logo

শুল্ক ও অস্থিরতায় টালমাটাল পোশাকশিল্পে নির্বাচন শেষে স্বস্তির প্রত্যাশা

শুল্ক ও অস্থিরতায় টালমাটাল পোশাকশিল্পে নির্বাচন শেষে স্বস্তির প্রত্যাশা

বাংলাদেশের অর্থনীতির প্রাণভোমরা যে শিল্প, সেই তৈরি পোশাক খাত আজ এক সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে। একদিকে যুক্তরাষ্ট্রের বাড়তি আমদানি শুল্ক, অন্যদিকে টানা রাজনৈতিক অস্থিরতা ও শ্রম অসন্তোষ—এই দ্বিমুখী চাপ গত ছয় মাসে দেশের প্রধান রপ্তানি শিল্পটিকে নড়বড়ে করে দিয়েছে। এমন প্রেক্ষাপটে জাতীয় নির্বাচনকে ঘিরে শিল্পোদ্যোক্তা থেকে শ্রমিক—সবাই তাকিয়ে আছেন নতুন সরকারের দিকে, যে সরকার নীতি-স্থিতিশীলতা, বাণিজ্যিক আস্থা এবং আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতিযোগিতার পরিবেশ ফিরিয়ে আনতে পারবে কি না, সেটিই এখন বড় প্রশ্ন।

বাংলাদেশের মোট রপ্তানি আয়ের প্রায় ৮০ শতাংশ আসে তৈরি পোশাক খাত থেকে এবং জাতীয় অর্থনীতির ১০ শতাংশেরও বেশি অবদান এই শিল্পের। প্রায় ৪০ লাখ শ্রমিক—যাদের বড় অংশ নারী, সরাসরি এ খাতের ওপর নির্ভরশীল। বিশ্ববিখ্যাত বহু ব্র্যান্ডের সরবরাহ–শৃঙ্খলে বাংলাদেশ দীর্ঘদিন ধরেই একটি গুরুত্বপূর্ণ উৎপাদনকেন্দ্র। ফলে এই শিল্পের ওঠানামা শুধু অর্থনীতিকেই নয়, সামাজিক স্থিতিশীলতা ও কর্মসংস্থানকেও সরাসরি প্রভাবিত করে।

শিল্পসংশ্লিষ্টরা বলছেন, ২০২৫ সালের মাঝামাঝি থেকে যুক্তরাষ্ট্রের অতিরিক্ত শুল্ক আরোপের পর থেকেই রপ্তানিপ্রবাহে ধাক্কা লাগে। শুল্ক এক দফা ৩৭ শতাংশ পর্যন্ত বাড়ার পর ধারাবাহিক আলোচনায় তা কমিয়ে ১৯ শতাংশে নামানো হলেও পূর্বের তুলনায় এখনও তা বেশি। সাম্প্রতিক বাণিজ্য চুক্তির আওতায় নির্দিষ্ট পরিমাণ পোশাক ও টেক্সটাইল পণ্য শুল্কমুক্ত প্রবেশের সুযোগ তৈরি হয়েছে বটে, তবে সেটি নির্ভর করছে বাংলাদেশ কতটা মার্কিন তুলা ও কৃত্রিম তন্তু আমদানি করছে তার ওপর। শিল্প মালিকদের মতে, এই চুক্তি আংশিক স্বস্তি দিলেও পুরো খাতকে স্থিতিশীল করতে আরও সময় ও নীতিগত স্পষ্টতা প্রয়োজন।

রাজনৈতিক অস্থিরতাও সমানভাবে প্রভাব ফেলেছে শিল্পে। ২০২৪ সালের সরকার পরিবর্তনের পর দীর্ঘ সময় ধরে প্রশাসনিক অনিশ্চয়তা ও আইনশৃঙ্খলা উদ্বেগের কারণে আন্তর্জাতিক ক্রেতাদের আস্থা কমে যায়। অনেক ক্রেতা বিকল্প বাজারের দিকে ঝুঁকেছেন বলে অভিযোগ রয়েছে। উদ্যোক্তাদের ভাষ্য, অর্ডার আসছে অনিয়মিতভাবে—কখনো বড়, কখনো ছোট, যা উৎপাদন পরিকল্পনা ও আর্থিক স্থিতি দুটোকেই দুর্বল করছে।

শ্রম খাতের চাপও কম নয়। ন্যূনতম মজুরি বৃদ্ধির দাবিতে গত বছরের আন্দোলনের পর মজুরি কাঠামোয় পরিবর্তন আনা হয়, বার্ষিক বৃদ্ধির হার বাড়ানো হয় এবং মজুরি পুনর্বিবেচনার সময়সীমা কমানো হয়। শ্রমিকদের জন্য এটি স্বস্তির হলেও উদ্যোক্তাদের মতে, বাড়তি ব্যয় ও আন্তর্জাতিক ক্রেতাদের কম দামে দ্রুত সরবরাহের চাপ লাভের পরিসর সংকুচিত করেছে।

এই বাস্তবতায় নির্বাচনকে শিল্পমহল দেখছে এক ধরনের ‘টার্নিং পয়েন্ট’ হিসেবে। নতুন সরকার যদি দীর্ঘমেয়াদি নীতিগত স্থিরতা, ব্যাংকিং খাতের সংস্কার, জ্বালানি খরচে প্রতিযোগিতামূলক সুবিধা এবং রপ্তানি বৈচিত্র্য আনার কার্যকর পরিকল্পনা নিতে পারে, তবে পোশাক খাত আবারও শক্ত অবস্থানে ফিরতে পারে—এমনটাই প্রত্যাশা উদ্যোক্তাদের। একই সঙ্গে চামড়া, পাট, ওষুধ ও কৃষি–প্রক্রিয়াজাত খাতের মতো বিকল্প রপ্তানি খাত গড়ে তোলার কথাও গুরুত্ব পাচ্ছে, যাতে অর্থনীতি একক কোনো শিল্পের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরশীল না থাকে।

সব মিলিয়ে, বাংলাদেশের পোশাকশিল্প আজ শুধু একটি বাণিজ্য খাতের সংকটের গল্প নয়; এটি কর্মসংস্থান, বৈদেশিক মুদ্রা, সামাজিক স্থিতি এবং আন্তর্জাতিক বাজারে দেশের অবস্থানের প্রশ্ন। নির্বাচনের ফলাফল তাই এই শিল্পের জন্য কেবল রাজনৈতিক পরিবর্তনের বার্তা নয়—বরং অর্থনীতির সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ চালিকাশক্তির ভবিষ্যৎ পথরেখা নির্ধারণের একটি বড় মোড় হিসেবেই বিবেচিত হচ্ছে। 

লেখক : তোরা আগারওয়াল
রয়টার্সের প্রতিবেদন থেকে অনূদিত