logo

জমির শেয়ারের নামে আবাসন ব্যবসায় ক্ষতিগ্রস্ত ৪০ হাজার নাগরিক: রিহ্যাব

জমির শেয়ারের নামে আবাসন ব্যবসায় ক্ষতিগ্রস্ত ৪০ হাজার নাগরিক: রিহ্যাব
সংবাদ সম্মেলনের আয়োজন করে রিহ্যাব। ছবি: এশিয়া পোস্ট

জমির শেয়ার বিক্রি করে নির্দিষ্ট ফ্ল্যাট দেওয়ার প্রতিশ্রুতিতে পরিচালিত অনিয়ন্ত্রিত আবাসন ব্যবসা বন্ধের দাবি জানিয়েছে রিয়েল এস্টেট অ্যান্ড হাউজিং অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (রিহ্যাব)। সংগঠনটির দাবি, এ ধরনের ব্যবসায়িক মডেলের কারণে ইতিমধ্যে প্রায় ৪০ হাজার নাগরিক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন। প্রায় ১০ হাজার বিচারাধীন মামলার কারণে অনেক ক্রেতা তাদের সারা জীবনের সঞ্চয় হারিয়ে অনিশ্চয়তার মধ্যে রয়েছেন। এভাবে চলতে থাকলে আগামী দুই থেকে তিন বছরে শেয়ারভিত্তিক আবাসন প্রকল্পসংক্রান্ত মামলা ও আইনি জটিলতায় প্রায় ৫০ হাজার কোটি টাকা আটকে যাওয়ার আশঙ্কা করছে সংগঠনটি।

রোববার (৮ নভেম্বর) রাজধানীর সিরডাপ মিলনায়তনে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে এসব তথ্য তুলে ধরেন রিহ্যাবের প্রেসিডেন্ট ড. আলী আফজাল। সংবাদ সম্মেলন শেষে সাংবাদিকদের বিভিন্ন প্রশ্নের উত্তর দেন সংগঠনটির সিনিয়র ভাইস প্রেসিডেন্ট আব্দুর রাজ্জাক।

সংবাদ সম্মেলনে রিহ্যাব প্রেসিডেন্ট বলেন, বর্তমানে আবাসন খাতে উদ্বেগজনকভাবে এমন একটি ব্যবসায়িক মডেলের বিস্তার ঘটছে, যেখানে জমির নির্দিষ্ট অংশ বা শেয়ার বিক্রি করে ভবিষ্যতে নির্দিষ্ট আয়তনের ফ্ল্যাট নির্মাণ ও হস্তান্তরের প্রতিশ্রুতি দেওয়া হচ্ছে। কিন্তু অনেক ক্ষেত্রে ভবনের অনুমোদিত নকশা, নির্মাণের সক্ষমতা, অর্থের ব্যবহার, ফ্ল্যাটের সুনির্দিষ্ট অবস্থান এবং হস্তান্তরের আইনি নিশ্চয়তা স্পষ্ট থাকে না।

ফলে একজন ক্রেতা অর্থ বিনিয়োগ করেও নির্ধারিত সময়ে ফ্ল্যাট পাওয়া, বৈধ মালিকানা বুঝে পাওয়া কিংবা বিনিয়োগ করা অর্থ ফেরত পাওয়ার নিশ্চয়তা পান না। জমির শেয়ার কেনার পরও নির্দিষ্ট ফ্ল্যাটের মালিকানা প্রতিষ্ঠা নিয়ে জটিলতা তৈরি হচ্ছে। কোনো কোনো ক্ষেত্রে একই জমি বা ভবনের বিপরীতে একাধিক ব্যক্তির কাছে শেয়ার বিক্রির অভিযোগও রয়েছে।

তিনি বলেন, এ ধরনের ব্যবসায়িক মডেলে নির্মিত ভবনগুলোর অনুমোদিত নকশা ও বাস্তব নির্মাণের মধ্যে অসংগতি এবং নির্মাণসংক্রান্ত বিভিন্ন শর্তের ব্যত্যয়ের অভিযোগ রয়েছে। ১০০টি ভবন পরিদর্শন করলে প্রায় প্রতিটি ভবনেই কোনো না কোনো ধরনের ব্যত্যয়ের অভিযোগ পাওয়া যেতে পারে। এসব ভবনের অনুমোদিত ব্যবহার, নির্মাণের শর্ত এবং কারিগরি নিরাপত্তা নিয়ে গুরুতর প্রশ্ন রয়েছে। তাই শেয়ারভিত্তিক আবাসন প্রকল্পের আওতায় নির্মিত ভবনগুলো সংশ্লিষ্ট নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষের মাধ্যমে স্বাধীন, নিরপেক্ষ ও কারিগরি যাচাই করা জরুরি।

