logo

স্বর্ণময়ীর আত্মহত্যা সংঘবদ্ধ ডিসইনফরমেশন ক্যাম্পেইনের হাতিয়ার

স্বর্ণময়ীর আত্মহত্যা সংঘবদ্ধ ডিসইনফরমেশন ক্যাম্পেইনের হাতিয়ার

রাজধানীর ধানমন্ডির একটি বাসা থেকে অনলাইন সংবাদমাধ্যম ঢাকা স্ট্রিমের গ্রাফিক্স ডিজাইনার স্বর্ণময়ী বিশ্বাসের (২৬) মৃতদেহ উদ্ধার করেছে পুলিশ। গত বছরের অক্টোবরে ঘটনা এটি। প্রাথমিকভাবে পুলিশ এটিকে আত্মহত্যা ধারণা করে তদন্ত চালায়।

মৃত্যুর আগে স্বর্ণময়ী বিশ্বাস কর্মক্ষেত্রে যৌন হয়রানির অভিযোগ করেছিলেন বলে তার সহকর্মীরা জানিয়েছেন। অভিযোগে তিনি ঢাকা স্ট্রিমের একজন সিনিয়র কর্মকর্তার বিরুদ্ধে অনাকাঙ্ক্ষিত আচরণের কথা উল্লেখ করেছিলেন। অভ্যন্তরীণ তদন্তপ্রক্রিয়া নিয়ে তিনি অসন্তুষ্ট ছিলেন না বলেও জানা গেছে।

এ ঘটনার পর ঢাকা স্ট্রিমের পক্ষ থেকেও এক বিবৃতি দিয়ে গভীর শোক প্রকাশ করা হয়েছে এবং ঘটনাটি তদন্তাধীন বলে জানানো হয়েছে। তখন পুলিশ জানিয়েছিল, মৃত্যুর কারণ নির্ধারণে তদন্ত চলছে এবং কর্মক্ষেত্রের অভিযোগের বিষয়েও খতিয়ে দেখা হবে।

যদিও গত ১৪ এপ্রিল এই মামলার চূড়ান্ত রিপোর্ট আদালতে জমা দিয়েছে পুলিশ।

স্বর্ণময়ীর আত্মহত্যার ঘটনায় অভিযুক্ত হিসেবে উঠে আসে তারই সহকর্মী সাংবাদিক আলতাফ শাহনেওয়াজের নাম। তবে এ ঘটনার পর থেকে তার স্ত্রী ফাতেমা আবেদিন নাজলাও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নানাভাবে আক্রমণের শিকার হয়েছেন এবং তা এখনো অব্যাহত আছে।

রোববার (৩ মে) এ নিয়ে এক প্রতিবেদন প্রকাশ করে ফ্যাক্টচেক প্রতিষ্ঠান দ্য ডিসেন্ট। গত ছয় মাসে নাজলা ও আলতাফ শাহনেওয়াজের বিরুদ্ধে নানা অভিযোগ তুলে ধরে ফেসবুকে প্রকাশ করা ১০০ এর বেশি পোস্ট ও সেগুলোর মন্তব্য বিশ্লেষণ করেছে দ্য ডিসেন্ট। 

প্রতিবেদন বলা হয়, ‘রুমানা বৈশাখী একজন লেখিকা ও অনলাইন ইনফ্লুয়েন্সার। গত ৫ এপ্রিল বিকালে নিজের ভেরিফায়েড ফেসবুক প্রোফাইলে একটি ধন্যবাদমূলক পোস্ট লিখেন তিনি। এক শুভাকাঙ্ক্ষী তাকে উপহার হিসেবে বেশ কিছু রান্না করা খাবার পাঠিয়েছিলেন। রুমানা তার সেই শুভাকাঙ্ক্ষীকে এবং যে প্রতিষ্ঠান থেকে খাবারগুলো কিনে পাঠানো হয়েছে সেই প্রতিষ্ঠানকে কৃতজ্ঞতা জানান পোস্টে; প্রশংসা করেন রান্নারও। লিখেছেন, “এন'স কিচেনের খাবার।…. খুবই চমৎকার, ঘরোয়া স্বাদের রান্না…।”

রুমানা বৈশাখীর ধন্যবাদমূলক পোস্টের নিচে অনেকে ইতিবাচক মন্তব্য করেছেন। তবে কয়েকটি নেতিবাচক মন্তব্যও ছিল। সেই মন্তব্যগুলোতে ছিল বেশ কিছু অভিযোগ; এন’স কিচেনের মালিক ফাতেমা আবেদিন নাজলা ও তার স্বামীর বিরুদ্ধে।

এর মধ্যে একটি মন্তব্যে রুমানা বৈশাখী কর্তৃক এন’স কিচেনের ‘প্রোমোশনের’ ব্যাপারে ঘোরতর আপত্তি জানিয়ে প্রিয়ন্তী কর্মকার নামে এক নারী লিখেছেন, “প্লিজ ওনার কিচেনের প্রোমোশন টা করবেন না। উনার জামাইয়ের পরকিয়ার জেরে একটা মেয়ে মারা গেছে। আর উনিও সেই জামাইয়ের অনেক কীর্তির স্বাক্ষী। অন্তত আপনি উনার মতোন মানুষের বিজনেস প্রোমোশন করলে ইথিক্যালি খুবই খারাপ লাগবে ব্যাপারটা।”

শাহীদ নুসরাত নামের আরেক নারী লিখেছেন, “রেপিস্ট স্বামীর জন্যে একটা মেয়ে চলে গেছে তাও উনি স্বামীর জন্য পা ধরসে... এটা জানার পর আর ইচ্ছে করেনি উনার খাবার খাইতে।”

বেশ দীর্ঘ আরেকটি মন্তব্য করেছেন কাজী আয়েশা নামে একজন। তিনি রুমানাকে উদ্দেশ্য করে লিখেছেন, “কিছু মনে করবেন না আপু। না বলে পারছি না। এই এন'স কিচেনের মালিক নাজলা। নাজলার স্বামী তার সহকর্মী স্বর্ণময়ীর আত্মহত্যার জন্য দায়ী। কিন্তু নাজলার স্বামীর কিছুই হয়নি। বিকৃত মানসিকতার অধিকারী আলতাফ প্রভাবশালী। সেই প্রভাব কাজে লাগিয়ে সে আর নাজলা নানা অসুদপায় অবলম্বন করেছিল, করছে। সেই প্রভাব খাটিয়ে তারা তাদের ক্যাটারিং সার্ভিসের প্রসার ঘটিয়েছে। এই মহিলার স্বামীর এত এত অপকর্মের সঙ্গী। কেউ তার স্বামী নিয়ে কথা বললে নোংরা ভাষায় গালি দেয়। তার স্বামীর অপরাধে তাকে দায়ী করা যায় না নিশ্চয়ই। কিন্তু তাদের বহু অপকর্ম যৌথ প্রযোজনার। যেমন বাংলা একাডেমির ক্যান্টিন তদবির করে অবৈধভাবে লিজ নেওয়া।”

রুমানা বৈশাখী পরে নেতিবাচক এই মন্তব্যগুলো ডিলিট করে দেন। এবং পোস্টের নিচে একটি ডিসক্লেইমার যুক্ত করতে বাধ্য হন।

সেই ডিসক্লেইমারে তিনি লিখেছেন, “এই বক্সটা আমাকে আমার প্রিয় মানুষটা "কিনে" পাঠিয়েছে। এন'স কিচেন থেকে আসেনি। এটা কোন প্রমোশনাল পোস্ট না। পেজ ওনারের ব্যক্তিগত জীবনে কী হচ্ছে, সেটার সাথে আমার প্রিয়জনের পাঠানো উপহারের কোন সম্পর্ক নেই। পেজ ওনারের ব্যক্তিগত জীবন নিয়ে কমেন্ট করতে চাইলে তাদের কাছে গিয়ে করাই ভালো।”

ছয় মাস ধরে সাইবার বুলিংয়ে নাজলা এখন ‘ট্রমাটাইজড’

সম্প্রতি হামে আক্রান্ত হয়ে মারা যাওয়া এক শিশুর লাশ কোলে নিয়ে হাঁটছেন বাবা, এমন একটি ছবি ফেসবুকে ভাইরাল হয়। গত ২২ এপ্রিল নাজলা তার প্রোফাইলে সেই ছবিটি নিয়ে আবেগঘন একটি পোস্ট লিখেছেন; যেখানে স্মৃতিচারণ করেছেন কোভিডের সময় নিজের বোনের ৪৫ দিন বয়সী ছেলের লাশ কোলে নিয়ে হাসপাতাল থেকে বের হওয়ার ঘটনা। 

একান্ত ব্যক্তিগত জীবনের মানবিক একটি মুহূর্তের স্মৃতিচারণামূলক সেই পোস্টে হালিমা আক্তার নামে এক নারী মন্তব্য করেছেন, ‘আপা, আপনার রেপিস্ট স্বামীটার কী হলো পরে জানালেন নাতো। লাত্থি দিয়ে বের করে দিছেন নাকি এখনো তার সাথেই স্ন্যাক্স করেন?’

