logo

ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থান/হাসিনা সরকারের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়েন বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা

হাসিনা সরকারের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়েন বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা
কানাডিয়ান ইউনিভার্সিটির সামনে শিক্ষার্থীদের অবরোধের দৃশ্য। ছবি: সংগৃহীত

২০২৪ সালের ১৭ জুলাই ছাত্র আন্দোলন স্তিমিত করতে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নির্দেশে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে পুলিশি ক্র্যাকডাউন চালানোর পর আবাসিক হলগুলো ফাঁকা হয়ে যায়। এর ঠিক পরদিন, ১৮ জুলাই বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন অগ্নিস্ফুলিঙ্গের মতো জ্বলে ওঠে। ঢাকার বিভিন্ন বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা সেদিন স্বৈরাচারের বিরুদ্ধে এক দুর্বার প্রতিরোধ গড়ে তোলেন।

ওই দিন থেকেই পরবর্তীতে কার্যক্রম নিষিদ্ধ ঘোষিত আওয়ামী লীগ ও পুলিশ ছাত্র-জনতার ওপর একযোগে বর্বরোচিত হামলা চালায়। একই সঙ্গে বন্ধ করে দেওয়া হয় ইন্টারনেট এবং জোরদার করা হয় আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সাঁড়াশি অভিযান।

১৮ জুলাই সকাল থেকেই বাড্ডায় ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ের সামনে পুলিশের সঙ্গে কোটা সংস্কারের দাবিতে আন্দোলনরত শিক্ষার্থীদের দফায় দফায় সংঘর্ষ চলায় মেরুল বাড্ডা এলাকায় পুরোপুরি যান চলাচল বন্ধ হয়ে যায়। বেলা ১১টার দিকে মেরুল বাড্ডার কানাডিয়ান ইউনিভার্সিটি অব বাংলাদেশের ভেতরে ঢুকে পড়ে পুলিশ এবং বাইরে অবস্থান নেন আন্দোলনকারীরা।

বিশ্ববিদ্যালয়ের ভেতর থেকেই পুলিশের ছোড়া ছররা গুলি ও রাবার বুলেটে অসংখ্য আন্দোলনকারী গুরুতর আহত হন। তবে তীব্র প্রতিরোধের মুখে কানাডিয়ান ইউনিভার্সিটি থেকে বের হতে পারেননি পুলিশ সদস্যরা। পরবর্তীতে বেলা তিনটার কিছু আগে দুটি হেলিকপ্টারে করে অবরুদ্ধ পুলিশ সদস্যদের সেখান থেকে উদ্ধার করে নিয়ে যাওয়া হয়।

শিক্ষার্থীদের এই কোটা সংস্কার আন্দোলনের সঙ্গে স্বতঃস্ফূর্তভাবে যুক্ত হয় সাধারণ মানুষও। রাজধানীর বাড্ডা ছাড়াও সেদিন উত্তরা, রামপুরা, মালিবাগ, ধানমন্ডি, মিরপুর, নীলক্ষেত, আজিমপুর, তেজগাঁও, শান্তিনগর, মহাখালী, শনির আখড়া, কাজলা ও যাত্রাবাড়ীসহ বিভিন্ন এলাকায় দুই পক্ষের মধ্যে ব্যাপক সংঘর্ষ হয়। দিনভর এসব এলাকা রণক্ষেত্রে পরিণত হয়।

ঢাকার বাইরেও এদিন আন্দোলনকারীদের সঙ্গে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী এবং আওয়ামী লীগ ও এর বিভিন্ন অঙ্গসংগঠনের নেতা-কর্মীদের ব্যাপক সংঘর্ষের খবর পাওয়া যায়। চট্টগ্রাম, কুমিল্লা, নরসিংদী, নারায়ণগঞ্জ, বরিশাল, ময়মনসিংহ, খুলনা, রংপুর ও রাজশাহীসহ প্রায় সারা দেশে এই সংঘর্ষ ছড়িয়ে পড়ে। জুলাই গণ-অভ্যুত্থানে সবচেয়ে রক্তক্ষয়ী দিনগুলোর একটি ছিল এই ১৮ জুলাই। সারা দেশে সংঘর্ষে এদিন ২৭ জন (ঢাকায় ১৯ ও বাইরে ৮ জন) শহীদ হন এবং আহত হন প্রায় দেড় হাজার মানুষ।

বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের ডাকে ১৮ জুলাই দেশজুড়ে ‘কমপ্লিট শাটডাউন’ কর্মসূচি পালন করেন শিক্ষার্থীরা। আন্দোলনকারীদের প্রধান দাবিগুলো ছিল—কোটা সংস্কার আন্দোলনে পুলিশ, বিজিবি, র‍্যাব ও পুলিশের বিশেষায়িত টিম সোয়াটের বর্বরোচিত হামলা ও খুনের প্রতিবাদ, খুনিদের দৃষ্টান্তমূলক বিচার, সন্ত্রাসমুক্ত নিরাপদ ক্যাম্পাস নিশ্চিত করা এবং কোটাব্যবস্থার যৌক্তিক সংস্কার।

