logo
Advertisement

গবেষণা জালিয়াতি/বাংলাদেশি গবেষকদের ৩২৫টি গবেষণাপত্র প্রত্যাহার, শীর্ষে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়

এশিয়া পোস্ট ডেস্ক
বাংলাদেশি গবেষকদের ৩২৫টি গবেষণাপত্র প্রত্যাহার, শীর্ষে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়
প্রতীকী ছবি।

ভুয়া বিশেষজ্ঞ মূল্যায়ন (পিয়ার রিভিউ), চৌর্যবৃত্তি (প্লেজিয়ারিজম), কাল্পনিক উপাত্ত ব্যবহারসহ নানা অনিয়মের অভিযোগে বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সাময়িকী বা জার্নাল থেকে বাংলাদেশের সরকারি ও বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় এবং গবেষণাপ্রতিষ্ঠান-সংশ্লিষ্ট অন্তত ৩২৫টি গবেষণাপত্র প্রত্যাহার করা হয়েছে।

Advertisement

২০১৯ থেকে ২০২৬ সালের জুন সময়কালে প্রত্যাহার হওয়া এসব গবেষণার তথ্য আন্তর্জাতিক সংস্থা ‘রিট্রাকশন ওয়াচ’ ও প্রথম আলোর অনুসন্ধানে উঠে এসেছে।

গবেষকদের মতে, বৈশ্বিক ও একাডেমিক স্বীকৃতি, পদোন্নতি এবং মর্যাদার জন্য জার্নালে গবেষণাপত্র প্রকাশ একটি গুরুত্বপূর্ণ ধাপ। তবে একের পর এক গবেষণাপত্র প্রত্যাহারের ঘটনা দেশের গবেষকদের ভাবমূর্তি প্রশ্নের মুখে ফেলছে এবং আন্তর্জাতিক জার্নালে নতুন গবেষণা প্রকাশের পথ কঠিন করে তুলছে।

বিশ্বজুড়ে গবেষণার মূল্যায়ন হয় সাইটেশন বা উদ্ধৃতির ভিত্তিতে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভূতত্ত্ব বিভাগের অধ্যাপক কাজী মতিন উদ্দিন আহমেদ (যার প্রায় ৪৫০টি গবেষণা প্রায় ২০ হাজার বার উদ্ধৃত হয়েছে) প্রথম আলোকে বলেন, ‘একেকটি গবেষণা প্রত্যাহারের ঘটনা ফুটবল মাঠের একেকটি লাল কার্ডের মতো। বাংলাদেশিদের গবেষণাপত্র প্রত্যাহারের সংখ্যা এখন উদ্বেগজনক।’

গবেষণাপত্রের নীতিগত মান নিয়ন্ত্রণে প্রকাশনা সংস্থাগুলো ‘কমিটি অন পাবলিকেশন এথিকস (কোপ)’-এর নীতিমালা অনুসরণ করে। অভিযোগ পেলে প্রাথমিক যাচাই, ব্যাখ্যা তলব এবং প্রয়োজনে স্বাধীন তদন্ত কমিটির মাধ্যমে জালিয়াতি প্রমাণিত হলে গবেষণাপত্র প্রত্যাহার (রিট্রাকশন) করা হয়।

রিট্রাকশন ওয়াচের সহায়তায় এবং অনুসন্ধানে প্রাপ্ত ৩২৫টি প্রত্যাহৃত গবেষণার তথ্য মিলেছে, যা চূড়ান্ত সংখ্যা নয়। এলসেভিয়ার, স্প্রিঞ্জার নেচার, উইলি, হিন্দাউই এবং আইইইই-এর মতো প্রকাশনা থেকেই বেশি গবেষণাপত্র প্রত্যাহার করা হয়েছে। এতে পিয়ার রিভিউ কারচুপি, কাল্পনিক ও অসংগতিপূর্ণ তথ্য, প্লেজিয়ারিজম, একই তথ্যের পুনর্ব্যবহার, অপ্রাসঙ্গিক উদ্ধৃতি এবং অর্থের বিনিময়ে লেখকস্বত্ব বেচাকেনার (পেপার মিল) বাণিজ্যিক চক্রের প্রমাণ মিলেছে।

প্রত্যাহার হওয়া ৩২৫টি গবেষণার বিশ্লেষণে বাংলাদেশি বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের নাম পাওয়ার তথ্য নিচে উল্লেখ করা হলো:

