিয়েছিলেন, কার সঙ্গে যোগাযোগ করেছিলেন এবং এরপর কী ঘটেছিল, এসব তথ্য সংগ্রহ করছে পুলিশ।
ঢাকা অঞ্চল নৌ পুলিশের পুলিশ সুপার (এসপি) আব্দুল্লাহ্ আল মামুন এশিয়া পোস্টকে বলেন, ‘এখন পর্যন্ত দৃশ্যমান কোনো কিছু নেই, যেটি দেখে মৃত্যুর কারণ বলা যায়। বিষক্রিয়া, শ্বাসরোধসহ বিভিন্ন সম্ভাবনাও তদন্তে বিবেচনায় থাকতে পারে। তবে ময়নাতদন্ত ও ফরেনসিক পরীক্ষার আগে কোনো সিদ্ধান্তে পৌঁছানো ঠিক হবে না।’
তিনি বলেন, নৌ পুলিশের পাশাপাশি একাধিক সংস্থা নিজেদের মতো করে তথ্য সংগ্রহ করছে। এখনো নিহতের পরিবারের পক্ষ থেকে কোনো অভিযোগ পাওয়া যায়নি। ময়নাতদন্তের প্রতিবেদন এবং পরিবারের অভিযোগের পর পরবর্তী আইনি পদক্ষেপ নেওয়া হবে।
পুলিশ সূত্র আরও জানায়, চাকরি থেকে বরখাস্ত হওয়ার পর ওই কর্মকর্তা মানসিকভাবে বিপর্যস্ত ছিলেন কি না, সেটিও তদন্তের অংশ হিসেবে খতিয়ে দেখা হচ্ছে। তবে এ বিষয়ে এখনো নিশ্চিত কোনো তথ্য পাওয়া যায়নি।
এদিকে মরদেহ উদ্ধারের পর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ঘটনাটি নিয়ে নানা দাবি ছড়িয়ে পড়েছে। নিহত কর্মকর্তাকে ঘিরে পুরোনো একটি ভিডিও সামনে এনে বিভিন্ন বক্তব্যও দেওয়া হচ্ছে।
তদন্ত সংশ্লিষ্টরা বলছেন, এসব তথ্যের অনেকটাই যাচাই করা হয়নি। তাই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের কোনো দাবি বা গুজবের ভিত্তিতে মৃত্যুর কারণ কিংবা কারও সম্পৃক্ততা নির্ধারণ করা যাবে না।
ঘটনার দিন জুনিয়র বন্ধুর সঙ্গে বাইরে গিয়েছিলেন তাহসিফ: পুলিশ
ঘটনার দিনও তুরাগের সেই ঘাটে গিয়েছিলেন তাহসিফ: পুলিশ
হাসিনার সেই ভিডিও নিয়ে ৩ মাস আগেই মুখ খুলেছিলেন তাহসিফ
তাহসিফের শরীরে আঘাতের চিহ্ন প্রাথমিকভাবে নির্ধারণ করতে পারিনি: পুলিশ
পকেটে পাওয়া আইফোনের মাধ্যমে সাবেক লেফটেন্যান্ট তাহসিফ সৌরির মরদেহ শনাক্ত
হাসিনার পালানোর ভিডিও ধারণ নিয়ে আলোচনায় আসা সাবেক লেফটেন্যান্ট তাহসিফ সৌরির মরদেহ উদ্ধার
ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) উত্তরা বিভাগের উপপুলিশ কমিশনার (ডিসি) মো. রেজাউল করিম এশিয়া পোস্টকে বলেন, ‘নিহতের বাবা এখনো কোনো অভিযোগ দায়ের করেননি। তারা যদি হত্যার অভিযোগ না করেন, সে ক্ষেত্রে ইউডি মামলা দায়ের করা হবে। এছাড়াও ঘটনা আপাতত নৌ পুলিশের তদন্তে রয়েছে। নৌ পুলিশের পাশাপাশি পুলিশের বিভিন্ন ইউনিট ঘটনাটি গুরুত্ব দিয়ে দেখছে।’
উল্লেখ্য, ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট শেখ হাসিনার দেশ ছেড়ে পালানোর ভিডিও ধারণ ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে দেওয়ার ঘটনায় বিমানবাহিনীর দুই কর্মকর্তা আলোচনায় আসেন। তাদের একজন ফ্লাইট লেফটেন্যান্ট রিফাত আশরাফী। তিনি বিমানবাহিনীর কুর্মিটোলা এয়ারবেইসের অফিসার্স মেসের একটি কক্ষের জানালা থেকে দৃশ্যটি ধারণ করেছিলেন বলে জানা গেছে।
অন্যজন ফ্লাইট লেফটেন্যান্ট তাহসিফ সৌরি, যিনি ভিডিওটি ফেসবুকে নিজের টাইমলাইন থেকে প্রকাশ করেছিলেন। এ ঘটনায় দুজনকেই বাধ্যতামূলক অবসরে পাঠানো হয়। রিফাত আশরাফী বিমানবাহিনীর প্রশাসন শাখার কর্মকর্তা ছিলেন বলেও জানা গেছে।
জানা গেছে, শেখ হাসিনার দেশত্যাগের দৃশ্যটি একটি নির্দিষ্ট অ্যাঙ্গেল থেকে ধারণ করা হয়েছিল। ভিডিওটির সূত্র ধরে বিমানবাহিনীর এয়ার ইন্টেলিজেন্স তদন্ত শুরু করে।
তদন্তে ভিডিও ধারণের অ্যাঙ্গেল, অবস্থান ও ক্যামেরা ঘোরানোর ধরন বিশ্লেষণ করে কোন কক্ষ থেকে এবং কে দৃশ্যটি ধারণ করেছিলেন, তা শনাক্ত হয়। জিজ্ঞাসাবাদে রিফাত আশরাফী তার অফিসকক্ষের জানালা থেকে ছবিটি তোলার কথা স্বীকার করেন। তাহসিফ সাউরিও পোস্ট দেওয়ার কথা জানান।


