logo

৯ ঘণ্টার ব্যবধান, চার দুর্ঘটনায় ঝরে গেল ২০ প্রাণ

৯ ঘণ্টার ব্যবধান, চার দুর্ঘটনায় ঝরে গেল ২০ প্রাণ
বাঁয়ে ইনানীতে অগ্নিকাণ্ডের পর টুপটুপ রেস্টো অ্যান্ড রিসোর্ট এবং ডানে রৌমারীতে উল্টে যাওয়া ধানবোঝাই ট্রাক। ছবি: এশিয়া পোস্ট

সকাল ৭টা থেকে বিকেল ৪টা, মাত্র নয় ঘণ্টার ব্যবধান। এরই মধ্যে দেশের পৃথক চারটি স্থানে মর্মান্তিক দুর্ঘটনায় ঝরে গেছে ২০টি তাজা প্রাণ। একদিকে রিসোর্টের আনন্দভ্রমণ রূপ নিয়েছে আগুনের বিষাদে, অন্যদিকে সড়কে থমকে গেছে জীবন।

শনিবার (১৭ অক্টোবর) কক্সবাজারের ইনানীতে কাঠের তৈরি একটি রিসোর্টে ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডে ১০ জন এবং কুড়িগ্রাম, টাঙ্গাইল ও সিলেটে সড়ক দুর্ঘটনায় আরও ১০ জন নিহত হয়েছেন। হৃদয়বিদারক বিষয় হলো, কক্সবাজারের অগ্নিকাণ্ডে একই পরিবারের ৬ জন এবং কুড়িগ্রামের রৌমারীতে সড়ক দুর্ঘটনায় একই পরিবারের ৪ জন প্রাণ হারিয়েছেন।

কী ঘটেছিল টুপটুপ রিসোর্টে

এদিন সকাল ৭টার দিকে ইনানীর মেরিন ড্রাইভ সড়কসংলগ্ন টুপটুপ রেস্টো অ্যান্ড রিসোর্টে আগুন লাগে। খবর পেয়ে ফায়ার সার্ভিসের তিনটি ইউনিটের কর্মীরা ঘটনাস্থলে পৌঁছান। পরে স্থানীয় বাসিন্দারা পুলিশের সহায়তায় আগুন নিয়ন্ত্রণ ও উদ্ধার তৎপরতা শুরু করেন। পরে সকাল ১০টার দিকে আগুন নিয়ন্ত্রণে আনে।

প্রথমে ফায়ার সার্ভিসের সিনিয়র কর্মকর্তা দোলন আচার্য নিশ্চিত করে জানান, ঘটনাস্থল থেকে পাঁচটি মরদেহ উদ্ধার করা হয়েছে। পরে আরও একজনের মৃত্যু হয়।

এরপর দুপুর ১টা ৫০ মিনিটের দিকে আরও ৪টি মরদেহ উদ্ধারের তথ্য নিশ্চিত করেন কক্সবাজার ফায়ার সার্ভিস স্টেশনের উপসহকারী পরিচালক সৈয়দ মোরশেদ হোসেন। এর ফলে মৃতের সংখ্যা বেড়ে দাঁড়ায় ১০ জনে।

নিহত ১০ জনের মধ্যে ৬ জনের পরিচয় পাওয়া গেছে। নিহত ব্যক্তিরা হলেন ঢাকার বনশ্রীর ইসরাত জাহান মালিহা (৩০) ও মিলিতা মেহেজাবিন আলভী (২৩), খিলগাঁওয়ের লায়লা জাহান নাবিলা (২৭) ও নাফিসতা মীম (২৭), চুয়াডাঙ্গার ফারিহা কবির (৩৩) এবং পাঁচ বছর বয়সি ফায়িজান আহম্মেদ।

কক্সবাজার সদর হাসপাতালের আবাসিক চিকিৎসা কর্মকর্তা (আরএমও) সুবক্তগীন মাহমুদ সোহেল তাদের পরিচয় নিশ্চিত করেছেন।

