তিন মাসে বাণিজ্য ঘাটতি সাড়ে ৭ বিলিয়ন ডলার

চলতি অর্থবছরের প্রথম তিন মাসে (জুলাই-সেপ্টেম্বর) দেশের বাণিজ্য ঘাটতি বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৭৪৭ কোটি ডলারে। একই সময়ে চলতি হিসাবে ১৩৩ কোটি ডলারের ঘাটতি তৈরি হয়েছে। অন্যদিকে বিদেশি বিনিয়োগ ও ঋণপ্রবাহ প্রত্যাশিত হারে না বাড়ায় সামগ্রিক লেনদেনের ভারসাম্যেও ঘাটতি বেড়ে ১১৬ কোটি ডলারে দাঁড়িয়েছে। রেমিট্যান্সে ভালো প্রবৃদ্ধি থাকার পরও বৈদেশিক লেনদেনে এ চাপ তৈরি হয়েছে।
বিশ্ববাজারে জ্বালানি ও ভোগ্যপণ্যের মূল্যবৃদ্ধির কারণে আমদানি ব্যয় বেড়ে যাওয়াকে বাণিজ্য ঘাটতি বৃদ্ধির অন্যতম কারণ হিসেবে দেখছেন সংশ্লিষ্টরা। অন্যদিকে দেশের শিল্প খাতের স্থবিরতা ও জ্বালানি সংকটের কারণে প্রত্যাশিত হারে বাড়ছে না রপ্তানি আয়। ফলে আমদানি ও রপ্তানির মধ্যে ব্যবধান ক্রমেই বাড়ছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, চলতি অর্থবছরের প্রথম তিন মাসে দেশে পণ্য আমদানি হয়েছে ১ হাজার ৯৩৩ কোটি ডলারের। আগের অর্থবছরের একই সময়ের তুলনায় আমদানি বেড়েছে ১৫ দশমিক ১০ শতাংশ। বিপরীতে পণ্য রপ্তানি হয়েছে ৮৩৮ কোটি ডলারের, যা আগের অর্থবছরের একই সময়ের তুলনায় ৭ শতাংশ বেশি। আমদানি ও রপ্তানির এই ব্যবধানের ফলেই বাণিজ্য ঘাটতি বেড়ে ৭৪৭ কোটি ডলারে পৌঁছেছে।
আমদানি ব্যয় বৃদ্ধির পেছনে সবচেয়ে বড় ভূমিকা রেখেছে জ্বালানি তেল আমদানি। বাংলাদেশ ব্যাংকের হিসাবে, চলতি অর্থবছরের জুলাই-সেপ্টেম্বর সময়ে অপরিশোধিত জ্বালানি তেল, পেট্রোলিয়ামজাত পণ্য ও লুব্রিকেন্ট আমদানিতে ব্যয় হয়েছে ৪২২ কোটি ডলার। আগের অর্থবছরের একই সময়ে এ খাতে ব্যয় হয়েছিল ২০৫ কোটি ডলার। অর্থাৎ এক বছরের ব্যবধানে জ্বালানি ও পেট্রোলিয়ামজাত পণ্য আমদানিতে ব্যয় বেড়েছে ১০৫ শতাংশ।
সংশ্লিষ্টদের মতে, আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানির উচ্চমূল্যের কারণে দেশের আমদানি ব্যয়ে বড় ধরনের চাপ তৈরি হয়েছে। একই সঙ্গে শিল্প উৎপাদন ও রপ্তানি খাতে প্রত্যাশিত গতি না থাকায় বৈদেশিক মুদ্রা আয়ের প্রবৃদ্ধিও আমদানি ব্যয়ের সঙ্গে তাল মেলাতে পারছে না। ফলে দেশের বৈদেশিক বাণিজ্যের ভারসাম্য ক্রমেই চাপে পড়ছে।
বাণিজ্য ঘাটতি বাড়ার প্রভাব পড়েছে দেশের চলতি হিসাবের ভারসাম্যেও। অর্থবছরের প্রথম দুই মাসে (জুলাই-আগস্ট) চলতি হিসাবে ৫৯ কোটি ডলারের উদ্বৃত্ত ছিল। তবে সেপ্টেম্বর শেষে তা ঘাটতিতে পরিণত হয়েছে। তিন মাস শেষে চলতি হিসাবের ঘাটতি দাঁড়িয়েছে ১৩৩ কোটি ডলারে।
অর্থাৎ মাত্র এক মাসের ব্যবধানে চলতি হিসাবের অবস্থানে বড় পরিবর্তন হয়েছে। অথচ এ সময়ে প্রবাসী আয় বা রেমিট্যান্সে ১৩ শতাংশের বেশি প্রবৃদ্ধি ছিল। তারপরও আমদানি ব্যয়ের চাপ সামাল দেওয়া সম্ভব হয়নি।
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কর্মকর্তারা জানান, রপ্তানি ও রেমিট্যান্সের মাধ্যমে দেশে যে পরিমাণ বৈদেশিক মুদ্রা আসছে, আমদানির বিপরীতে তার চেয়ে বেশি ডলার ব্যয় হচ্ছে। ফলে চলতি হিসাবের ভারসাম্যে ঘাটতি তৈরি হয়েছে। আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি ও অন্যান্য পণ্যের মূল্যবৃদ্ধি এ পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে।
