মাদক কারবারে জড়িত রাজনীতিবিদদের রাজনীতি করার অধিকার নেই: ইশরাক

মাদক কারবারের বিস্তার ও পরিবহনে রাজনৈতিক পৃষ্ঠপোষকতা এবং আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কিছু সদস্যের সংশ্লিষ্টতা রয়েছে বলে দাবি করেছেন ঢাকা-৬ আসনের সংসদ সদস্য ইশরাক হোসেন।
তিনি বলেছেন, মাদক একটি সমাজ ও জাতিকে ধ্বংস করে দিতে পারে। তাই মাদক কারবারে জড়িত রাজনীতিবিদদের রাজনীতি করার কোনো অধিকার নেই। মাদকের বিরুদ্ধে সামাজিক প্রতিরোধ গড়ে তুলতে জনপ্রতিনিধি, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী, শিক্ষক, অভিভাবক ও ধর্মীয় নেতাদের একসঙ্গে কাজ করতে হবে।
শুক্রবার (৬ নভেম্বর) রাজধানীর সিরডাপ মিলনায়তনে ডিবেট ফর ডেমোক্রেসি আয়োজিত ‘মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ: চ্যালেঞ্জ ও করণীয়’ শীর্ষক সেমিনারে প্রধান অতিথির বক্তব্যে ইশরাক হোসেন এসব কথা বলেন।
ইশরাক হোসেন বলেন, মাদক পরিবহন ও বিস্তারের ক্ষেত্রে রাজনৈতিক পৃষ্ঠপোষকতা ছাড়া কোনোভাবেই এটি সম্ভব নয়। সীমান্ত দিয়ে মাদক প্রবেশের পর তা দেশের বিভিন্ন স্থানে ছড়িয়ে দিতে একাধিক সিন্ডিকেট কাজ করে। এক্ষেত্রে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কিছু সদস্যও জড়িত হয়ে পড়েন। তবে কোনো একটি সংস্থার সবাই জড়িত, এমনটা তিনি বলছেন না।
তিনি বলেন, মাদক অন্য অপরাধের মতো নয়। এটি সমাজ ও জাতিকে ধ্বংস করে দেওয়ার ভূমিকা রাখে। রাজনীতিবিদেরা জনগণের বিশ্বাস নিয়ে রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্ব পান। সেই রাজনীতিবিদদের কেউ মাদক কারবারের সঙ্গে যুক্ত হলে তাদের রাজনীতি করার কোনো অধিকার নেই।
মাদক নিয়ন্ত্রণে শুধু আলোচনা ও সভা-সেমিনারে সীমাবদ্ধ না থেকে বাস্তবমুখী পদক্ষেপ নেওয়ার ওপর গুরুত্ব দেন সংসদ সদস্য ইশরাক। তিনি বলেন, ২০২৬ সালের জানুয়ারিতে প্রকাশিত একটি জাতীয় গবেষণার ফলাফল অনুযায়ী, দেশে আনুমানিক ৮২ লাখ অবৈধ মাদক ব্যবহারকারী রয়েছেন, যা জনসংখ্যার প্রায় ৫ শতাংশ। উল্লেখযোগ্য একটি অংশ ২৫ বছর বয়সের আগেই মাদকের সঙ্গে যুক্ত হয়ে যাচ্ছে। দেশের তরুণ প্রজন্মকে রক্ষা করতে এখনই কার্যকর উদ্যোগ নিতে হবে।
তিনি বলেন, মাদকের বিস্তার রোধের পাশাপাশি যারা ইতোমধ্যে আসক্ত হয়েছেন, তাদের পুনর্বাসনের ব্যবস্থা করতে হবে। এ জন্য আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর পাশাপাশি জনপ্রতিনিধি, শিক্ষক, সামাজিক ও ধর্মীয় নেতাদের সম্পৃক্ত করে সামাজিক প্রতিরোধ গড়ে তুলতে হবে। পরিবার থেকেও সন্তানদের প্রতি নজরদারি ও সঠিক শিক্ষা নিশ্চিত করা জরুরি।
নিজের নির্বাচনি এলাকার অভিজ্ঞতা তুলে ধরে ইশরাক বলেন, ঢাকা-৬ আসনের গেন্ডারিয়ার ঘুণ্টিঘর এলাকায় মাদকের বিস্তার ভয়াবহ পর্যায়ে পৌঁছেছিল। জুরাইন রেলগেট থেকে গেন্ডারিয়া ঘুণ্টিঘর পর্যন্ত প্রায় আড়াই কিলোমিটার সড়কের দুই পাশে বেশ কয়েকটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান রয়েছে। রাতে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের দেয়াল টপকে অল্প বয়সি শিক্ষার্থী ও তরুণ-তরুণীদের সেখানে প্রবেশ করে মাদক সেবনের ফুটেজ দেখে তিনি উদ্বিগ্ন হন। মাদক বিক্রেতারাও সেখানে প্রবেশ করে মাদক বিক্রি করতেন।
