Advertisement

রাষ্ট্রপতি নির্বাচন নিয়ে ৫৭ নেতার বিবৃতি

এশিয়া পোস্ট প্রতিবেদক
রাষ্ট্রপতি নির্বাচন নিয়ে ৫৭ নেতার বিবৃতি
রাষ্ট্রপতির সরকারি বাসভবন বঙ্গভবন। ছবি: সংগৃহীত

গণঅভ্যুত্থান-পরবর্তী বাংলাদেশে রাষ্ট্রপতি নির্বাচনকে দলীয়করণ এবং সংবিধানের ৭০ অনুচ্ছেদের অপব্যাখ্যা বন্ধের দাবি জানিয়েছেন দেশের রাজনৈতিক ও সামাজিক নেতারা। রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ সাংবিধানিক পদকে দলীয় দর-কষাকষি ও আনুগত্যের রাজনীতির অধীন করা জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের আকাঙ্ক্ষা ও আত্মত্যাগের প্রতি অবমাননাকর বলে মনে করেন তারা।

Advertisement

মঙ্গলবার (১৮ আগস্ট) এশিয়া পোস্টকে পাঠানো এক যৌথ বিবৃতিতে তারা এ কথা জানান।

বিবৃতিতে বলা হয়েছে, রাষ্ট্রপতি প্রজাতন্ত্রের সর্বোচ্চ সাংবিধানিক পদ এবং জাতীয় ঐক্যের প্রতীক। অথচ গণ-অভ্যুত্থানের পর রাষ্ট্রপতির পদকে দলীয় সংকীর্ণতার ঊর্ধ্বে তুলে জাতীয় ঐক্যের কেন্দ্রে প্রতিষ্ঠার যে ঐতিহাসিক সম্ভাবনা সৃষ্টি হয়েছিল, সরকারি দল ও ১১-দলীয় জোটের মধ্যকার সমঝোতা, দলীয় স্বার্থ ও আভিজাত্য রক্ষার রাজনীতি সেই সম্ভাবনাকে নস্যাৎ করছে।

‘রাষ্ট্রপতি নির্বাচনকে দলীয় আনুগত্যের পরীক্ষায় পরিণত করা সংবিধানের লঙ্ঘন’ উল্লেখ করে বিবৃতিতে বলা হয়, সংবিধানের ৪৮(১) অনুচ্ছেদে সংসদ সদস্যদের রাষ্ট্রপতির নির্বাচকমণ্ডলী হিসেবে নির্ধারণ করা হলেও রাষ্ট্রপতি নির্বাচন সংসদের কোনো সিদ্ধান্ত গ্রহণের প্রক্রিয়া নয়; এটি নির্বাচন কমিশনের অধীনে অনুষ্ঠিত একটি স্বতন্ত্র সাংবিধানিক নির্বাচন। অতএব রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে সংসদ সদস্যের ভোটকে স্বয়ংক্রিয়ভাবে সংসদে দলের বিপক্ষে ভোট হিসেবে গণ্য করার কোনো সাংবিধানিক ভিত্তি নেই।

নেতারা আরও জানান, বিশেষভাবে উদ্বেগের বিষয়, সরকারের পক্ষে চিফ হুইপ রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে ৭০ অনুচ্ছেদ প্রযোজ্য এবং দলীয় সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে ভোট দিলে সংসদ সদস্যের আসন শূন্য হবে—এমন বক্তব্য দিয়েছেন। আমরা মনে করি, এ বক্তব্য ৭০ অনুচ্ছেদের আক্ষরিক ভাষা এবং ৪৮(১), ১১৯ অনুচ্ছেদ ও রাষ্ট্রপতি নির্বাচন আইন, ১৯৯১-এর সমন্বিত সাংবিধানিক কাঠামো সম্পর্কে গুরুতর বিভ্রান্তি সৃষ্টি করেছে। সংসদ সদস্যের প্রতিটি ভোটকে ‘সংসদে প্রদত্ত ভোট’ হিসেবে অভিহিত করা ৭০ অনুচ্ছেদের সাংবিধানিক প্রয়োগ ক্ষেত্রকে অযৌক্তিকভাবে সম্প্রসারিত করার শামিল।