নাজলার বিরুদ্ধে অনলাইনে এমন অভিযোগ এবং আক্রমণের শুরু হয় গত বছরের অক্টোবর মাসের শেষাংশ থেকে। গত ছয় মাসে নিজের প্রোফাইল ও ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানের ফেসবুক পেজ থেকে প্রতিদিন এমন বহু মন্তব্য ডিলিট করেছেন তিনি। তবু থেকে গেছে বহু মন্তব্য, যেগুলো নাজলার ভাষায় তাকে ‘ট্রমাটাইজড’ করে রেখেছে।

গত ১৯ নভেম্বর এন’স কিচেনের এক পোস্টে সাবরিনা আমান রিভির মন্তব্য, ‘স্বর্ণময়ী নামে একটা মেয়ে ছিল। আপনাদের মতো মানুষেরা তাকে হত্যা করে তার স্মৃতি মুছে দিতে চাইতে পারেন। আমরা ভুলে যাব না, আমরা মুছে যেতে দিব না।’

শুধু নিজেদের পেজ বা প্রোফাইলে এসে শুধু মন্তব্য করা হয়েছে তা নয়, ফেসবুকে নানাজনের প্রোফাইল থেকেও ধারাবাহিকভাবে পোস্ট করা হয়েছে নাজলা ও তার স্বামীর বিরুদ্ধে।

১৯ নভেম্বরের এন’স কিচেনের উপরোল্লিখত পোস্টটি নিজের প্রোফাইলে শেয়ার করে অদিতি জাবিন নামে একজন লিখেছেন, ‘যাক আমরা স্বর্ণময়ীর কথা ভুলে গেছি । নাজলা আপার কাছে থেকে প্রতিবাদের ভাষা শুনতে চেয়েছিলাম। তিনি নিশ্চুপ ছিলেন। এখন আবার এসেছেন তার রান্না নিয়ে। যাক আমরা তো সব ভুলেই গেছি । এখন পোলাও মাংস অর্ডার করে খান। আমাদের সাথে এরকমই হবে। বমি আসে আপনাদের দেখলে।’

অদিতির পোস্টে শারমিন সুলতানা আভা নামের একজন জানতে চান ‘কী হয়েছিল?’ জবাবে অদিতি লিখেছেন, ‘ভাবী, স্বর্ণময়ী বিশ্বাসের খবরটা জানেন না? এই কিনেচেনের স্বত্বাধিকারী নাজলা আপার স্বামী স্বর্ণময়ী বিশ্বাসকে যৌন নিপীড়ন করে তার কর্মক্ষেত্রে। এরপর মেয়েটা অনেক ফাইট করে। শেষমেশ কোনো জায়গায় বিচার না পেয়ে মেয়েটা সুইসাইড করে।’

মাসের পর পর মাস ধরে এমন অভিযোগ, অনলাইন আক্রমণ এবং নিজের ব্যবসার ওপর আঘাত– এসব মোকাবেলা করার করার ব্যর্থ চেষ্টা মানসিকভাবে ভঙ্গুর করে দিয়েছে ৩ বছরের এক কন্যা সন্তানের মা নাজলাকে। সহায়তা নিতে হয়েছে মনস্তাত্ত্বিক পরামর্শকের।

ব্যবসায়িক ক্ষতির কথা জানিয়ে নাজলা বলেন, ‘আমাদের রেস্তোরাঁর আয় একদম বন্ধ হয়ে যায় অক্টোবর মাস থেকেই কিন্তু ব্যবসায়িক কারণে ঋণের কিস্তি, কর্মীদের বেতন, কোনোটাই বন্ধ হয়নি। আমরা আবার শুরু করতে পারব, এমন বিশ্বাসে অনেক বিশ্বস্ত কর্মীদের রেখে দিই। আয় নেই, এদের বেতন, থাকা-খাওয়া, আলতাফের আয় বন্ধ, সব মিলিয়ে ঢাকা শহরে নিজেদের সার্ভাইব করা দুঃসহ হয়ে ওঠে। ঋণ শোধ করতে ঋণ করতে হয়েছে বহুবার। কত শত বন্ধু, স্বজনের কাছে ঋণের পাহাড় জমে গেছে। এমন অবস্থা দাঁড়িয়েছে, চোখ খুললে কেবল পাওনাদার দেখি। ক্যাটারিংটা খুব ধুঁকে ধুঁকে চলছে।’

অভিযোগগুলোর উৎস সংঘবদ্ধ অনলাইন ক্যাম্পেইন

২০২৫ সালের ১৮ অক্টোবর সন্ধ্যায় ঢাকার ধানমন্ডির একটি বাসা থেকে স্বর্ণময়ী বিশ্বাসের (২৬) ঝুলন্ত মরদেহ উদ্ধার করা হয়।

এ নিয়ে রাজধানীর শেরেবাংলা নগর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) ইমাউল হক বলেছেন, ওই নারীর পরিবারের লোকজন ঘরের দরজা ভেঙে তাকে উদ্ধার করে একটি বেসরকারি হাসপাতালে নিয়ে যান। পুলিশ ওই হাসপাতাল থেকে লাশ উদ্ধার করে সুরতহাল প্রতিবেদন তৈরি করে।

স্বর্ণময়ী বিশ্বাসের মৃত্যুর পর তার কর্মক্ষেত্র ঢাকা স্ট্রিমের একটি ঘটনা সামনে আসে। মৃত্যুর তিন মাস আগে ১৩ জুলাই স্বর্ণময়ীসহ ৭ জন নারী সহকর্মী ঢাকা স্ট্রিমের সম্পাদক বরাবর প্রতিষ্ঠানটির বাংলা কন্টেন্ট প্রধান আলতাফ শাহনেওয়াজের বিরুদ্ধে একটি লিখিত অভিযোগপত্র জমা দিয়েছিলেন। সেখানে আলতাফের বিরুদ্ধে যে ৯টি অভিযোগ করা হয়েছিল সেগুলো হলো: ‘নারী সহকর্মীদের সাথে অনুপযুক্ত আচরণ’, ‘অনুপযুক্ত শারীরিক ভাষা ব্যবহার’, ‘ফ্লার্টেশন’, ‘বুলিং’, ‘ব্যক্তিগত যৌন ইতিহাস জানতে চাওয়া’, ‘রাত ১২টার পর উপযুক্ত কারণ ছাড়া ফোন করা’, ‘অপ্রীতিকর মন্তব্য’, ‘কোনো কারণ ছাড়া নিউজরুমে ঝামেলা তৈরি করা’ এবং ‘প্রোফাইলিং’।

তবে সেই অভিযোগপত্রে আলতাফের বিরুদ্ধে নির্দিষ্ট কোনো ঘটনার উল্লেখ করা হয়নি, যেখানে উপরিউক্ত ৯টি অভিযোগের এক বা একাধিকটি সংঘটিত হয়েছিল।

