logo

নতুন আইন ঘিরে বিতর্ক, অনিশ্চয়তায় সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংক

নতুন আইন ঘিরে বিতর্ক, অনিশ্চয়তায় সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংক
ছবি: এশিয়া পোস্ট কোলাজ

‘একেক সময় একেক অজুহাত দেয় ব্যাংক। হয়রানির যেন শেষ নেই। প্রায় দুই বছর ধরে তিনটি ব্যাংকে আমার তিন কোটির বেশি টাকা আটকে আছে।’

চট্টগ্রামের আন্দরকিল্লার বাসিন্দা ব্যবসায়ী মোহাম্মদ আবুল কালাম আজাদ এভাবেই নিজের ভোগান্তির কথা বলছিলেন। তার দাবি, ফার্স্ট সিকিউরিটি ইসলামী ব্যাংক, ইউনিয়ন ব্যাংক ও সোশ্যাল ইসলামী ব্যাংকে থাকা বিপুল অঙ্কের আমানতের মধ্যে গত দেড় বছরে তিনি তুলতে পেরেছেন মাত্র সাত লাখ টাকা।

তিনি বলেন, পাঁচ আগস্টের পর থেকে আন্দোলন করেছি, মন্ত্রী-উপদেষ্টা-গভর্নর সবার কাছে গেছি। কিন্তু কোনো সমাধান পাইনি।

শুধু আজাদ নন, সংকটে থাকা শরিয়াভিত্তিক কয়েকটি ব্যাংকের হাজারো গ্রাহকের অভিযোগ এখন প্রায় একই রকম। আমানতের টাকা ফেরত না পাওয়ার ক্ষোভে সম্প্রতি চট্টগ্রাম, রাজশাহীসহ বিভিন্ন এলাকায় বিক্ষোভ করেছেন গ্রাহকেরা। চট্টগ্রামের খাতুনগঞ্জ ও আগ্রাবাদে কয়েকটি শাখায় তালা ঝুলিয়ে দেওয়ার ঘটনাও ঘটেছে।

আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর বড় অঙ্কের খেলাপি ঋণের চাপে নড়বড়ে হয়ে পড়ে দেশের পাঁচটি ইসলামী ধারার ব্যাংক। পরিস্থিতি সামাল দিতে রাষ্ট্রীয় উদ্যোগে এক্সিম ব্যাংক, ফার্স্ট সিকিউরিটি ইসলামী ব্যাংক, গ্লোবাল ইসলামী ব্যাংক, ইউনিয়ন ব্যাংক ও সোশ্যাল ইসলামী ব্যাংককে একীভূত করে ‘সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংক’ গঠনের উদ্যোগ নেয় সরকার। তবে পাঁচ মাস পেরিয়ে গেলেও কাঙ্ক্ষিত সুফল মেলেনি বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

বরং একীভূত হওয়া ব্যাংকগুলোর মধ্যে সমন্বয়হীনতা, প্রশাসনিক জটিলতা ও নতুন বিনিয়োগের অভাব পুরো উদ্যোগটিকেই অনিশ্চয়তার মুখে ঠেলে দিয়েছে। এর মধ্যে আবার নতুন করে বিতর্ক তৈরি করেছে ‘ব্যাংক রেজল্যুশন আইন ২০২৬’।

শুরু থেকেই ভুল পথে

ব্যাংক খাত বিশ্লেষকদের অনেকে মনে করছেন, পুরো একীভূতকরণ প্রক্রিয়াটিই ছিল ত্রুটিপূর্ণ।

বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব ব্যাংক ম্যানেজমেন্টের (বিআইবিএম) সাবেক মহাপরিচালক ড. তৌফিক আহমদ চৌধুরী বলেন, মার্জার সাধারণত স্বেচ্ছাভিত্তিক প্রক্রিয়া। এখানে সেটা হয়নি। জোর করে কয়েকটি দুর্বল ব্যাংককে একসঙ্গে আনা হয়েছে।

তার ভাষ্য, ভালো ও খারাপ ব্যাংকের একীভূতকরণ কার্যকর হতে পারে। কিন্তু একসঙ্গে একাধিক দুর্বল ব্যাংককে একীভূত করলে কাঙ্ক্ষিত ফল পাওয়া কঠিন।

একই ধরনের মন্তব্য করেছেন বিআইবিএমের অধ্যাপক ড. আহসান হাবীব। তিনি বলেন, একটি ব্যাংকের খেলাপি ঋণ ৯০ শতাংশ, অন্যটির ৪০ শতাংশ— এমন অবস্থায় কম ঝুঁকির ব্যাংক কেন অন্যের দায় নেবে, সেই প্রশ্ন তো উঠবেই।