  • ড্যাফোডিল ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি: ৪৪টি
  • নর্থ সাউথ ইউনিভার্সিটি: ৪২টি
  • জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়: ৩২টি
  • ইউনাইটেড ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি (ইউআইইউ): ২১টি
  • ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়: ২০টি
  • চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় ও বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়: ১১টি করে
  • ওয়ার্ল্ড ইউনিভার্সিটি অব বাংলাদেশ, নোয়াখালী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় এবং বিজিসি ট্রাস্ট ইউনিভার্সিটি: ১০টি করে
  • বাংলাদেশ ইউনিভার্সিটি অব বিজনেস অ্যান্ড টেকনোলজি: ৭টি
  • গোপালগঞ্জ বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়: ৬টি

নর্থ সাউথ বিশ্ববিদ্যালয়ের ইলেকট্রিক্যাল অ্যান্ড কম্পিউটার ইঞ্জিনিয়ারিং (ইসিই) বিভাগের অধ্যাপক মোহাম্মদ মনিরুজ্জামান খানের ২৬টি গবেষণাপত্র প্রত্যাহার হয়েছে (৬টিতে মূল লেখক, ২০টিতে সহলেখক)। ভুয়া পিয়ার রিভিউ, তথ্যের অসংগতি ও চৌর্যবৃত্তির অভিযোগে ২০২৩ সালে এগুলো প্রত্যাহার হয়, যেগুলো প্রকাশিত হয়েছিল ২০২১ থেকে ২০২২ সালের মাঝামাঝি সময়ে। এসব গবেষণায় সৌদি আরবের বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষকরা সহলেখক ছিলেন।

সৌদি আরব বৈশ্বিক র্যাঙ্কিংয়ে উন্নতির জন্য আর্থিক সুবিধা দিত, ফলে আন্তর্জাতিক গবেষকরা তাদের নাম ব্যবহার করতেন। তবে মানের প্রশ্নে ২০২০ সালের পর সেখানে প্রত্যাহারের হার বাড়ে। দেড় বছরে মনিরুজ্জামান ও তার শিক্ষার্থীরা অন্তত ৮০টি গবেষণা প্রকাশ করায় অনুষদে সন্দেহ তৈরি হয়।

প্রকৌশল ও পদার্থবিজ্ঞান অনুষদপ্রধান অধ্যাপক সাজ্জাদ হোসাইন বলেন, ‘এতগুলো গবেষণা একসঙ্গে প্রকাশ হয়েছিল আন্তর্জাতিক প্রকাশনায়। এটা বিশ্ববিদ্যালয়ের কাছেও অস্বাভাবিক মনে হয়েছিল। বিষয়টি নিয়ে তখনই আমরা মনিরুজ্জামানকে সতর্ক করে দিই।’ তবে বিশ্ববিদ্যালয় কোনো প্রাতিষ্ঠানিক তদন্ত করেনি।

নিজের দায় অস্বীকার করে অধ্যাপক মনিরুজ্জামান দাবি করেন, তিনি বিশ্বসেরা গবেষকদের একজন। তিনি বলেন, ‘একাধিক পর্যালোচকের মূল্যায়ন ও সংশোধনের পরই গবেষণাগুলো প্রকাশিত হয়েছিল।’ প্রকাশকদের মতামত দেওয়ার কথা জানিয়ে তিনি বলেন, ‘আমরা মতামত দিয়েছিলাম। কিন্তু প্রকাশকেরা গুরুত্ব দেয়নি।’

এদিকে নর্থ সাউথের সাবেক শিক্ষার্থী ও বিআইডিএসের গবেষণা ফেলো মুনতাসির মোরশেদের ৮টি গবেষণা প্রত্যাহার হয়েছে, যেখানে তিনি নর্থ সাউথ ও ড্যাফোডিলকে সংযুক্ত দেখিয়েছেন।

তিনি বলেন, ‘জাস্ট ইউনিভার্সিটির প্রতি ভালোবাসার কারণে তিনি নাম দিয়েছেন এবং প্রত্যাহারের কারণ সম্পর্কে তিনি পরিষ্কার নন।’ এ বিষয়টিকে বিআইডিএসের মহাপরিচালক অধ্যাপক এনামুল হক ‘গুরুতর অপরাধ’ উল্লেখ করে বলেন, ‘আমরা প্রাতিষ্ঠানিকভাবে পদক্ষেপ নেব।’

ড্যাফোডিল ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটির (ডিআইইউ) ফার্মেসি বিভাগের প্রভাষক মমিনুর রহমানের ক্যানসার, কোভিড-১৯ ইত্যাদি বিষয়ক ৭টি গবেষণাপত্র স্প্রিঞ্জার ও এলসেভিয়ার থেকে প্রত্যাহার হয়েছে। তিনি বিদেশে থাকায় তার বক্তব্য নেওয়া সম্ভব হয়নি। বিশ্ববিদ্যালয়ে গবেষণার জন্য ২০-৫০ হাজার টাকা প্রণোদনা ও বেস্ট রিসার্চার অ্যাওয়ার্ড ব্যবস্থা রয়েছে। গবেষণার পরিচালক মাহফুজা পারভীন জানান, অভিযোগ প্রমাণিত হলে অর্থ ফেরত নেওয়া হবে এবং বিষয়টির সুরাহা করা হবে।

