logo

শরিয়া গভর্ন্যান্স নিশ্চিতে বোর্ডকে আইনি সুরক্ষা দিতে হবে: গভর্নর

শরিয়া গভর্ন্যান্স নিশ্চিতে বোর্ডকে আইনি সুরক্ষা দিতে হবে: গভর্নর

ইসলামি ব্যাংকিং সঠিক পথে ফেরাতে হলে শরিয়া বোর্ডকে কার্যকর ও শক্তিশালী করতে হবে বলে জানিয়েছেন বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর মো. মোস্তাকুর রহমান। তিনি বলেন, শরিয়া গভর্ন্যান্স নিশ্চিত করতে বোর্ডকে আইনি সুরক্ষা দিতে হবে।

সম্প্রতি বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রধান কার্যালয়ে শরিয়া বিশেষজ্ঞ, আলেম এবং ইসলামি ব্যাংকের শরিয়া বোর্ডের প্রতিনিধিদের সঙ্গে অনুষ্ঠিত মতবিনিময় সভায় এ কথা জানান তিনি। ‘ইসলামি ব্যাংকিংয়ের বর্তমান পরিস্থিতি, চ্যালেঞ্জ ও ভবিষ্যৎ করণীয়’ শিরোনামে এ সভা হয়। 

মঙ্গলবার (৭ এপ্রিল) বাংলাদেশ ব্যাংকের পাঠানো এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে এ তথ্য নিশ্চিত করা হয়েছে।  

ইসলামি ব্যাংকিংয়ের শরিয়া বোর্ডের ক্ষমতায়নের ওপর জোর দিয়ে মো. মোস্তাকুর রহমান বলেন, ইসলামি ব্যাংকিং সঠিক পথে ফেরাতে হলে শরিয়া বোর্ডের সিদ্ধান্তকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিতে হবে। পরিচালনা পর্ষদের প্রভাবমুক্ত রাখতে হবে। স্বাধীনভাবে কাজের আইনি নিশ্চয়তা দিতে হবে। শক্তিশালী শরিয়া গভর্ন্যান্স নিশ্চিত হলেই প্রকৃত তদারকি ফিরে আসবে। তখন ব্যাংকে অনিয়ম বন্ধ হবে। কেউ ব্যাংকের অর্থ পাচার করতে পারবে না। তখন ইসলামি ব্যাংকিংয়ের ওপর আস্থা বাড়বে। 

দেশের ইসলামি ব্যাংকিং খাতে সুশাসন প্রতিষ্ঠা, জবাবদিহিতা নিশ্চিতকরণ এবং শরিয়া মান্যতা শক্তিশালী করতে বড় ধরনের সংস্কারের ইঙ্গিত দেন গভর্নর। তিনি জানান, শরিয়া বোর্ডের সদস্যরা স্বাধীনভাবে কাজ করবেন, কেন্দ্রীয় ব্যাংক তাদের পূর্ণ সুরক্ষা দেবেন। 

অতীতে ইসলামি ব্যাংকিং খাতের কয়েকটি প্রতিষ্ঠানে অর্থপাচারের ঘটনা ঘটেছে বলে জানান গভর্নর। তার মতে, এর অন্যতম কারণ ছিল যথাযথ তদারকির অভাব।

মোস্তাকুর রহমান বলেন, ইসলামি ব্যাংকিং মূলত সম্পদভিত্তিক কাঠামোর ওপর পরিচালিত হওয়ার কথা। কিন্তু বাস্তবে সেই কাঠামো পুরোপুরি অনুসরণ না হওয়ায় ক্ষতির ঘটনা ঘটেছে, যা উদ্বেগজনক। এমন ঘটনার পুনরাবৃত্তি ঠেকাতে বাংলাদেশ ব্যাংক বদ্ধপরিকর। 

 

সভায় আলেমরা ইসলামি ব্যাংকিং খাতের সংকট উত্তরণে ২০ দফা সুপারিশ তুলে ধরেন। এর মধ্যে রয়েছে—

