জুলাইকে ব্যঙ্গের অভিযোগে বাংলা একাডেমিতে তোপের মুখে মোহন রায়হান

বাংলা একাডেমি পুরস্কার ঘিরে কিছুদিন আগেই কবি মোহন রায়হানকে নিয়ে নানা আলোচনা-সমালোচনার সূত্রপাত ঘটে। তার রেশ না কাটতেই বৃহস্পতিবার (২৩ জুলাই) বিকেলে বাংলা একাডেমির স্বরচিত কবিতাপাঠ অনুষ্ঠানে উপস্থিত কবি-সাহিত্যিকদের তোপের মুখে পড়েন তিনি। তাদের অভিযোগ, ওই আয়োজনে মোহন রায়হানের একটি কবিতায় জুলাই গণ-অভ্যুত্থানকে ব্যঙ্গাত্মকভাবে তুলে ধরা হয়েছে।
পরে অবশ্য এর একটি ব্যাখ্যা দিয়েছেন মোহন রায়হান। তার অভিযোগ, একটি পক্ষ তার কবিতাকে ভুলভাবে ব্যাখ্যা করে অপপ্রচার চালাচ্ছে। অন্যদিকে কবি সাইয়্যেদ জামিল, আহমেদ ইসহাক ও তানজিনা ফেরদৌসসহ প্রতিবাদকারীরা বলছেন, জুলাইবিরোধী বক্তব্যের প্রতিবাদ করা তাদের গণতান্ত্রিক অধিকার।
বাংলা একাডেমিতে কী ঘটেছিল?
বাংলা একাডেমির কবি শামসুর রাহমান সেমিনার কক্ষে অনুষ্ঠিত এ আয়োজনে জুলাই গণ-অভ্যুত্থান নিয়ে স্বরচিত কবিতা পাঠ করেন দেশের ৯০ জন কবি। একাডেমির মহাপরিচালক অধ্যাপক মোহাম্মদ আজমের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত এই আয়োজনে উপস্থিত ছিলেন কবি আবদুল হাই শিকদার, মতিন বৈরাগী, মাহবুব হাসান ও জাকির আবু জাফরের মতো খ্যাতিমান কবি-সাহিত্যিকরা।
এক পর্যায়ে ‘জুলাই এখন’ শীর্ষক কবিতায় পাঠ করেন অনুষ্ঠানের অতিথি জাতীয় কবিতা পরিষদের সভাপতি মোহন রায়হান। এ সময় তার কবিতায় জুলাই গণ-অভ্যুত্থান নিয়ে ব্যঙ্গাত্মক উপস্থাপনার অভিযোগ এনে প্রতিবাদ জানান উপস্থিত কবি-সাহিত্যিকদের অনেকে।
পরিস্থিতি উত্তপ্ত হয়ে উঠলে মোহন রায়হানের হাত থেকে মাইক্রোফোন কেড়ে নেন কবি আহমেদ ইসহাক। এ সময় তিনি বলেন, ‘আজ থেকে এখানে এই মোহন রায়হান আওয়ামী লীগের দালালকে বাংলা একাডেমিতে আমরা নিষিদ্ধ ঘোষণা করলাম।’ এরপর ‘ইনকিলাব ইনকিলাব, জিন্দাবাদ জিন্দাবাদ’, ‘আবু সাঈদ মুগ্ধ, শেষ হয়নি যুদ্ধ’ এমন নানা স্লোগান দেন তিনি।
এর মধ্যেই মঞ্চে বসে থাকা মোহন রায়হান বলেন, ‘কবিতার শেষ শুনতে হবে, এটা আওয়ামী লীগের কবিতা নয়। কবিতার শেষ শুনতে হবে।’
হট্টগোলের মধ্যে মাইক হাতে নিয়ে কবি সাইয়েদ জামিল বলেন, ‘গণতান্ত্রিকভাবে আমরা প্রতিবাদ জানালাম। মতপ্রকাশের স্বাধীনতার জন্যও যেহেতু জুলাই হয়েছে, আমরা বিরোধী কণ্ঠও রোধ করতে চাই না। সুতরাং মোহন রায়হান বাকি কবিতা শেষ করবেন।’