ছাত্র-জনতার সর্বাত্মক এই অবরোধ কর্মসূচির কারণে ঢাকাসহ সারা দেশ স্থবির ও অচল হয়ে পড়ে। আন্দোলনকারীরা সড়ক ও রেলপথ অবরুদ্ধ করলে ১৮ জুলাই ঢাকার সঙ্গে সারা দেশের যোগাযোগ প্রায় বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়। বিকেল সাড়ে পাঁচটার পর নিরাপত্তার স্বার্থে বন্ধ করে দেওয়া হয় মেট্রোরেল চলাচলও।

এ ছাড়া আন্দোলন চলাকালে কয়েক দফায় সংঘর্ষের মধ্যে রাষ্ট্রায়ত্ত টেলিভিশন বিটিভির কার্যালয়ে অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটলে সন্ধ্যা সাতটায় এর সম্প্রচার বন্ধ হয়ে যায়। একই সঙ্গে সেতু ভবন, দুর্যোগ ভবন, বিভিন্ন পুলিশ স্থাপনা ও মেয়র হানিফ ফ্লাইওভারের টোল প্লাজায় হামলার খবর পাওয়া যায়।

ঢাকার বাইরে অবরোধ ঘিরে সংঘর্ষের জেরে ক্ষুব্ধ আন্দোলনকারীরা বিভিন্ন স্থাপনায় ভাঙচুর চালান। ফলে সাতক্ষীরা সদর, ময়মনসিংহের ফুলপুর, মাদারীপুর শহর, রংপুর, বগুড়া শহর ও হবিগঞ্জ জেলা প্রশাসকের কার্যালয়, থানা, সরকারি অফিস এবং আওয়ামী লীগ ও সহযোগী সংগঠনের কার্যালয়ে হামলা-পাল্টা হামলার ঘটনা ঘটে।

উদ্ভূত পরিস্থিতিতে তৎকালীন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর নির্দেশে সারা দেশে বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি) মোতায়েন করে সরকার। এরপর সেদিন রাতেই ব্রডব্যান্ড ইন্টারনেটও সম্পূর্ণ বন্ধ করে দেওয়া হয়। এর আগে ১৭ জুলাই রাতে মুঠোফোনের মোবাইল ইন্টারনেট বন্ধ করা হয়েছিল, যার ফলে ১৮ জুলাই দেশ পুরোপুরি ইন্টারনেটবিহীন ব্ল্যাকআউটের কবলে পড়ে।

১৮ জুলাই দিবাগত রাত ১২টায় সাংবাদিকদের কাছে পাঠানো এক খুদে বার্তায় বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের অন্যতম সমন্বয়ক আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়া (পরবর্তীতে অন্তর্বর্তী সরকারের উপদেষ্টা) জানান, ১৯ জুলাইও সারা দেশে ‘কমপ্লিট শাটডাউন’ কর্মসূচি অব্যাহত থাকবে।

জুলাই গণ-অভ্যুত্থান বিষয়ক জাতিসংঘের মানবাধিকারবিষয়ক হাইকমিশনারের কার্যালয়ের (ওএইচসিএইচআর) ফ্যাক্ট-ফাইন্ডিং প্রতিবেদনে বলা হয়, বাংলাদেশে ২০২৪ সালের জুলাই ও আগস্টে সংঘটিত বিক্ষোভের সময়ে ব্যাপক মানবাধিকার লঙ্ঘন ও ক্ষমতার অপব্যবহার হয়েছে।

ওই প্রতিবেদনে আরও উল্লেখ করা হয়, ১৮ জুলাই তৎকালীন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর সভাপতিত্বে পুলিশ, বিজিবি, র‍্যাব, সেনাবাহিনী, ডিজিএফআই এবং অন্যান্য নিরাপত্তা ও গোয়েন্দা সংস্থার ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের উপস্থিতিতে ‘কোর কমিটির’ সভায় নির্বিচার গ্রেপ্তার অভিযান (যার মধ্যে ব্লক রেইডও অন্তর্ভুক্ত ছিল) নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা হয়েছিল। তৎকালীন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর সরাসরি নির্দেশেই মূলত ইন্টারনেট বন্ধ করা হয়েছিল; যার উদ্দেশ্য ছিল গুরুতর মানবাধিকার লঙ্ঘন গোপন করা, নির্বিচার গ্রেপ্তার চালানো এবং শান্তিপূর্ণ বিক্ষোভে বাধা দেওয়া।