জিসানের নির্দেশে পলাশকে গুলি, মিশনে নামা ৬ জনের পরিচয় প্রকাশ

রাজধানীর রামপুরায় শীর্ষ সন্ত্রাসী ইয়াসিন খান পলাশ ওরফে ‘কাইল্যা’ পলাশকে গুলি করে হত্যার নির্দেশ দিয়েছে আরেক শীর্ষ সন্ত্রাসী জিসান। অপরাধ জগতে নিজের অবস্থান অটুট রাখতে পলাশকে চিরতরে সরিয়ে দিতে একটি কিলিং মিশনের পরিকল্পনা করা হয়। পরিকল্পনা অনুসারে শুটারসহ এই মিশনে অংশ নেয় ছয় ব্যক্তি। তাদের মধ্যে চারজন জিসানের অত্যন্ত ঘনিষ্ঠ। ঘটনার আগে তারা এলাকা রেকি করে মসজিদে পলাশ থাকার বিষয়টি নিশ্চিত করে। তাদের সংকেত পেয়ে ভাড়া করা দুই শুটার পলাশকে গুলি করে বলে গোয়েন্দা পুলিশের অনুসন্ধানে উঠে আসে।
ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) উপ-পুলিশ কমিশনার জিয়া উদ্দিন আহম্মেদ এশিয়া পোস্টকে বলেন, পলাশকে হত্যার উদ্দেশ্যে গুলি করার ঘটনা তদন্ত করে দেখা হচ্ছে। জিসান বা কার নির্দেশে কারা এ ঘটনায় জড়িত ছিল সে বিষয়ে এখনই কথা বলার সময় হয়নি। তদন্ত শেষ করে সব কিছু জানানো হবে।
স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, দীর্ঘদিন ধরে দেশের বাইরে অবস্থান করছেন তালিকাভুক্ত শীর্ষ সন্ত্রাসী জিসান। বিদেশে বসেই তিনি ঢাকার অপরাধ জগত নিয়ন্ত্রণ করছেন। তার নেতৃত্বে রাজধানীর মগবাজার, মালিবাগ, রামপুরা, গুলশান, বনানী, পল্টন, ফকিরাপুল, মতিঝিল ও বাড্ডাসহ বিভিন্ন এলাকায় ডিস ব্যবসা, ময়লার টাকা আদায়, চাঁদাবাজি ও টেন্ডারবাজি পরিচালিত হয়ে আসছিল। আওয়ামী লীগ সরকার পতনের পর জিসানের প্রভাব আরও বেড়ে যায়। স্থানীয় বিএনপির কিছু নেতাকর্মী তার সন্ত্রাসী গ্রুপে সঙ্গে যোগাযোগ রেখে নতুন নতুন এলাকা প্রভাব বিস্তার করে।

দীর্ঘ দিন পর গত ৭ মে কারামুক্ত হয়ে রামপুরার নিজ বাসায় ফিরে আবারও সন্ত্রাসী কার্যক্রম শুরু করে আরেক শীর্ষ সন্ত্রাসী ইয়াসিন খান পলাশ। কারাগারে থাকাকালীন তার প্রভাবেই এলাকার বিভিন্ন কর্মকাণ্ড নিয়ন্ত্রিত হতো। তার হয়ে চাঁদাবাজি, মাদক কারবার, ময়লার ব্যবসা, অস্ত্র ব্যবসা ও জবরদখল চালাতেন ‘টোকাই’ সুজন। অস্ত্র ব্যবসার জন্য পলাশকে অস্ত্র সরবরাহ করতেন বাড্ডার আনন্দ নামে এক ব্যক্তি, যিনি বাড্ডার স্থায়ী বাসিন্দা ছিলেন না, বাইরে থেকে এসে অস্ত্র সরবরাহ করতেন।
কিন্তু ৫ আগস্টের পর বিএনপির লোকজন পলাশের নিয়ন্ত্রণে থাকা বিভিন্ন ব্যবসা ও এলাকা দখলে ব্যস্ত হয়ে পড়ে। বিশেষ করে বাগিচারটেক এলাকার দখল, মাদক আখড়া ও গ্যারেজপট্টি নিয়ে স্থানীয় বিএনপি নেতা ‘গুজা’ বাদশার সঙ্গে বিরোধ শুরু হয়। একপর্যায়ে বাদশার লোকজনের সঙ্গে পলাশের লোকজনের গোলাগুলি হয়। ওই গোলাগুলির নেতৃত্ব দেন কুদ্দুস। ঘটনার পর তিনি অস্ত্রসহ যৌথবাহিনীর হাতে গ্রেপ্তার হন।
ওই গোলাগুলিতে আরও অংশ নেয় মোল্লা জনি, হাবেল (এসপি হত্যা মামলার আসামি), ল্যাংড়া জাকির (পুলিশের সোর্স) ও রাফসান। গোলাগুলির ঘটনায় উভয়পক্ষ বেশ কিছুদিনের জন্য এলাকা ছাড়ে। এ সুযোগে গুজা বাদশা, তার ঘনিষ্ঠ যুবদল নেতা ‘বলদা’ বাদশা (মগা বাদশা নামেও পরিচিত) এবং রামপুরার দাতু ইউসুফসহ (বাড্ডায় শান্ত নামে পরিচিত) কয়েকজনের মাধ্যমে জিসান তার গ্রুপ দিয়ে এলাকার নিয়ন্ত্রণ নেয়। পরে তাদের সঙ্গে যোগ দেন স্বেচ্ছাসেবক দলের নেতা এবাদুল এবং ওমর আলী লেনের ‘দাঁতভাঙা’ সাকিব ও তার ভাই রাকিব।

