তামাকপণ্যে কার্যকর কর ও মূল্যবৃদ্ধির দাবি

জনস্বাস্থ্য সুরক্ষায় আসন্ন ২০২৬-২৭ অর্থবছরের জাতীয় বাজেটে তামাকপণ্যের ওপর কার্যকর করারোপ ও মূল্যবৃদ্ধির দাবি জানিয়েছে ডেভেলপমেন্ট অর্গানাইজেশন অব দি রুরাল পূয়র-ডব়্প।
বুধবার (১৩ মে) সকালে রাজধানীর সিরডাপ মিলনায়তনে আয়োজিত ‘জনস্বাস্থ্য সুরক্ষার জন্য আসন্ন ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেটে কার্যকরভাবে সকল তামাকপণ্যের কর ও মূল্যবৃদ্ধির প্রয়োজনীয়তা’ শীর্ষক জাতীয় সেমিনারে এ দাবি জানানো হয়।
সেমিনারে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন ধর্মসচিব মুন্সী আলাউদ্দিন আল আজাদ, এনডিসি। তিনি বলেন, বাংলাদেশে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের তুলনায় তামাকপণ্য এখনও অনেক সস্তা। কৃষি বিপণন অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, ২০২১ থেকে ২০২৩ সালের মধ্যে বিভিন্ন নিত্যপণ্যের দাম ২৭ থেকে ৮৯ শতাংশ পর্যন্ত বেড়েছে, অথচ একই সময়ে বিভিন্ন স্তরের সিগারেটের দাম বেড়েছে মাত্র ৬ থেকে ১৫ শতাংশ। ফলে তামাকপণ্য আরও সহজলভ্য হয়ে উঠছে এবং তরুণ ও নিম্ন আয়ের মানুষের মধ্যে ধূমপানের প্রবণতা বাড়ছে। জনস্বাস্থ্যের জন্য এ প্রবণতা বড় হুমকি। এই স্বাস্থ্য ঝুঁকি কমাতে তামাকপণ্যের মূল্যবৃদ্ধি অবশ্যই মূল্যস্ফীতি ও মানুষের আয় বৃদ্ধির চেয়েও বেশি হতে হবে।
বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের প্রথম সচিব (ভ্যাট মনিটরিং ও আইটি) নাহিদ নওশাদ মুকুল। তিনি বলেন, তামাক পণ্যের বর্তমান কর কাঠামোর কারণে সরকার বছরে অতিরিক্ত প্রায় ৪৪ হাজার কোটি টাকা রাজস্ব আয়ের সুযোগ হারাচ্ছে। এই বিশাল অর্থ দিয়ে শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও সামাজিক নিরাপত্তা খাতের উন্নয়ন নিশ্চিত করা সম্ভব। কার্যকর তামাক কর এমন একটি শক্তিশালী নীতি যা বাস্তবায়ন করলে ধূমপান কমবে, জনস্বাস্থ্য সুরক্ষিত হবে এবং একইসঙ্গে সরকারের আয়ও বৃদ্ধি পাবে।
সেমিনারে মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের স্বাস্থ্য অর্থনীতি ইন্সটিটিউটের পরিচালক অধ্যাপক ড. শাফিউন নাহিন শিমুল। তিনি উল্লেখ করেন, বাংলাদেশে বর্তমানে নিম্ন, মধ্যম, উচ্চ ও অতি উচ্চ—এই চার স্তরের সিগারেট বিদ্যমান; এর মধ্যে বাজারে বিক্রিত সিগারেটের প্রায় ৯০ শতাংশই নিম্ন ও মধ্যম স্তরের। এই পণ্য সহজলভ্য হওয়ায় যুবসমাজ ও নিম্ন আয়ের মানুষকে দ্রুত আসক্ত করে তুলছে।