তার মতে, একীভূত করার ক্ষেত্রে কোন ব্যাংকগুলোকে অন্তর্ভুক্ত করা হবে, সে সিদ্ধান্তেও অসংগতি ছিল।

নতুন আইন ঘিরে বিতর্ক

এখন সবচেয়ে বেশি আলোচনা হচ্ছে নতুন পাস হওয়া ‘ব্যাংক রেজল্যুশন আইন ২০২৬’ নিয়ে। ব্যাংক খাত সংশ্লিষ্টদের একটি অংশের আশঙ্কা, আইনের কিছু ধারা সাবেক মালিকদের আবারও ব্যাংকের নিয়ন্ত্রণে ফেরার সুযোগ তৈরি করতে পারে।

বিশেষ করে আইনের ১৮(ক) ধারা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছে বাংলাদেশ অ্যাসোসিয়েশন অব ব্যাংকস (বিএবি)। সংগঠনটির আশঙ্কা, অতীতে যাদের বিরুদ্ধে ব্যাংক থেকে অর্থ আত্মসাতের অভিযোগ রয়েছে, তারাই আবার মালিকানায় ফিরে আসতে পারেন।

তবে বাংলাদেশ ব্যাংক জানিয়েছে, আইনের শর্ত পূরণ ছাড়া কাউকে ফেরার সুযোগ দেওয়া হবে না।

এর মধ্যেই সোশ্যাল ইসলামী ব্যাংক একীভূত কাঠামো থেকে বেরিয়ে আবার স্বতন্ত্র ব্যাংক হিসেবে পরিচালিত হওয়ার আবেদন করেছে। গত ২৭ এপ্রিল বাংলাদেশ ব্যাংকে পাঠানো এক চিঠিতে ব্যাংকটি সেই আগ্রহের কথা জানায়।

বিশ্লেষকেরা বলছেন, এ ঘটনা পুরো একীভূতকরণ উদ্যোগের ভবিষ্যৎ নিয়েই নতুন প্রশ্ন তৈরি করেছে।

আস্থাহীনতায় ভুগছেন গ্রাহকেরা

২০২৫ সালের ২১ ডিসেম্বর পাঁচটি ব্যাংককে একীভূত করা হয়। তখন এসব ব্যাংকের মোট ঋণের পরিমাণ ছিল প্রায় ১ লাখ ৯৬ হাজার কোটি টাকা। এর মধ্যে খেলাপি ঋণের হার ছিল ৪৮ থেকে ৯৭ শতাংশ পর্যন্ত।

তীব্র তারল্য সংকটে গ্রাহকদের আমানত ফেরত দেওয়ার সক্ষমতাও হারিয়ে ফেলেছিল ব্যাংকগুলো। সেই প্রেক্ষাপটে রাষ্ট্রীয় গ্যারান্টিতে গ্রাহকদের সুরক্ষা দিতে ‘সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংক’ গঠনের উদ্যোগ নেওয়া হয়।

ব্যাংকটির অনুমোদিত মূলধন ধরা হয় ৪০ হাজার কোটি টাকা। কিন্তু নতুন করে পুঁজি জোগাড়, ব্যবস্থাপনায় সমন্বয় ও গ্রাহকের আস্থা ফেরানো—কোনো ক্ষেত্রেই দৃশ্যমান অগ্রগতি হয়নি বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।

বাংলাদেশ ব্যাংকের মুখপাত্র আরিফ হোসেন খান সম্প্রতি বলেন, এখন পর্যন্ত উল্লেখযোগ্য উন্নতি হয়নি। দেশি-বিদেশি কোনো বিনিয়োগকারীও বড় আগ্রহ দেখায়নি।

বিশেষজ্ঞদের মতে, ব্যাংক খাতে সুশাসন নিশ্চিত করতে ব্যর্থতার দায় শুধু গ্রাহকদের ওপর চাপানো যায় না। রাষ্ট্র ও নিয়ন্ত্রক সংস্থাকেও দায় নিতে হবে।

ড. আহসান হাবীব বলেন, যেখানে আর্থিক খাতে অপরাধ বা নিয়ন্ত্রক ব্যর্থতা থাকে, সেখানে দায় সরকারেরও। কারণ আর্থিক অপরাধ ঠেকানো সাধারণ মানুষের দায়িত্ব নয়।

তার মতে, পরিস্থিতি সামাল দিতে গ্রাহকের স্বার্থকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ নিতে হবে।

সূত্র: বিবিসি বাংলা