  • মৌলিক নীতির বাস্তবায়নের লক্ষ্যে সুদমুক্ত ব্যবস্থা নিশ্চিত করা।
  • প্রতারণামুক্ত লেনদেন ও লাভ-ক্ষতি ভাগাভাগিভিত্তিক বিনিয়োগ। 
  • তদারকি ও কাঠামোগত সংস্কারের মাধ্যমে শরিয়া সুপারভাইজরি কমিটি।
  • সেক্রেটারিয়েট ও অডিট শক্তিশালী করা।
  • বড় বিনিয়োগে অন্তত ৩ সদস্যের শরিয়া অনুমোদন বাধ্যতামূলক করা।
  • মুরাকিবদের (শরিয়াহ অডিটর) সুরক্ষা নিশ্চিত করা। 
  • আইনি ও প্রাতিষ্ঠানিক ব্যবস্থা পরিপালনের মাধ্যমে স্বতন্ত্র ‘ইসলামি ব্যাংকিং আইন’ প্রণয়ন করা। 
  • কেন্দ্রীয় ব্যাংকে ইসলামি ব্যাংকিংয়ের জন্য আলাদা ডেপুটি গভর্নর ও পৃথক কমপ্লায়েন্স বিভাগ গঠন। 
  • স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতার জন্য বছরে অন্তত একবার বাহ্যিক শরিয়া অডিট, শরিয়া কমপ্লাইন্স রেটিং চালু করা।
  • আলাদা কোর ব্যাংকিং সিস্টেম প্রচলন করা। 
  • মানবসম্পদ উন্নয়নের জন্য ব্যাংক পরিচালক ও এমডিদের শরিয়া জ্ঞান বাধ্যতামূলক করা। 
  • আলেমদের প্রশিক্ষণ দিয়ে ব্যাংকে অন্তর্ভুক্তি করা। 
  • বিশ্ববিদ্যালয়ে ইসলামি অর্থনীতি বিভাগ চালু করা। 
  • আর্থিক ও বাজার সংস্কারের লক্ষ্যে শরিয়াসম্মত মুদ্রাবাজার উপকরণ চালু করা। 
  • তারল্য ব্যবস্থাপনা শক্তিশালী করা।
  • খেলাপি বিনিয়োগ দ্রুত আদায়ে কার্যকর নীতিমালা প্রচলন করা। 
  • ইসলামি ব্যাংকিং যথাযথভবে পরিচালনা নিশ্চিত করার লক্ষ্যে কঠোর শাস্তির মাধ্যমে অর্থপাচার বন্ধ করা। 
  • বড় দুর্নীতিকে রাষ্ট্রদ্রোহ হিসেবে গণ্য করা।
  • কঠোর ফৌজদারি শাস্তির দাবির বিধান করা।  
  • ইসলামি ব্যাংকিং হাব গড়ার পরিকল্পনা নেওয়া।  

আলোচনায় বাংলাদেশকে ইসলামি ব্যাংকিংয়ের আঞ্চলিক হাব হিসেবে গড়ে তোলার প্রস্তাব উঠে আসে। গবেষণা কেন্দ্র ও সমৃদ্ধ লাইব্রেরি স্থাপন, আন্তর্জাতিক কনফারেন্স আয়োজন, বিশ্বখ্যাত শরিয়া স্কলারদের আমন্ত্রণ ও কনভেনশনাল ব্যাংক ও ইসলামি সেবা বাড়ানোর কথাও বলা হয়।  

সভায় বাংলাদেশ ব্যাংকের শরিয়া অ্যাডভাইজরি বোর্ডের সদস্য অধ্যাপক ড. আবু বকর রফিক, মুফতি শাহেদ রহমানী, ড. মুফতি ইউসুফ সুলতান প্রমুখ উপস্থিত ছিলেন। 

এ ছাড়া সভায় অংশ নেন বিভিন্ন ব্যাংকের শরিয়া বোর্ডের চেয়ারম্যান ও প্রতিনিধি, বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক, ইসলামিক স্কলার ও খ্যাতিমান আলেমরা।