স্বর্ণময়ী আত্মহত্যার পর এই অস্পষ্ট অভিযোগগুলো সামনে নিয়ে এসে ‘এই মৃত্যুর জন্য আলতাফ শাহনেওয়াজ ও ঢাকা স্ট্রিম কর্তৃপক্ষ দায়ী’ ফ্রেইম করে অনলাইনে একটি সংঘবদ্ধ ক্যাম্পেইন শুরু হয়। এই ক্যাম্পেইনের মাধ্যমে আলতাফের বিরুদ্ধে ১৩ জুলাই দায়ের করা অস্পষ্ট ৯টি অভিযোগকে অতিরঞ্জন করে আলতাফ ‘স্বর্ণময়ীর আত্মহত্যার জন্য দায়ী’, ‘আলতাফ রেপিস্ট’ ‘আলতাফের পরকীয়ার কারণে স্বর্ণময়ীর মৃত্যু’ ইত্যাদি বয়ানে প্রচার করা হয়েছে।

ক্যাম্পেইনের শুরুতে ভূমিকা রেখেছে ‘ঢাকা ওপেরা’ ও ‘মজদুর’ নামক দুটি ফেসবুক পেজ। ‘ঢাকা ওপেরা’য় স্বর্ণময়ীর মৃত্যুর পরের কয়েক দিনে এই আত্মহত্যার সঙ্গে আলতাফ শাহনেওয়াজের বিরুদ্ধে করা অভিযোগগুলোর সংযোগ স্থাপন করে অন্তত ১৪টি পোস্ট করা হয়েছে। আত্মহত্যার খবরটিও প্রথমে এই পেজেই প্রকাশ করা হয়। তারপর প্রকাশ করা হয় ‘মজদুর’-এ।

এরপর এই ক্যাম্পেইনে যোগ দেন কয়েকজন আওয়ামী লীগ অ্যাক্টিভিস্ট। তাদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলেন ডাল্টন সৌভাত হীরা, কাজী মামুন, আফসানা কিশোয়ার লোচন, মুনমুন শারমিন শামস। এ ছাড়া ফটোগ্রাফার সুদীপ্ত সালাম (যিনি ঢাকা ওপেরা পেজটি পরিচালনা করেন এবং একই সঙ্গে ‘চর্চা’ নামে একটি অনলাইন প্লাটফর্মের কর্মরত), সাংবাদিক নজরুল কবির, ইশরাত জাহান উর্মি, শুভজিত ভৌমিকসহ আরও বেশ কয়েকজন ব্যক্তি আত্মহত্যার সঙ্গে আলতাফ শাহনেওয়াজের বিরুদ্ধে দেওয়া অভিযোগের সংযোগের বিষয়টি হাইলাইট করে ফেসবুকে অ্যাক্টিভিজম করেছেন।

আওয়ামী লীগ অ্যাক্টিভিস্টরা এই ঘটনায় আলতাফকে স্বর্ণময়ীর আত্মহত্যার সঙ্গে আলতাফকে জড়িয়ে নানান ধরনের অসত্য তথ্য প্রচার করতে থাকেন। যেমন, ডাল্টন হীরা ১৯ অক্টোবরের এক পোস্টে দাবি করেন, আত্মহত্যার দুদিন আগে আলতাফ শাহনেওয়াজের বিরুদ্ধে “যৌন নিপীড়নের বিরুদ্ধে থানায় সাধারণ ডায়েরি করেন”। বাস্তবে স্বর্ণময়ী আলতাফের বিরুদ্ধে কোন সাধারণ ডায়েরি করেননি।

স্বর্ণময়ীর আত্মহত্যার ঘটনায় আওয়ামী লীগ অ্যাক্টিভিস্ট কাজী মামুন, সুদীপ্ত সরকার আলতাফকে ‘ধর্ষক’ ও ‘খুনি’ হিসেবে অভিহিত করে ক্যাম্পেইন করেছেন। কাজী মামুন এক পোস্টে অভিযোগ করে লিখেছেন, “২০২৪ সালের জুলাই আন্দোলনের পক্ষে তরুণ কবি সাহিত্যিকদের মাঠে নামাতে নয়নের ভূমিকা সবচেয়ে বেশি’।

bigStoryContent

২২ অক্টোবর অনির্বান অনিক নামক এক আওয়ামী অ্যাক্টিভিস্ট আলতাফের ছবি পোস্ট করে লিখেছেন, “রাজাকারের ভাগ্নি জামাই কোবি আলতাফ শাহনেওয়াজ ওরফে ধর্ষক নয়নকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক বানানোর প্রক্রিয়া প্রায় শেষ।’

bigStoryContent

এর মধ্যে কয়েকটি সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদনও ভূমিকা রাখে ‘স্বর্ণময়ী হত্যার দায় আলতাফ শাহনেওয়াজের’, এই বয়ান প্রতিষ্ঠার পেছনে।

২১ অক্টোবর একুশে টিভি একটি প্রতিবেদন প্রকাশ করে, যেটি ফেসবুকে পোস্ট করে ক্যাপশন দেওয়া হয়, ‘আত্মহত্যা নাকি প্রাতিষ্ঠানিক হত্যাকাণ্ড? স্বর্ণময়ীর মৃত্যুর নেপথ্যে কে?’ প্রতিবেদনে আত্মহত্যার পেছনে আলতাফ শাহনেওয়াজ ও ঢাকা স্ট্রিমকে পরোক্ষভাবে দায়ী করা হয়েছে।

এ ছাড়া ‘কেন এই পথ বেছে নিলেন স্বর্ণময়ী?’ শিরোনামে বিডিনিউজের এক প্রতিবেদনেও ঘটনার পেছনে আলতাফ শাহনেওয়াজের ভূমিকাকে হাইলাইট করা হয়েছে।

ক্যাম্পেইনে অভ্যন্তরীণ সমন্বয়

গত ২ এপ্রিল নিউজ ফরেনসিক (News Forensic) নামক একটি ফেসবুক পেজ থেকে হোয়াটসঅ্যাপ কথপোকথনের বেশ কিছু স্ক্রিনশট ফাঁস করা হয়। ফাঁস হওয়া স্ক্রিনশটগুলোতে দেখা যাচ্ছে, ঢাকা স্ট্রিমে কর্মরত শতাব্দিকা ঊর্মি, যিনি ১৩ জুলাই আলতাফ শাহনেওয়াজের বিরুদ্ধে ৯টি অভিযোগ দেওয়া নারীদের একজন, ঢাকা স্ট্রিমে কর্মরত সৈকত আমীনসহ তার পরিচিত বেশ কয়েকজন ব্যক্তির সঙ্গে স্বর্ণময়ীর আত্মহত্যা এবং তৎপরবর্তী বিষয়াবলি নিয়ে কথা বলছেন।

নিউজ ফরেনসিক কে বা কারা পরিচালনা করেন, সে বিষয়ে দ্য ডিসেন্ট নিশ্চিত হতে পারেনি এবং এসব স্ক্রিনশট কীভাবে সংগ্রহ করা হয়েছে, সে বিষয়ে কোনো তথ্য ফেসবুক পেজটি প্রকাশ করেনি।

শতাব্দিকা ঊর্মি দ্য ডিসেন্টকে জানিয়েছেন, তার হোয়াটসঅ্যাপ একাউন্ট সম্প্রতি হ্যাক হয়েছিল। সেই সময় এসব স্ক্রিনশট হ্যাকাররা সংগ্রহ করে থাকতে পারে। একই সঙ্গে ঊর্মি দাবি করেছেন, স্ক্রিনশটগুলোর কথাবার্তা কিছুটা এডিট করা হয়েছে।

তবে দ্য ডিসেন্ট ডিজিটাল ফরেনসিক বিশ্লেষণে ফাঁস হওয়া স্ক্রিনশটগুলোতে কোনো ধরনের ডিজিটাল পরিবর্তনের প্রমাণ পায়নি। যদিও স্ক্রিনশটগুলোর কথপোকথনের মধ্যে ধারাবাহিকতা নেই। বিচ্ছিন্নভাবে বিভিন্ন সময়ে বিভিন্নজনের সাথে নানান বিষয়ে ঊর্মির বক্তব্য উঠে এসেছে।

