ঢাকায় আসতে পারেনি এয়ার প্রিমিয়ার অবৈধ ফ্লাইট

নানা চেষ্টা তদবিরের পরেও দক্ষিণ কোরিয়ার সিউল থেকে বাংলাদেশে আসতে পারেনি এয়ার প্রিমিয়ার অবৈধ নন-শিডিউল চার্টার ফ্লাইট। স্থানীয় সময় বুধবার (১৮ মার্চ) প্রায় মধ্যরাত পর্যন্ত যাত্রীদের অপেক্ষা করিয়ে শেষমেশ ১৬ মার্চের ফ্লাইটটি অনির্দিষ্টকালের জন্য সাময়িকভাবে স্থগিতের ঘোষণা দিয়েছে এয়ার প্রিমিয়া।
যদিও এ ফ্লাইট পরিচালনা করতে না পারার জন্য বাংলাদেশের বেসামরিক বিমান চলাচল ও পর্যটন মন্ত্রণালয় এবং বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষকে (বেবিচক) ঢাল হিসেবে ব্যবহার করেছে এয়ারলাইন্সটি। এয়ার প্রিমিয়ার অবৈধ ফ্লাইটের টিকিট বিক্রির ফলে ব্যাপক ভোগান্তিতে পড়েছেন সিউলে দেশে ফেরার অপেক্ষায় থাকা প্রবাসীরা।
জানা গেছে, টিকিট বিক্রি ও অর্থ লেনদেনে স্বচ্ছতার অভাব এবং টাকা পাচারের অভিযোগে এয়ার প্রিমিয়া এবং টাওয়ে এয়ারের নন-শিডিউল চার্টার ফ্লাইট সাময়িকভাবে স্থগিত করেছে বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন মন্ত্রণালয়। গত ৯ মার্চ থেকে এই নিষেধাজ্ঞা কার্যকর হয়; বিষয়টি এয়ারলাইন্স দুইটিতে গত ২৩ ফেব্রুয়ারিতেই জানিয়ে দেওয়া হয়।
এই নিষেধাজ্ঞার প্রেক্ষিতে টিকিট কেনা যাত্রীদের একাংশকে বিকল্প ফ্লাইটে দেশে পাঠিয়েছে টাওয়ে এয়ার। বাকিদেরকে ফিরিয়ে দেওয়া হয়েছে টিকিটের মূল্য। কিন্তু নিষেধাজ্ঞার তথ্য জানার পরেও কোরিয়ার যাত্রীদের কাছে বাংলাদেশে আসার ওয়ান-ওয়ে এবং রাউন্ড ট্রিপ টিকিট বিক্রি করে এয়ার প্রিমিয়া। বাংলাদেশে ফ্লাইট পরিচালনার অনুমতি না থাকলেও অবৈধভাবে গত ১৬ মার্চ প্রায় তিন শতাধিক যাত্রী নিয়ে দেশে আসার চেষ্টা করে এয়ার প্রিমিয়া।
অনুসন্ধানে জানা যায়, যাত্রীদের দুর্ভোগকে পুঁজি করে বাংলাদেশি কর্তৃপক্ষকে ব্ল্যাকমেইল করে শেষ মুহূর্তে অনুমতি পাওয়ার চেষ্টা ছিল কোরিয়ায় এয়ার প্রিমিয়ার চার্টারের প্রতিষ্ঠান কেবি অ্যাভিয়েশনের চেয়ারম্যান আবু বকরের। তবে বেবিচক এবং মন্ত্রণালয়ের শক্ত অবস্থানের কারণে সেদিন ফ্লাইট পরিচালনা করতে পারেনি এয়ার লাইন্সটি। এতে চরম ভোগান্তির পাশাপাশি দেশে আসা অনিশ্চিত হয়ে যায় ওই যাত্রীদের।
পরবর্তীতে ১৮ মার্চ অর্থাৎ গতকাল বুধবার স্থানীয় সময় বিকেল ৫টা ২৫ মিনিটে ফ্লাইটটি ঢাকার উদ্দেশে ছেড়ে আসবে বলে যাত্রীদেরকে জানায় এয়ার প্রিমিয়া। নির্ধারিত সময়ে ইনচিওন বিমানবন্দরে যাত্রীদেরকে বোর্ডিং পাসও দেওয়া হয়। তবে এবারও নির্ধারিত সময়ের আগে ফ্লাইটটি ঢাকায় অবতরণে বাংলাদেশের সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের অনুমোদন পায়নি।
এরপর ফ্লাইটের পরবর্তী সময় রাত ৯টা বলে যাত্রীদেরকে জানানো হয়। কিন্তু এবারও অবৈধ ফ্লাইটটি পরিচালনা করতে পারেনি এয়ার প্রিমিয়া। এ বিষয়ে বেবিচকের উর্ধ্বতন একটি সূত্র এশিয়া পোস্টকে জানান, এয়ার প্রিমিয়ার ফ্লাইট পরিচালনা বাতিল করেছিল মন্ত্রণালয়। তাই এ ফ্লাইট পরিচালনার সিদ্ধান্তও মন্ত্রণালয় থেকে আসতে হবে, যে সিদ্ধান্তটি বুধবার রাত পর্যন্ত আসেনি।