পরিস্থিতি অনুকূলে এলে গুজা বাদশার লোকজন এলাকায় ফিরে আসে। পরে ময়লার ভাগাভাগি নিয়ে গুজা বাদশা ও পলাশ-সুজন গ্রুপের মধ্যে সংঘর্ষ হয়। তখন পলাশ গ্রুপের ‘বেলু’ রুবেল মারধরের শিকার হন। এ সময় হাসিব, হাসনাইনসহ অন্যরা পালিয়ে যায়। এর মাসখানেক পর র্যাব গুজা বাদশাকে গ্রেপ্তার করে। এরপর আধিপত্য প্রতিষ্ঠাকে নিয়ে স্থানীয় একাধিক গ্রুপের মধ্যে ধাওয়া-পাল্টা ধাওয়া চলতে থাকে। তখন হাবেল, পেন্ডি হাসান, ল্যাংড়া জাকির ও দাতু ইউসুফ যুবদল নেতা বলদা বাদশা এবং স্বেচ্ছাসেবক নেতা এবাদুলের নেতৃত্বে এলাকায় নিয়মিত চলাচল বাড়িয়ে নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করে।

এর কিছুদিন পর কুদ্দুস অস্ত্রসহ আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর হাতে গ্রেপ্তার হন। এ খবর ছড়িয়ে পড়লে সবাই গা ঢাকা দেয়। এ সময় রামপুরাসহ আশপাশের এলাকা পুনরায় নিয়ন্ত্রণে নিতে যুবদল ও স্বেচ্ছাসেবক দলের নেতাদের মাধ্যমে ব্যাপক চেষ্টা চলতে থাকে। ঠিক তখনই কারামুক্ত হয়ে এলাকায় ফিরে আসেন পলাশ। এরপর ছোট-বড় প্রায় সব গ্রুপই নিশ্চুপ হয়ে যায় এবং পলাশ পুনরায় এলাকার নিয়ন্ত্রণ নিতে শুরু করেন।
এ সময় হঠাৎ করেই পলাশের সামনে প্রতিপক্ষ হিসেবে দাঁড়ায় তার গ্রুপের অন্যতম সুজন। পলাশ দীর্ঘদিন কারাগারে থাকার সুযোগে সুজন এলাকায় শক্ত অবস্থান তৈরি করে এবং তার গ্রুপ পলাশের নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যায়। অন্যদিকে গুজা বাদশা গ্রুপ নীরবে সুযোগের অপেক্ষায় ছিল। একই সময়ে বিএনপির কয়েকজন নেতার সঙ্গে পলাশের মনোমালিন্য এবং এলাকার বাইরের কয়েকটি গ্রুপের সঙ্গে পুরোনো বিরোধ আবার সামনে চলে আসে।
যে সুজন একসময় খুব খারাপ অবস্থায় ছিল, সেই সুজনের ঢাকায় ফ্ল্যাট, নিজস্ব বাড়ি, ব্যবসা ও কোটি কোটি টাকার সম্পদের কথা জেনে পলাশ বিস্মিত হয়ে পড়েন। কারাগারে থাকতে পলাশ জানতেন যে সুজন তার বাইরে কিছু জানে না-বুঝে না। এসব দেখে তিনি উত্তেজিত হয়ে তার গ্রুপের সবাইকে দেখা করতে ডাকেন। কিন্তু তার ডাকে কেউ আসেনি। পরে তিনি তাদের অকথ্য ভাষায় গালাগালি করেন।
অনুসন্ধানে জানা গেছে, পলাশের এমন উত্তেজনা ও অশোভনীয় আচরণের সুযোগ নেয় জিসান। স্থানীয় অন্যান্য গ্রুপ ও সুজন গ্রুপের সঙ্গে আলোচনা করে পলাশকে হত্যার পরিকল্পনা চূড়ান্ত করা হয়। এ জন্য দুইজন সাহসী শুটার ভাড়া করার পরামর্শ দেয়। তাদের দায়িত্ব ছিল পলাশকে গুলি করা। এ সময় ব্যাকআপ টিম হিসেবে কিছুটা দূরে অবস্থান করছিল মগবাজার টিএনটি কলোনির নাদিম, চেয়ারম্যান গলির ভোলা, বাড্ডা ও রামপুরার শুটার শান্ত মাহবুব এবং রামপুরার মোল্লা জনি।