১৯ অক্টোবর রাত ১টা ১০ মিনিটে ‘ঢাকা ওপেরা’ নামক ফেসবুক পেজে প্রকাশিত স্বর্ণময়ীর আত্মহত্যার খবর (যেটির সঙ্গে আলতাফ শাহনেওয়াজের কথিত যৌন নিপীড়নের অভিযোগের সংযোগকে হাইলাইট করা হয়েছে) প্রকাশ করা হয়।

ফাঁস হওয়া একটি স্ক্রিনশটে দেখা যাচ্ছে, তার ৫ মিনিট পর রাত ১টা ১৫ মিনিটে ঢাকা স্ট্রিমে কর্মরত (৯ নভেম্বর তিনি দৈনিক প্রথম আলোতে যোগ দেন) সৈকত আমীন শতাব্দিকা ঊর্মিকে ‘ঢাকা ওপেরা’র পোস্টের লিংক পাঠিয়ে লিখেছেন, “প্রথমে আশেপাশে কিছু মানুষ দিয়ে শেয়ার দেওয়াও”।

জবাবে ১টা ২১ মিনিটে ঊর্মি লিখেছেন, ‘হ’।

এরপর সৈকত আমীন লিখেছেন, “অমর্ত্যকে দিয়ে শুরু করো।”, ঊর্মি এরপরে লিখেছেন, “বিথিরে বলেন। মজদুর (ফেসবুক পেইজ) ডিলিট করলো কেন?” সৈকত লিখেছেন, “আবার দিচ্ছে।”

মজদুর নামক ফেসবুক পেজ থেকে স্বর্ণময়ীকে নিয়ে একই রকম পোস্ট করা হয় রাত ১টা ৩৪ মিনিটে।

এই কথপোকথন থেকে স্পষ্ট যে, ঢাকা স্ট্রিমে কর্মরত থাকাবস্থায় সৈকত আমীন ও ঊর্মি প্রতিষ্ঠানটির বাইরের এমন ব্যক্তিদের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন, যারা স্বর্ণময়ীর আত্মহত্যার ঘটনার সঙ্গে আলতাফ শাহনেওয়াজের বিরুদ্ধে থাকা অভিযোগকে হাইলাইট করে প্রচার শুরু করেছেন।

ফাঁস হওয়া স্ক্রিনশটগুলোতে আরও দেখা গেছে, একই বিষয় ঊর্মি ঢাকা স্ট্রিমে কর্মরত এবং বাইরের আরও বেশ কয়েকজন ব্যক্তির সঙ্গে বিষয়টি নিয়ে আলাপ করেছেন। এর ঢাকা স্ট্রিমে কর্মরত একজন পুরুষ এমন মন্তব্যও করেছেন, “নয়নকে নির্লিপ্ত করতে হবে স্ট্রিম থেকে’। উল্লেখ্য, ‘নির্লিপ্ত নয়ন’ আলতাফ শাহনেওয়াজের ছদ্মনাম, যেটির অধীনে তিনি বিভিন্ন বিষয়ে লেখালেখি করে থাকেন।

সৈকত আমীনকে ঊর্মির সঙ্গে তার কথপোকথনের স্ক্রিনশটের বিষয়ে জিজ্ঞাসা করলে তিনি বলেন, ‘হোয়াটসঅ্যাপ চ্যাট রিয়েল নাকি আনরিয়েল, আমি সেই আলাপে যাব না। এটা সম্ভবত আমার এন্ড থেকেও হয়নি। আমি ডিসঅ্যাপিয়ারেন্স মুড চালু করে রাখি। আমি সবগুলো চ্যাট দেখিওনি।’

‘আমি ওই ঘটনা হুইসেলব্লো করেছিলাম। কারণ আমাদের একজন সহকর্মী মারা গেছেন, তার একটা অভিযোগ ছিল। তিন মাস হয়ে গেছে সেটার কোনো সুরাহা হয়নি। তার মৃত্যু আমাদের ট্রিগার করেছে। আমি ও আমাদের অন্য সহকর্মীরা এটা নিয়ে কথা বলেছি। আমরা কখনো দাবি করিনি আত্মহত্যার জন্য আলতাফ শাহনেওয়াজ দায়ী। এ রকম পারসেপশন যদি তৈরি হয়েও থাকে, আমরা সেটাকে সমর্থন করি না।’

‘ঢাকা ওপেরা’ নামক ফেসবুক পেজটির পরিচালনাকারী সুদীপ্ত সালাম তখন চর্চা নামক একটি অনলাইন প্লাটফর্মে কর্মরত ছিলেন এবং এখনো আছেন। 

চর্চার সম্পাদক সোহরাব হাসানের কাছে জানতে চাওয়া হয়েছিল, আপনাদের সংবাদমাধ্যমে চাকরিরত অবস্থায় আপনাদের সহকর্মী ‘সংবাদমাধ্যম’-এর আদলে আরেকটি ফেসবুক পেজ পরিচালনা করে, সেই পেজ থেকে তদন্ত ছাড়া আলতাফ শাহনেওয়াজকে একজনের আত্মহত্যার জন্য দায়ী হিসেবে প্রচার করার ব্যাপারটিকে কীভাবে দেখেন?

সোহরাব হাসান বলেছেন, ‘এ রকম করাটা আমি সঠিক মনে করি না। ওকে (সুদীপ্ত সালামকে) আমি ওই সময় নিষেধ করেছি এ রকম যেন না করে। এটা করা উচিত না।’

ক্যাম্পেইনের টার্গেট ঢাকা স্ট্রিম ও আলতাফের স্ত্রীর ব্যবসা প্রতিষ্ঠান

আওয়ামী অ্যাক্টিভিস্টদের ক্যাম্পেইনের লক্ষ্য শুধু আলতাফ শাহনেওয়াজ ছিলেন না। ৫ আগস্টের পর শুরু হওয়া অনলাইন সংবাদমাধ্যম ঢাকা স্ট্রিম  এবং আলতাফের স্ত্রীর ফাতেমা আবেদিন নাজলা পরিচালিত এন’স কিচেনকেও লক্ষ্যবস্তু বানানো হয় ক্যাম্পেইনে। ঢাকা স্ট্রিমকে ‘এনসিপির মালিকানাধীন মিডিয়া’ বলে প্রচার চালানো হয়। সম্পাদক ইফতেখার মাহমুদকেও ‘জুলাইপন্থী’ হিসেবে চিহ্নিত করা হয় অনেক পোস্টে। দাবি করা হয়, ঢাকা স্ট্রিমের মালিকানায় আছেন আলতাফ শাহনেওয়াজ। যদিও বাস্তবে প্রতিষ্ঠানটির মালিকদের মধ্যে আলতাফ কেউ নন।

কাজী মামুন ২১ অক্টোবর এক পোস্টে লিখেছেন, ‘নয়ন (আলতাফ শাহনেওয়াজের ডাকনাম) প্রথম আলো ছেড়ে দিয়েছেন। ঢাকা স্ট্রিম/ বাংলা স্ট্রিম নামে নতুন পত্রিকার শেয়ারহোল্ডার বা অন্যতম মালিক হয়েছেন। এই পত্রিকার সিংহভাগ শেয়ারের মালিক নতুন রাজনৈতিক দল এনসিপি। নয়নের স্ত্রী ফাতেমা আবেদীন নাজলা (রাজাকার কামারুজ্জামানের ভাগনি), অফিস-বাসায় খাবার সরবরাহের ব্যবসা করতেন। নাজলা’স কিচেন নামে। ৫ আগস্টের পর বাংলা একাডেমির ক্যান্টিন বরাদ্দ নেন। কোনো রকম টেন্ডার, কোটেশন বা জামানত ছাড়াই এই ক্যান্টিন পরিচালনা করছেন নাজলা।’

২০২৫ সালের ২৩ অক্টোবর বিকালে ধানমন্ডি ৬/এ তে অবস্থিত নাজলার পরিচালিত রেস্টুরেন্টে হামলা হয়। কয়েকটি মোটরসাইকেলে করে অজ্ঞাত পরিচয় ব্যক্তি এসে ইটপাটকেল মেরে চলে যায়। এরপর ওই দিন সন্ধ্যায় রেস্টুরেন্টের সামনে দাঁড়িয়ে একটি ফেসবুক পেজ থেকে ‘লাইভ’ করা হয় এবং সেই লাইভে দাবি করা হয়, এই রেস্টুরেন্টটি ‘একজন ধর্ষকের স্ত্রীর রেস্টুরেন্ট’। যদিও পরে লাইভটি ডিলিট করে দেওয়া হয়েছে।