পরে কবিতাপাঠ শেষ করেন মোহন রায়হান। এরপর বাংলা একাডেমির মহাপরিচালকের অনুমতি নিয়ে নিয়ে আত্মপক্ষ সমর্থন করে তিনি বলেন, ‘জীবনের প্রথম এবার ধানের শীষে ভোট দিয়েছি। ১৯৭২ সালের ১০ জানুয়ারির পর কোনোদিন শেখ মুজিবকে ‘বঙ্গবন্ধু’ বলিনি। কোনোদিন আওয়ামী লীগ করিনি। জাসদ করতাম ২০ বছর আগে। হাসিনার পতনের পর আমি জাসদ অফিস দখল করি। বর্তমান আইনমন্ত্রী আমার শিষ্য।’
এ সময় প্রতিবাদকারী এক কবির প্রশ্নের মুখে মোহন রায়হান স্বীকার করেন, একসময় তিনি শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানকে কর্নেল তাহেরের ‘খুনি’ আখ্যায়িত করে কবিতা লিখেছিলেন।
জুলাইবিরোধী কোনো কবিতা পাঠ করিনি: মোহন রায়হান
বাংলা একাডেমিতে বৃহস্পতিবার পাঠ করা কবিতাটি জুলাইয়ের বিরুদ্ধে নয়, বরং এটি ছিল এই গণ-অভ্যুত্থানের পক্ষের কবিতা। এশিয়া পোস্টের সঙ্গে আলাপকালে এমন দাবি করেছেন কবি মোহন রায়হান।
তিনি বলেন, ‘তারা আমার পুরো কবিতা না শুনেই আওয়ামী লীগের কবিতা বলে চালিয়ে দেওয়ার অপচেষ্টা চালিয়েছে। আমি কবিতায় বলেছি যে, জুলাই নিয়ে আমাদের যে স্বপ্ন-আকাঙ্ক্ষা, শহীদদের স্বপ্ন, সেটা এখন ঝুলে আছে। জুলাইয়ের মধ্য দিয়ে ধর্ম ব্যবসায়ী, ৭১-এর পরাজিত শক্তির পুনরুত্থান হয়েছে। কবিতায় ‘জুলাই এখন হাসপাতালের আইসিইউতে, জীবন-মৃত্যুর সন্ধিক্ষণে’ যেমন বলেছি তোমনি ‘জুলাই কখনও বৃথা যেতে পারে না’ এটাও বলেছি। কিন্তু জামায়াতের লোকেরা উঠে বলছেন, ‘আপনি কবিতা পড়তে পারবেন না।’ আমি বলেছি, ‘আমি কবিতা পড়ব।’ তারা হইচই করছেন, কিন্তু আমি দাঁড়িয়ে তাদের বিরুদ্ধে বক্তৃতা দিয়ে কবিতা পড়ে নেমেছি। আমার স্পষ্ট অভিযোগ, স্বাধীনতাবিরোধী শক্তি এবং যারা জুলাই ব্যবসায়ী, তারাই বাধা দিচ্ছে। আমি ওদের ভয় পাই না, রাজাকার ও স্বাধীনতাবিরোধীদের সঙ্গে কোনো আপস নেই।’
মোহন রায়হানের দাবি, যারা তার কবিতা পাঠে বাধা দিয়েছেন, তাদের তিনি চেনেন না। কিন্তু তার ধারণা, তারা ‘স্বাধীনতাবিরোধী’ এবং ‘জুলাই ব্যবসায়ী’। কারণ, স্বাধীনতাবিরোধী শক্তির পুনরুত্থানের অংশ পাঠের সময়েই তাকে বাধা দেওয়া হয়।
জুলাইকে ধারণ করে প্রতিবাদ করেছি: আহমেদ ইসহাক
বাংলা একাডেমিতে সেদিন প্রতিবাদকারীদের মধ্যে যারা সবচেয়ে সরব ছিলেন তাদের একজন কবি আহমেদ ইসহাক। তিনি এশিয়া পোস্টকে বলেন, ‘বাংলা একাডেমিতে জুলাই গণ-অভ্যুত্থানবিষয়ক স্বরচিত কবিতা পাঠের অনুষ্ঠানে মঞ্চ থেকে তিনি (মোহন রায়হান) যখন কবিতা পড়তে উঠলেন, তখন একদমই আওয়ামী বয়ানের একটি জুলাইবিরোধী কবিতা পাঠ শুরু করলেন। মনে হচ্ছিল ভারত থেকে শেখ হাসিনার লিখে দেওয়া বক্তব্য তিনি পাঠ করছেন। জুলাই গণহত্যার প্রত্যক্ষদর্শী একজন সংগঠক হিসেবে প্রতিবাদ জানানো জরুরি মনে করেছি। সেখানে উপস্থিত দু-একজন ছাড়া বাকি সবাই এর প্রতিবাদ জানিয়েছেন।’
