logo
অভ্যন্তরীণ তদন্ত

স্ট্যান্ডার্ড ব্যাংকে ‘ভুয়া কেনাকাটা’, ৬ কোটি টাকা আত্মসাৎ

• তিন প্রতিষ্ঠানের নামে অর্থ স্থানান্তর

• দরপত্রের শর্ত বাদ দিয়ে কার্যাদেশ

• ইনভয়েসের ভিত্তিতে ৪ কোটি ১৫ লাখ টাকা পরিশোধের অনুমোদন

• রক্ষণাবেক্ষণ চুক্তির নামে আরও অর্থ পরিশোধ

• নথিতে ৯ কর্মকর্তার নাম

স্ট্যান্ডার্ড ব্যাংকে ‘ভুয়া কেনাকাটা’, ৬ কোটি টাকা আত্মসাৎ
অভ্যন্তরীণ তদন্তে অর্থ সরানোর বিষয়টি ধরা পড়লেও কারও বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়নি স্ট্যান্ডার্ড ব্যাংক কর্তৃপক্ষ। ছবি: ব্যাংকের ওয়েবসাইট থেকে নেওয়া।

স্ট্যান্ডার্ড ব্যাংকের আইটি বিভাগে ভুয়া কেনাকাটার মাধ্যমে ছয় কোটি টাকারও বেশি অর্থ আত্মসাৎ করা হয়েছে। তিন প্রতিষ্ঠানের নামে এই অর্থ সরানো হয়। আত্মসাৎ হওয়া মোট অর্থের পরিমাণ ৬ কোটি ৩৭ লাখ ৫৮ হাজার ৭৫০ টাকা। ব্যাংকের অভ্যন্তরীণ তদন্তে বিষয়টি ধরা পড়লেও এখনও পর্যন্ত কারও বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি।

কাগজে-কলমে ২০২২ সালে আধুনিক প্রযুক্তির সফটওয়্যার ও ডেটাবেজ কেনা হয়েছে। এর কার্যাদেশ, বিল ও পেমেন্ট হয়েছে। পরে রক্ষণাবেক্ষণ বাবদও অর্থ পরিশোধ করা হয়। কিন্তু বাস্তবে এসব সেবা ও পণ্যের কোনো অস্তিত্ব নেই।

২০২৫ সালের মে মাসের প্রাথমিক তদন্ত প্রতিবেদনে কোথাও প্রয়োজনীয় কারিগরি সক্ষমতা না থাকা প্রতিষ্ঠানকে কাজ দেওয়ার তথ্য আছে। কোথাও টেন্ডারের শর্ত বাদ দিয়ে কার্যাদেশ দেওয়ার কথা আছে। আবার কোথাও পণ্য বা সেবা সরবরাহের আগেই বিল পরিশোধের তথ্য রয়েছে।

এসবের সঙ্গে জড়িতদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে প্রতিবেদনটি কেন্দ্রীয় ব্যাংকে পাঠানো হয়। পরে কেন্দ্রীয় ব্যাংক সূত্রে এটি এশিয়া পোস্টের হাতে পৌঁছায়।

ঘটনার শুরু ওরাকল ডেটাবেজ ১৯সি নিয়ে। ১২টি সিপিইউ লাইসেন্সসহ ওরাকল ডেটাবেজ ১৯সি সংগ্রহ, ইনস্টলেশন ও কনফিগারেশনের উদ্যোগ নেওয়া হয়। এ কাজের জন্য ইআরএ ইনফো টেক লিমিটেডকে নির্বাচন করা হয়। প্রতিষ্ঠানটিকে কাজ দেওয়ার প্রক্রিয়া এবং পরবর্তী লেনদেন নিয়ে তদন্ত প্রতিবেদনে একাধিক অনিয়মের তথ্য উঠে এসেছে।