এমন প্রেক্ষাপটে যাত্রীদেরকে এয়ার প্রিমিয়ার পক্ষ থেকে জানানো হয় যে, ১৬ মার্চের ফ্লাইটটি যা পরবর্তীতে ১৮ মার্চে নির্ধারিত হয়, সেটি অনির্দিষ্টকালের জন্য সাময়িকভাবে স্থগিত করা হয়েছে।
বেআইনিভাবে এর দায় বেবিচক এবং বিমান মন্ত্রণালয়ের ওপর চাপিয়ে এয়ার প্রিমিয়া জানায় যে, ‘এয়ার প্রিমিয়া যাত্রীবৃন্দকে অবহিত করছে যে, বাংলাদেশ সরকারের সংশ্লিষ্ট ফ্লাইট অনুমোদনকারী কর্তৃপক্ষের নিকট থেকে ইনচন–ঢাকা–ইনচন রুটে পরিচালিত চার্টার ফ্লাইটের জন্য প্রয়োজনীয় ল্যান্ডিং পারমিশন অযৌক্তিক ও অগ্রহণযোগ্য কারণ দেখিয়ে বাতিল করা হয়েছে। উক্ত পরিস্থিতির কারণে ১৬ মার্চ (পরবর্তীতে ১৮ মার্চ) তারিখের নির্ধারিত ফ্লাইট স্থগিত করা হয়।’
যদিও ১৬ মার্চ ফ্লাইট বাতিল হওয়ার পর ভিন্ন অজুহাত দিয়েছিল এয়ার প্রিমিয়া। তখন বাংলাদেশের কোন কর্তৃপক্ষকে দায়ী করা হয়নি। সেদিন যাত্রীদেরকে এয়ারলাইন্স জানিয়েছিল যে, ‘বিমান চলাচল সংক্রান্ত সমস্যা এবং চায়নার অতিরিক্ত ফ্লাইট পারমিটের কারণে ১৬ মার্চের ফ্লাইটের নতুন সূচি নির্ধারণ করা হয়েছে।’
এয়ার প্রিমিয়ার মনগড়া অভিযোগের প্রেক্ষিতে বেবিচকের পক্ষ থেকে এশিয়া পোস্টকে লিখিতভাবে জানানো হয় যে, ‘প্রবাসীদের ভোগান্তিতে আমরা মর্মাহত এবং আইনের আওতায় থেকে এয়ার প্রিমিয়াকে সবধরনের সহায়তায় প্রস্তুত বেবিচক। কিন্তু তাদের ফ্লাইট পরিচালনায় নিষেধাজ্ঞা বলবত আছে।’
দেশের এভিয়েশন খাতের অভিজ্ঞ এক সূত্র পরিচয় গোপনের শর্তে এশিয়া পোস্টকে বলেন, ‘এর আগেও এয়ার প্রিমিয়ার ফ্লাইট পরিচালনায় নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা হয়েছিল। কিন্তু প্রবাসীদের কাছে টিকিট বিক্রি করে, তাদেরকে বিমানবন্দরে এনে জিম্মি করে শেষ মুহুর্তে ফ্লাইট পরিচালনার অনুমতি আদায় করতো এয়ার প্রিমিয়ার চার্টারার কেবি এভিয়েশনের চেয়ারম্যান আবু বকর। এবারও তারা একই কাজ করতে চেয়েছিল। ১৬ মার্চ ফ্লাইট বাতিল হওয়ার পর বিগত দুই দিন নিশ্চই নানান দেন দরবারের চেষ্টা করেন তিনি। কিন্তু বেবিচক এবং মন্ত্রণালয় অনড় থাকায় তার পরিকল্পনা এবার সফল হয়নি।’
এদিকে কোরিয়ার সিওলের স্থানীয় সূত্র জানায়, প্রতিবার ফ্লাইট ডিলে, রি-শিডিউল এবং শেষমেশ বাতিল হওয়াতে আবু বকরকে জেকে ধরেন টিকিট কেনা প্রবাসী বাংলাদেশিরা। এ সময় তার সঙ্গে যাত্রীদের দফায় দফায় উত্তপ্ত বাক্য বিনিময় হয়। যাত্রীরা তাদের ভোগান্তির কথা জানালেও কোন সমাধান দেননি আবু বকর।
‘রিফান্ড’ করে দেওয়া হবে বলে যাত্রীদেরকে জানান আবু বকর। তবে এতে আশ্বস্ত হননি যাত্রীরা কারণ রিফান্ড নিয়েও যাত্রীদের সঙ্গে দীর্ঘদিন টালবাহানা করার অভিযোগ আছে বকরের বিরুদ্ধে। বুধবার রাতে বিষয়টি এতটা বড় হয় যে, স্থানীয় পুলিশকে এসে পরিস্থিতি সামাল দিতে হয়। ক্ষতিগ্রস্ত যাত্রীদেরকে কোরিয়ার স্থানীয় এভিয়েশন আইনের আওতায় ক্ষতিপূরণের জন্য অভিযোগ দায়েরের পরামর্শ দেয় পুলিশ।