ঝিনাইদহে আলতাফের গ্রামের বাড়ির ভিডিও করে ঠিকানা ফেসবুকে প্রচার করা হয়েছে। এস এম রবি নামে স্থানীয় ‘সাংবাদিক’ পরিচয় দেওয়া এক ব্যক্তি ২১ অক্টোবর একটি ভিডিও পোস্ট করেন। ভিডিওটির শুরুতে ভয়েসওভারে তিনি বলেছেন, ‘...আলতাফ শাহনেওয়াজ নয়ন তারই মিডিয়া হাউসের সহকর্মী স্বর্ণময়ী নামক একজন নারী, যাকে তিনি যৌন হয়রানি করেছেন এবং তার কারণে স্বর্ণময়ী আত্মহত্যা করেছেন বলে সংবাদ প্রকাশিত হয়েছে।’

এসব ঘটনা এবং অনলাইনে অব্যাহত হুমকির প্রেক্ষিতে অক্টোবর মাসেই ধানমন্ডিতে ওই রেস্টুরেন্টটি বন্ধ করে দিতে বাধ্য হন নাজলা। পাশাপাশি ধারাবাহিক ক্যাম্পেইনে কমে আসে তার অনলাইনে আসা অর্ডারের সংখ্যা।

দ্য ডিসেন্টকে নামজলা বলেন, ‘অনলাইন ক্যাম্পেইন শুরুর পর এন’স কিচেনে আসার অর্ডারের সংখ্যা ৬০ শতাংশ কমে গেছে।’

জিজ্ঞাসা করে নাজলা বলেন, ‘আওয়ামী লীগাররা শুধু আলতাফকে নয়, আমার পরিবারকে টার্গেট করেছে। অসত্য একটা অভিযোগ টেনে আমার পরিবারের ওপর নিয়ে এসে আমাদের ধ্বংস করে দিতে চায়। ১৯ অক্টোবর দুপুর থেকেই আমাকে ও আমার ব্যবসাকে টার্গেট করা শুরু হয়। আলতাফের বিরুদ্ধে কোনো অভিযোগ থাকলে সেটার যথাযথ বিচার করুন। আমাকে, আমার ব্যবসাকে সেখানে টানার কারণ কী?’ 

মামলার চূড়ান্ত রিপোর্ট স্বর্ণময়ীর সুইসাইড নোট : আত্মহত্যার কারণ মায়ের প্রতি অভিমান

স্বর্ণময়ীর আত্মহত্যার পরদিন ১৯ অক্টোবর তার ভাই সৌরভ বিশ্বাস রাজধানীর শেরেবাংলা নগর থানায় একটি অপমৃত্যুর মামলা করেন। সেখানে আত্মহত্যার পেছনে কাউকে দায়ী করা হয়নি। আলতাফ শাহনেওয়াজের বিরুদ্ধেও সেখানে কোনো অভিযোগ ছিল না পরিবারের।

গত ১৪ এপ্রিল এই মামলার চূড়ান্ত রিপোর্ট আদালতে জমা দিয়েছে পুলিশ। তদন্ত শেষে তদন্তকারী কর্মকর্তা লিখেছেন, ‘এই মৃত্যুর বিষয়ে মৃতের আত্মীয়-স্বজনের কোনো সন্দেহ না থাকায় আমি বিষয়টি ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের সহিত আলোচনা সাপেক্ষে অত্র অপমৃত্যু মামলাটির চূড়ান্ত রিপোর্ট বিজ্ঞ আদালতে দাখিল করিলাম।’

চূড়ান্ত রিপোর্টে আত্মহত্যার আগে স্বর্ণময়ীর নিজের হাতে লেখা সুইসাইড নোট উদ্ধারের কথা উল্লেখ করা হয়েছে। 

রিপোর্ট মতে, ‘জব্দকৃত আলামতের মধ্যে নোটবুকের দ্বিতীয় পাতায় ভিকটিমের স্বহস্তে লেখা পাওয়া যায়। যাহাতে লেখা আছে, “সবাই এটাই ভাবছে, “আমার হইতে এটা আশা করেনি”। মজার ব্যাপার হলো, আমি নিজেও আশা করিনি। কী লিখব বুঝতে পারছি না। মাথার মধ্যে শুধু অভিমান। আর অনেকগুলো প্রশ্নের উত্তর নেই কারও কাছে। চলে যাওয়ার প্ল্যান করেছি অনেকদিন আগে। মাঝে দাদাভাইয়ের বিয়ে বেঁধে গেল। এতো বাধার মধ্যে আমি বাধা হইতে চাইলাম না। তাই শেষবারের মতো তোমাদের একটু গুছিয়ে দিয়ে গেলাম। আমি না থাকলে তোমাদের দিব্যি চলবে। বরং আমি থাকলেই জ্বালা। আমি যাদের ওপর খুব ভরসা করেছিলাম, তারা খুব নড়বড়ে। কিন্তু আমি ভেবেছি শক্ত।”

স্বর্ণময়ী নোটে আরও লিখেছেন, ‘মা দাদাভাই ছাড়া কোনো দিন কিছু চিনলই না। মা আমার মুখের উপরই বলেন, তোমাকে নিয়ে আমি ভাবি না। আমার ছেলেকে নিয়ে যত চিন্তা।’ কেন? মা আমাকে নিয়ে শুধুমাত্র এটা ভাবে যে, আমার জন্য তার ঘাড়ে যেন কোনো দোষ না চাপে। মায়ের জগতে তার ছেলে বাপি আর মানুষ। ওই জগতে আমি কোথাও ছিলাম না। ছিলাম শুধু দায়িত্ব হয়ে। সবার দায়িত্ব।’

তবে এই নোটটি প্রাপ্তির কথা ঘটনার পর পরিবার বা পুলিশ কাউকে জানায়নি।

আলতাফ শাহনেওয়াজ বলছেন, ‘যখন আমার ও আমার পরিবারের বিরুদ্ধে মিডিয়া ট্রায়াল চলছিল, এই আত্মহত্যার পেছনে আমাকে দায়ী করা হচ্ছিল। তখন এই নোটটার কথা প্রকাশ করলে আমাকে এই দুঃসহ পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে যেতে হতো না।’

এখন কী বলছেন সেই অভিযোগকারীরা

১৩ জুলাই আলতাফ শাহনেওয়াজের বিরুদ্ধে লিখিতভাবে ৯টি অভিযোগ দিয়েছিলেন ঢাকা স্ট্রিমের সাতজন নারী কর্মী। তাদের মধ্যে আত্মহত্যাকারী স্বর্ণময়ী ছাড়া বাকি ছয়জনের কথা বলেছে দ্য ডিসেন্ট। জানতে চাওয়া হয়েছে ৯টি অভিযোগের মধ্যে তাদের কার কী অভিযোগ ছিল আলতাফের বিরুদ্ধে। তাদের মধ্যে দুজন কথা বলতে রাজি হননি।

তাদের একজন শতাব্দিকা ঊর্মিকে (যিনি বর্তমানে দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ড পত্রিকায় কাজ করছেন) জিজ্ঞেস করা হয়েছিল ৯টি অভিযোগের মধ্যে আপনার সঙ্গে কোন কোনটি ঘটেছে?