অনুসন্ধানে আরও জানা গেছে, পলাশকে হত্যার জন্য ব্যবহৃত অস্ত্র ও গুলি সরবরাহ করেন ভিপি উজ্জলের ঘনিষ্ঠ ও জিসানের আস্থাভাজন মিন্টু, যাকে অপরাধ জগতে ‘গোডাউন মিন্টু’ নামে সবাই চেনে। গুলির ঘটনার আগে নাদিম, রাজ ও আমান এলাকা রেকি করে। তারা তিনজনই ঘটনাস্থলের আশপাশে ছিল এবং নাদিমের কোমরে একটি অস্ত্র ছিল, যা ব্যাকআপ হিসেবে রাখা হয়েছিল।
ঘটনার পরপরই নাদিম, রাজ ও আমান টিএন্ডটি কলোনির গ্রিন এলাকার একটি বাসায় যায়, যেখানে নাদিমের খালা থাকেন, সেখানে গিয়ে কাপড় পরিবর্তন করে তারা ঢাকা ছাড়ার উদ্দেশ্যে বের হয়ে যায়।
গোয়েন্দা সূত্রে জানা গেছে, জিসানের পাশাপাশি পলাশ হত্যার জন্য নাদিম ও সুজনের ভুমিকা ছিল গুরত্বপূর্ণ। সিদ্ধেশ্বরী কলেজ ছাত্রদলের সাবেক ভিপি মফিজুল হক বিপুকে হত্যার উদ্দেশ্যে মগবাজার টিএন্ডটি কলোনির সামনে প্রকাশ্যে সশস্ত্র হামলা চালানো হয়।
মগবাজারের আলোচিত ডিস ব্যবসায়ী অপু হত্যা মামলার অন্যতম আসামি এই নাদিম। তার শেল্টারদাতা হিসেবে পরিচিত ভিপি উজ্জল ও রিকির মাধ্যমে এলাকায় নিয়ন্ত্রণ পরিচালিত হয়। ক্যাসিনো নাদিম মূলত শীর্ষ সন্ত্রাসী জিসান গ্রুপের মগবাজার শাখার নিয়ন্ত্রণকারী। কেন্দ্রীয় যুবদলের সহ-সাধারণ সম্পাদক ভিপি উজ্জল জিসানের বন্ধু, ব্যবসায়িক অংশীদার এবং তাদের শেল্টারদাতা বলে পরিচিত।

জানা গেছে, কয়েক বছর আগে তাজরীন ফ্যাশনের মালিক দেলোয়ার হোসেনের শ্বশুরকে একই স্থানে টিভি সেন্টারের বিপরীতে গাড়ির ভেতরে প্রকাশ্যে গুলি করে হত্যা করা হয়। ওই ঘটনায় নাদিমের সঙ্গে শামিম হোসেন ভোলাও জড়িত ছিল বলে অভিযোগ রয়েছে। ভিপি উজ্জল, গুজা বাদশা, বলদা বাদশা এবং বর্তমানে সুজন—এরা সবাই জিসানের লোক। কারামুক্ত পলাশ ছিল তাদের সবার সামনে নতুন এক আপদ। এ জন্য তাকে গুলি করা হয়েছে পথের কাটা পরিস্কার করার জন্য।
এ বিষয়ে হাতিরঝিল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) সাদুজ্জামান এশিয়া পোস্টকে পলাশ হত্যা চেষ্টার অভিযোগে ইমাম হোসেন নামের একজনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। তিনি ঘটনাস্থল ছিলেন এবং হামলাকারীকে মোটরসাইকেলে নিরাপদ স্থানে পালানোর কাজে সহায়তা করেন।
ওসি বলেন, তাকে আদালতের অনুমতি নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করা হচ্ছে। তার কাছ থেকে আরও গুরুত্বপূর্ণ নানা বিষয়ে জানা যাবে।
.png)


