logo
Advertisement

বাংলাদেশি খলিলুরের সভাপতিত্বে জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের ৮১তম অধিবেশন শুরু

বাংলাদেশি খলিলুরের সভাপতিত্বে জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের ৮১তম অধিবেশন শুরু
অধিবেশনের ৮১তম সভার উদ্বোধন করেন খলিলুর রহমান, (বাঁয়ে) জাতিসংঘ মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেস ও (ডানে) আন্ডার সেক্রেটারি জেনারেল মভসেস আবেলিয়ান। ছবি: জাতিসংঘের ওয়েবসাইট থেকে নেওয়া

জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের ৮১তম অধিবেশন শুরু হয়েছে। মঙ্গলবার (৮ সেপ্টেম্বর) নিউইয়র্কে জাতিসংঘ সদর দপ্তরের সাধারণ পরিষদ হলে প্রথম পূর্ণাঙ্গ বৈঠকের মধ্য দিয়ে আনুষ্ঠানিকভাবে অধিবেশনের কার্যক্রম শুরু হয়।

এবারের অধিবেশনে সভাপতিত্ব করছেন বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ও অভিজ্ঞ কূটনীতিক ড. খলিলুর রহমান। বৈঠকে সভাপতির আসনে বসে অধিবেশনের কার্যক্রম উদ্বোধন করেন খলিলুর রহমান। তার বাঁ পাশে ছিলেন জাতিসংঘ মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেস এবং ডান পাশে ছিলেন সাধারণ পরিষদ ও সম্মেলন ব্যবস্থাপনাবিষয়ক জাতিসংঘের আন্ডার সেক্রেটারি জেনারেল মভসেস আবেলিয়ান।

বৈঠকের শুরুতে উপস্থিত প্রতিনিধিরা দাঁড়িয়ে এক মুহূর্ত নীরবতা পালন করেন। এরপর উদ্বোধনী বক্তব্য দেন জাতিসংঘ মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেস।

এবারের অধিবেষণে প্রতিপাদ্য ‘আস্থা পুনঃপ্রতিষ্ঠা, রূপান্তর ব্যবস্থাপনা: সবার জন্য কার্যকর জাতিসংঘ’।

৮ সেপ্টেম্বর অধিবেশনের উদ্বোধনী বক্তব্যে খলিলুর রহমান জাতিসংঘের প্রতি আস্থা পুনরুজ্জীবিত করতে নিরলসভাবে কাজ করার অঙ্গীকার করেন। তার মতে, সদস্য রাষ্ট্রগুলোর সম্মিলিত উদ্যোগ সফল করার ক্ষেত্রে এই প্রতিষ্ঠানের প্রতি আস্থা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

সভায় ছয়টি কর্মপরিকল্পনা নির্ধারণ করা হয়েছে—নিরাপত্তা ও ন্যায়বিচার; টেকসই উন্নয়ন; পৃথিবী ও জলবায়ু; অধিকার ও সুরক্ষা; ডিজিটাল প্রযুক্তি ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তায় অন্তর্ভুক্তিমূলক অগ্রগতি; এবং জাতিসংঘ ও বহুপাক্ষিক ব্যবস্থাকে আরও কার্যকর করে তোলা।

যেভাবে সভাপতি খলিলুর রহমান

নিউইয়র্কে জাতিসংঘ সদর দপ্তরে চলতি বছরের ২ জুন জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের ৮১তম অধিবেশনের সভাপতি নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। সাধারণ পরিষদের কার্যপ্রণালির ৩০ নম্বর বিধি অনুসারে এই নির্বাচন হয়। আঞ্চলিক পালাক্রম বা আবর্তন নীতি অনুযায়ী, এবার সভাপতি নির্বাচনের সুযোগ ছিল এশিয়া-প্যাসিফিক অঞ্চলের। ভোটাভুটিতে ৯৯ ভোট পেয়ে বাংলাদেশের খলিলুর রহমান সাধারণ পরিষদের ৮১তম অধিবেশনের সভাপতি নির্বাচিত হন।

নির্বাচিত হওয়ার পর দেওয়া বক্তব্যে খলিলুর রহমান সদস্য রাষ্ট্রগুলোর মধ্যে আস্থা পুনর্গঠন, ঐকমত্য সৃষ্টি এবং আন্তরিক আলোচনার সুযোগ তৈরিতে কাজ করার অঙ্গীকার করেন।

তিনি বলেন, তিনি সব সদস্য রাষ্ট্রের সভাপতি হিসেবে কাজ করবেন এবং মতপার্থক্য উপেক্ষা না করেই অভিন্ন অবস্থান খুঁজে বের করার চেষ্টা করবেন।

খলিলুর রহমানের পরিচয়

ড. খলিলুর রহমান বর্তমানে বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী। ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে পররাষ্ট্রমন্ত্রী হওয়ার আগে তিনি বাংলাদেশের অন্তর্বর্তী সরকারের জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা এবং রোহিঙ্গাবিষয়ক হাই রিপ্রেজেন্টেটিভ হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন।

তার কূটনৈতিক ও জাতিসংঘের কর্মজীবন কয়েক দশকের। ১৯৭৯ সালে বাংলাদেশের কূটনৈতিক সার্ভিসে যোগ দেন তিনি। বাংলাদেশের প্রথম নিয়মিত সিভিল সার্ভিস পরীক্ষায় প্রথম স্থান অর্জন করেছিলেন।