ঊর্মি বলেন, “বুলি করার অভিযোগটি আমার ছিল।’

কীভাবে বুলি করা হয়েছিল, সেটা জানতে চাইলে বলেন, ‘আমার ছেলে বন্ধু আত্মহত্যা করেছিল। সেটা নিয়ে আমার ট্রমা রয়েছে। সেই ট্রমা যেন ট্রিগার করে, আলতাফ শাহনেওয়াজ ইচ্ছা করে আমাকে নিউজ শেখানোর নাম করে সে ধরনের কন্টেন্ট পড়তে দিতেন।’

এ রকম নিউজ কতবার দিয়েছেন, তার আনুমানিক একটা সংখ্যা জানতে চাইলে ঊর্মি জানান, এমনটা একবার হয়েছিল।

আত্মহত্যার ট্রমা ট্রিগার করার মতো কী কন্টেন্ট পড়তে দিয়েছিলেন, তার জবাবে জানান, ‘উনি (আলতাফ) উনার বোনের আত্মহত্যা নিয়ে একটা লেখা লিখেছিলেন, সেটা আমাকে পড়তে দিয়েছিলেন।’

এ ছাড়া ঊর্মি দাবি করেন, ‘আলতাফ শাহনেওয়াজ তাকে মধ্যরাতে (রাত ১১-১২টার পর) ফোন দিয়েছিলেন। তবে ফোন দিয়ে ব্যক্তিগত কোনো কথা বলেননি, বরং কাজের কথাই বলেছিলেন।’

আলতাফের মোবাইল ফোনে ঊর্মির সঙ্গে কয়েক মাসের কথপোকথনের রেকর্ড যাচাই করে দেখেছে দ্য ডিসেন্ট। এতে দেখা গেছে, ১১ জুলাই (আলতাফের বিরুদ্ধে অভিযোগ দেওয়ার দুই দিন আগে) রাত ১টার কিছু আগে আলতাফ ঊর্মির হোয়াটসঅ্যাপে লেখেন, “আছো”? উত্তরে ঊর্মি লেখেন, “হ, ভাই”। এরপর আবারও কিছুক্ষণ পর আলতাফ “আছো” জিজ্ঞেস করলে ঊর্মি বলেন, “আছি, বলেন ভাইয়া”। এরপরই ঊর্মি নিজেই কল করে ৩ মিনিট কথা বলেন। এর বাইরে রাত ১২টার পর অন্য কোনো দিন কল করার রেকর্ড পাওয়া যায়নি।

ঊর্মি দ্য ডিসেন্টকে বলেন, ‘আলতাফ শাহনেওয়াজ ব্যক্তিগত প্রশ্ন করতেন। রাত ১২টায় ফোন দিয়ে বয়ফ্রেন্ডের সাথে কী চলতেছে, সেটা জিজ্ঞেস করতেন। প্রত্যেকটা নারী সহকর্মী একই অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে যাচ্ছিলেন। আমরা এগুলো নিজেদের মধ্যে আলাপ করি, দেখা যায় সবারই একই অভিজ্ঞতা। পরে আমরা লিখিত অভিযোগ দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিই। লিখিত অভিযোগ সম্পাদক খুব আন্তরিকভাবেই গ্রহণ করেন, তিনি আমাদের সাথে সহমর্মিতাও প্রকাশ করেন। পরে তাকে নিউজরুম থেকে সরিয়ে দেওয়া হয়।’

তিনি আরও বলেন, ‘কিন্তু নিউজরুম থেকে সরিয়ে বরং তাকে আরও এম্পাওয়ার করা হয়। এমন জায়গায় বসানো হয়, যেখানে তার পারমিশন ছাড়া কোনো নিউজ পাবলিশ হওয়া পসিবল ছিল না। আমাদের সঙ্গে তার সরাসরি ইন্টারেকশন না থাকলেও যেকোনো নিউজ পাবলিশ হতে হলে তার হাত ধরেই যেতে হতো। তবে নিউজরুম থেকে সরিয়ে দেওয়ার পর তার পার্সোনাল প্রশ্ন করা বন্ধ হইছিল। আমাদের তখনো সমস্য ছিল আমাদের তার সুপারভিশনেই কাজ করতে হচ্ছিল। স্বর্ণময়ীও তার বিরুদ্ধে দুর্ব্যবহারের কথা বলত, কাজ নিয়ে নেগেটিভ রিভিউ দেওয়ার কথা বলত। স্বর্ণর সরাসরি বস যিনি, তিনি কিছু না বললেও আলতাফ শাহনেওয়াজ তার কাজ নিয়ে দোষ ধরত।’

‘এখন তার (স্বর্ণময়ী) সুইসাইডের পেছনে যে কেবল আলতাফ শাহনেওয়াজই দায়ী এটা কেউ বলতে পারবে না। তার পারিবারিক সমস্যা ছিল, রিলেশনশিপের সমস্যার কথাও শুনেছি। এখন কোনটা আসল কারণ তা তো কেউ বলতে পারবে না। আমিও দাবি করিনি। আমার শুধু অভিযোগ এটাই ছিল যে, তার বিরুদ্ধে একটা অভিযোগ দেওয়া হয়েছে, তিন মাস হয়েছে, অভিযোগকারী একটা মেয়ে আত্মহত্যাও করল কিন্তু এরমধ্যে অভিযোগের কোনো সুরাহা হলো না। এই ঘটনায় অফিসের বাইরের লোকজন কেন যুক্ত হয়েছে, সে ব্যাপারে আমার কোনো ধারণা নেই,’ বলেন শতাব্দিকা ঊর্মি।

নিউজ ফরেনসিক নামক ফেসবুক পেজে নিজের হোয়াটসঅ্যাপ কথপোকথন ফাঁস হওয়ার বিষয়ে প্রশ্ন করলে ঊর্মি জানান তার একাউন্ট হ্যাক হওয়ার বিষয়টি তিনি বুঝতে পেরেছিলেন।

‘আইডি হ্যাক হয়েছে, তবে যেসব টেক্সট ছড়ানো হয়েছে সেগুলো চ্যাটে ঢুকে ইচ্ছেমতো এডিট করে স্ক্রিনশট নেওয়া হয়েছে। বহু আগের চ্যাটের স্ক্রিনশটও তারা নিয়েছে। আমার মৃত বন্ধুর সাথে কী চ্যাট হয়েছে, সেগুলোও ছড়িয়েছে। আমি অনিরাপদবোধ করছি। আমার প্রাইভেসির তো আর কোনো কিছু থাকল না’, বলেছেন ঊর্মি।

আরেক অভিযোগকারী নারী সাংবাদিক তৃষা। ৯টি অভিযোগের মধ্যে কোন কোন অভিযোগ তার ছিল, জানতে চাইলে তিনি এক হোয়াটসঅ্যাপ বার্তায় বলেন, ‘আমার অভিযোগ ছিল তিনি নিউজরুমে সমস্যা তৈরি করতেন। তিনি আমাকে তুচ্ছ প্রশ্ন করতেন, বিশেষ করে সহকর্মীদের ব্যাপারে। এ ছাড়া সবার সাথে উনার আচরণ ছিল খুবই রুক্ষ। তিনি অফিসে একটা বিষাক্ত পরিবেশ তৈরি করেছিলেন।‘

ঢাকা স্ট্রিমের আরেকজন অভিযোগকারী নারী সাংবাদিক মোরসালিনা আনিকা। তার সঙ্গে গত ১১ এপ্রিল যোগাযোগ করার চেষ্টা করলে তার নম্বরটি অকার্যকর পাওয়া যায়, তবে একই নম্বরে হোয়াটসঅ্যাপে কল দিলে তিনি রিসিভ করেন।

অভিযোগের ব্যাপারে জানতে চাইলে তিনি বিস্তারিত কথা বলতে রাজি হননি। তবে বলেন, ‘আমরা যে অভিযোগ দিয়েছি, সেটার সমাধান হয়েছে। এটা যেহেতু আমাদের অফিসের ইন্টারনাল বিষয় ছিল এবং এটার সমাধান হয়েছে তাই আমি অফিসের অনুমোদন ছাড়া এই বিষয়ে কথা বলতে পারবো না।’ 

কী সমাধান হয়েছে, জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘আলতাফ শাহনেওয়াজ আর আমাদের সাথে যুক্ত নাই। তার ব্যাপারে ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। আমাদের সমস্যার সমাধান না হলে তো আর আমি এই অফিসে থাকতাম না। সমাধান হয়েছে বলেই আছি।’

