যোগ্যতা অনুযায়ী কাজ পাচ্ছেন না উচ্চশিক্ষিতদের বড় অংশ

২০৫০ সালের মধ্যে দেশে শ্রমের জোগান কর্মসংস্থানের চেয়ে ১ কোটি ৩০ লাখ বেশি হতে পারে। অথচ এখনই উচ্চশিক্ষিতদের বড় অংশ যোগ্যতা অনুযায়ী কাজ পাচ্ছেন না। অন্যদিকে তরুণের সংখ্যা বেশি হওয়ার যে অর্থনৈতিক সুবিধা, তা-ও পাওয়া যাবে আর মাত্র ১৯ বছর।
আগামী দুই দশকে বাংলাদেশে কর্মক্ষম মানুষের সংখ্যা বাড়বে, কিন্তু তাদের জন্য পর্যাপ্ত কর্মসংস্থান তৈরি না হলে এই জনশক্তি অর্থনীতির জন্য বড় চাপে পরিণত হতে পারে।
বিশ্বব্যাংকের ২০২৬ সালের ‘ডেমোগ্রাফিক চেঞ্জ ইন সাউথ এশিয়া: ফ্রম টেলউইন্ডস টু হেডউইন্ডস ফর ডেভেলপমেন্ট’ শীর্ষক প্রতিবেদনে দেশের সামনে থাকা এসব চ্যালেঞ্জ তুলে ধরা হয়েছে।
মঙ্গলবার (৩ নভেম্বর) রাজধানীর সোনারগাঁও হোটেলে প্রতিবেদনটি প্রকাশ করা হয়।
প্রতিবেদন প্রকাশ অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন বিশ্বব্যাংকের রিজিওনাল প্র্যাকটিস ডিরেক্টর জেম মেতে, এশিয়ার প্রধান অর্থনীতিবিদ ফ্রান্সিসকা লিজেলোটে ওনসর্গ এবং বাংলাদেশ ও ভুটানের অপারেশনস ম্যানেজার গেইল মার্টিন।
পরে এ নিয়ে অনুষ্ঠিত প্যানেল আলোচনায় অংশ নেন সমাজকল্যাণমন্ত্রী আবু জাফর মো. জাহিদ হোসেন, পরিকল্পনা প্রতিমন্ত্রী জোনায়েদ আব্দুর রহিম সাকি, পিপিআরসির নির্বাহী চেয়ারম্যান ড. হোসেন জিল্লুর রহমান, সিপিডির নির্বাহী পরিচালক ড. নাজনীন আহমেদ প্রমুখ।
প্রতিবেদনে বলা হয়, এখন বাংলাদেশে স্নাতক বা তার চেয়ে বেশি শিক্ষিত ব্যক্তিদের ৬০ শতাংশের অধিক বিভিন্ন অনানুষ্ঠানিক কাজে যুক্ত রয়েছেন, যেখানে তাদের আয় আনুষ্ঠানিক খাতের কর্মীদের তুলনায় ৪৫ থেকে ৮৪ শতাংশ কম।
মানসম্মত কর্মসংস্থানের অভাব
২০৪৫ সালেই কর্মক্ষম মানুষের অনুপাত সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছানোর পর বয়স্ক জনগোষ্ঠীর সংখ্যা বাড়তে শুরু করবে। কর্মসংস্থান, উৎপাদনশীলতা ও মানবসম্পদ উন্নয়নে দ্রুত অগ্রগতি না হলে ধনী দেশে পরিণত হওয়ার আগেই প্রবীণ জনগোষ্ঠীর স্বাস্থ্যসেবাসহ বাড়তি বড় দায়িত্ব নিতে হবে রাষ্ট্রকে।
প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়, বাংলাদেশের শ্রমবাজারের সবচেয়ে বড় দুর্বলতা হলো মানসম্মত কর্মসংস্থানের অভাব। বর্তমানে দেশের মোট কর্মক্ষম জনগোষ্ঠীর ৮৪ শতাংশই (৫ কোটি ৮০ লাখ) অনানুষ্ঠানিক খাতে কাজ করছেন। এসব কাজে সাধারণত নিয়োগপত্র, নির্ধারিত মজুরি কিংবা চাকরির নিরাপত্তা থাকে না। কর্মীরা যেকোনো সময় কাজ হারানোর ঝুঁকিতে থাকেন।
মোট কর্মসংস্থানের ৩৫ থেকে ৪০ শতাংশ অনানুষ্ঠানিক
