জ্বালানি সংকটে নগর উন্নয়ন কৌশল বদলের তাগিদ

জ্বালানি সংকট ও পরিবর্তিত বৈশ্বিক বাস্তবতায় বাংলাদেশের নগরায়ণ ও উন্নয়ন কৌশলে মৌলিক পরিবর্তন আনা জরুরি বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা। তারা বলছেন, বিদ্যমান গাড়িনির্ভর নগর ব্যবস্থা, অপরিকল্পিত আবাসন ও পরিবেশবিরোধী অবকাঠামো উন্নয়ন দেশের জ্বালানি চাহিদা অস্বাভাবিকভাবে বাড়িয়ে দিয়েছে। এই পরিস্থিতিতে টেকসই উন্নয়ন নিশ্চিত করতে হলে জ্বালানি ও নগর পরিকল্পনার সমন্বিত দৃষ্টিভঙ্গি গ্রহণ ছাড়া বিকল্প নেই।
শুক্রবার (১৭ এপ্রিল) রাজধানীর বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্রের সম্মেলন কক্ষে ইনস্টিটিউট ফর প্ল্যানিং অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট (আইপিডি) আয়োজিত এক সংলাপে এসব কথা বলেন বিশেষজ্ঞরা।
‘জ্বালানি সংকট এবং পরিবর্তিত বিশ্ব পরিস্থিতিতে বাংলাদেশের নগরায়ণ ও উন্নয়ন ভাবনা’ শীর্ষক এ সংলাপে নগর পরিকল্পনাবিদ, গবেষক ও শিক্ষকেরা অংশ নেন।
সংলাপে বক্তারা বলেন, নগর এলাকায় গণপরিবহন ব্যবস্থার ঘাটতি এবং ব্যক্তিগত গাড়িনির্ভরতা জ্বালানি ব্যবহারের চাপ বাড়াচ্ছে। একই সঙ্গে আবাসন পরিকল্পনায় প্রাকৃতিক উপাদান উপেক্ষা, খাল-বিল ও জলাশয় ভরাট এবং সবুজায়ন ধ্বংসের ফলে শহরের তাপমাত্রা বৃদ্ধি পাচ্ছে। এতে শীতাতপ নিয়ন্ত্রণ যন্ত্রের ব্যবহার বাড়ছে, যা বিদ্যুতের চাহিদা আরও বাড়িয়ে তুলছে। কাঁচঘেরা ভবন ও আলো-বাতাসবিহীন স্থাপত্যও এই সংকটকে তীব্র করছে।
বক্তারা আরও বলেন, বর্তমানে গ্রাম ও শহরের মধ্যে যেমন বিদ্যুৎ প্রাপ্তিতে বৈষম্য রয়েছে, তেমনি শহরের মধ্যেও বিভিন্ন এলাকায় এ বৈষম্য স্পষ্ট। বিশেষ করে প্রান্তিক ও স্বল্প আয়ের মানুষ বিদ্যুৎ সংকটে বেশি ভোগান্তির শিকার হচ্ছেন। জ্বালানি বণ্টনে ন্যায্যতা ও ভারসাম্য নিশ্চিত করা না গেলে পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে উঠতে পারে।
সংলাপের মূল প্রবন্ধে আইপিডির নির্বাহী পরিচালক অধ্যাপক ড. আদিল মুহাম্মদ খান বলেন, দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে জ্বালানির চাহিদা ভিন্ন হওয়ায় ‘এনার্জি ডিমান্ড ম্যাপিং’ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ঢাকাকেন্দ্রিক জ্বালানি ব্যবহার দেশের অন্যান্য অঞ্চলের তুলনায় অনেক বেশি, যা একটি কাঠামোগত বৈষম্য তৈরি করছে। এই বৈষম্য দূর করতে পরিকল্পিত বিদ্যুৎ বণ্টন, তথ্যনির্ভর পরিকল্পনা এবং নিয়মিত মনিটরিং প্রয়োজন।
তিনি বলেন, উন্নয়ন বাজেটের মতো বিদ্যুৎ বরাদ্দেও বৈষম্য রয়েছে, যা দেশের উন্নয়নকে এককেন্দ্রিক করে তুলছে। এ অবস্থা থেকে বেরিয়ে আসতে হলে বিকেন্দ্রীকরণ এবং বহুকেন্দ্রিক নগরায়ণ নিশ্চিত করতে হবে।