রিহ্যাবের পক্ষ থেকে বলা হয়, একটি নিরাপদ ভবন নির্মাণের জন্য শুধু প্রকল্পের অনুমোদন থাকলেই হয় না। এর পাশাপাশি কাঠামোগত নকশা, ভিত্তির সক্ষমতা, নির্মাণসামগ্রীর মান, অগ্নিনিরাপত্তা, পানি ও পয়োনিষ্কাশন ব্যবস্থা এবং নির্মাণের প্রতিটি পর্যায়ে পেশাদার তদারকি নিশ্চিত করা প্রয়োজন। কিন্তু শেয়ারভিত্তিক আবাসন প্রকল্পের অনেক ক্ষেত্রে এসব বিষয় যথাযথভাবে অনুসরণ করা হচ্ছে কি না, তা নিয়ে সংশয় রয়েছে।

সংবাদ সম্মেলনে সম্প্রতি প্রকাশিত একটি অনুসন্ধানী প্রতিবেদনের তথ্যও তুলে ধরা হয়। সেখানে বলা হয়েছে, ৩০ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত জমির শেয়ারভিত্তিক আবাসন প্রকল্পে প্রতারণার অভিযোগে ৯ হাজার ৮২৩টি মামলা বিচারাধীন রয়েছে। এসব মামলায় প্রায় ৪০ হাজার ক্রেতা এবং প্রায় ১২ হাজার কোটি টাকা সংশ্লিষ্ট বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। রিহ্যাবের মতে, এই পরিসংখ্যান আবাসন খাতে ক্রেতাদের সুরক্ষা এবং কার্যকর নজরদারি নিশ্চিত করার প্রয়োজনীয়তাকে স্পষ্ট করেছে।

রিহ্যাব জানায়, জমির শেয়ার কিনলেই নির্দিষ্ট ফ্ল্যাটের আইনগত মালিকানা নিশ্চিত হয় না। জমির অবিভক্ত অংশের মালিকানা থাকলেও ভবিষ্যতে নির্দিষ্ট ফ্ল্যাটের মালিকানা প্রতিষ্ঠা, বিক্রি, ব্যাংকে বন্ধক রাখা কিংবা উত্তরাধিকারীদের মধ্যে সম্পত্তি বণ্টনে জটিলতা তৈরি হতে পারে।

এ ছাড়া প্রকল্পের যথাযথ অনুমোদন, অনুমোদিত নকশা এবং আইনগত নির্মাণ অধিকার নিশ্চিত না করেই অর্থ সংগ্রহের অভিযোগ রয়েছে। দক্ষ প্রকৌশলী, স্থপতি ও পেশাদার নির্মাণ তদারকির অভাবে ভবনের কাঠামোগত নিরাপত্তা এবং নির্মাণমানও ঝুঁকির মুখে পড়ছে।

সংগঠনটি আরও জানায়, অনেক ক্ষেত্রে জমির মূল্য, শেয়ার বিক্রি, অর্থ সংগ্রহ ও নির্মাণ ব্যয়ের হিসাব স্বচ্ছ থাকে না। ফলে এসব অর্থের যথাযথ ব্যবহার এবং প্রযোজ্য আয়কর, ভ্যাট, নিবন্ধন ফি ও অন্যান্য সরকারি রাজস্ব পরিশোধ করা হচ্ছে কি না, তা নিয়েও প্রশ্ন রয়েছে।

অন্যদিকে প্রচলিত আইন মেনে ব্যবসা পরিচালনাকারী ডেভেলপার প্রতিষ্ঠানগুলোকে জমির মালিকানা, প্রকল্প অনুমোদন, নকশা, নির্মাণবিধি, প্রকৌশলগত নিরাপত্তা, কর ও ভ্যাটসহ সব ধরনের আইনগত বাধ্যবাধকতা পূরণ করতে হয়। কোনো ব্যত্যয় ঘটলে তাদের বিরুদ্ধে প্রশাসনিক ও আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হয়। কিন্তু শেয়ারভিত্তিক মালিকানার নামে পরিচালিত কিছু প্রকল্পে একই মাত্রার তদারকি ও আইন প্রয়োগ হচ্ছে কি না, তা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। এতে নিয়ম মেনে ব্যবসা পরিচালনাকারী প্রতিষ্ঠানগুলো অসম প্রতিযোগিতার মুখে পড়ছে।

