রাজধানীর অধিকাংশ পাম্পে তেল নেই, হচ্ছে বাগ্বিতণ্ডা

তেল সংকটে রাজধানীর অধিকাংশ স্টেশন বন্ধ রয়েছে। পাম্পগুলো রমজান মাসে ঠিকঠাকভাবে তেল সরবরাহ করলেও ঈদের আগের দিন থেকে আর তেল দিতে পারছে না। কারণ হিসেবে এসব স্টেশন থেকে বলা হচ্ছে, ডিপো থেকে তেল দেওয়া হচ্ছে না।
সোমবার (২৩ মার্চ) রাজধানীর বিভিন্ন এলাকা যেমন— মিরপুর, রামপুরা, শাহবাগ, গাবতলী, আগারগাঁও, মহাখালী, তেজগাঁওসহ বিভিন্ন এলাকা সরেজমিনে গিয়ে দেখা গেছে অধিকাংশ পাম্পে ৪ দিন ধরে তেল নেই, বন্ধ রয়েছে সরবরাহ।
মিরপুর
মিরপুর-২ এর শাহ আলীবাগে স্যাম অ্যাসোসিয়েটস লিমিটেড স্টেশনের কর্মচারী জানান, এখানে তারা ঈদের দিন পর্যন্ত অকটেন-পেট্রোল-ডিজেল সবকিছুই বিক্রি করেছেন। তবে ঈদের কারণে তিন দিন ডিপো বন্ধ থাকায় কোনো ধরনের জ্বালানি তেল তারা আনতে পারেনি। তাদের যেটা মজুত ছিল সেটাও শেষ হয়ে গেছে। মঙ্গলবার ডিপো থেকে তেল আনতে পারলে আবারও বিক্রি করার আশা প্রকাশ করেছেন তিনি।
মিরপুর শেওড়াপাড়ার সোবহান ফিলিং স্টেশন ৫ দিন ধরে বন্ধ। গত ১৯ মার্চ থেকে এ স্টেশনে তেল সরবরাহ বন্ধ রয়েছে। আজ ঈদের তৃতীয় দিন পর্যন্ত টানা পাঁচ দিন ধরে স্টেশনটি বন্ধ আছে।

এ বিষয়ে স্টেশনের ম্যানেজার সিয়াম খান জানান, গত ১৮ মার্চ চাহিদার তুলনায় কম তেল পাওয়ায় মজুত থাকা শেষ বিন্দু পর্যন্ত সরবরাহ করা হয়েছে। বর্তমানে তেলের অভাবেই স্টেশনটি বন্ধ রাখা হয়েছে।
মিরপুরের পশ্চিম কাফরুল এলাকার এ.এস.ফিলিং স্টেশনের অবস্থাও একই রকম। স্টেশনটিতে কোনো কর্মকর্তা বা দায়িত্বশীল ব্যক্তিকে খুঁজে পাওয়া যায়নি। তবে তেল দেওয়ার বুথে সাদা কাগজে স্পষ্টভাবে লেখা ছিল ‘অক্টেন নেই।’ এতে ধারণা করা হচ্ছে, তেলের সংকটের কারণেই স্টেশনটির কার্যক্রম বন্ধ রয়েছে।

আগারগাঁও
তেলের সংকটে টানা দুই দিন ধরে রাজধানীর আগারগাঁওয়ের তালতলার হাসান ফিলিং স্টেশনের কার্যক্রম আংশিক বন্ধ রয়েছে। স্টেশনটি বন্ধ থাকায় সেখানে কোনো দায়িত্বশীল ব্যক্তিকে খুঁজে পাওয়া যায়নি।
পরে ম্যানেজারের সঙ্গে ফোনে যোগাযোগ করা হলে তিনি এশিয়া পোস্টকে বলেন, দুই দিন আগে অকটেন শেষ হয়ে যাওয়ায় স্টেশনটি বন্ধ রাখা হয়েছে। তবে ডিজেল মজুত আছে, কেউ ডিজেল নিতে এলে তা দেওয়া হচ্ছে।
তিনি আরও বলেন, আজ রাজধানীর সব পাম্পে অকটেন সরবরাহ আসার কথা রয়েছে। তেল পৌঁছালে বিকেল ২টা থেকে পুনরায় সরবরাহ শুরু করা যাবে, ইনশাআল্লাহ।
দারুস সালাম
দারুস সালাম রোডের আল মাহমুদ ফিলিং স্টেশনের ক্যাশিয়ার ইমতিয়াজ হক বলেন, ডিপো থেকে কম তেল পাচ্ছি। মানুষ বেশি বেশি তেল নেওয়ার কারণেই এ রকম সংকট হচ্ছে। ঈদের কারণে তিন দিন ডিপো বন্ধ থাকায় অকটেন পাচ্ছি না। তবে পর্যাপ্ত পরিমাণে ডিজেল রয়েছে।

