রোহিঙ্গাদের জন্য ৭১ কোটি ডলার সহায়তা আহবান

রোহিঙ্গা এবং বাংলাদেশের স্থানীয় জনগোষ্ঠীর সবচেয়ে জরুরি চাহিদা মেটাতে আন্তর্জাতিক সহায়তার আহ্বান জানিয়েছে জাতিসংঘ এবং এর অংশীদাররা। এই সহায়তার অংশ হিসেবে ৭১ দশমিক শুন্য পাঁচ কোটি মার্কিন ডলারের অর্থ সহায়তার আবেদন করা হয়েছে।
বাংলাদেশ সরকারের সঙ্গে নিবিড় সমন্বয়ের মাধ্যমে এই সহায়তা চাওয়া হয়েছে বলে বুধবার (২০ মে) এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে বাংলাদেশে জাতিসংঘ শরণার্থী হাইকমিশনারের (ইউএনএইচসিআর) কার্যালয় থেকে জানানো হয়।
এতে বলা হয়, বিশ্বব্যাপী ক্রমবর্ধমান অস্থিতিশীলতা এবং মানবিক চাপের মধ্যে এই সহায়তার আহ্বান জানানো হলো। এই পরিস্থিতির কারণে অগ্রাধিকার নির্ধারণ কঠিন হয়ে পড়েছে এবং ঝুঁকিপূর্ণ জনগোষ্ঠীর জন্য জরুরি পরিষেবাগুলো আজ হুমকির মুখে। একটি স্থায়ী সমাধান না হওয়া পর্যন্ত বাংলাদেশ উদারভাবে শরণার্থীদের আশ্রয় দেওয়া অব্যাহত রেখেছে। তাই বাংলাদেশের এই পদক্ষেপে জোর দিতে আন্তর্জাতিক সহায়তা অব্যাহত রাখা অত্যন্ত জরুরি।
মিয়ানমারে পরিকল্পিত সহিংসতা ও নিপীড়নের শিকার হয়ে পালিয়ে আসার প্রায় এক দশক পর বর্তমানে প্রায় ১২ লাখ রোহিঙ্গা শরণার্থী বাংলাদেশে আশ্রয় নিয়েছেন। মিয়ানমারের সংঘাত আরও বেশি মানুষকে পালাতে বাধ্য করায় তাদের চাহিদাও ক্রমাগত বাড়ছে। ২০২৪ সালের শুরু থেকে নতুন করে প্রায় ১ লাখ ৫০ হাজার রোহিঙ্গা বাংলাদেশে প্রবেশ করেছেন। এর ফলে সীমিত মানবিক সম্পদের ওপর চাপ পড়ার পাশাপাশি জনাকীর্ণ ক্যাম্পগুলোতেও চাপ তীব্র হয়েছে।
এতে আরও বলা হয়, ২০১৭ সাল থেকে ২০২৫ সালের শেষ পর্যন্ত, আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় রোহিঙ্গা সংকটে প্রায় ৫ দশমিক ৪২ বিলিয়ন মার্কিন ডলার মানবিক তহবিল প্রদান করেছে, যেখানে যুক্তরাষ্ট্র সবচেয়ে বড় দাতা হিসেবে অবস্থান ধরে রেখেছে। এর ফলে বাংলাদেশ জীবন রক্ষাকারী সহায়তা অব্যাহত রাখতে পেরেছে এবং শরণার্থীদের শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও সুরক্ষায় বড় ধরনের অগ্রগতি সম্ভব হয়েছে। তবে, এখনও উল্লেখযোগ্য মানবিক চাহিদা রয়ে গেছে এবং অব্যাহত আন্তর্জাতিক সংহতি ছাড়া রোহিঙ্গা পরিবারগুলো তাদের অর্জিত মূল্যবান অগ্রগতি হারানোর ঝুঁকিতে পড়বে।
জাতিসংঘের শরণার্থী বিষয়ক সংস্থার (ইউএনএইচসিআর) ডেপুটি হাই কমিশনার কেলি টি ক্লেমেন্টস বলেন, যেহেতু সম্পদ সীমিত হয়ে আসছে, তাই শরণার্থীদের দক্ষতা ও সহনশীলতা বৃদ্ধিতে সহায়তা করা আগের চেয়ে অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ, যাতে তারা স্বনির্ভরতা অর্জন করতে পারে, আশা ধরে রাখতে পারে এবং নিজেদের জীবন নতুন করে গড়তে পারে।