কর্মসংস্থানের এই অনানুষ্ঠানিকতা শুধু ক্ষুদ্র ব্যবসা বা ছোট প্রতিষ্ঠানে সীমাবদ্ধ নয়। মাঝারি ও বড় প্রতিষ্ঠানেও মোট কর্মসংস্থানের ৩৫ থেকে ৪০ শতাংশ অনানুষ্ঠানিক। বাংলাদেশ, ভারত ও নেপালে অনানুষ্ঠানিক খাতের ৪৫ থেকে ৭০ শতাংশ উদ্যোক্তা জানিয়েছেন, বিকল্প বা নিয়মিত চাকরি না পেয়ে তারা ব্যবসা বা নিজস্ব উদ্যোগ শুরু করেছেন। বাংলাদেশের ক্ষেত্রে সরকারের পরিসংখ্যান ব্যুরোর ২০২২ সালের অনানুষ্ঠানিক খাত জরিপ বিশ্লেষণ করেছে বিশ্বব্যাংক।
আনুষ্ঠানিক প্রতিষ্ঠানগুলোতেও কর্মসংস্থান তৈরির গতি প্রত্যাশার তুলনায় কম। বাংলাদেশে এসব প্রতিষ্ঠানে বছরে কর্মসংস্থান বাড়ছে ২ দশমিক ৭ শতাংশ হারে। যেখানে বিশ্বের ৮২টি উদীয়মান অর্থনীতির দেশের গড় হার ৫ দশমিক ৪ শতাংশ।
কর্মসংস্থানের এই দুর্বলতার সঙ্গে যুক্ত হয়েছে কম উৎপাদনশীলতা। বাংলাদেশ ও ভারতের প্রতিষ্ঠানগুলোতে শ্রমিক প্রতি উৎপাদন বৃদ্ধির হার বিশ্বের অধিকাংশ দেশের তুলনায় কম। পর্যটন ও খাদ্যসংশ্লিষ্ট খাতেও কর্মসংস্থান বাড়ছে ধীরগতিতে। ক্ষুদ্র ও মাঝারি প্রতিষ্ঠানগুলোর একাংশ নতুন কর্মী নেওয়ার বদলে কর্মীর সংখ্যা কমাচ্ছে।
বিশ্বব্যাংকের হিসাবে, বাংলাদেশে ২০৫১ সালের মধ্যে ৬৫ বছর বা তার বেশি বয়সী মানুষের সংখ্যা বেড়ে মোট জনসংখ্যার ১৪ শতাংশে পৌঁছাতে পারে। তখন বাংলাদেশ বয়স্ক সমাজে পরিণত হবে। প্রতিবেশী দেশগুলোর তুলনায় হাতে সময় অনেকটা বেশি (১৯ বছর) থাকলেও এই সুযোগ কাজে লাগাতে কর্মসংস্থান ও মানবসম্পদ উন্নয়নে দ্রুত বিনিয়োগ বাড়াতে হবে। ভারতের হাতে এই সুযোগ কাজে লাগানোর সময় মাত্র আট বছর, আর ভুটানের পাঁচ বছর।
প্রয়োজনীয় ওষুধ ও সরঞ্জাম মিলছে সাড়ে ৭ শতাংশ কেন্দ্রে
প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়, স্বাস্থ্য খাতেও শহর ও গ্রামের বৈষম্য প্রকট। দেশের ৭০ শতাংশ মানুষ গ্রামে বাস করলেও স্বাস্থ্যকর্মীদের মাত্র ২০ শতাংশ সেখানে কর্মরত। শহরে চিকিৎসকের ঘনত্ব গ্রামের তুলনায় ১৮ গুণ বেশি। অসংক্রামক রোগের চিকিৎসার প্রয়োজনীয় সব উপাদান রয়েছে দেশের মাত্র ১৮ শতাংশ প্রাথমিক স্বাস্থ্যকেন্দ্রে। প্রয়োজনীয় ওষুধ ও সরঞ্জাম পাওয়া যায় মাত্র সাড়ে ৭ শতাংশ কেন্দ্রে। উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের মাত্র ১ দশমিক ৬ শতাংশে ইনজেকশনে দেওয়ার ইনসুলিন এবং ৩৮ শতাংশে মেটফরমিন পাওয়া যায়। হৃদ্রোগের চিকিৎসার জন্য প্রয়োজনীয় সব উপাদান রয়েছে ১ শতাংশের কম প্রতিষ্ঠানে।
দেশের শিক্ষার ভিত্তিও শক্তিশালী নয়। প্রাক-প্রাথমিক শিক্ষায় ভর্তির হার ৩৬ শতাংশ, দক্ষিণ এশিয়ায় যার গড় ৬২ শতাংশ। সামাজিক সুরক্ষা ব্যয়ও এই অঞ্চলের দেশগুলোর মধ্যে সর্বনিম্ন। পাঁচ বছরের কম বয়সী শিশুরা মোট সামাজিক সুরক্ষা ব্যয়ের মাত্র ২ শতাংশ পায়। প্রবীণদের সরকারি বয়স্ক ভাতা মাসে ৫০০ টাকা, যা দরিদ্র গ্রামীণ পরিবারের গড় আয়ের মাত্র ৫ থেকে ৮ শতাংশ। মূল্যস্ফীতির কারণে এই ভাতার প্রকৃত মূল্য আরও কমেছে।