গাবতলী
গাবতলির মোহনা ফিলিং স্টেশনের মালিক মাজহারুল বলেন, আমার ব্যবসার বয়স ৩৭ বছর; এমন অভিজ্ঞতা জীবনেও হয়নি। ডিপো তিন দিন বন্ধ ছিল। তিন দিন পর সাড়ে ৪ হাজার লিটার অকটেন পেয়েছি; যা আমার স্টেশনের চাহিদার তুলনায় অনেক কম।

তেজগাঁও
তেজগাঁও সাউদার্ন অটোমোবাইলস পাম্পে পাওয়া যাচ্ছে না অকটেন। পাম্পের ক্যাশিয়ার নয়ন আহম্মেদ বলেন, ঈদের আগের দিন থেকেই অকটেন পাওয়া যাচ্ছে না। কবে পাওয়া যাবে তারও কোনো সঠিক সময় নেই। আমাদের কাছে শুধু ডিজেল আছে। সেটা বাস, ছোট ট্রাক ও ডিজেল চালিত গাড়ি সেগুলোতে সরবরাহ করছি। অকটেন না থাকার কারণে অনেক গ্রাহক এসে ঘুরে যাচ্ছেন।

তিনি বলেন, তেল না থাকার কারণ আমরা ডিপো থেকে তেল পাচ্ছি না। তাই আমাদের পক্ষ থেকে একটা নোটিশ বোর্ড টাঙানো হয়েছে যেন মানুষের বুঝতে অসুবিধা না হয় যে, এই পাম্পে তেল পাওয়া যাচ্ছে না।
একই এলাকায় অবস্থিত বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন করপোরেশনের (বিআরটিসি) নিজস্ব প্রতিষ্ঠান সিটি ফিলিং স্টেশনে তেল নেই। এ কারণে ইদের আগের দিন থেকে বন্ধ রয়েছে পাম্প। অকটেন, ডিজেল এবং পেট্রোল কোনোটিই পাওয়া যাচ্ছে না এ পাম্পে।

পাম্পের কর্মকর্তা মাসুম বিল্লাহ বলেন, গত চার দিন ধরে পাম্প বন্ধ রয়েছে। আজকে তেল আসার কথা রয়েছে তবে এখন পর্যন্ত তেল আসেনি ডিপো থেকে। যারা তেল নিতে আসছেন, তারা ঘুরে যাচ্ছেন। অনেকে তেল নিতে এসে না পেয়ে বাগ্বিতণ্ডায় জড়িয়ে পড়ছে।
তিনি বলেন, এ সংকট কতদিন থাকবে আমরা সেটা জানি না। সরকার থেকে বলা হচ্ছে তেল আছে বাংলাদেশে, কোনো সংকট নেই। তবে ডিপো থেকে আমাদেরকে তেল দেওয়া হচ্ছে না। তেল না দিলে কীভাবে পাম্প চালাব। এভাবে ১ মাস চললে তো আর রাস্তায় গাড়ি চলবে না।
রামপুরা
রামপুরার হাজীপাড়া পেট্রোল পাম্পের কর্মকর্তা মামুনুর রশিদ বলেন, উনারা (সরকার) বলছে তেলের ঘাটতি নেই। কিন্তু ডিপো থেকে তেল দিচ্ছে না। ঈদের কয়েক দিন আগেও তেল দিয়েছিল। ঈদের পরে আর আমাদের তেল দেইনি। প্রচুর গ্রাহক আসছে কিন্তু চার দিন ধরে আমাদের পাম্পে তেল নেই।

তিনি আরও বলেন, আমাদের চাহিদা ১৩ হাজার লিটার কিন্তু আমাদের দিচ্ছে ৪ হাজার লিটার। এই তেল আমাদের ২-৩ ঘণ্টায় শেষ হয়ে যায়। আমাদের চাহিদা বেশি কিন্তু ডিপো থেকে চাহিদা অনুযায়ী তেল দেওয়া হচ্ছে না।
এ পাম্পে তেল কিনতে আসা মো. আব্দুল্লাহ নামে একজন গ্রাহক বলেন, সরকার বলছে তেলের সংকট নাই। সেখান থেকে সরকারের প্রতি আস্থা রাখে আমি তেল কিনি নাই। এখন তেল কেনার জন্য ঢাকার আশপাশে অনেকগুলো পাম্পে গেছি কিন্তু তেল পাইনি। এখন এটা কেন নাই, কৃত্রিম সংকট নাকি আদৌ তেল নাই এ বিষয়টা বুঝতে পারছি না।
রাজারবাগ
রাজারবাগের পাওয়ার জি-গ্যাস স্টেশনের কর্মকর্তা মুমিনুল হক বলেন, আমাদের এখানে শুধু গ্যাস দেওয়া হচ্ছে। এখানে গ্যাসের কোনো সংকট নেই।