জমির মালিকানা, শেয়ার বিক্রি, ফ্ল্যাট বরাদ্দ, নির্মাণ ব্যয় ও দখল নিয়ে ক্রেতাদের মধ্যে বিরোধ তৈরি হচ্ছে। এসব বিরোধ আদালত পর্যন্ত গড়াচ্ছে। ফলে ক্রেতাদের আর্থিক ক্ষতির পাশাপাশি পারিবারিক বিরোধ ও সামাজিক অস্থিরতাও বাড়ছে বলে মনে করছে রিহ্যাব।

সরকারের কাছে ৬ দফা দাবি

আবাসন খাতে শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠা, ক্রেতাদের অর্থ ও মালিকানা সুরক্ষা এবং নিরাপদ ভবন নির্মাণ নিশ্চিত করতে সরকারের কাছে ছয় দফা দাবি জানিয়েছে রিহ্যাব।

দাবিগুলোর মধ্যে রয়েছে, জমির শেয়ার বিক্রি করে নির্দিষ্ট ফ্ল্যাট দেওয়ার প্রতিশ্রুতিনির্ভর অনিয়ন্ত্রিত আবাসন ব্যবসায়িক মডেল বন্ধ করা এবং প্রয়োজনীয় আইনগত পর্যালোচনার মাধ্যমে এ ধরনের কার্যক্রম নিষিদ্ধ করা। প্রকল্পের জমির মালিকানা, নিবন্ধন, দায়-দেনা, অনুমোদিত নকশা ও নির্মাণের আইনগত অধিকার নিশ্চিত না করে কোনো ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানকে ফ্ল্যাট দেওয়ার প্রতিশ্রুতিতে অর্থ সংগ্রহ করতে না দেওয়া।

এ ছাড়া শেয়ারভিত্তিক আবাসন প্রকল্পের আওতায় নির্মিত ভবনগুলোতে জরুরি ভিত্তিতে স্বাধীন কারিগরি ও আইনগত নিরীক্ষা করার দাবি জানিয়েছে সংগঠনটি। অনুমোদিত নকশা ও বাস্তব নির্মাণের তুলনামূলক তথ্য যাচাই করে প্রয়োজনীয় ক্ষেত্রে তা প্রকাশ করার কথাও বলা হয়েছে।

একই জমি বা জমির অংশ একাধিকবার বিক্রি, জাল দলিল, ভুয়া অনুমোদন, অর্থ আত্মসাৎ ও প্রতারণার অভিযোগ নিরপেক্ষভাবে তদন্ত করে প্রমাণিত অপরাধের ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানিয়েছে রিহ্যাব।

পাশাপাশি প্রতিটি প্রকল্পে জমি ক্রয়, অর্থ সংগ্রহ, নির্মাণ ব্যয়, প্রকল্পের অগ্রগতি এবং ক্রেতাদের অর্থ ব্যবহারের বিষয়ে স্বচ্ছ ও নিরীক্ষাযোগ্য হিসাব নিশ্চিত করতে হবে। প্রযোজ্য কর, ভ্যাট ও অন্যান্য সরকারি রাজস্ব পরিশোধের বিষয়টিও যাচাই করতে হবে।

প্রতিটি প্রকল্পে দায়িত্বশীল ডেভেলপার, যোগ্য স্থপতি, প্রকৌশলী ও প্রয়োজনীয় পেশাদার জনবল নিয়োগ এবং নির্মাণের প্রতিটি পর্যায়ে গুণগত মান ও নিরাপত্তা তদারকির ব্যবস্থাও নিশ্চিত করার আহ্বান জানিয়েছে সংগঠনটি।

রিহ্যাব প্রেসিডেন্ট ড. আলী আফজাল বলেন, কোনো বৈধ যৌথ মালিকানা বা স্বচ্ছ বিনিয়োগ ব্যবস্থার বিরোধিতা করছে না রিহ্যাব। তবে জমির অংশীদারত্ব বা যৌথ উদ্যোগের নামে এমন কোনো ব্যবসায়িক মডেল পরিচালিত হতে পারে না, যেখানে অর্থের বিপরীতে নির্দিষ্ট ফ্ল্যাটের অধিকার, বৈধ মালিকানা, নির্মাণের দায় এবং চূড়ান্ত হস্তান্তরের কার্যকর নিশ্চয়তা নেই। একই সঙ্গে সরকারি রাজস্ব পরিশোধ ও প্রচলিত আইন অনুসরণের বাধ্যবাধকতাও নিশ্চিত করতে হবে।