ব্যাংকের আইসিসি ডিভিশনের অডিট দল নিয়মিত অডিটে দেখতে পায়, ১২টি সিপিইউ লাইসেন্স কেনা হলেও চারটি ডেটাবেজ সার্ভার তখনও ১৯সি-র বদলে আগের ওরাকল ডেটাবেজ ১১জির অধীনে চলছে। এরপর ২০২৫ সালের ১২ মে চার সদস্যের তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়। আইটি বিভাগের তৎকালীন প্রধান ও সিআইটিও সুফি তোফায়েল আহমেদের অনিয়মের আলামত কমিটির কাছে স্পষ্ট হয়।

তদন্ত প্রতিবেদনে প্রশ্ন তোলা হয়েছে, সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের কাজটির জন্য প্রয়োজনীয় পূর্ব অভিজ্ঞতা না থাকা সত্ত্বেও কীভাবে তাদের কাজ দেওয়ার সুপারিশ করা হয়েছে।

২০২২ সালের ১২ এপ্রিল তিন সদস্যের টেকনিক্যাল অ্যাসেসমেন্ট কমিটি ইআরএ ইনফো টেক লিমিটেডকে কাজ দেওয়ার সুপারিশ করে। কমিটির সদস্য ছিলেন সুফি তোফায়েল আহমেদ, মহি উদ্দিন ও শেখ শরিফুল ইসলাম।

ডেটাবেজ ইনস্টলেশন ও কনফিগারেশন বিষয়ে মূল্যায়নকারী কর্মকর্তাদের প্রয়োজনীয় পেশাগত ডিগ্রি ছিল না। কী পদ্ধতি ব্যবহার করে কারিগরি মূল্যায়ন করা হয়েছিল, তারও স্পষ্ট বিবরণ পাওয়া যায়নি। দরপত্রে অংশ নেওয়া অন্য চার প্রতিষ্ঠানকে ২১ থেকে ২১ দশমিক ৫০ নম্বর দেওয়া হয়। ইআরএ ইনফো টেক লিমিটেডের নম্বর ছিল ২৭ দশমিক ২৫। প্রতিবেদনে বলা হয়, প্রতিষ্ঠানটিকে ইচ্ছাকৃতভাবে অতি মূল্যায়ন করা হয়েছে।

২০২২ সালের ২০ এপ্রিল ওরাকল ডেটাবেজ ১৯সি কেনার বিষয়ে ক্রয় কমিটির সভা হয়। টেকনিক্যাল অ্যাসেসমেন্ট কমিটির মূল্যায়নের ভিত্তিতে ইআরএ ইনফো টেক লিমিটেডকে কাজ দেওয়ার সিদ্ধান্ত হয়। এরপর ৫ মে প্রতিষ্ঠানটিকে কার্যাদেশ দেওয়া হয়।

ক্রয় কমিটির সভায় সদস্য ছিলেন রফিকুল ইসলাম, সুফি তোফায়েল আহমেদ, আলী রেজা ও মেজর (অব.) মো. সাইফুল ইসলাম। আলী রেজা সভায় অনুপস্থিত থেকে তার পক্ষে মাকসুদুর রহমানকে পাঠান। কার্যাদেশে স্বাক্ষর করেন রফিকুল ইসলাম, সুফি তোফায়েল আহমেদ ও মেজর (অব.) মো. সাইফুল ইসলাম।

সেই কার্যাদেশে টেন্ডার শিডিউলের গুরুত্বপূর্ণ কিছু শর্ত অন্তর্ভুক্ত করা হয়নি। এর মধ্যে জরিমানা সংক্রান্ত ধারাও ছিল। এতে ব্যাংকের স্বার্থ ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কার কথা জানিয়েছেন অডিটে অংশ নেওয়া কর্মকর্তারা। কার্যাদেশে ১৯সি লাইসেন্স ও বার্ষিক রক্ষণাবেক্ষণ (এএমসি) সংক্রান্ত চুক্তির কথা থাকলেও সংশ্লিষ্ট নথি পাওয়া যায়নি।