আহমেদ ইসহাক বলেন, ‘যেহেতু উপস্থিত প্রায় সবাই জুলাইয়ের কর্মী, তাই স্বভাবতই তারা প্রতিবাদ জানিয়েছেন। ‘ইনকিলাব জিন্দাবাদ’ স্বাধীনতাবিরোধীদের স্লোগান, ৭১-এর পরাজিত শক্তি জুলাই অভ্যুত্থান ঘটিয়েছে। তিনি (মোহন রায়হান) এমন কথাবার্তা বলার চেষ্টা করছিলেন। জুলাই অভ্যুত্থানে সক্রিয় একজন কবি হিসেবে আমি মঞ্চে উঠে তাকে অবাঞ্ছিত ঘোষণা করি।’
তিনি বলেন, ‘একাত্তরের ধারাবাহিকতা হলো চব্বিশ। মুক্তিযুদ্ধের পর কিন্তু ’৭৪ সালে দুর্ভিক্ষ হয়েছে, একদলীয় শাসন কায়েম হয়েছে। একাত্তরের আকাঙ্ক্ষা পূর্ণ হয়নি। তাই বলে আমরা কি একাত্তরের বিরুদ্ধে কবিতা লিখতে পারি? মোহন রায়হানের আলোচ্য কবিতার ‘জুলাই’র স্থলে ‘একাত্তর’ বসিয়ে পাঠ করার আহ্বান জানাই। তাহলেই স্পষ্ট হবে যে, এটি জুলাইয়ের মূল্যবোধের পরিপন্থি কবিতা।’
বাংলা একাডেমির মহাপরিচালকের বক্তব্য
অনুষ্ঠানের শেষ পর্যায়ে সভাপতির বক্তব্যে বাংলা একাডেমির মহাপরিচালক অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ আজম বলেন, ‘একটি কবিতাকে কেন্দ্র করে যা ঘটল এটি প্রমাণ করে যে, জুলাই এখনও জীবিত। কবি মোহন রায়হান কবিতার ক্রিটিক্যাল পজিশন থেকেও শেষাংশে জুলাইয়ের মাহাত্ম্য প্রকাশ করেছেন। তবে কবিতার প্রথমাংশে যে প্রতিবাদ উপস্থিত অনেকে করেছেন, আমি মনে করি তারও ন্যায্যতা আছে। কারণ, জুলাইকে আপনারা জীবন্ত ভঙ্গিতে দেখতে চান।’
ড. মোহাম্মদ আজম বলেন, ‘অনুষ্ঠানে পঠিত কবিতার ধরন, চিত্রকল্প, ছন্দ, রিদম ও উচ্চারণে জুলাইয়ের যে প্রকাশ কবিরা করেছেন, তা অন্তর্নিহিত স্বতঃস্ফূর্ত কবিসত্ত্বার বহিঃপ্রকাশ, এখানে আরোপিত কিছু নেই।’
তিনি বলেন, জুলাইয়ে বহু মত-পথের সার্বজনীন জাগরণ ঘটেছিল। কালচারাল পলিটিক্স গড়ে উঠেছিল বলেই জুলাই সম্ভব হয়েছে।
এর আগে গত ফেব্রুয়ারিতে বাংলা একাডেমি সাহিত্য পুরস্কার ২০২৫–এর জন্য মনোনীত হয়েও নানা বিতর্কের মুখে শেষ পর্যন্ত পুরস্কার হাতে পাননি কবি মোহন রায়হান। তখন সংস্কৃতিমন্ত্রী নিতাই রায় চৌধুরী সংবাদমাধ্যমকে বলেছিলেন, ‘মোহন রায়হানের বিরুদ্ধে বেশকিছু অভিযোগ আছে। এসব বিষয় খতিয়ে দেখে আবার পুরস্কার ঘোষণা করা হবে।’ পরে নতুন করে পুরস্কারের জন্য তার নাম ঘোষণা করা হলেও প্রধানমন্ত্রী ছাড়া আর কারও হাত থেকে পুরস্কার না নেওয়ার ঘোষণা দেন তিনি। ফলে শেষ পর্যন্ত পুরস্কারের বিষয়টি অমীমাংসিত থেকে যায়।
.png)







