রপ্তানি বাণিজ্য বাড়াতে নতুন বাজার ও চুক্তির সন্ধানে বাংলাদেশ: বাণিজ্যমন্ত্রী

দেশের রপ্তানি বাজারের পরিধি বাড়াতে এবং একটিমাত্র খাতের ওপর নির্ভরতা কমিয়ে আনতে সরকার বিশ্বের বিভিন্ন দেশের সঙ্গে নতুন বাণিজ্য চুক্তি ও বাজার সম্প্রসারণের জোর প্রচেষ্টা চালাচ্ছে বলে জানিয়েছেন বাণিজ্যমন্ত্রী খন্দকার আব্দুল মুক্তাদির।
সোমবার (৮ জুন) জাতীয় সংসদে জামালপুর-৩ আসনের সরকারি দলের সংসদ সদস্য মো. মোস্তাফিজুর রহমান বাবুলের এক লিখিত প্রশ্নের জবাবে তিনি এ তথ্য জানান।
বাণিজ্যমন্ত্রী জানান, দেশের মোট রপ্তানি আয়ের প্রায় ৮৪ শতাংশই আসে তৈরি পোশাক (আরএমজি) খাত থেকে। এই একক নির্ভরতা কমিয়ে আনতে সরকার চামড়া ও চামড়াজাত পণ্য, পাট ও পাটজাত পণ্য, কৃষিপণ্য, ওষুধশিল্প, আইসিটি ও সফটওয়্যার সেবা, লাইট ইঞ্জিনিয়ারিং, হিমায়িত খাদ্য ও মাছ এবং প্লাস্টিক পণ্যের মতো সম্ভাবনাময় খাতগুলোকে একই ধরনের নীতিগত সুবিধা প্রদান করছে।
তিনি আরও উল্লেখ করেন, জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) নির্দেশনা অনুযায়ী এসব খাতের আংশিক রপ্তানিকারকদের ব্যাংক গ্যারান্টির বিপরীতে বন্ড সুবিধা দেওয়া হয়েছে। এ ছাড়া আঞ্চলিক পর্যায়ে রপ্তানি বৃদ্ধি ও পণ্যের বৈচিত্র্যকরণে জাপানের ‘ওয়ান ভিলেজ ওয়ান প্রোডাক্ট’ মডেলের আদলে দেশে ‘ওয়ান ডিস্ট্রিক্ট ওয়ান প্রোডাক্ট (ওডিওপি)’ কর্মসূচি চলছে। এর আওতায় ইতিমধ্যেই দেশের ৬৪ জেলার জন্য ১৪টি পণ্য নির্ধারণ করা হয়েছে।
স্বল্পোন্নত দেশের (এলডিসি) তালিকা থেকে বাংলাদেশের উত্তরণের চ্যালেঞ্জ প্রসঙ্গে খন্দকার আব্দুল মুক্তাদির বলেন, এলডিসি উত্তরণের ফলে অগ্রাধিকারমূলক বাজার সুবিধা হারানোর একটি ঝুঁকি রয়েছে, যা প্রায় ১৭ দশমিক ৫ বিলিয়ন মার্কিন ডলারের রপ্তানি বাণিজ্যে প্রভাব ফেলতে পারে।
এই পরিস্থিতি মোকাবিলায় বাংলাদেশ ইতিমধ্যেই জাপানের সঙ্গে অর্থনৈতিক অংশীদারি চুক্তি (ইপিএ) সই করেছে। পাশাপাশি দক্ষিণ কোরিয়ার সঙ্গে সিইপিএ চুক্তির আলোচনা চলছে।
এ ছাড়া ইউরোপীয় ইউনিয়ন, আরসিইপি সদস্য দেশসমূহ, সংযুক্ত আরব আমিরাত, সিঙ্গাপুর, ইন্দোনেশিয়া, চীনসহ অন্যান্য সম্ভাব্য বাজারের সঙ্গে ইপিএ, সিইপিএ ও মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি (এফটিএ) নিয়ে আলোচনা অব্যাহত রয়েছে।
মন্ত্রী জানান, রপ্তানি প্রবৃদ্ধি টেকসই করতে এবং বৈশ্বিক বাণিজ্যে দেশের অবস্থান সুদৃঢ় করার লক্ষ্যে ‘রপ্তানি নীতি ২০২৪-২০২৭’ প্রণয়ন করা হয়েছে। প্রথাগত বাজার হিসেবে পরিচিত যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপের বাইরে নতুন বাজার ধরার লক্ষ্যে ব্রাজিল, মধ্যপ্রাচ্য, জাপান, কানাডা, অস্ট্রেলিয়া, সিআইএসভুক্ত দেশ এবং আফ্রিকার বিভিন্ন দেশে আয়োজিত আন্তর্জাতিক বাণিজ্য মেলাগুলোতে বাংলাদেশ সক্রিয়ভাবে অংশ নিচ্ছে। একই সঙ্গে লাতিন আমেরিকা, আফ্রিকা ও সিআইএস অঞ্চলে বাংলাদেশি পণ্যের শুল্কমুক্ত প্রবেশাধিকার নিশ্চিত করতে সরকারি ও বেসরকারি খাতের যৌথ বাণিজ্য প্রতিনিধিদল পাঠানো হচ্ছে।