তিনি আরও বলেন, রোহিঙ্গারা নিরাপদে নিজ দেশে ফিরে গিয়ে সেখানে নিজেদের সমাজ নতুন করে গড়তে পারার আগ পর্যন্ত, তারা এখন যেখানে আছে সেখানেই তাদের নিরাপত্তা, যত্ন এবং মর্যাদা প্রদান আমাদের অব্যাহত রাখতে হবে। সম্পদ ক্রমাগত কমে যাওয়ার এই সময়ে মানবিক সম্প্রদায় যতটা সম্ভব দক্ষতার সাথে এই সহায়তা পৌঁছে দিতে কঠোর পরিশ্রম করে যাচ্ছে। কিন্তু চাহিদা এখনও বিশাল, এবং তহবিল হ্রাসের কারণে রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠী ও স্থানীয় সম্প্রদায়ের ওপর এর যে বাস্তব প্রভাব পড়ছে, তা কেবল দক্ষতা দিয়ে মেটানো সম্ভব নয়। শরণার্থী সম্প্রদায়কে আরও বেশি স্বনির্ভর হতে সাহায্য করা আমাদের একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ লক্ষ্য।
জাতিসংঘের বিশ্ব খাদ্য কর্মসূচির (ডব্লিউএফপি) পার্টনারশিপ অ্যান্ড ইনোভেশন বিষয়ক অ্যাসিস্ট্যান্ট এক্সিকিউটিভ ডিরেক্টর রানিয়া দাগাশ-কামারা বলেন, এই অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ জনগোষ্ঠীকে আশ্রয় দেওয়ার ক্ষেত্রে বাংলাদেশ অসাধারণ উদারতা দেখিয়েছে। আমরা আমাদের দাতাদের কাছে গভীরভাবে কৃতজ্ঞ, যারা এই কার্যক্রমে যুক্ত রয়েছেন। তাদের অব্যাহত সহায়তা শরণার্থীদের জন্য একটি জীবনরেখা হিসেবে কাজ করছে। ক্যাম্পের প্রকৃত এবং পরিবর্তনশীল চাহিদার ওপর ভিত্তি করে ডব্লিউএফপি সমতা, দক্ষতা এবং কার্যকরভাবে সহায়তা প্রদান নিশ্চিত করতে কাজ করে যাচ্ছে। কিন্তু মানবিক সহায়তাই চূড়ান্ত লক্ষ্য নয়। রোহিঙ্গা শরণার্থীরা যখন নিরাপদ, স্বেচ্ছায় এবং মর্যাদার সাথে ফিরতে পারবে, তখনই তারা মিয়ানমারে নিজ দেশে ফিরে যেতে চায়। আমাদের অবশ্যই এই পরিস্থিতি তৈরিতে সহায়তা অব্যাহত রাখতে হবে। আমরা এই সংকটকে ভুলে যেতে দিতে পারি না।
ইউএন উইমেন-এর ডেপুটি এক্সিকিউটিভ ডিরেক্টর নিয়ারাদজাই গুম্বনজভান্দা (নর্মাটিভ সাপোর্ট, ইউএন সিস্টেম কোঅর্ডিনেশন অ্যান্ড প্রোগ্রাম রেজাল্টস) বলেন, রোহিঙ্গা শরণার্থী, বিশেষ করে নারী ও মেয়েদের চাহিদা এখনও বিশাল। তহবিল হ্রাসের প্রভাব ইতিমধ্যে ক্যাম্পের দৈনন্দিন জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রেই অনুভূত হচ্ছে। বাস্তুচ্যুতির বৃহত্তর চ্যালেঞ্জের মধ্যে নারী ও মেয়েরা আরও বেশি ঝুঁকি এবং বাধার সম্মুখীন হয়, যার জন্য টেকসই মনোযোগ প্রয়োজন। জেন্ডার-সংবেদনশীল, নারীকেন্দ্রিক, ব্যাপক এবং পর্যাপ্ত সম্পদশালী একটি ব্যবস্থা জরুরি। এটি শরণার্থী জনগোষ্ঠীর সার্বিক চাহিদা মেটানোর পাশাপাশি নিরাপত্তা, মর্যাদা, অন্তর্ভুক্তি এবং জেন্ডারভিত্তিক সহিংসতা থেকে সুরক্ষার জরুরি প্রয়োজনকে স্বীকৃতি দেয়, যা পুরো সম্প্রদায়ের সহনশীলতা তৈরিতে অপরিহার্য।
মানবিক তহবিল তীব্রভাবে হ্রাস পাওয়া এবং উন্নয়ন সহায়তা কমে যাওয়ার কারণে রোহিঙ্গা শরণার্থীরা এখনও অনেকাংশে ত্রাণের ওপর নির্ভরশীল। ২০২৫ সালে, ক্যাম্পের প্রায় ৩৫ শতাংশ পরিবার সম্পূর্ণভাবে মানবিক খাদ্য সহায়তার ওপর নির্ভরশীল ছিল, ৪২ শতাংশের অস্থায়ী ও অস্থিতিশীল আয়ের উৎস ছিল এবং মাত্র ২৩ শতাংশ মানবিক কার্যক্রমের অধীনে কাজের বিনিময়ে নগদ অর্থের মাধ্যমে আয় করতে পেরেছে। সীমিত অর্থনৈতিক সুযোগ এবং সহায়তার হ্রাস রোহিঙ্গা পরিবারগুলোর ওপর মারাত্মক প্রভাব ফেলছে, নতুন আসা এবং ঝুঁকিপূর্ণ গোষ্ঠী, বিশেষ করে নারী ও মেয়ে, প্রতিবন্ধী ব্যক্তি এবং বয়স্কদের জন্য এই পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ।