তিনি বলেন, আমরা পেট্রোল দিচ্ছি না। অকটেনও চার দিন ধরে নেই।
তবে ভিন্ন কথা বলছেন কয়েকটি পাম্প স্টেশন। তারা বলছে, তেলের তেমন কোনো সংকট নেই। তেল সরবরাহ চাহিদামতো দেওয়া হচ্ছে।
মহাখালী
মহাখালী এস আর এন্টারপ্রাইজ মেঘনা পেট্রোলিয়াম লিমিটেডের পাম্পে পাওয়া যাচ্ছে অকটেন। পাম্পের কর্মী সামাদ বলেন, আমাদের এখানে তেল আছে। আমরা কোনো লিমিটেশন রাখিনি। যে যতটুকু পারছে তেল নিয়ে যাচ্ছে। বেশির ভাগই বাইকে তেল ফুল ট্যাংক করে নিয়ে যাচ্ছে। কতক্ষণ তেল দিতে পারব জানি না। তবে তেল যতক্ষণ আছে এভাবেই দিয়ে যাব।

বিজয় সরণি
বিজয় সরণির ট্রাস্ট ফিলিং স্টেশনে তেল সরবরাহ বন্ধ থাকায় দীর্ঘ লাইনে দাঁড়িয়ে আছে কয়েকশ মোটরসাইকেল। স্টেশনের ম্যানেজার তারিকুল ইসলাম জানান, গতকাল (২২ মার্চ) বিকেল পর্যন্ত তেল সরবরাহ করা হয়েছে। আজ নতুন তেল আসার কথা রয়েছে, যা পৌঁছালে দুপুর ২টার পর থেকে পুনরায় সরবরাহ শুরু করা হবে। এ সময় তিনি তেলের কোনো সংকট নেই বলে জানান।

শাহবাগ
শাহবাগে মেঘনা মডেল সার্ভিস পাম্পে তেল পাওয়া যাচ্ছে তবে সীমিত আকারে। বাইকের জন্য সর্বোচ্চ ৬০০ টাকার তেল দেওয়া হচ্ছে বলে অভিযোগ করেছেন ক্রেতারা। তবে ভিন্ন কথা বলছেন বিক্রেতা।

পাম্পের কর্মকর্তা মাসুদ বলেন, এখন পর্যন্ত আমাদের পাম্পে তেল আছে যতক্ষণ পর্যন্ত থাকে আমরা দিয়ে যাবো। সীমিত আকারে তেল দিচ্ছি না। যার যতটুকু প্রয়োজন নিচ্ছে।
এদিকে দেশের বিভিন্ন এলাকায় জ্বালানি তেলের ঘাটতি ও নিরাপত্তাজনিত উদ্বেগে পেট্রোল পাম্পগুলো যে কোনো সময় বন্ধ হয়ে যেতে পারে বলে আশঙ্কা জানিয়েছে বাংলাদেশ পেট্রোল পাম্প ওনার্স অ্যাসোসিয়েশন।
রোববার (২২ মার্চ) রাতে দেওয়া এক বিজ্ঞপ্তিতে সংগঠনটি জানায়, কোম্পানিগুলোর সরবরাহ করা তেল দিয়ে বর্তমান চাহিদা পূরণ করা যাচ্ছে না। ফলে অনেক স্থানে গ্রাহকদের দীর্ঘ সময় লাইনে দাঁড়িয়ে থাকতে হচ্ছে।
সংগঠনটির দাবি, অতিরিক্ত চাপ সামলাতে গিয়ে পাম্পকর্মীরাও শারীরিক ও মানসিকভাবে চাপে পড়ছেন। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে না এলে পাম্প বন্ধ হয়ে যাওয়ার ঝুঁকি তৈরি হতে পারে।
বিজ্ঞপ্তিতে আরও বলা হয়, কিছু ক্ষেত্রে বিশৃঙ্খলা বাড়ছে। অভিযোগ রয়েছে, অনেকে প্রয়োজনের চেয়ে বেশি তেল নিচ্ছেন এবং পরে বেশি দামে বিক্রি করছেন। আবার আংশিক ভর্তি ট্যাংক নিয়েও বারবার তেল নেওয়ার প্রবণতা দেখা যাচ্ছে, এতে প্রকৃত প্রয়োজনীয় গ্রাহকরা বঞ্চিত হচ্ছেন।
কয়েকটি এলাকায় জোরপূর্বক তেল নেওয়ার ঘটনাও ঘটেছে বলে দাবি করা হয়েছে। একটি জেলার উদাহরণ দিয়ে বলা হয়, স্বাভাবিকভাবে কয়েক দিন চলার মতো মজুত খুব অল্প সময়েই শেষ হয়ে গেছে অতিরিক্ত চাপের কারণে।
সংগঠনটির মতে, শুধু পাম্পেই নয়, ডিপো থেকে তেল পরিবহনের সময়ও নিরাপত্তা ঝুঁকি তৈরি হয়েছে। এমন পরিস্থিতিতে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নতি না হলে ডিপো থেকে তেল উত্তোলন বন্ধ করার মতো সিদ্ধান্তও নিতে হতে পারে।