শুল্ক ও অশুল্ক বাধা দূরীকরণে দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্য চুক্তির উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে জানিয়ে মন্ত্রী বলেন, রপ্তানিকারকদের উৎসাহিত করতে সিআইপি মর্যাদা ও এক্সপোর্ট ট্রফি দেওয়া হচ্ছে। সেই সঙ্গে তাদের দক্ষতা বাড়াতে নিয়মিত প্রশিক্ষণ, সেমিনার ও কর্মশালার আয়োজন করা হচ্ছে। কাঁচামাল আমদানির সুবিধার্থে এক্সপোর্ট ডেভেলপমেন্ট ফান্ড (ইডিএফ) থেকে আর্থিক সহায়তার পাশাপাশি রপ্তানিমুখী শিল্পের জন্য বাংলাদেশ ব্যাংক ৫ হাজার কোটি টাকার একটি প্রি-শিপমেন্ট ঋণ তহবিল গঠন করেছে, যেখান থেকে স্বল্প সুদে ঋণ সুবিধা পাচ্ছেন উদ্যোক্তারা।
তিনি জানান, বিদেশে অবস্থিত বাংলাদেশের মিশনগুলোর মাধ্যমে অর্থনৈতিক কূটনীতি জোরদার করা হয়েছে এবং সেখানকার বাণিজ্য উইংগুলো রপ্তানি বৃদ্ধি ও দেশীয় পণ্যের ব্র্যান্ডিংয়ে কাজ করছে। পণ্যের বৈচিত্র্য, প্রতিযোগিতা সক্ষমতা, নারীর ক্ষমতায়ন ও কর্মসংস্থান সৃষ্টিতে অবদানের জন্য সরকার ‘পেপার অ্যান্ড প্যাকেজিং প্রোডাক্টস’কে ২০২৬ সালের বর্ষসেরা রপ্তানি পণ্য ঘোষণা করেছে।
পণ্যের মান ও বৈচিত্র্য বাড়াতে প্রতিবছর ঢাকা আন্তর্জাতিক বাণিজ্য মেলার আয়োজন অব্যাহত রয়েছে উল্লেখ করে বাণিজ্যমন্ত্রী বলেন, ২০২৫-২৬ অর্থবছরে রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরো (ইপিবি) ‘গ্লোবাল সোর্সিং এক্সপো’ আয়োজন করেছে, যা রপ্তানি উন্নয়নে নতুন মাইলফলক। একই সময়ে ইপিবি ৪৬টি আন্তর্জাতিক বাণিজ্য মেলাকে তাদের ক্যালেন্ডারে অন্তর্ভুক্ত করেছে এবং ঢাকা আন্তর্জাতিক বাণিজ্য মেলার পার্শ্ব-আয়োজন হিসেবে ৮টি সেমিনারের আয়োজন করেছে।
মন্ত্রী আরও জানান, বৈশ্বিক মূল্য শৃঙ্খলে (গ্লোবাল ভ্যালু চেইন) অংশগ্রহণ বাড়াতে এবং রপ্তানিনির্ভর বিনিয়োগ আকর্ষণে এফটিএ, ইপিএ ও সিইপিএভিত্তিক উদ্যোগ চালু রয়েছে। এলডিসি উত্তরণ এবং বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থার (ডব্লিউটিও) নিয়ম মেনে নগদ সহায়তার পরিবর্তে আন্তর্জাতিক মানদণ্ডসম্মত বিকল্প প্রণোদনা ব্যবস্থা চালুর বিষয়েও সরকার কাজ করছে।
এলডিসি-উত্তর সময়ে দেশের নির্বিঘ্ন ও টেকসই অগ্রগতি নিশ্চিত করতে দক্ষিণ কোরিয়া, সিঙ্গাপুর, চীন, ভারত, ইন্দোনেশিয়া, নেপাল, সংযুক্ত আরব আমিরাত, মালয়েশিয়া ও শ্রীলঙ্কার সঙ্গে অর্থনৈতিক অংশীদারি আরও গভীর করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এছাড়া জিসিসি, মার্কিনোসুরভুক্ত দেশ, রাশিয়া, পূর্ব ইউরোপ, পূর্ব এশিয়া এবং আফ্রিকার বিভিন্ন দেশের সঙ্গে বাণিজ্য চুক্তির সম্ভাব্যতা সমীক্ষা চলছে। ভিয়েতনাম, হংকং, তুরস্ক ও নাইজেরিয়ার সঙ্গে এফটিএ স্বাক্ষরের সম্ভাব্যতা সমীক্ষাও যথাসময়ে সরকারি অনুমোদনের জন্য উপস্থাপন করা হবে বলে জানান বাণিজ্যমন্ত্রী।