পুলিশ সূত্র এশিয়া পোস্টকে জানিয়েছে, টুপটুপ রেস্টো অ্যান্ড রিসোর্টটি কাঠের তৈরি। এতে মোট রুম ছিল ৯টি। গতকাল শুক্রবার (১৬ অক্টোবর) রাতে তিন রুমের পর্যটক চেকআউট হয়ে চলে যান। বাকি ৬ রুমে ১৬ জন পর্যটক অবস্থান করছিলেন। তাদের মধ্য থেকে ৫ থেকে ৬ জনের মতো সকালে বেরিয়ে বিভিন্ন কাজে বাইরে ছিলেন। অগ্নিকাণ্ডে তাদের মধ্য থেকে ছয়জন মারা যান। বাকিদের আহত অবস্থায় উদ্ধার করে হাসপাতালে ভর্তি করা হয়।

রিসোর্টের ছিল না লাইসেন্স, করা হয় সতর্ক

ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্সের চট্টগ্রাম বিভাগের উপপরিচালক মো. তৌফিকুল ইসলাম ভূঁইয়া জানান, আজ সকাল ৭টা ২৩ মিনিটে কক্সবাজার ফায়ার সার্ভিসে আগুনের খবর দেওয়া হয়। সকাল ৮টার দিকে ফায়ার সার্ভিসের দল ঘটনাস্থলে পৌঁছায়। ৮টা ১৫ মিনিটে আগুন নিয়ন্ত্রণে আসে। চারজন ব্যক্তি মারা গেছেন তিনতলার দুটি শৌচাগারে।

তিনি বলেন, সমুদ্রের তীব্র বাতাসে কাঠের রিসোর্টে আগুন দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে। এ ধরনের স্থাপনায় বহনযোগ্য অগ্নিনির্বাপক যন্ত্র, অগ্নি সংকেত, হোস পাইপ ও অগ্নিনিরাপত্তা পরিকল্পনা থাকা দরকার। কিন্তু রিসোর্টটিতে এগুলোর কিছুই ছিল না। ফায়ার লাইসেন্সও ছিল না। মাত্র সাত-আট মাস আগে রিসোর্টটি তৈরি হয়েছিল। জায়গাটির মালিকানা নিয়েও দ্বন্দ্ব ছিল বলে জানান তিনি।

একই পরিবারের গেল ৬ প্রাণ, জানালা দিয়ে বাঁচলেন আশিক

পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে নিয়ে ছুটি কাটাতে কক্সবাজার গিয়েছেন মো. আশিকুল ইসলাম। সঙ্গে ছিলেন তার স্ত্রী ইসরাত জাহান মালিহা ও স্ত্রীর ছোট বোন লায়লা জাহান নাবিলাসহ পরিবারের অন্য সদস্যরা।

আশিকুল ইসলামের এক স্বজন গণমাধ্যমকে জানান, আগুন লাগার পর আশিকুল ইসলাম দোতলা থেকে লাফ দিয়ে বেঁচে আছেন। তবে আশিকুলের স্ত্রী, স্ত্রীর বোনসহ পরিবারের ছয়জন মারা গেছেন।

কুড়িগ্রামে সড়কে নিভে গেল ৫ জনের প্রাণ

কুড়িগ্রামের রৌমারীতে ধানবোঝাই ট্রাকের ধাক্কায় অটোরিকশার চালকসহ পাঁচজন নিহত হয়েছেন। নিহত ব্যক্তিদের মধ্যে একই পরিবারের চারজন রয়েছেন।

শনিবার (১৭ অক্টোবর) দুপুরে উপজেলার যাদুরচর ইউনিয়নের সায়েদাবাদ বাজারের কাছে এ দুর্ঘটনা ঘটে।

মালবাহী ট্রাক ও সিএনজিচালিত অটোরিকশার মুখোমুখি সংঘর্ষে ঘটনাস্থলে স্থানীয়দের ভিড়। ছবি: এশিয়া পোস্ট
মালবাহী ট্রাক ও সিএনজিচালিত অটোরিকশার মুখোমুখি সংঘর্ষে ঘটনাস্থলে স্থানীয়দের ভিড়। ছবি: এশিয়া পোস্ট

নিহতদের মধ্যে একই পরিবারের চারজন হলেন শরিফা বেগম, লিপি বেগম, তুবা খাতুন (৭) ও রিশাদ মিয়া (১২)। এ ছাড়া নিহত অটোরিকশাচালকের পরিচয় জানা যায়নি। এ ঘটনায় বৃষ্টি খাতুন (২৫) নামে একজন গুরুতর আহত হয়েছেন।