খলিলুর রহমান পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের পাশাপাশি নিউইয়র্কে জাতিসংঘে বাংলাদেশের স্থায়ী মিশনেও তিনি দায়িত্ব পালন করেন। সাধারণ পরিষদের অর্থনৈতিক ও আর্থিক কমিটিতে বাংলাদেশের প্রতিনিধিত্ব এবং স্বল্পোন্নত দেশগুলোর গ্রুপের মুখপাত্র হিসেবেও দায়িত্ব পালনের অভিজ্ঞতা রয়েছে তার।

খলিলুর রহমান অনেক আগে থেকেই জাতিসংঘের সঙ্গে কাজ করছেন। ১৯৯১ সাল তিনি জেনেভায় জাতিসংঘের বাণিজ্য ও উন্নয়ন সংস্থায় বিশেষ উপদেষ্টা হিসেবে কাজ শুরু করেন। পরবর্তী প্রায় ২৫ বছর নিউইয়র্ক ও জেনেভায় জাতিসংঘের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ ও জ্যেষ্ঠ পদে দায়িত্ব পালন করেন। সব মিলিয়ে জাতিসংঘে তার তিন দশকের বেশি কাজের অভিজ্ঞতা রয়েছে।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রথম, হার্ভার্ড ও টাফটসে উচ্চশিক্ষা

খলিলুর রহমানের শিক্ষাজীবনও উল্লেখযোগ্য। ১৯৭৭ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে অর্থনীতিতে এমএ পরীক্ষায় প্রথম শ্রেণিতে প্রথম হন তিনি। পরে যুক্তরাষ্ট্রের টাফটস বিশ্ববিদ্যালয়ের ফ্লেচার স্কুল অব ল অ্যান্ড ডিপ্লোমেসি এবং হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের কেনেডি স্কুল অব গভর্নমেন্টে পড়াশোনা করেন। তিনি ‘ল অ্যান্ড ডিপ্লোমেসি’তে এমএ এবং অর্থনীতিতে পিএইচডি ডিগ্রি অর্জন করেন। ঢাকার ইস্ট ওয়েস্ট ইউনিভার্সিটির প্রতিষ্ঠাতাদের একজনও তিনি এবং বিশ্ববিদ্যালয়টির বোর্ড অব ট্রাস্টিজে দায়িত্ব পালন করেছেন।

আন্তর্জাতিক বাণিজ্যনীতি নিয়েও দীর্ঘদিন কাজ করেছেন খলিলুর রহমান। জাতিসংঘের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ প্রকাশনা এবং বাণিজ্য, অর্থায়ন ও উন্নয়নবিষয়ক জাতিসংঘ মহাসচিব ও আঙ্কটাড মহাসচিবের বিভিন্ন প্রতিবেদনে লেখক বা অবদানকারী হিসেবে যুক্ত ছিলেন তিনি।

এক বছর চলবে ৮১তম অধিবেশন

জাতিসংঘের তথ্য অনুযায়ী, সাধারণ পরিষদের ৮১তম নিয়মিত অধিবেশন ২০২৬ সালের ৮ সেপ্টেম্বর শুরু হয়েছে এবং এটি ২০২৭ সালের ৭ সেপ্টেম্বর শেষ হওয়ার কথা। সাধারণ পরিষদের নিয়মিত অধিবেশনের মূল কার্যক্রম সাধারণত সেপ্টেম্বর থেকে ডিসেম্বর পর্যন্ত চলে। এরপর জানুয়ারি থেকে প্রয়োজন অনুযায়ী বিভিন্ন এজেন্ডা নিয়ে সভা ও কার্যক্রম অব্যাহত থাকে।

জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদ সংস্থাটির অন্যতম প্রধান নীতিনির্ধারণী অঙ্গ। বিশ্বের বিভিন্ন সংকট, শান্তি ও নিরাপত্তা, উন্নয়ন, মানবাধিকার, জলবায়ু পরিবর্তন এবং আন্তর্জাতিক সহযোগিতার গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলো এখানে সদস্য রাষ্ট্রগুলোর আলোচনায় উঠে আসে।

বিশ্বজুড়ে যুদ্ধ ও সংঘাত, ক্রমবর্ধমান বৈষম্য, জলবায়ু সংকট, আন্তর্জাতিক ব্যবস্থার প্রতি আস্থার ঘাটতি এবং ঘৃণা ও বিভ্রান্তিকর তথ্যে পরিপূর্ণ তথ্যব্যবস্থার মতো চ্যালেঞ্জের মধ্যে এবারের অধিবেশন শুরু হয়েছে বলে খলিলুর রহমানের সভাপতির কার্যালয়ের নীতিগত বিবৃতিতে উল্লেখ করা হয়েছে।

ফলে বাংলাদেশের একজন কূটনীতিকের নেতৃত্বে জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের এবারের অধিবেশন বাংলাদেশের জন্য যেমন গুরুত্বপূর্ণ, তেমনি বহুপাক্ষিক কূটনীতি, উন্নয়নশীল দেশগুলোর স্বার্থ এবং জাতিসংঘের সংস্কার প্রশ্নেও খলিলুর রহমানের এক বছরের সভাপতিত্ব বিশেষভাবে নজরে থাকবে।