আরও উদ্বেগজনক হলো, গণ-অভ্যুত্থানের পক্ষে লড়াই করা শক্তি, জুলাই গণঅভ্যুত্থানের শহীদ পরিবার ও আহতদের প্রতিনিধিদের সঙ্গে কোনো অর্থবহ আলোচনা ছাড়াই রাষ্ট্রপতি পদকে দলীয় সমীকরণের সংকীর্ণ পথে পরিচালিত করার উদ্যোগ। গণ-অভ্যুত্থান যে নতুন রাজনৈতিক বন্দোবস্তের প্রত্যাশা সৃষ্টি করেছে, তার কেন্দ্রে থাকার কথা ছিল প্রজাতন্ত্র—কোনো দল বা দলীয় অভিজাত্য নয়।

বিবৃতিতে বলা হয়, আমরা স্পষ্টভাবে বলতে চাই, রাষ্ট্রপতি কোনো দলের রাষ্ট্রপতি নন; তিনি প্রজাতন্ত্রের রাষ্ট্রপতি। অতএব, রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে দলীয় আনুগত্যকে সাংবিধানিক বাধ্যবাধকতা হিসেবে প্রতিষ্ঠার চেষ্টা রাষ্ট্রপতি পদের নিরপেক্ষতা, মর্যাদা এবং জাতীয় ঐক্যের সাংবিধানিক ধারণাকে দুর্বল করে।

৫৭ রাজনৈতিক ও সামাজিক নেতার দাবি

১. ৭০ অনুচ্ছেদ সংস্কার করে এর আওতা কেবল অর্থবিল ও অনাস্থা ভোটে সীমিত করতে হবে।

২. জুলাই জাতীয় সনদ ও ৩১ দফায় সরকারি দলের অঙ্গীকার ভঙ্গ করে ৭০ অনুচ্ছেদের বিদ্যমান আওতা প্রসারিত করে। রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে প্রয়োগের অপচেষ্টা বন্ধ করতে হবে।

৩. নির্বাচন কমিশনকে সাংবিধানিক ব্যাখ্যা দিতে হবে: রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে ৭০ অনুচ্ছেদের প্রযোজ্যতা সম্পর্কে নির্বাচন কমিশনকে অবিলম্বে সুস্পষ্ট, নিরপেক্ষ ও সাংবিধানিক ব্যাখ্যা ভোটার ও দেশবাসীর সামনে উপস্থাপন করতে হবে। ভোটারদের মনে ভয়, সংশয় ও বিভ্রান্তি রেখে রাষ্ট্রপতি নির্বাচন সম্পন্ন করা গ্রহণযোগ্য নয়। সংসদ সদস্যদের স্বাধীনভাবে ভোট দেওয়ার সাংবিধানিক পরিসর সম্পর্কে নির্বাচন কমিশনকে তার যথাযথ ভূমিকা পালন করতে হবে।

৪. সংসদ সদস্যদের বিবেকের স্বাধীনতা নিশ্চিত করতে হবে: ত্রয়োদশ সংসদের সব সংসদ সদস্যকে দলীয় চাপ, ভয় ও আনুগত্যের ঊর্ধ্বে উঠে তাদের সাংবিধানিক বিবেক, স্বাধীন বিচারবোধ এবং প্রজাতন্ত্রের প্রতি দায়বদ্ধতা থেকে ভোট দেওয়ার আহ্বান জানাচ্ছি। রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে বিবেকের স্বাধীনতা কোনো অপরাধ নয়; বরং এটি প্রজাতন্ত্রের প্রতি একজন নির্বাচকের সাংবিধানিক দায়িত্ব।

আমরা মনে করি, গণ-অভ্যুত্থানের পর রাষ্ট্রপতি পদটি জাতীয় পুনর্মিলন, ঐক্য ও নতুন রাষ্ট্রনৈতিক বন্দোবস্তের একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রতীক হওয়ার ঐতিহাসিক সুযোগ সৃষ্টি করেছে। দলীয় সংকীর্ণতার কাছে সেই সম্ভাবনাকে বিসর্জন দেওয়া শুধু একটি দলীয় স্বার্থপরতা নয়, এটি জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের রাজনৈতিক তাৎপর্য ও আকাঙ্ক্ষাকেই সংকুচিত করার শামিল।