এই পরিস্থিতি মোকাবিলায় প্রাথমিক শিক্ষা ও স্বাস্থ্যসেবায় বিনিয়োগ বাড়ানো, ক্ষুদ্র ও মাঝারি প্রতিষ্ঠানের আনুষ্ঠানিক অর্থায়ন সহজ করা এবং শ্রমিকদের দক্ষতা উন্নয়নের সুপারিশ করেছে বিশ্বব্যাংক। নারীদের শ্রমবাজারে অংশগ্রহণ বাড়ানোর ওপরও গুরুত্ব দিয়েছে সংস্থাটি।
ধীরে ধীরে কমছে জনমিতিক লভ্যাংশ
প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০০০ থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত বাংলাদেশের জনসংখ্যার বয়সভিত্তিক কাঠামোর পরিবর্তন মাথাপিছু মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) প্রবৃদ্ধিতে প্রতিবছর প্রায় ০.৪ শতাংশ পয়েন্ট অবদান রেখেছে।
তবে ২০২৫ থেকে ২০৪৪ সাল পর্যন্ত এ অবদান কমে প্রতিবছর ০.২ শতাংশ পয়েন্টে নেমে আসবে বলে ধারণা করা হচ্ছে। ২০৪৫ সাল থেকে এ অবদান ঋণাত্মক হয়ে যাবে।
বয়স্কদের আর্থিক নিরাপত্তা এখনও নাজুক
বিশ্বব্যাংক বলছে, বাংলাদেশে বয়স্ক জনগোষ্ঠীর আর্থিক নিরাপত্তার অবস্থা এখনও নাজুক। পেনশন সুবিধার আওতা সীমিত, সামাজিক সুরক্ষা অপর্যাপ্ত এবং স্বাস্থ্যসেবার ব্যয় বেশি হওয়ায় তারা আর্থিক অনিশ্চয়তার মধ্যে রয়েছেন।
প্রতিবেদনে উদ্ধৃত ২০১৮ সালের একটি আনুমানিক পরিসংখ্যান অনুযায়ী, বাংলাদেশের মাত্র ৩ শতাংশ প্রাপ্তবয়স্ক মানুষ জানিয়েছেন, তারা বিশেষত বৃদ্ধ বয়সের কথা বিবেচনা করে সঞ্চয় করেন। বয়স্ক জনগোষ্ঠীর প্রায় অর্ধেক সামাজিক পেনশন সুবিধার আওতায় থাকলেও, আর্থিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করার জন্য এ সুবিধা যথেষ্ট নয়।
২০২৩ সালে সর্বজনীন পেনশন কর্মসূচি চালু হলেও অনানুষ্ঠানিক খাতের শ্রমিকদের জন্য উল্লেখযোগ্য পেনশন কর্মসূচি নেই। অথচ দেশের অধিকাংশ মানুষ এই খাতেই কাজ করেন। কম কর-রাজস্ব আদায়ের কারণে স্বাস্থ্য, শিক্ষা ও সামাজিক সুরক্ষায় প্রয়োজনীয় সরকারি ব্যয় বাড়ানোও কঠিন হয়ে পড়ছে।
অনানুষ্ঠানিক কর্মসংস্থানে ঝুঁকিতে জনমিতিক লভ্যাংশ
প্রতিবেদন অনুযায়ী, শ্রমবাজারের কাঠামোগত দুর্বলতার কারণে বাংলাদেশ জনমিতিক লভ্যাংশের সময়কে পুরোপুরি কাজে লাগাতে ব্যর্থ হতে পারে।
বাংলাদেশে কর্মক্ষম জনগোষ্ঠীর মধ্যে কর্মসংস্থানের হার দক্ষিণ এশিয়ার গড় হারের চেয়ে বেশি হলেও, উদীয়মান বাজার ও উন্নয়নশীল অর্থনীতির দেশগুলোর গড় হারের চেয়ে কম। বিশেষ করে নারী জনগোষ্ঠী এবং অকৃষি খাতে এ ব্যবধান বেশি।
বাংলাদেশের মোট কর্মসংস্থানের প্রায় ৮৪ শতাংশই অনানুষ্ঠানিক খাতে। এর ফলে কর্মীদের চাকরির নিরাপত্তা, সামাজিক সুরক্ষা এবং অবসরকালীন সুবিধা পাওয়ার সুযোগ সীমিত হয়ে পড়ছে।