তিনি আরও বলেন, শেয়ারভিত্তিক অনিয়ন্ত্রিত আবাসন ব্যবসার সমস্যা শুধু আবাসন খাতের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। এর সঙ্গে সাধারণ মানুষের সারা জীবনের সঞ্চয়, আবাসনের নিরাপত্তা, সরকারি রাজস্ব, দেশের বিনিয়োগ পরিবেশ এবং সামগ্রিক অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা জড়িত। এখনই যথাযথ পদক্ষেপ না নিলে ভবিষ্যতে এর আর্থিক, সামাজিক ও আইনি ক্ষতির বোঝা রাষ্ট্র ও সাধারণ মানুষকে বহন করতে হবে।

সংবাদ সম্মেলন শেষে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে রিহ্যাবের সিনিয়র ভাইস প্রেসিডেন্ট আব্দুর রাজ্জাক বলেন, তদন্তের নামে প্রায় তিন মাস ধরে দেশের আবাসন খাতের শীর্ষ বাণিজ্য সংগঠন রিহ্যাবের স্বাভাবিক কার্যক্রম বাধাগ্রস্ত হচ্ছে।

তিনি বলেন, বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের চলমান তদন্তের প্রতি রিহ্যাবের পূর্ণ সহযোগিতা রয়েছে। তবে তদন্তের অজুহাতে একটি জাতীয় পর্যায়ের বাণিজ্য সংগঠনের নেতৃত্ব, প্রশাসনিক কার্যক্রম ও নিয়মিত সাংগঠনিক সিদ্ধান্ত দীর্ঘদিন অনিশ্চয়তার মধ্যে রাখা কোনোভাবেই কাম্য ও যৌক্তিক নয়। অভিযোগের সত্যতা যাচাই করে প্রয়োজনীয় সিদ্ধান্ত নেওয়া সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের দায়িত্ব।

আব্দুর রাজ্জাক বলেন, ‘একটি সংগঠনের নেতৃত্ব, প্রশাসনিক কার্যক্রম ও নিয়মিত সাংগঠনিক সিদ্ধান্ত যদি দীর্ঘদিন অনিশ্চয়তার মধ্যে থাকে, তাহলে সেই সংগঠন কীভাবে তার সদস্যদের স্বার্থ রক্ষা করবে? আমরা মনে করি, তদন্ত চলতে পারে, কিন্তু সে কারণে সংগঠনের স্বাভাবিক কার্যক্রম বন্ধ বা বাধাগ্রস্ত থাকার কোনো যৌক্তিকতা নেই।’

এ সময় রিহ্যাবের নেতারা বলেন, বাণিজ্য মন্ত্রণালয় দেশের বাণিজ্য সংগঠনগুলোর নিয়ন্ত্রক ও তদারককারী কর্তৃপক্ষ। রিহ্যাব সবসময় সরকারের সহযোগী হিসেবে কাজ করেছে এবং ভবিষ্যতেও করবে। মন্ত্রণালয়ের যে কোনো আইনসংগত নির্দেশনা ও তদন্ত কার্যক্রমে সহযোগিতা করতে প্রস্তুত সংগঠনটি। তবে সংগঠনের প্রশাসনিক ও সাংগঠনিক কার্যক্রমের বিষয়ে বিদ্যমান অনিশ্চয়তা দূর করতে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের কার্যকর উদ্যোগ প্রয়োজন।

সংবাদ সম্মেলনে রিহ্যাবের ভাইস প্রেসিডেন্ট-২ আবু খালিদ মো. বরকত উল্লাহ, ভাইস প্রেসিডেন্ট-৩ এ এফ এম ওবায়দুল্লাহ, ভাইস প্রেসিডেন্ট (ফিন্যান্স) ড. মো. হারুন অর রশিদসহ সংগঠনটির পরিচালক ও অন্যান্য নেতা উপস্থিত ছিলেন। এ ছাড়া রিহ্যাবের প্রেস অ্যান্ড মিডিয়া কমিটির সদস্য সঞ্জয় চক্রবর্তী এবং সংগঠনের সদস্য শফিকুল ইসলাম বাদল উপস্থিত ছিলেন।