logo

পাচার হওয়া ৪৪ কোটি টাকা যেভাবে ফেরত আনল সিআইডি

পাচার হওয়া ৪৪ কোটি টাকা যেভাবে ফেরত আনল সিআইডি

আন্তর্জাতিক অনলাইন বিনিয়োগ প্ল্যাটফর্‌ম এমটিএফই (মেটারভার্স ফরেন এক্সচেঞ্জ)-এর মাধ্যমে পাচার হওয়া বিপুল অর্থের একটি অংশ উদ্ধার করেছে অপরাধ তদন্ত বিভাগ (সিআইডি)। উদ্ধারকৃত অর্থের পরিমাণ প্রায় ৩৬ লাখ ২২ হাজার ৯৯৮ মার্কিন ডলার, যা বাংলাদেশি মুদ্রায় প্রায় ৪৪ কোটি ১৪ লাখ টাকার বেশি।

সোমবার (৩০ মার্চ) দুপুরে রাজধানীর মালিবাগে সিআইডির সদর দপ্তরে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে সংস্থাটির সাইবার পুলিশ সেন্টারের (সিপিসি) ডিআইজি মো. আবুল বাশার তালুকদার এ তথ্য জানান।

তিনি বলেন, ‘MTFE Ponzi Scheme’-এর মাধ্যমে প্রতারণার অভিযোগে ২০২৩ সালের ২৮ আগস্ট খিলগাঁও থানায় একটি মামলা দায়ের করা হয়। মামলায় এক ভুক্তভোগী প্রায় ২ লাখ টাকা বিনিয়োগ করে প্রতারিত হওয়ার অভিযোগ করেন। তবে তদন্তে দেখা গেছে, এই প্ল্যাটফর্মের মাধ্যমে অসংখ্য বিনিয়োগকারী কোটি কোটি টাকার প্রতারণার শিকার হয়েছেন।

সিআইডির তদন্তের বরাত দিয়ে তিনি জানা যায়, ২০২২ সালের জুন মাস থেকে বাংলাদেশে কার্যক্রম শুরু করে এমটিএফই। ফেসবুক ও ইউটিউবে বিজ্ঞাপনের মাধ্যমে দ্রুত মুনাফার প্রলোভন দেখিয়ে বিনিয়োগকারীদের আকৃষ্ট করা হতো। ব্যবহারকারীদের ভার্চুয়াল ট্রেডিং অ্যাকাউন্টে ডিজিটাল ডলার প্রদর্শন করা হলেও বাস্তবে এসব লেনদেন ছিল সম্পূর্ণ ভুয়া। কৃত্রিমভাবে লাভ দেখিয়ে নতুন বিনিয়োগ সংগ্রহই ছিল তাদের মূল কৌশল।

 

প্রতারণার কৌশলের অংশ হিসেবে শুরুতে কিছু অর্থ ফেরত দিয়ে বিনিয়োগকারীদের আস্থা অর্জন করে চক্রটি। পরবর্তীতে ২০২৩ সালের মাঝামাঝি সময়ে হঠাৎ কার্যক্রম বন্ধ করে তারা উধাও হয়ে যায়। পরে বিনিয়োগকারীদের অর্থ বিভিন্ন ক্রিপ্টোকারেন্সি ওয়ালেটের মাধ্যমে বিদেশে পাচার করা হয়।

তদন্তে আরও জানা যায়, প্রতারণার মাধ্যমে আদায়কৃত প্রায় ৩ দশমিক ৬ মিলিয়ন ইউএসডিটি আন্তর্জাতিক ক্রিপ্টোকারেন্সি এক্সচেঞ্জ ওকেএক্স-এ সংরক্ষিত ছিল। ব্লকচেইন বিশ্লেষণ টুল ব্যবহার করে এ অর্থের সঙ্গে প্রতারণা চক্রের সংশ্লিষ্টতা নিশ্চিত করা হয়। পরবর্তীতে ওকেএক্স-এর লিগ্যাল টিমের সঙ্গে যোগাযোগ করে আইনগত প্রক্রিয়ায় অর্থ ফেরতের উদ্যোগ নেয় সিআইডি।

আদালতের নির্দেশনায় রাষ্ট্রায়ত্ত সোনালী ব্যাংকের মালিবাগ শাখায় সিআইডির নামে একটি সরকারি হিসাব খোলা হয়। একই সঙ্গে যুক্তরাজ্যভিত্তিক অ্যাসেট রিয়েলিটি লিমিটেডের সঙ্গে চুক্তির মাধ্যমে পাচার হওয়া ক্রিপ্টোকারেন্সি বৈধ মুদ্রায় রূপান্তরের ব্যবস্থা করা হয়। সব প্রক্রিয়া শেষে উদ্ধারকৃত অর্থ সোনালী ব্যাংকের ওই হিসাবে জমা হয়েছে বলে জানায় সিআইডি।

সিআইডি জানায়, যুক্তরাষ্ট্রসহ সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংস্থার সহযোগিতা এবং কূটনৈতিক সহায়তার ফলে তুলনামূলক স্বল্প সময়ে এই অর্থ উদ্ধার সম্ভব হয়েছে। বর্তমানে মামলার তদন্ত কার্যক্রম চলমান রয়েছে। ভুক্তভোগীদের শনাক্ত করে আদালতের নির্দেশনা অনুযায়ী তাদের মধ্যে অর্থ ফেরত দেওয়ার প্রক্রিয়া শুরু করা হবে। পাশাপাশি পাচার হওয়া অবশিষ্ট অর্থ শনাক্ত ও উদ্ধারে অভিযান অব্যাহত রয়েছে।

সংবাদ সম্মেলনে ডিআইজি আবুল বাশার তালুকদার বলেন, উচ্চ মুনাফার প্রলোভনে পড়ে দেশের অনেক মানুষ সর্বস্ব হারাচ্ছেন। অনেকেই টাকা, স্বর্ণালংকার এমনকি জমিজমা বিক্রি করে এসব স্কিমে বিনিয়োগ করেন। পরবর্তীতে তারা নিঃস্ব হয়ে পড়েন। সামাজিক মর্যাদার ভয়ে অনেক ভুক্তভোগী আইনের আশ্রয়ও নেন না।

তিনি গণমাধ্যমের প্রতি আহ্বান জানিয়ে বলেন, সচেতনতা বৃদ্ধির মাধ্যমে এ ধরনের প্রতারণা রোধ করা সম্ভব। ভুক্তভোগীর সংখ্যা সম্পর্কে তিনি বলেন, সঠিক সংখ্যা নির্ধারণ করা কঠিন। কারণ অনেকেই এখনো অভিযোগ জানাননি। তবে সিআইডি ভুক্তভোগীদের অর্থ ফেরত দিতে কাজ করে যাচ্ছে।