logo

কোরিয়ায় বিমানবন্দরে আটকে আছে তিন শতাধিক বাংলাদেশি

কোরিয়ায় বিমানবন্দরে আটকে আছে তিন শতাধিক বাংলাদেশি

বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন মন্ত্রণালয়ের নিষেধাজ্ঞার পরও সিউল-ঢাকা রুটে অবৈধ ফ্লাইট পরিচালনার উদ্যোগ নেয় দক্ষিণ কোরিয়াভিত্তিক চার্টার্ড এয়ারলাইন্স ‘এয়ার প্রিমিয়া’। অবৈধ নন-শিডিউল চার্টার্ড ফ্লাইটের কারণে দক্ষিণ কোরিয়ার রাজধানী সিউলে এখন আটকা পড়েছেন প্রায় তিন শতাধিক যাত্রী। দেশে পরিবার-পরিজনদের সঙ্গে ঈদ উদযাপনের আনন্দ এখন পরিণত হয়েছে মহাদুর্ভোগে। যাত্রীদের এই জিম্মি দশাকে পুঁজি করে মন্ত্রণালয় এবং বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষকে (বেবিচক) ব্ল্যাকমেইল করে ফ্লাইট পরিচালনার অনুমতি নেওয়ার চেষ্টা করছে এয়ার প্রিমিয়া। তবে নিয়ন্ত্রক সংস্থা বেবিচক বলছে, মন্ত্রণালয় থেকে অনুমতি না পাওয়া পর্যন্ত এয়ার প্রিমিয়ার কোনো উড়োজাহাজ অবতরণ করতে দেওয়া হবে না ঢাকায়।

জানা গেছে, টিকিট বিক্রি ও অর্থ লেনদেনে স্বচ্ছতার অভাব এবং টাকা পাচারের অভিযোগে বাংলাদেশ এবং দক্ষিণ কোরিয়ার মধ্যেকার ঢাকা-সিউল রুটে পরিচালিত নন-শিডিউল চার্টার ফ্লাইট সাময়িকভাবে স্থগিত করেছে বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন মন্ত্রণালয়। এই নিষেধাজ্ঞার আওতায় ছিল এয়ার প্রিমিয়া এবং টাওয়ে এয়ার। অপারেটর দুটি চার্টার্ড বিমানের আড়ালে নিয়মিত ফ্লাইট পরিচালনা করে আসছিল। অথচ সংস্থাগুলোর ঢাকায় কোনো অফিস বা ব্যাংক অ্যাকাউন্ট পর্যন্ত নেই। বাংলাদেশে কোনো যাত্রীর কাছে টিকিট বিক্রির অনুমতিও নেই অপারেটরগুলোর। কিন্তু দেদার টিকিট বিক্রি করছিল এয়ার প্রিমিয়া এবং টাওয়ে এয়ার। টিকিট বিক্রির টাকা কীভাবে হস্তান্তর হয়, তার তথ্য দিতে পারেনি এয়ারলাইনসগুলো।

সম্প্রতি এই দুই অপারেটরের বাংলাদেশি প্রতিনিধিদের সঙ্গে সভা করে সিভিল এভিয়েশন। সভায় চার্টার ফ্লাইটে টিকিট বিক্রির পদ্ধতি, বাংলাদেশ থেকে কোরিয়ায় টিকিটের অর্থ স্থানান্তর এবং স্থানীয় যোগাযোগ ব্যবস্থাপনা সম্পর্কে বিস্তারিত জানতে চাওয়া হয়। কিন্তু অপারেটরদের পক্ষ থেকে সন্তোষজনক ব্যাখ্যা পাওয়া যায়নি। এমতাবস্থায় গত ৯ মার্চ থেকে এই রুটে কোনো কোরিও এয়ারলাইন্সের নন-শিডিউল চার্টার ফ্লাইট পরিচালনায় নিষেধাজ্ঞা দেয় মন্ত্রণালয়। এয়ারলাইন্সগুলোর পক্ষ থেকে সন্তোষজনক ব্যাখ্যা না পাওয়া পর্যন্ত এই নিষেধাজ্ঞা বলবত থাকবে বলেও নিষেধাজ্ঞায় উল্লেখ করা হয়।

সোমবার (১৬ মার্চ) বেবিচকের একাধিক সূত্রের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, দুই প্রতিষ্ঠানের ওপর নিষেধাজ্ঞা এখনও বলবত আছে। সে হিসেবে কোরিয়ার সিউল থেকে ঢাকার হযরত শাহ জালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের উদ্দেশে কোনো ফ্লাইট পরিচালনার সুযোগ নেই। কিন্তু নিষেধাজ্ঞা থাকার পরও সিউলে প্রবাসী বাংলাদেশিদের কাছে টিকিট বিক্রি করেছে এয়ার প্রিমিয়া। কোরিয়া থেকে বাংলাদেশের উদ্দেশে আজ (সোমবার) সরাসরি ফ্লাইট পরিচালনার পূর্ব ঘোষণা দেয় এয়ারলাইন্সটি। একই ঘোষণায় বাংলাদেশ থেকে সিউলের উদ্দেশে আগামী ৩০ মার্চ এবং ১৩ এপ্রিল বা ২৭ এপ্রিল ফ্লাইট চলাচল করবে বলে উল্লেখ করা হয়।