প্রতিবেদনের গুরুত্বপূর্ণ পর্যবেক্ষণগুলোর একটি ছিল বিল পরিশোধের প্রক্রিয়া। সম্পূর্ণ বিল দাখিল না করে শুধু ইনভয়েস পাওয়ার পর ২০২২ সালের ২৭ জুন ৪ কোটি ১৫ লাখ টাকা ইআরএ ইনফো টেক লিমিটেডকে দেওয়ার অনুমোদন করা হয়। এ ক্ষেত্রে সাধারণ সেবা বিভাগের বদলে আইটি বিভাগ থেকে অফিস নোট ইস্যু করা হয়েছিল। তদন্ত দলের কাছে এটি ‘কনফ্লিক্ট অব ইন্টারেস্ট’ হিসেবে প্রতীয়মান হয়েছে। অর্থাৎ যে বিভাগ প্রযুক্তিগত প্রয়োজন নির্ধারণ করেছে, মূল্যায়ন প্রক্রিয়ায় ভূমিকা রেখেছে এবং কাজের সঙ্গে সম্পৃক্ত ছিল, অর্থ পরিশোধের প্রক্রিয়াও তাদের মাধ্যমে হয়েছে।

কার্যাদেশের শর্তে লেখা ছিল, ওরাকল ডেটাবেজের সরবরাহ, ইনস্টলেশন ও কনফিগারেশনের পর পেমেন্ট করা হবে। তবে বাস্তবে ইনস্টলেশন ও কনফিগারেশন ছাড়াই বিল পরিশোধ করা হয়। ২০২২ সালের ৬ জুলাই ইআরএ ইনফো টেক লিমিটেডের হিসাব থেকে চেকের মাধ্যমে নগদ অর্থ তোলা হয়।

তদন্ত প্রতিবেদনে কথিত ‘ফিকটিশাস পারচেজ’-এর সঙ্গে তিনটি প্রতিষ্ঠানের নাম এসেছে। ইআরএ ইনফো টেক লিমিটেডের নামে ওরাকল ডেটাবেজ ১৯সি সরবরাহ, ইনস্টলেশন, কনফিগারেশন ও এএমসি বাবদ ৫ কোটি টাকা দেখানো হয়েছে। স্মার্ট টেকনোলজিস (বিডি) লিমিটেডের নামে ওরাকল ডেটাবেজ ১৯সি-এর এএমসি-সংক্রান্ত সেবা বাবদ ৯৩ লাখ ৬০ হাজার টাকা দেখানো হয়েছে। করপোরেট প্রযুক্তি লিমিটেডের নামে মাইক্রোসফট ৩৬৫ এফথ্রি ও মাইক্রোসফট ৩৬৫ অ্যাপস বাবদ ৪৩ লাখ ৯৯ হাজার টাকা দেখানো হয়েছে।

সব মিলিয়ে অর্থের পরিমাণ ৬ কোটি ৩৭ লাখ ৫৮ হাজার ৭৫০ টাকা। এই অর্থ বিভিন্ন প্রক্রিয়ায় ব্যাংকের হিসাব থেকে স্থানান্তর করা হয়েছে এবং এসব লেনদেন অসাধু পদ্ধতিতে সম্পন্ন হয়েছে।

ব্যাংকের পুরোনো ওরাকল ডেটাবেজ ১১জি থেকে ১৯সি-তে মাইগ্রেশন করার কথা থাকলেও তদন্তে ১৯সি ডেটাবেজ ইনস্টলেশন বা মাইগ্রেশন না হওয়ার তথ্য পাওয়া যায়। একই ডেটাবেজের এএমসি বাবদ অর্থ পরিশোধ নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন নিরীক্ষকরা।

স্মার্ট টেকনোলজিসের সঙ্গে পরে নতুন করে এএমসি চুক্তি করা হয়। ২০২৪ সালের ১৯ মে তিন বছরের চুক্তি হয়। এক বছরের এএমসি বাবদ ৭৮ হাজার ডলার, অর্থাৎ ৯৩ লাখ ৬০ হাজার টাকা পরিশোধ করা হয়। মাইক্রোসফট ৩৬৫ নিয়ে ব্যাংকের আইটি বিভাগের এক চিঠিতে বলা হয়, ব্যাংকের কোনো কম্পিউটারে এই সফটওয়্যার ইনস্টল করা হয়নি।