আরেক অভিযোগকারী ফারিহা নওশিন, যিনি এখন আর ঢাকা স্ট্রিমে কাজ করছেন না, তিনি দ্য ডিসেন্টকে বলেন, ‘আমি উনাকে সরাসরি কাউকে যৌন নিপীড়ন করেছেন বা অশালীন আচরণ করেছেন, এমনটা দেখিনি বা শুনিনি। তবে একটা ব্যাপার বলতে পারি, উনার নজর কখনো ভালো ছিল না। যেটা আমি অভিযোগ দেওয়ার সময় মৌখিকভাবে বলেছি। তবে উনি যা-ই করেছেন, তার যথেষ্ট শাস্তি ইতিমধ্যে হয়ে গেছে। বরং বেশিই হয়েছে। উনার ফ্যামিলির সাথে যা ঘটেছে, আমি মনে করি সেটা অমানবিক।’

আরেক অভিযোগকারী নুসরাত তায়েবা মীম বলেন, ‘তখন আমার চাকরির বয়স ছিল মাত্র দুদিন। তিনি আমার সাথে কথা বলেন এবং আমার পরিবার, পড়াশোনা ইত্যাদি জানতে চান এবং আমার রিলেশনশিপ হিস্টরি জানতে চান। এটা আমার কাছে অস্বস্তিকর ছিল।’

ঢাকা স্ট্রিমের অফিসে বসে এই নারী সাংবাদিকের সঙ্গে যখন কথা হয়, তখন সেখানে আরও দুজন নারী সহকর্মী উপস্থিত ছিলেন। তারা জানান, আলতাফ শাহনেওয়াজ পুরুষ সহকর্মীদেরও এই ধরনের ব্যক্তিগত প্রশ্ন করতেন।

অভিযোগকারী নারী সাংবাদিক শিশির রায় বলেন, ‘উনি খুবই ডমিনেটিং ছিলেন। এটা নারী-পুরুষ সবার ক্ষেত্রেই। উনি সহকর্মীদের ‘তুই’ বলে সম্বোধন করতেন। নেগেটিভ রিভিউ দিতেন, যেমন তুমি তো কাজ করতে পারছ না, হচ্ছে না কিছু, তোমাকে দিয়ে হবে না। নিউজরুমে উচ্চস্বরে কথা বলতেন।’

৯টি অভিযোগের মধ্যে একটি অভিযোগ ছিল নারী সহকর্মীদের প্রতি অনুপযুক্ত শারীরিক ভাষা ব্যবহার করা। এই অভিযোগের ব্যাপারে শিশির রায় ব্যাখ্যা দেন, ‘এটা উনার শারীরিক অস্বাভাবিকতার কারণেও হতে পারে। উনার তো একটু শারীরিক অস্বাভাবিকতা (প্রতিবন্ধকতা) রয়েছে। উনি যখন কথা বলেন, তখন আসলে কার দিকে তাকিয়ে কথা বলেন, সেটা তো সব সময় বোঝা যায় না। এ ছাড়া উনি যেকোনো কিছু বললে সেটা তীব্রভাবে বলেন। এসব কারণে এমন মনে হতে পারে।’

আরেকটি অভিযোগ ছিল ‘প্রোফাইলিং’। এ ব্যাপারে জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘এটা নেগেটিভ রিভিউর মতোই। মানে তোমাকে দিয়ে হবে না, হচ্ছে না, এ রকম।’

শিশির রায় জানান, আলতাফ শাহনেওয়াজ তাকে এক দিন রাত সাড়ে ১১টায় কল দিয়েছিলেন, তবে তখন কাজ সংক্রান্ত বিষয়েই কথা বলেছিলেন।

যা বলছে স্বর্ণময়ীর পরিবার

আত্মহত্যার ক্ষেত্রে আলতাফ শাহনেওয়াজের কোনো ভূমিকা ছিল কি না, জানতে চাইলে স্বর্ণময়ী বিশ্বাসের ভাই সৌরভ বিশ্বাস বলেন, ‘আমরা এ রকমটা মনে করি না। উনার বিরুদ্ধে আমরা তখনো কোনো অভিযোগ করিনি, এখনো কোনো অভিযোগ নেই। স্বর্ণ খুব ওপেন ছিল। আলতাফের বিরুদ্ধে যেসব অভিযোগের কথা সামাজিক মাধ্যমে বলা হচ্ছে, এগুলা নিয়ে সে (স্বর্ণময়ী) কখনো কিছু বলেনি। টু বি অনেস্ট, আমরা আসলেই জানি না কোন সোর্সে এসব কথা ছড়ানো হয়েছিল।’

আত্মহত্যার ব্যাপারে আলতাফ শাহনেওয়াজ বা অফিসের কোনো বিষয় ভূমিকা রেখেছিল কি না, জানতে চাইলে স্বর্ণময়ী বিশ্বাসের মামাতো ভাই পার্থ ধর বলেন, ‘এটা বলার সুযোগ নাই। আমরা এ রকম কোনো কিছু শুনিনি। মানুষ যখন সুইসাইড করে, সেখানে নানা কারণ থাকতে পারে। ফ্যামিলি প্রবলেম থাকতে পারে, ব্যক্তিগত ব্যাপার থাকতে পারে, অফিসের বিষয়ও থাকতে পারে। কিন্তু ও আমার সমবয়স্ক। ওর সাথে আমার কথা হতো, কিন্তু সে এ রকম কোনো কিছু বলেনি।’

ঢাকা স্ট্রিম কর্তৃপক্ষের বিরুদ্ধে অভিযোগ কী

১৩ জুলাই ঢাকা স্ট্রিমের প্রধান সম্পাদক ইফতেখার মাহমুদের কাছে স্বর্ণময়ীসহ সাতজন নারী সাংবাদিক অভিযোগ দেন। এর তিন মাস পর ১৮ অক্টোবর স্বর্ণময়ীর আত্মহত্যার পরপর সামাজিক মাধ্যমে অভিযোগকারী শতাব্দিকা ঊর্মি, একই সংবাদমাধ্যমে কর্মরত সৈকত আমীনসহ আরও অনেকে প্রশ্ন তোলেন, গত তিন মাসে সাত নারীর অভিযোগের বিষয়ে আনুষ্ঠানিক কোনো সুরাহা কেন করেনি ঢাকা স্ট্রিম কর্তৃপক্ষ?

দ্য ডিসেন্টেরর কাছে একই অভিযোগ করেছেন আলতাফ শাহনেওয়াজ। তিনি বলেন, ‘আমার বিরুদ্ধে অফিসের কয়েকজন ঐক্যবদ্ধ হয়ে মব করে একটা অভিযোগ করে। তাদের তোপের মুখে ওই দিন আমাকে নিউজরুমের দায়িত্ব থেকে অব্যাহতি দেওয়া হয়। কিন্তু আমার কোনো বক্তব্য শোনা হয়নি। কোনো আনুষ্ঠানিক তদন্ত না করে আমাকে দায়ী করা হয়। এরপর একাধিকবার আমি তদন্ত কমিটি করার কথা বললেও কর্তৃপক্ষ তা করেনি।’

তবে সম্পাদক ইফতেখার মাহমুদ দ্য ডিসেন্টকে বলেছেন, ‘ঘটনার দিনই একটা সালিসির মাধ্যমে বিষয়টির সুরাহা করা হয়। বেশ কয়েকজন সহকর্মী অভিযোগ করায় তাদের দাবির প্রেক্ষিতে আমরা আলতাফকে নিউজরুম থেকে উইথড্র করি। এতে সবাই সন্তুষ্ট হয়ে কাজে ফিরে যায়। এ নিয়ে আর কেউ কোনো অভিযোগ পরবর্তীতে করেনি।’

‘অভিযোগ দেওয়ার দিন আমি তাদের জিজ্ঞেস করি, আপনারা কী চান? আলতাফকে উইথড্র করব নিউজরুম থেকে নাকি চাকরিচ্যুতি? তারা বলেন, উনাকে নিউজরুমে চাই না। উনি দুর্ব্যবহার করেন। আমরা সাথে সাথে তাকে নিউজরুম থেকে সরিয়ে নিই। সবাই এতে খুশি হয়ে কাজে ফিরে যায়,’ বলেন ইফতেখার।