অতএব, আমরা সব সংসদ সদস্যের প্রতি আহ্বান জানাই, কোনো নির্দিষ্ট দলের রাষ্ট্রপতি নয়, বরং প্রজাতন্ত্রের সর্বজনগ্রাহ্য রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের স্বার্থে দলীয় স্বার্থের ঊর্ধ্বে উঠে নিজেদের বিবেক ও স্বাধীন বিচারবোধ প্রয়োগ করে ভোট দিতে দলীয় প্রতিবন্ধকতা দূরের উদ্যোগ নিন। রাষ্ট্রপতি নির্বাচনকে দলীয়করণের পথ থেকে ফিরিয়ে এনে প্রজাতন্ত্রের সর্বোচ্চ সাংবিধানিক পদটির মর্যাদা, নিরপেক্ষতা ও জাতীয় ঐক্যের সম্ভাবনা পুনঃপ্রতিষ্ঠা করতে হবে।

বিবৃতিদাতা নেতারা হলেন

১. হাসনাত কাইয়ূম, সভাপতি, রাষ্ট্র সংস্কার আন্দোলন

২. শহীদ উদ্দিন মাহমুদ স্বপন, সাধারণ সম্পাদক, জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দল (জেএসডি)

৩. বীর মুক্তিযোদ্ধা মো. আবুল বাশার, সভাপতি, অহিংস গণঅভ্যুত্থান বাংলাদেশ

৪. ফেরদৌস আরা রুমী, মুখপাত্র, নেটওয়ার্ক ফর পিপলস অ্যাকশন (এনপিএ)

৫. সিনিয়র অ্যাডভোকেট ড. শরীফ ভূঁইয়া

৬. মাওলানা মুত্তাকী বিন মনির

৭. শেখ নাসিরউদ্দিন, সাধারণ সম্পাদক, বাংলাদেশ ভূমিহীন আন্দোলন

৮. নাঈম আহমাদ, আহ্বায়ক, জাস্টিস অ্যান্ড ডেমোক্রেসি পার্টি (জেডিপি)

৯. নাজিফা জান্নাত, সাবেক সমন্বয়ক, বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন

১০. শামীম আরা নীপা, সংগঠক, সম্প্রীতি যাত্রা

১১. নাজমুল আহমেদ, সংগঠক, গণতান্ত্রিক বাংলাদেশ নেটওয়ার্ক

১২. মি. বার্নাবাস টুডু, সভাপতি, সাহেবগঞ্জ বাগদাফার্ম ভূমি উদ্ধার সংগ্রাম কমিটি

১৩. মোস্তফা রিজওয়ান রাহাত, সমন্বয়ক, নিরাপদ সড়ক আন্দোলন এবং প্রতিষ্ঠাকালীন আহ্বায়ক, নিরাপদ সড়ক আন্দোলন-নিসআ

১৪. আয়াতুল্লাহ বেহেস্তি, সাবেক সমন্বয়ক, বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন

১৫. ফাহিম মাশরুর, আহ্বায়ক, গণভোট বাস্তবায়ন নাগরিক ফোরাম

১৬. সেলিম খান, সাংবাদিক ও সদস্য, রাষ্ট্রচিন্তা

১৭. বীর মুক্তিযোদ্ধা মাহমুদ জামাল কাদেরী

১৮. বীর মুক্তিযোদ্ধা আব্দুল্লাহ মহিউদ্দিন

১৯. আবু বকর মুহাম্মদ মুঈন উদ্দীন, অ্যাকটিভিস্ট

২০. রুবী আমাতুল্লা, রাজনৈতিক বিশ্লেষক, লেখক এবং মানবাধিকারকর্মী

২১. সাকিব আলী, সাবেক কূটনীতিক

২২. রুশাদ ফরিদী, শিক্ষক, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়

২৩. এম এ এন শাহীন, সদস্য সচিব, অপরাজেয় বাংলা

২৪. ইউসুফ আম্মার, সিনিয়র যুগ্ম সদস্য সচিব, বাংলাদেশ গ্রিন পার্টি

২৫. গোলাম মাহফুজ জোয়ার্দার, আহ্বায়ক, ডিএসএ ভিক্টিমস নেটওয়ার্ক

২৬. স্মৃতি পাটোয়ারী, আহ্বায়ক, জাতীয় ছাত্রমঞ্চ

২৭. লামিয়া ইসলাম, সভাপতি, রাষ্ট্র সংস্কার ছাত্র আন্দোলন

২৮. মিন্টু মিয়া, সভাপতি, রাষ্ট্র সংস্কার শ্রমিক আন্দোলন

২৯. মো. আরিফুল ইসলাম জুয়েল, সাংগঠনিক সম্পাদক, রাষ্ট্র সংস্কার কৃষক আন্দোলন

৩০. ইবনুল সাঈদ রানা, পরিবেশ বিষয়ক সংগঠক

৩১. মোহাম্মদ সোহেল, সমন্বয়ক, সম্মিলিত শ্রমিক পরিষদ

৩২. খান শোয়েব আমান, মানবাধিকার কর্মী

৩৩. দেবাশিস চক্রবর্তী, আর্টিস্ট, লেখক

৩৪. আবু সাঈদ খান, আহ্বায়ক, কোরআন পাঠ আন্দোলন

৩৫. চারু হক, সদস্য, রাষ্ট্রচিন্তা

৩৬. সানাউল্লাহ সাগর, কবি ও যুব সংগঠক

৩৭. সাইফুল আলম শোভন, পরিবেশকর্মী

৩৮. মো. জাফরুল ইসলাম প্রধান, সদস্য সচিব, সাহেবগঞ্জ বাগদাফার্ম ভূমি উদ্ধার সংগ্রাম কমিটি

৩৯. নাজমুল হাসান, অ্যাকটিভিস্ট

৪০. রুদ্রাক্ষ রায়হান, কবি

৪১. উম্মে হাবীবা মায়া, কবি

৪২. মনজুর হোসেন, আলোকচিত্রী ও অ্যাকটিভিস্ট

৪৩. মাহাতাব উদ্দিন আহাম্মাদ, অ্যাকটিভিস্ট

৪৪. মনোয়ারা রহমান, নারী সংগঠক

৪৫. রাশেদ রাহম, আইনের ইতিহাস গবেষক

৪৬. অ্যাডভোকেট আব্দুল আলিম, সদস্য সচিব, জাস্টিস অ্যান্ড ডেমোক্রেসি পার্টি (জেডিপি)

৪৭. আহছান উল্লাহ, প্রধান সংগঠক, জাস্টিস অ্যান্ড ডেমোক্রেসি পার্টি (জেডিপি)

৪৮. মো. নজরুল ইসলাম, সিনিয়র যুগ্ম আহ্বায়ক, জাস্টিস অ্যান্ড ডেমোক্রেসি পার্টি (জেডিপি)

৪৯. ইমরান হোসেন রাহাত, সিনিয়র যুগ্ম আহ্বায়ক, জাস্টিস অ্যান্ড ডেমোক্রেসি পার্টি (জেডিপি)

৫০. মানিষা আক্তার শ্রুতি, নির্বাহী পর্ষদ সদস্য, জাস্টিস অ্যান্ড ডেমোক্রেসি পার্টি (জেডিপি)

৫১. বাকী বিল্লাহ, সেন্ট্রাল কাউন্সিল সদস্য, নেটওয়ার্ক ফর পিপলস অ্যাকশন (এনপিএ)

৫২. অনিক রায়, সেন্ট্রাল কাউন্সিল সদস্য, নেটওয়ার্ক ফর পিপলস অ্যাকশন (এনপিএ)

৫৩. শিমুল খান, সেন্ট্রাল কাউন্সিল সদস্য, নেটওয়ার্ক ফর পিপলস অ্যাকশন (এনপিএ)

৫৪. অনুপম সৈকত শান্ত, সংগঠক, গণতান্ত্রিক বাংলাদেশ নেটওয়ার্ক

৫৫. রাহাত মুস্তাফিজ, সংগঠক, গণতান্ত্রিক বাংলাদেশ নেটওয়ার্ক

৫৬. সৈয়দ হাসিবউদ্দীন হোসেন, রাষ্ট্র সংস্কার আন্দোলন

৫৭. দিদার ভূঁইয়া, যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক, রাষ্ট্র সংস্কার আন্দোলন