ঘটনার বর্ণনা দিয়ে সংশ্লিষ্ট ইউনিয়ন পরিষদের (ইউপি) সদস্য জিয়াউর রহমান বলেন, কাউনিয়ারচর থেকে পাঁচ যাত্রী নিয়ে একটি অটোরিকশা কর্তীমারীর দিকে যাচ্ছিল। পথে শিবেরডাঙ্গি বাজারের কাছে বিপরীত দিক থেকে আসা ধান বোঝাই একটি ট্রাক অটোরিকশাটিকে ধাক্কা দেয়। এতে ঘটনাস্থলেই চালকসহ তিনজনের মৃত্যু হয়। হাসপাতালে নেওয়ার পথে মারা যান আরও দুজন।

রৌমারী থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) কাউসার আলী বলেন, নিহতদের চারজন একই পরিবারের সদস্য। অটোরিকশা চালকের পরিচয় এখনও জানা যায়নি। ট্রাকটি পুলিশ হেফাজতে রয়েছে। এ ঘটনায় আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে।

মির্জাপুরে ত্রিমুখী সংঘর্ষে দুজন নিহত

বিকেল ৪টার দিকে ঢাকা-টাঙ্গাইল মহাসড়কের মির্জাপুরের জামুর্কী এলাকায় বাস, পিকআপ ও মোটরসাইকেলের ত্রিমুখী সংঘর্ষে দুইজনের মৃত্যু হয়। নিহতরা হলেন টাঙ্গাইলের বাসাইল এলাকার মোটরসাইকেল আরোহী আসিফ (১৮) এবং সিরাজগঞ্জের উল্লাপাড়ার বাসিন্দা ও পিকআপের সহকারী আব্দুল রহিম (৪০)।

সংঘর্ষে দুর্ঘটনাকবলিত বাসের ক্ষতিগ্রস্ত অংশ। ছবি : এশিয়া পোস্ট
সংঘর্ষে দুর্ঘটনাকবলিত বাসের ক্ষতিগ্রস্ত অংশ। ছবি : এশিয়া পোস্ট

গোড়াই হাইওয়ে থানার উপপরিদর্শক (এসআই) আনিসুর রহমান এশিয়া পোস্টকে জানান, দুর্ঘটনাকবলিত বাস ও পিকআপটি পুলিশ হেফাজতে নেওয়া হয়েছে। আইনি প্রক্রিয়া শেষে মরদেহ দুটি স্বজনদের কাছে হস্তান্তর করা হবে।

সিলেট-তামাবিল মহাসড়কে পৃথক দুর্ঘটনায় শিশুসহ ৩ পর্যটক নিহত

দুপুরের দিকে সিলেট-তামাবিল মহাসড়কের জৈন্তাপুরে পৃথক দুটি সড়ক দুর্ঘটনায় এক শিশুসহ ৩ জন নিহত হয়েছেন। এ ঘটনায় অন্তত ১০ জন আহত হয়েছেন। দুপুর সোয়া ১২টার দিকে জৈন্তাপুরের ফেরিঘাট এলাকায় পর্যটকবাহী বাস ও পাথরবোঝাই ট্রাকের সংঘর্ষে দুই পর্যটক নিহত হন। নিহতদের একজন রাজবাড়ীর কালুখালী এলাকার বাসিন্দা হাসান প্রামাণিক (৪০), নিহত অপর নারীর পরিচয় এখনও জানা যায়নি। তারা রাজবাড়ী থেকে সিলেটে ভ্রমণে এসেছিলেন।

সিলেট-তামাবিল মহাসড়কে পাশে দুর্ঘটনার শিকার বাস। ছবি : এশিয়া পোস্ট
সিলেট-তামাবিল মহাসড়কে পাশে দুর্ঘটনার শিকার বাস। ছবি : এশিয়া পোস্ট

অন্যদিকে, দুপুর সাড়ে ১২টার দিকে বিরাইমারা সেতুর কাছে দুটি প্রাইভেটকারের মুখোমুখি সংঘর্ষে হাসানুজ্জামান নামে এক ব্যক্তির তিন মাসের শিশুসন্তান আয়াত নিহত হয়।

তামাবিল হাইওয়ে পুলিশের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) সঞ্চয় চক্রবর্তী এশিয়া পোস্টকে জানান, প্রাইভেটকারের মুখোমুখি সংঘর্ষে এক শিশু এবং বাস-ট্রাক সংঘর্ষে দুই পর্যটক মারা গেছেন। মরদেহ ওসমানী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের মর্গে রাখা হয়েছে।