সুফি তোফায়েল আহমেদ, মো. মোহন মিয়া ও মেজর (অব.) আহমেদ মোস্তফা সাইরাস কারচুপির মাধ্যমে স্মার্ট টেকনোলজিসের সঙ্গে নতুন চুক্তি করেন। ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের অনুমতি ছাড়াই এই চুক্তি হয়।

মাইক্রোসফট ৩৬৫ বাবদ অর্থ পরিশোধ হয় ২০২৩ সালের ২১ সেপ্টেম্বরের পেমেন্ট অর্ডারের (নম্বর ২৯৩৩১২৫) মাধ্যমে। মাইক্রোসফট ৩৬৫ এফথ্রি ও অ্যাপস না কিনেই পরিচালনা পর্ষদকে বিভ্রান্তিকর তথ্য দিয়ে অর্থ উত্তোলন করা হয়। এ ক্ষেত্রে সহযোগিতা করেন সুফি তোফায়েল আহমেদ, রফিকুল ইসলাম, মো. ওয়াহিদ জামান ও মাকসুদুর রহমান।

তদন্তে সুফি তোফায়েল আহমেদ, আলী রেজা, মো. মোহন মিয়া, মাকসুদুর রহমান, জয়নুল আবেদীন, মেজর (অব.) মো. সাইফুল ইসলাম, মেজর (অব.) আহমেদ মোস্তফা সাইরাস, রফিকুল ইসলাম ও তৌহিদুল ইসলাম খানের নাম উঠে এসেছে। সুপারিশে বলা হয়, এসব কর্মকর্তার ভূমিকা খতিয়ে দেখা হলে প্রকৃত দায়ীদের শনাক্ত করা সম্ভব হবে।

পৃথক লেনদেনের মাধ্যমে ব্যাংকের ৬ কোটি ৩৭ লাখ ৫৮ হাজার ৭৫০ টাকা স্থানান্তর করা হয়েছে। প্রতিবেদনে বলা হয়, ইআরএ ইনফো টেক, স্মার্ট টেকনোলজিস ও করপোরেট প্রযুক্তি লিমিটেডের সঙ্গে অবৈধ প্রক্রিয়ায় এই অর্থ স্থানান্তর করা হয়েছে। এ ক্ষেত্রে আইটি বিভাগের সংবেদনশীল ও কারিগরি ব্যবস্থার সুযোগ নেওয়া হয়েছে।

যা বলছেন সংশ্লিষ্টরা

স্ট্যান্ডার্ড ব্যাংকের অভ্যন্তরীণ তদন্তে ভুয়া কেনাকাটার মাধ্যমে ৬ কোটি টাকা আত্মসাতের ঘটনায় ইআরএ ইনফো টেকের নাম আসার বিষয়ে কথা হয় প্রতিষ্ঠানটির মার্কেটিং বিভাগের কর্মকর্তা রেজাউর রহমানের সঙ্গে। তিনি এশিয়া পোস্টকে বলেন, ‘সফটওয়্যার আপডেটের জন্য কিছু কাজ করা হয়েছে। সেখানে কোনো অনিয়ম দুর্নীতির অভিযোগ সত্য নয়। তাদের সঙ্গে আমাদের চুক্তি অনুযায়ী, বৈধ কাগজপত্র সাবমিট করে কাজ করা হয়েছে।’

ব্যাংকের আইটি বিভাগের সাবেক প্রধান সুফি তোফায়েল আহমেদের সঙ্গে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করেন এই প্রতিবেদক। তবে মোবাইলে ও হোয়াটসঅ্যাপে বারবার চেষ্টা করেও তাকে পাওয়া যায়নি।

অর্থ আত্মসাতের ঘটনায় অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে কি না, সে বিষয়ে কোনো তথ্য দিতে পারেননি ইস্টার্ন ব্যাংকের হেড অব কোর ব্যাংকিং সিস্টেম মহিউদ্দিন আহমেদ। জানান, তিনি সংশ্লিষ্ট অভ্যন্তরীণ তদন্ত কমিটির সদস্য ছিলেন না। ফলে এ বিষয়ে তার কাছে সুনির্দিষ্ট কোনো তথ্য নেই।