এদিকে চলতি অর্থবছরের প্রথম দুই মাসে আর্থিক হিসাবে ঘাটতি থাকলেও সেপ্টেম্বর শেষে তা আবার উদ্বৃত্ত ধারায় ফিরেছে। তিন মাস শেষে আর্থিক হিসাবে উদ্বৃত্তের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৩২ কোটি ডলার। মূলত প্রত্যক্ষ বিদেশি বিনিয়োগ (এফডিআই), বিদেশি অনুদান ও ঋণপ্রবাহ কিছুটা বাড়ায় আর্থিক হিসাবের অবস্থার উন্নতি হয়েছে। তবে গত অর্থবছরের একই সময়ের তুলনায় এ উদ্বৃত্ত অনেক কম।
বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, গত অর্থবছরের প্রথম তিন মাসে আর্থিক হিসাবে উদ্বৃত্ত ছিল ১৭৯ কোটি ডলার। ওই সময়ে বিদেশি ঋণ এসেছিল প্রায় ১০০ কোটি ডলার। কিন্তু চলতি অর্থবছরের একই সময়ে বিদেশি ঋণ এসেছে এর অর্ধেক। ফলে আর্থিক হিসাবে কিছুটা উন্নতি হলেও আগের বছরের তুলনায় বিদেশি অর্থায়নের প্রবাহ কম রয়েছে।
অর্থনীতিবিদদের মতে, বৈদেশিক মুদ্রার সরবরাহ স্বাভাবিক রাখতে রপ্তানি ও রেমিট্যান্সের পাশাপাশি প্রত্যক্ষ বিদেশি বিনিয়োগ এবং বিদেশি ঋণপ্রবাহ বাড়ানো জরুরি। কিন্তু বিনিয়োগ ও ঋণপ্রবাহ প্রত্যাশিত মাত্রায় না বাড়লে বৈদেশিক লেনদেনের ওপর চাপ আরও বাড়তে পারে।
বাণিজ্য ঘাটতি বাড়লেও এতদিন দেশের সামগ্রিক বৈদেশিক লেনদেনের ভারসাম্যে বড় ধরনের সংকট তৈরি হয়নি। তবে চলতি অর্থবছরের শুরু থেকেই বিদেশি অর্থায়ন কমে যাওয়ায় পরিস্থিতির অবনতি হচ্ছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, চলতি অর্থবছরের প্রথম দুই মাসেই সামগ্রিক লেনদেনের ভারসাম্যে ৬৯ কোটি ৪০ লাখ ডলারের ঘাটতি তৈরি হয়েছিল। সেপ্টেম্বর শেষে সেই ঘাটতি বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১১৬ কোটি ডলারে।
অর্থাৎ তিন মাসে দেশের সামগ্রিক বৈদেশিক লেনদেনের ঘাটতি আরও বেড়েছে। রেমিট্যান্সে শক্তিশালী প্রবৃদ্ধি থাকলেও বাণিজ্য ঘাটতি এবং বিদেশি অর্থায়নের স্বল্পতা সামগ্রিক ঘাটতি পূরণে বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে। এতে দেশের বৈদেশিক খাতের ওপর নতুন করে চাপ তৈরি হয়েছে।
এ বিষয়ে বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্বাহী পরিচালক ও মুখপাত্র আরিফ হোসেন খান বলেন, জ্বালানি আমদানির উচ্চ ব্যয়ের কারণে বাণিজ্য ঘাটতি বাড়ছে। আন্তর্জাতিক বাজার থেকে জ্বালানি সংগ্রহ করতে গিয়ে এর মূল্য আগের তুলনায় দ্বিগুণ হয়ে গেছে। এতে সামগ্রিক ব্যয়ের ওপর বড় ধরনের চাপ তৈরি হয়েছে।
তিনি বলেন, এ পরিস্থিতি কিছুটা অর্থনৈতিক চাপ সৃষ্টি করলেও তা দীর্ঘস্থায়ী হবে না বলে আশা করা হচ্ছে। পরিস্থিতি আবার স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরে আসবে বলেও আশাবাদ ব্যক্ত করেন কেন্দ্রীয় ব্যাংকের এ মুখপাত্র।
সংশ্লিষ্টদের মতে, বৈদেশিক বাণিজ্যের ভারসাম্য স্বাভাবিক রাখতে আমদানি ব্যয় নিয়ন্ত্রণের পাশাপাশি রপ্তানি আয় বাড়ানো, শিল্প উৎপাদনে গতি ফেরানো এবং বিদেশি বিনিয়োগ আকর্ষণ করা জরুরি। একই সঙ্গে জ্বালানি সরবরাহ পরিস্থিতির উন্নতি না হলে উৎপাদন ও রপ্তানি খাতের প্রত্যাশিত প্রবৃদ্ধি অর্জন কঠিন হয়ে পড়তে পারে। ফলে আগামী মাসগুলোতে বৈদেশিক লেনদেনের পরিস্থিতি কোন দিকে যায়, তা অর্থনীতির জন্য গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে।
(2)-6182f1.jpg)