তিনি বলেন, আসন্ন অর্থবছরে তামাকপণ্যে কার্যকর করারোপের মাধ্যমে দাম বৃদ্ধি করে নিম্ন ও মধ্যম স্তরকে একত্র করে প্রতি ১০ শলাকার সিগারেটের প্যাকেটের সর্বনিম্ন দাম ১০০ টাকা, উচ্চ স্তরে ১৫০ টাকা ও অতি উচ্চ স্তরে ২০০ টাকা নির্ধারণ এবং সকল স্তরে ৬৭ শতাংশ সম্পূরক শুল্ক বহাল রেখে প্রতি প্যাকেটে ৪ টাকা সুনির্দিষ্ট কর আরোপ করতে হবে। তামাকপণ্যে এই কর ও মূল্য প্রস্তাব বাস্তবায়ন করা গেলে ৩ লাখ ৭২ হাজারের বেশি তরুণ ধূমপান শুরু করতে নিরুৎসাহিত হবে এবং দীর্ঘমেয়াদে প্রায় ১ লাখ ৮৫ হাজারের বেশি তরুণ জনগোষ্ঠীর অকালমৃত্যু রোধ করা সম্ভব হবে।
জাতীয় তামাক নিয়ন্ত্রণ সেলের মহাপরিচালক মো. আখতারউজ-জামান বলেন, দক্ষিণ এশিয়ার মধ্যে বাংলাদেশে তামাক ব্যবহারের হার সবচেয়ে বেশি (৩৫.৩ শতাংশ) এবং তামাকজনিত রোগে দেশে প্রতিবছর প্রায় ২ লাখ মানুষের অকালমৃত্যু ঘটে। ২০২৪ সালে তামাকের কারণে স্বাস্থ্য ও পরিবেশগত ক্ষতির পরিমাণ ছিল প্রায় ৮৭ হাজার কোটি টাকা, যা এই খাত থেকে প্রাপ্ত রাজস্বের দ্বিগুণেরও বেশি।
অন্যান্য দেশের তামাক আইনের বিষয় উল্লেখ করে তিনি বলেন, কার্যকর করারোপের মাধ্যমে তামাক ব্যবহার কমানো ও রাজস্ব বাড়ানোর ক্ষেত্রে ফিলিপাইন, তুরস্ক, মেক্সিকো এবং সাউথ আফ্রিকা সফল উদাহরণ তৈরি করেছে। বিশেষ করে ফিলিপাইনে সিন ট্যাক্স সংস্কারের মাধ্যমে সিগারেটের মূল্যবৃদ্ধি ও একক কর কাঠামো চালুর ফলে ২০১২ থেকে ২০১৫ সালের মধ্যে সিগারেট বিক্রি ২৮ দশমিক ১ শতাংশ কমে যায় এবং রাজস্ব তিনগুণের বেশি বৃদ্ধি পায়। একইভাবে সাউথ আফ্রিকায় কার্যকর তামাক কর বৃদ্ধির ফলে ধূমপান কমার পাশাপাশি সরকারের রাজস্ব আয়ও ৯ গুণ বৃদ্ধি পেয়েছে। তাই তামাক খাতকে শুধু রাজস্ব আয়ের চশমা দিয়ে না দেখে জনস্বাস্থ্য সুরক্ষায় কার্যকর করনীতি বাস্তবায়নের কোনো বিকল্প নেই।
সেমিনারে স্বাগত বক্তব্য দেন ডব়্প-এর প্রতিষ্ঠাতা ও সিইও এএইচএম নোমান, সমাপনী বক্তব্য দেন চেয়ারম্যান মোহাম্মদ নূরুল আমিন এবং সঞ্চালনা করেন উপ-নির্বাহী পরিচালক মোহাম্মদ যোবায়ের হাসান। আরও উপস্থিত ছিলেন বিসিআইসির সাবেক চেয়ারম্যান মো. মোস্তাফিজুর রহমান, ডব়্প তামাক নিয়ন্ত্রণ প্রকল্পের প্রতিনিধি জেবা আফরোজা ও অন্যান্য অতিথিরা।