সংলাপে বক্তারা দ্রুত নবায়নযোগ্য জ্বালানি নীতি অনুমোদন ও বাস্তবায়নের ওপর জোর দেন। তারা বলেন, গ্রিন বিল্ডিং কোড প্রণয়ন, ভবন ও অবকাঠামো নির্মাণে এনার্জি ডিমান্ড ও ইমপ্যাক্ট এসেসমেন্ট বাধ্যতামূলক করা জরুরি। অপ্রয়োজনীয় উচ্চ ভবনের পরিবর্তে মাঝারি উচ্চতার ঘনবসতিপূর্ণ উন্নয়ন জ্বালানি সাশ্রয়ে সহায়ক হতে পারে।
বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব প্ল্যানার্স (বিআইপি)-এর সভাপতি ড. আরিফুল ইসলাম বলেন, গ্রামে জ্বালানি ঘাটতির কারণে শহরমুখী প্রবণতা বাড়ছে, যা টেকসই উন্নয়নের পথে বড় বাধা। তিনি উন্নত গণপরিবহন ব্যবস্থা, ট্রানজিট-অরিয়েন্টেড ডেভেলপমেন্ট এবং জ্বালানি দক্ষতার ওপর গুরুত্বারোপ করেন।
বাংলাদেশ ট্রাফিক ও ট্রান্সপোর্ট ফোরামের সভাপতি সাজেদুল হক বলেন, নগর উন্নয়নে সমন্বিত পরিকল্পনার অভাব রয়েছে। গণপরিবহনভিত্তিক যাতায়াত ব্যবস্থা গড়ে তুলতে সমন্বিত বাস রুট, ছায়াযুক্ত ফুটপাত এবং পৃথক সাইকেল লেন নির্মাণ জরুরি। পাশাপাশি সামাজিক আচরণে পরিবর্তন এনে ব্যক্তিগত গাড়ির ব্যবহার কমানোর আহ্বান জানান তিনি।
স্টেট ইউনিভার্সিটি অব বাংলাদেশের শিক্ষক ও আইপিডির রিসার্চ ফেলো কে এম আসিফ ইকবাল বলেন, গ্রামীণ এলাকায় এখনও বিদ্যুৎ সরবরাহ অনিয়মিত। তিনি অভিযোগ করেন, অতীতে সৌরবিদ্যুৎ সম্প্রসারণের উদ্যোগ থাকলেও উচ্চ কর আরোপের কারণে তা বাধাগ্রস্ত হয়েছে। বর্তমান সরকারকে দ্রুত কার্যকর নবায়নযোগ্য জ্বালানি নীতি অনুমোদনের আহ্বান জানান তিনি।
আইপিডির রিসার্চ ফেলো ড. ফরহাদুর রেজা বলেন, ভবনের টেকসই নকশা ব্যবহারের মাধ্যমে ৪০ থেকে ৫০ শতাংশ পর্যন্ত জ্বালানি সাশ্রয় সম্ভব। তিনি বলেন, ঢাকায় উচ্চ ভবন নির্মাণের প্রবণতা জ্বালানি চাহিদা বাড়িয়ে দিচ্ছে। এর পরিবর্তে মাঝারি উচ্চতার ঘনবসতিপূর্ণ উন্নয়ন কৌশল গ্রহণ করা প্রয়োজন।
জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ড. শাম্মী আক্তার সেতু বলেন, কার্যকর ভূমি ব্যবহার পরিকল্পনার মাধ্যমে শিল্প, পরিবহন ও নবায়নযোগ্য জ্বালানিকে সমন্বিত করলে জ্বালানি ব্যবস্থাপনাকে টেকসই করা সম্ভব। তিনি নাগরিক সচেতনতা বৃদ্ধির ওপরও গুরুত্ব দেন।
সংলাপে আইপিডির প্রস্তাবনায় বলা হয়, এককেন্দ্রিক নগরায়ণের পরিবর্তে বহুকেন্দ্রিক উন্নয়ন কাঠামো গড়ে তুলতে হবে। গণপরিবহনকেন্দ্রিক উন্নয়ন, হাঁটা ও সাইকেলবান্ধব অবকাঠামো এবং নীল-সবুজ অবকাঠামো সংরক্ষণে গুরুত্ব দিতে হবে।
এ ছাড়া ছাদে সৌরবিদ্যুৎ স্থাপন বৃদ্ধি, মাইক্রোগ্রিড উন্নয়ন, কৃষিখাতে সৌর সেচ ব্যবস্থা চালু এবং গ্রামীণ শিল্পে নিরবচ্ছিন্ন জ্বালানি সরবরাহ নিশ্চিত করার সুপারিশ করা হয়। একই সঙ্গে রেল ও নৌপথে পণ্য পরিবহন বাড়ানোর ওপরও গুরুত্ব দেওয়া হয়।