ইশরাক বলেন, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে মাদক প্রবেশের বিষয়টি দেখে তিনি নিজেই মাঠে নামার সিদ্ধান্ত নেন। ঢাকা-৬ আসনের ৪৫ ও ৪৬ নম্বর ওয়ার্ডের গেন্ডারিয়া ঘুণ্টিঘর এলাকায় মাদকের যে সাম্রাজ্য গড়ে উঠেছিল, সেটি গুঁড়িয়ে দেওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এ কাজে ওয়ারী বিভাগের উপকমিশনার ব্যক্তিগতভাবে তৎপরতা চালিয়েছেন। ঢাকা-৪ আসনে বিএনপির মনোনীত প্রার্থী তানভীর আহমেদ রবিনের সঙ্গে সমন্বয় করে সেখানে একটি সড়ক নির্মাণের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
মাদকের কারণে ওই এলাকায় ছিনতাই, চুরি ও ডাকাতির মতো অপরাধ বেড়েছিল উল্লেখ করে তিনি বলেন, দিনদুপুরে নারীদের ধারালো অস্ত্র দিয়ে আঘাত করে মালামাল ছিনিয়ে নেওয়া এবং শিক্ষার্থীদের মুঠোফোন ছিনতাইয়ের ঘটনা ঘটেছে। রাতে বাসাবাড়িতে চুরি, বিদ্যুতের মিটার, বাতি ও সিসিটিভি ক্যামেরা খুলে নেওয়ার মতো ঘটনাও ঘটেছে। এসব কারণে এলাকার বাসিন্দারা নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছিলেন।
মাদক সরবরাহের উৎস ও পরিবহনব্যবস্থার ওপর নজরদারি বাড়ানোর তাগিদ দিয়ে ইশরাক বলেন, মাদকের চাহিদা থাকলে সরবরাহও থাকবে। পৃথিবীর কোনো দেশেই শতভাগ মাদক নির্মূল করা সম্ভব হয়নি। তবে সরবরাহব্যবস্থা নিয়ন্ত্রণে এনে মাদকের বিস্তার ঠেকাতে হবে।
নিজের অনুসন্ধানের কথা উল্লেখ করে তিনি জানান, কিছু নামকরা পরিবহন প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে বিপুল পরিমাণ মাদক পরিবহনের তথ্য তিনি পেয়েছেন। এমনকি কিছু পরিবহনের ক্ষেত্রে গন্তব্যে পৌঁছানোর আগে মাঝপথে তল্লাশি করা যায় না-এমন ব্যবস্থার কথাও জানতে পেরেছেন। এ ছাড়া ঢাকার অভিজাত এলাকায় মেথামফেটামিন তৈরির পরীক্ষাগারের অস্তিত্ব এবং কয়েকটি ওষুধ কোম্পানির সংশ্লিষ্টতার তথ্য তার অনুসন্ধানে উঠে এসেছে বলে দাবি করেন তিনি। এসব বিষয় গোয়েন্দা তৎপরতার মাধ্যমে শনাক্ত করে জড়িতদের আইনের আওতায় আনার আহ্বান জানান।
মাদকাসক্ত ব্যক্তিদের পুনর্বাসনের ওপর গুরুত্ব দিয়ে ইশরাক বলেন, ছিন্নমূল ও ঠিকানাহীন মাদকাসক্ত ব্যক্তিদের পুনর্বাসন একটি বড় চ্যালেঞ্জ। এ ক্ষেত্রে রাষ্ট্র ও সমাজকে কার্যকর ভূমিকা নিতে হবে। মাদক নিয়ন্ত্রণে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী, রাজনৈতিক নেতা ও সামাজিক নেতৃবৃন্দকে একসঙ্গে কাজ করতে হবে।
ইশরাক জানান, ডিবেট ফর ডেমোক্রেসির চেয়ারম্যান হাসান আহমেদ চৌধুরী কিরণের সঙ্গে মিলে তারা একটি অলাভজনক সংগঠন গড়ে তোলার উদ্যোগ নিয়েছেন। সংগঠনটির নাম এখনো চূড়ান্ত হয়নি। এ সংগঠনের মাধ্যমে সারা দেশে আলোচনা সভা ও জনসচেতনতামূলক কার্যক্রম পরিচালনা করে মাদকের বিরুদ্ধে সামাজিক প্রতিরোধ গড়ে তোলার পরিকল্পনা রয়েছে তাদের।