তিনি আরও বলেন, ‘কিন্তু স্বর্ণের মৃত্যুর পরদিন থেকে কেউ না জেনে এবং কেউ কেউ জেনে-বুঝে সামাজিক মাধ্যমে ছড়াতে থাকেন যে ঢাকা স্ট্রিম ঘটনার কোনো সুরাহা করেনি। এটা মোটেও সত্য নয়।’

তিনি আরও দাবি করে বলেন, ‘পরে ঘটনাটি আরও তদন্তের জন্য দুই সদস্যের কমিটি গঠন করা হয়। ওই কমিটি তদন্ত করে আলতাফের বিরুদ্ধে কোনো যৌন হয়রানির প্রমাণ না পেলেও সহকর্মীদের সঙ্গে দুর্ব্যবহারের কিছু প্রমাণ পায়। এতে আগের সিদ্ধান্ত মোতাবেক তাকে নিউজরুমের বাইরে রাখা হয় এবং মৌখিকভাবে সতর্ক করা হয়।’

‘আমাদের প্রতিষ্ঠান তখন কোনো আইনি কাঠামোতে ছিল না। আমরা রেজিস্ট্রেশন প্রক্রিয়ার মধ্যে ছিলাম। ফলে কোর্টের নির্দেশনা মোতাবেক তদন্ত করে যথাযথ ব্যবস্থা নেওয়ার মতো অবস্থায় আমরা ছিলাম না।’

স্বর্ণময়ীর আত্মহত্যার ঘটনার পর প্রতিষ্ঠান আকারে ঢাকা স্ট্রিমকে টার্গেট করে ক্যাম্পেইন চালানো হয়েছে বলে অভিযোগ করেন ইফতেখার।

আলতাফ শাহনেওয়াজ তার বিরুদ্ধে আনা ১৩ জুলাইয়ের অভিযোগগুলোকে ‘অসত্য ও ভিত্তিহীন’ অভিহিত করে বলেন, ‘স্বর্ণময়ীর আত্মহত্যা বা কোনো নারী সহকর্মীকে ‘নিপীড়ন’ বা ‘যৌন নিপীড়ন’-এর সঙ্গে আমার বিন্দু পরিমাণও সংশ্লিষ্টতা নেই, আমি নির্দোষ।’

দ্য ডিসেন্টকে দেওয়া এক লিখিত বক্তব্যে আলতাফ বলেছেন, ‘সমাজিক যোগাযোগমাধ্যমে  আমার বিরুদ্ধে কথিত ‘যৌন নিপীড়ন’-এর যে অভিযোগ তোলা হয়; এবং অনলাইন মবের মাধ্যমে সংঘবদ্ধভাবে আমার ও আমার পরিবারের ওপর যে সাঁড়াশি আক্রমণ করা হয়, তা যেমন ছিল রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত, তেমনি এ ব্যাপারে ‘ঢাকা স্ট্রিম’-এর এডিটর-ইন-চিফ গোলাম ইফতেখার মাহমুদসহ কতৃপক্ষের উদ্দেশ্যমূলক নীরবতা, তদন্তে গড়িমসি এবং প্রতিষ্ঠানের দোহাই দিয়ে আমাকে চুপ করিয়ে রাখার কারণে আমি সামাজিক, আর্থিক ও মানসিকভাবে চরম ক্ষতির মুখে পড়েছি। ক্ষুণ্ণ হয়েছে আমার এত দিনের পেশাদারি ও সামাজিক সুনাম।”

“আমি নিজে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বারবার প্রমাণ চাওয়ার পরও কেউ কোনো প্রমাণ দেননি। তা ছাড়া, স্বর্ণময়ীর আত্মহত্যার পর তাঁর পরিবারের পক্ষ থেকে যে অপমৃত্যু মামলা হয়, তাতেও আমার বিরুদ্ধে কোনো অভিযোগ নেই। এখন মামলার চূড়ান্ত রিপোর্টের মাধ্যমে প্রমাণিত হলো আমার বক্তব্য সত্য ছিল এবং আমার বিরুদ্ধে করা অভিযোগগুলো বানোয়াট ছিল।”

তিনি আরও বলেছেন, “তবে ‘ঢাকা স্ট্রিম’-এ কাজ করার সময় চরমভাবে অফিস পলিটিক্স ও ষড়যন্ত্রের শিকার হয়েছি আমি। ‘স্ট্রিম’-এর ভেতর থেকে প্রথমে ষড়যন্ত্র করে অমার বিরুদ্ধে ইস্যু তৈরি করা হয়। ১৩ জুলাই ২০২৫ তারিখে অকস্মাৎ একরকম মব করার পর ‘ঢাকা স্ট্রিম’-এর এডিটর-ইন-চিফ ইফতেখার মাহমুদের উপস্থিতিতে অভিযোগপত্রটি তৈরি করা হয়। পরে এডিটর-ইন-চিফ ইস্যুটি জিইয়ে রাখায় আত্মহত্যার ঘটনার পর একটি পক্ষ সেটিকে রাজনৈতিকভাবে ব্যবহারের সুযোগ পায়। ফলে রাজনৈতিক প্রতিহিংসাবশত আমি ও আমার গোটা পরিবার ভয়াবহ মিডিয়া ট্রায়ালের শিকার হই। কারণ, মুক্তিযুদ্ধের আর্দশ মেনে যেকোনো ধরনের কতৃত্ববাদী রাজনীতি ও দীর্ঘ দিন ধরে চলা নিপীড়নের বিরুদ্ধে আমি সব সময় সরব ছিলাম। চব্বিশের জুলাইয়ে নিরপরাধ মানুষ হত্যার প্রতিবাদসহ মানুষের অধিকারের পক্ষে কথা বলেছিলাম।”

“স্বর্ণময়ীর আত্মহত্যার ঘটনাকে পুঁজি করে অনলাইনে আমার স্ত্রীর ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান বয়কটের ডাক দেওয়া হয়। মব করে ধ্বংস করা হয় তাঁর ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান। তা ছাড়া, তাঁর ওপর চালানো হয় ভয়ংকর স্লাট শেমিং, যা এখনো চলমান। এই সংঘবদ্ধ অনলাইন মবের হাত থেকে বাঁচতে পারেনি আমার তিন বছর বয়সী মেয়েও। তার ছবি বিভিন্ন অ্যাডাল্ট পেজে ছড়িয়ে দেওয়া হয়েছে। অথচ আমার বিরুদ্ধে যে অভিযোগ, তার সঙ্গে তাদের কোনো ধরনের সংশ্লিষ্টতা নেই।”

আলতাফ বলেছেন, “সব মিলিয়ে একটি আত্মহত্যাকে পুঁজি করে আমার ও আমার পরিবারের ওপর চলে চরম নিপীড়ন। এ সময় আমার তৎকালীন কর্মস্থল ‘ঢাকা স্ট্রিম’ এবং আমার বিরুদ্ধে অসংখ্য গুজব ও মিথ্যা তথ্য ছড়ানো হয়েছে।”

তিনি বলেন, “সচেতনভাবে অমি কখনো নারী-পুরুষ কোনো সহকর্মীর সঙ্গেই অশোভন আচরণ করিনি। অনলাইন-গণমাধ্যমে কাজ করার ক্ষেত্রে সময় খুব গুরুত্বপূর্ণ। নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে এখানে কাজ শেষ করার বাধ্যবাধকতা থাকে। কাজের পদ্ধতি এমন হওয়ার দরুণ কখনো এটি হয়ে থাকতে পারে যে কোনো প্রতিবেদন, লেখা বা কাজ কারও নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে দেওয়ার কথা, কিন্তু যুক্তিযুক্ত কারণ ছাড়া সময় পার হওয়ার পরও তিনি তা দিচ্ছেন না, একাধিকবার তাগাদার পরেও দিচ্ছেন না। এ পরিস্থিতিতে দায়িত্ব পালনের স্বার্থে কখনো কারও সঙ্গে স্বাভাবিকের চেয়ে উচ্চস্বরে কথা বলে থাকতে পারি। তবে তা পরিস্থিতির প্রয়োজনে। এর বাইরে যেসব অভিযোগ করা হয়েছে সেগুলো অসত্য এবং অতিরঞ্জিত।”