তাদের ঘোষণা অনুযায়ী, আজ সোমবার সিউলের ইনচিওন আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে নিজেদের উড়োজাহাজে যাত্রীদের বোর্ডিং করেছে এয়ার প্রিমিয়া। অথচ তখনও বাংলাদেশে অবতরণের অনুমতি পায়নি এয়ারলাইন্সটি।

এ বিষয়ে বেবিচকের এক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, এয়ার প্রিমিয়াকে ফ্লাইট পরিচালনার এখনও অনুমতি দেওয়া হয়নি। গত ৯ মার্চ তাদের শেষবারের মতো অনুমতি দেওয়া হয়েছিল এবং সেই অনুমতিতে বলা ছিল, পরবর্তী নির্দেশনা না দেওয়া পর্যন্ত ফ্লাইট চলাচল স্থগিত থাকবে এবং ৯ তারিখের অনুমোদনকে দৃষ্টান্ত হিসেবে আগামীতে কোনো ফ্লাইট পরিচালনা করা যাবে না। এই নিষেধাজ্ঞা এখনও বলবত আছে। তারা যদি কোরিয়া থেকে উড়োজাহাজ উড্ডয়নও করে, ঢাকায় অবতরণ করতে পারবে না।

ওই কর্মকর্তা আরও বলেন, চার্টার ফ্লাইটে টিকিট বিক্রির কথাই না, তারপরও যদি এয়ার প্রিমিয়া টিকিট বিক্রি করে, সেটা সম্পূর্ণ নিজেদের দায়িত্বে করছে। ফ্লাইট পরিচালনার অনুমতির কোনো আশ্বাস বা আশাও দেইনি। কাজেই যাত্রীদের কাছে টিকিট বিক্রি করে থাকলে এর দায়িত্ব এয়ার প্রিমিয়াকেই নিতে হবে।

এদিকে সিউলের স্থানীয় সময় বিকেল ৫টা ২৫ মিনিটে ফ্লাইটটির বাংলাদেশের উদ্দেশে ছেড়ে আসার কথা ছিল। প্রায় তিন শতাধিক যাত্রীর বোর্ডিং পাসও দিয়েছে এয়ার প্রিমিয়া। কিন্তু সবশেষ খবর পাওয়া পর্যন্ত, সিউলের স্থানীয় সময় রাত ৮টা পর্যন্ত ফ্লাইটটি আকাশে উড্ডয়ন করেনি। এতে ভোগান্তিতে পড়েছে দেশমুখী প্রবাসী যাত্রীরা। প্রতিবার এক ঘণ্টা দেরি করে যাত্রীদের সময় জানানো হচ্ছে। এতে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ক্ষোভ প্রকাশ করছেন তারা।

সাদ সোহেল নামের এক যাত্রী লেখেন, ৫টা ২৫ মিনিটে ফ্লাইট হওয়ার কথা ছিল। ফ্লাইট লেইট ৬টা ২৫ কিন্তু এখনো কোন খবর নেই। ইমার্জেন্সি প্রয়োজনে যাচ্ছিলাম। জবান আর ঠিক রাখতে পারলাম না।

সেই পোস্টে আবার একাধিক যাত্রী কমেন্ট করেছেন, ফ্লাইট ছাড়ার সবশেষ সময় (স্থানীয়) সন্ধ্যা ৭টা ২৫ মিনিট। তবে এশিয়া পোস্টের স্থানীয় সূত্র বলছে, এখনও সেই ফ্লাইট উড্ডয়ন করেনি।

পরিচয় গোপন রাখার শর্তে এভিয়েশন খাতের এক বিশেষজ্ঞ এশিয়া পোস্টকে বলেন, এয়ার প্রিমিয়া আগেও এমন কাজ করেছে। অনুমোদন ছাড়াই যাত্রী অন-বোর্ড করে বাংলাদেশ সরকার তথা মন্ত্রণালয় এবং বেবিচককে যাত্রীদের নামে ব্ল্যাকমেইল করে। যাত্রীদের ভোগান্তি বিবেচনায় মন্ত্রণালয় শেষ মুহূর্তে ফ্লাইট পরিচালনার অনুমতি দিয়েছে, এমন ঘটনা আগেও হয়েছে। আর একেবারেই অনুমতি না পেলে, ফ্লাইট ক্যান্সেল করে দেয় এয়ার প্রিমিয়া। এরপর রিফান্ড পেতে যাত্রীদের ঘুরতে হয় মাসের পর মাস।

এ বিষয়ে বক্তব্যের জন্য এয়ার প্রিমিয়ার বাংলাদেশি প্রতিনিধির কারও সঙ্গে এ মুহূর্ত পর্যন্ত যোগাযোগ করা সম্ভব হয়নি।