অন্যদিকে বিজিসি ট্রাস্ট ইউনিভার্সিটিতে কর্মরত তালহা বিন ইমরানের ১০টি গবেষণায় ড্যাফোডিলের নাম ব্যবহার করা হয়েছে। ওয়ার্ল্ড ইউনিভার্সিটি অব বাংলাদেশের নাম ব্যবহার করে গবেষক আব্দুল কাদের মহিউদ্দিনের ৯টি একক গবেষণা প্রত্যাহার হয়েছে; তিনি ২০২২ সাল পর্যন্ত ওই প্রতিষ্ঠানে ছিলেন, পরে তার সন্ধান পাওয়া যায়নি।

বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা বিভাগের অধ্যাপক আবু রেজা মো. তৌফিকুল ইসলামের ৯টি গবেষণা প্রত্যাহার হলে বিশ্ববিদ্যালয় তদন্ত কমিটি গঠন করে। তবে সিন্ডিকেট তাকে কেবল ‘লঘুদণ্ড’ হিসেবে সতর্ক করেছে। উপাচার্য অধ্যাপক শওকত আলী বলেন, কোনো প্রতিষ্ঠিত নীতিমালা না থাকায় জটিলতার কারণে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া যায়নি।

জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিবেশবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক মো. মোস্তাফিজুর রহমানের ১০টি গবেষণা প্রত্যাহার হয়েছে কাল্পনিক উপাত্ত ও আগের তথ্য পুনর্ব্যবহারের অভিযোগে। ব্রাজিলের গবেষক গুইলহার্ম মালাফাইয়ার সঙ্গে মূল যোগাযোগ ছিল জানিয়ে অধ্যাপক মোস্তাফিজুর বলেন, তিনি সৎ থাকার চেষ্টা করেছিলেন এবং এই ঘটনায় দুঃখ প্রকাশ করে সতর্ক হয়েছেন।

কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের অধ্যাপক স্বপন চন্দ্র মজুমদার ২০২২ সালে পদোন্নতির আবেদনে যে গবেষণা উল্লেখ করেছিলেন, তা ভুয়া পিয়ার রিভিউর কারণে ২০২৪ সালের জুলাইয়ে প্রত্যাহার হয়। তার মূল লেখক হিসেবে থাকা অপর একটি করোনা বিষয়ক গবেষণা ২০২৫ সালের জুলাইয়ে চৌর্যবৃত্তির কারণে প্রত্যাহার হয়। তবে তিনি একে প্রকাশনা সংস্থার অভ্যন্তরীণ ত্রুটি বলে দাবি করেছেন।

ইউনাইটেড ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটির (ইউআইইউ) ব্যবসায়ে প্রশাসন বিভাগের অধ্যাপক মো. কামরুজ্জামানের ১১টি (৫টিতে মূল লেখক, ৬টিতে সহলেখক) এবং একই বিভাগের অধ্যাপক সালমা করিমের ৪টি গবেষণা ভুয়া পিয়ার রিভিউর কারণে ২০২৫ ও ২০২৬ সালের শুরুতে বাতিল হয়। কামরুজ্জামানের দাবি, বড় জালিয়াতি ছিল না, মূলত ‘লিটারেচার রিভিউ’-এর অসামঞ্জস্য ছিল। ইউআইইউ রেজিস্ট্রারের মতে, তারা বিষয়টি জানতেন না এবং জেনেই ব্যবস্থা নেবেন।

দেশে জার্নালে গবেষণা প্রকাশ করে সুবিধা নেওয়ার সুযোগ থাকলেও প্রত্যাহার হলে জবাবদিহির অভাব রয়েছে বলে গবেষকরা জানান।

বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনের (ইউজিসি) চেয়ারম্যান অধ্যাপক মামুন আহমেদ বলেন, ‘কোনো শিক্ষক বা গবেষকের বিরুদ্ধে জালিয়াতির অভিযোগ উঠলে তা তদন্ত করা এবং ব্যবস্থা নেওয়া প্রথমত ওই বিশ্ববিদ্যালয়ের কাজ। বিশ্ববিদ্যালয় যদি অভিযোগ উপেক্ষা করে বা ব্যবস্থা নিতে ব্যর্থ হয়, তখন ইউজিসি নিজে তদন্ত করবে এবং সরাসরি শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেবে।’

সূত্র: প্রথম আলো